সোনালি দিনের নতুন আহ্বান
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ০৩ মার্চ, ২০১৬ ইং
সোনালি দিনের নতুন আহ্বান
ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং ঐতিহ্যের অংশ।। স্বাদে গন্ধে ইলিশ আমাদের এক অতুলনীয় মত্স্য সম্পদ। দেশের মোট মত্স্য  উত্পাদনে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় ১১%। জিডিপিতে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় ১%। বিশ্বের মোট ইলিশ উত্পাদনের শতকরা ৫০-৬০ ভাগই বাংলাদেশে উত্পাদিত হয়, অবশিষ্ট ২০-২৫% মিয়ানমারে, ১৫-২০% ভারতে এবং ৫-১০% অন্যান্য  দেশে।

পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ইলিশ মাছে আছে উচ্চমাত্রায় আমিষ, চর্বি ও খনিজ পদার্থ। ইলিশ মাছের আমিষে ৯ ধরনের অ্যামাইনো এসিড পাওয়া যায়-যা মানুষের পাকস্থলী উত্পাদন করতে পারে না। ইলিশ মাছের চর্বিতে প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড থাকে। উক্ত অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের প্রায় ২% ওমেগা-৩% ফ্যাটি এসিড-যা মানব দেহের রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করে ও হূদরোগের ঝুঁকি কমায়। তাছাড়া, ইলিশ মাছ খেলে ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ইত্যাদি মারাত্মক রোগ থেকে নিজেকে সুরক্ষা করা যায়।

ইলিশ মাছ সাগরে বড় হয়। ডিম ছাড়ার জন্য এরা মোহনা ও নদ-নদীতে অভিপ্রায়ন করে। ইলিশ মাছ ১-২ বছর বয়সেই  প্রজননক্ষম হয়। ইলিশ মাছ সারা বছরই কমবেশি ডিম দেয়; তবে আশ্বিন মাসই হচ্ছে  ইলিশের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম। এ সময়  শতকরা  ৬০-৭০ ভাগ ইলিশ পরিপক্ব হয় এবং ডিম ছাড়ার উপযোগী অবস্থায় থাকে। তাই আশ্বিন মাসের বড় পূর্ণিমার দিনসহ পূর্বের ৩ দিন ও পরের ১১ দিন অর্থাত্ মোট ১৫ দিন প্রজনন এলাকায় ইলিশ মাছ ধরা বর্তমানে নিষিদ্ধ। মাঠ পর্যায়ের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার নিরীখে মন্ত্রণালয় থেকে বর্তমানে তা ২২ দিন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে; অর্থাত্ আশ্বিন মাসের পূর্ণিমার পূর্বে ৪ দিন, পূর্ণিমার দিন এবং পূর্ণিমার পর ১৭ দিন। এতে নিষিদ্ধকালীন সময় পূর্ণিমা পরবর্তী অমাবশ্যা পর্যন্ত প্রলম্বিত হবে এবং জাটকা অধিকতর সুরক্ষা হবে।

ইলিশের ডিম পরস্ফুিটনের মাধ্যমে ইলিশের বাচ্চা ‘জাটকা তৈরি হয়। ইলিশের পোনাকে (১০ ইঞ্চি/ ২৫ সেন্টিমিটার এর নিচে) জাটকা বলা হয়। আজকের জাটকাই আগামীদিনের ইলিশ। জাটকা নির্বিচারে ধরা হলে ইলিশের উত্পাদন কমে যায়। জাটকা নদ-নদীতে বিচরণ করে। তখন জেলেরা নির্বিচারে জাটকা আহরণ করতে চায়। নির্বিচারে জাটকা ধরা হলে ইলিশ উত্পাদন ও আহরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেন না জাটকা মাছ ইলিশ মাছের নতুন প্রজন্মের প্রবেশন স্তর। তাই জাটকা সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক পরিচালিত গবেষণার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে নভেম্বর-জুন পর্যন্ত জাটকা ধরা, বিক্রয়, পরিবহন ও মজুত মত্স্য সংরক্ষণ আইনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাছাড়া, দেশের ০৫ টি নদ-নদীকে ইলিশ অভয়াশ্রম এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো নিম্ন মেঘনা নদী (চাঁদপুর জেলার ষাটনল হতে লক্ষ্মীপুর জেলার চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত ১০০ কি.মি. এলাকা), শাহবাজপুর চ্যানেল (ভোলা জেলার মদনপুর/চর ইলিশা হতে চর পিয়াল পর্যন্ত ৯০ কি.মি. এলাকা), তেঁতুলিয়া নদী (ভোলা জেলার ভেদুরিয়া হতে পটুয়াখালী জেলার চর রুস্তম পর্যন্ত ১০০ কি.মি. এলাকা), আন্দারমানিক নদী (পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ৪০ কি.মি. এলাকা) এবং নিম্ন পদ্মা নদী (শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া-ভেদরগঞ্জ উপজেলার ২০কি.মি. এলাকা)। বরিশালের হিজলা উপজেলার ৬০ কি.মি. (মেঘনা সংযোগ নদী ধর্মগঞ্জ, নয়া ভাঙ্গানি ও লতা নদী) এলাকাকে ৬ষ্ঠ অভয়াশ্রম ঘোষণা করার প্রস্তাব বর্তমানে বিবেচনাধীন রয়েছে।

