ভূমিকম্প ও অবশ্য করণীয় নির্দেশনা
ভূমিকম্প ও অবশ্য করণীয় নির্দেশনা
মূলত ভূমিকম্প হলো- ভূ-পৃষ্ঠে সংঘটিত হঠাত্ ও অস্থায়ী কম্পন, যা ভূ-অভ্যন্তরস্থ শিলারাশিতে সঞ্চিত শক্তির বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এটি উক্ত শিলারাশির সঞ্চিত শক্তির অবমুক্তির কারণে সৃষ্ট। আর এ স্পন্দনের মাত্রা মৃদু বা প্রচণ্ড হতে পারে। এটি তরঙ্গ গতির বিশেষ ধরনের শক্তি, যা স্বল্প পরিসরে উদ্ভুত হয়ে উত্স থেকে ছড়িয়ে পড়ে এবং যা কয়েক সেকেন্ড থেকে এক মিনিট বা এর অধিক স্থায়ী হতে পারে। যে বিন্দুতে ভূমিকম্পের তরঙ্গ সূচিত হয়, তাকে কেন্দ্র বলে এবং এর থেকে সব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর এ কেন্দ্র থেকে ঠিক ভূ-উপরস্থ বিন্দুতে অনুভূত হয়, তাকে উপকেন্দ্র (Epicenter) বলে। আর এ উপকেন্দ্রেই প্রথম ঝাঁকি (Jerking) অনুভব হয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, কেন্দ্রের গভীরতা অনুযায়ী ভূমিকম্পকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়, যেমন- অগভীর কেন্দ্র (০-৭০ কি.মি.), মাঝারি কেন্দ্র (৭০-৩০০ কি.মি.) এবং গভীর কেন্দ্র (৩০০ কি.মি বা তার চেয়ে বেশি)। এদিকে ভূমিকম্পের আকার ও তীব্রতা মাপার জন্যে প্রচলিত মাপক হচ্ছে রিখটার স্কেল।

বাংলাদেশের ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাধীনের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, প্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ বছর পর পর বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়ে থাকে। ১৬৬৪ সালে যে, ভূমিকম্প হয়েছিল তার তীব্রতা ছিল ভয়ানক। সে হিসেবে যে কোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প বাংলাদেশে হতে পারে। এ দেশের ৪৩% জায়গা অধিক, ৪১% মাঝারি, আর ১৬% কম ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকম্প স্থান হিসেবে চিহ্নিত। বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, রংপুর, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও পাহাড়ি এলাকা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া বাংলাদেশে বেশ কিছু এলাকা ফল্টি জোন, এ সব স্থানে বড় ধরনের ফাটল বিরাজ করছে। এগুলো হলো আসাম ও বাংলাদেশের সীমানা বরাবর, সিলেট ও ময়মনসিংহের ডাউকি জোন, মধুপুর, সীতাকুন্ড এবং পাবর্ত্য চট্টগ্রাম। এ সব ফল্টি জোনে ভূমিকম্পের মাত্রা ৭ থেকে ৮ রিখটার স্কেলে হতে পারে, যার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। আর অগোছালো ও অপরিকল্পিত জনবহুল ঢাকার রাজধানীর কথা পূর্বেই বলেছি যে এর অবস্থান ফল্টি স্থান থেকে মাত্র ২৫ হতে ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে। এটা সত্য যে, শহরাঞ্চলের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করে মাটি ও ইমারতের অবকাঠামোর উপর। এ ক্ষেত্রে আমরা স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি, বিল্ডিং কোড মানা হয় না। ৫ তলার প্লানে ৬-৭ তলা পর্যন্ত করে থাকি। রাস্তা প্রশস্ত রাখতে চাই না, খোলা মাঠ নেই বললেই চলে। এক্ষেত্রে একটি বাস্তব ঘটনা তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছি। কয়েকদিন আগে রাজাবাজারে একটি বাচ্চা ছেলে ওয়াল বেয়ে উঠতে গিয়ে পা ফসকে পড়ে মারা যায়। তখন দুঃখ করে একজন পথচারী বলেছিল, মরবে না কেন? ঢাকা শহরে বলতে গেলে কোনো খোলা জায়গা বা মাঠ নেই, যেখানে বাচ্চারা খেলতে পারে। তাই আর কি করা খেলার ছলে ওয়াল বাওয়া ছাড়া আর কি করবে? যাহোক, এদিকে ভূমিকম্প হলে জরুরি অবস্থা মোকাবিলার জন্য ফায়ার সার্ভিস এবং সেনাবাহিনীকে এক্ষেত্রে আরও আধুনিক সাজ-সজ্জায় প্রশিক্ষিত করা আবশ্যক এবং একই সাথে সব ধরনের ডিভাইসসহ লজিস্টিক সাপোর্ট আনুপাতিক হারে বাড়াতে হবে।

ভূমিকম্পের সময় অবশ্য করণীয় জরুরি নির্দেশনা

প্রথম ঝাঁকুনির সাথে-সাথে দ্রুত খোলা জায়গায় আশ্রয় নিন। রুম বা ঘর থেকে বের হওয়া অথবা সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়ে আশে-পাশের লোকজনকে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ স্বরে ঘর থেকে বের হতে বলুন। ভূমিকম্প শেষ হওয়ার পরও অন্তত ত্রিশ মিনিট খোলা জায়গা বা রাস্তায়  থাকুন, কেননা  ভূমিকম্পের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আধা ঘণ্টার মধ্যে পুনরায় ভূমিকম্প হতে পারে। বের না হতে পারলে, পাকা বাড়ি হলে শক্ত কলামের গোড়ায় আশ্রয় নিন অথবা শক্ত খাট বা টেবিলের নিচে বসে থাকুন। যদি বাইরে থাকেন, ফাঁকা জায়গায় অবস্থান নিন। গাছ-পালা, ভবন ও লাইট পোস্ট থেকে দূরে থাকুন। ভূকম্পনের সময় বর্ণিত যে কোনো এক স্থানে বসে হাঁটুকে কোলের কাছে এনে মাথা গোড়ালির উপর রেখে হাত মাথার পিছনে রেখে অবস্থান করুন। অনতিবিলম্বে বৈদ্যুতিক ও গ্যাসের সুইচ বন্ধ করে দিন। সাথে কিছু নেওয়ার জন্য অযথা সময় নষ্ট করবেন না, মনে রাখবেন জিনিসপত্রের চেয়ে জীবনের মূল্য অধিক। ভূমিকম্প চলাকালীন সময়ে লিফ্্ট ব্যবহার করবেন না। গাড়িতে থাকাকালীন সময়ে চালককে গাড়ি থামিয়ে রাখতে বলুন এবং সে সময়ে সেতু পার হবেন না। কোনো অবস্থায় তাড়াহুড়া করবেন না। দুর্ভাগ্যবশত ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়লে, সাহস হারাবেন না। কেন না উত্তেজনা ও ভয় অধিকতর ক্ষতিকর হতে পারে। আর মনে রাখবেন মানুষ মানুষের জন্য, তাই বিলম্ব হলেও উদ্ধারকারী দল আসবেই। ভূমিকম্পে আহতদের জন্য সম্মিলিতভাবে জরুরি চিকিত্সার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। এ প্রেক্ষিতে আপনাদের সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, রাস্তা প্রশস্ত হলে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারকারী-টিম দ্রুত আসতে পারবে। কেন না এতটুকু সময়ের জন্য অনেক মূল্যবান জীবন বেঁচে যেতে পারে। আর এ বিপন্ন জীবন আমার কিংবা আপনার, এমনকি সকল মহল্লাবাসীরই হতে পারে।

n লেখক : গবেষক

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৭ জুলাই, ২০২১ ইং
ফজর৪:০২
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৪৭
এশা৮:০৮
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:৪২
পড়ুন