 প্রতি বছর নভেম্বর হতে জুন পর্যন্ত জাটকা আহরণ নিষিদ্ধ হলেও মার্চ-এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ পরিমাণে (৬০-৭০%) জাটকা ধরা পড়ে। তাই জেলেদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনা করে একমাত্র আন্দারমানিক নদী ছাড়া অন্যান্য অভয়াশ্রমে মার্চ ও এপ্রিল মাসে সকল প্রকার মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আন্দারমানিক নদীতে সকল প্রকার মাছ ধরা নিষিদ্ধ সময় নভেম্বর-জানুয়ারি। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১৫ দিন ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ থাকায় প্রায় ২৯ হাজার কোটি জাটকা ২০১৪ সালে ইলিশ জনতায় নতুনভাবে সংযুক্ত হয়েছে।

 ইলিশ সম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে জাটকা সুরক্ষার জন্য প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ২-৮ মার্চ দেশে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালিত হচ্ছে। এ বছর জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘জাটকা মাছ বাড়তে দিন, ফিরবে মোদের সোনালি দিন’। জাটকা ধরা, মজুত, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও খাওয়া থেকে বিরত থাকার লক্ষ্যে গণসচেতনতা সৃষ্টিই এ সপ্তাহের মূল উদ্দেশ্য।

দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ ইলিশ সম্পদ রক্ষার জন্য বর্তমান সরকারের আমলে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ভিজিএফ কর্মসূচির ব্যাপ্তি পূর্বের ১০টি জেলা থেকে বাড়িয়ে ১৬টি জেলায় সম্প্রসারিত করা হয়েছে। নতুন জেলাসমূহ হলো- নোয়াখালী, বাগেরহাট, মানিকগঞ্জ, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম ও মাদারীপুর। এই ১৬টি জেলার ৮৮টি উপজেলায় মোট ২,২৪,০০০টি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ভিজিএফ চাল পরিবার প্রতি মাসিক ১০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ইতোমধ্যে ৪০ কেজি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত ১ লক্ষ ৫৮ হাজার মে.টন চাল জেলেদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ভিজিএফ চাল প্রদানের ফলে তাদের অন্নের সংস্থান সুনিশ্চিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে জেলেরা স্বপ্রণোদিত হয়ে জাটকা আহরণ থেকে বিরত থাকছে। ফলে ইলিশের আকার অনেক সুষম হয়েছে এবং বাজারে অধিক হারে ইলিশ মাছ পাওয়া যাচ্ছে। চলতি বছরে ইলিশের মূল্য ও প্রাপ্যতা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে ছিল। এটা একটি আশার দিক এবং বর্তমান সরকারের যুগান্তরকারী সাফল্য। তবুও সমুদ্র জয় এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে ইলিশ নিয়ে নতুন ভাবনা ও গবেষণার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিককালে ছোট ছোট ইলিশে ডিম পাওয়া যাচ্ছে। এটি একটি উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এ নিয়ে কাজ করছে। ইলিশের প্রজনন হার ৫০% এর অধিক কিভাবে বৃদ্ধি করা যায় সে বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করতে হবে। অপরদিকে, ইলিশ সম্পদ সুরক্ষায় বাংলাদেশ যেভাবে কাজ করছে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ একইভাবে এগুচ্ছে কি-না সে বিষয়েও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। কেন না ইলিশ একটি অভিপ্রায়ণকারী মাছ।

n লেখক :মত্স্য বিষয়ক গবেষক

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩ মার্চ, ২০২১ ইং
ফজর৫:০৪
যোহর১২:১১
আসর৪:২৪
মাগরিব৬:০৫
এশা৭:১৮
সূর্যোদয় - ৬:১৯সূর্যাস্ত - ০৬:০০
পড়ুন