সুস্থ্য জীবনের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক
ড. মিহির কান্তি মজুমদার০৮ আগষ্ট, ২০১৬ ইং
সুস্থ্য জীবনের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক
উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সব সময় সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং সেবা গ্রহণকারী জনগণের মধ্যে একটি দূরত্ব থাকে। সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের অবস্থানিক দূরত্ব ও সীমাবদ্ধতা, সেবা গ্রহণকারীর অর্থনৈতিক অবস্থা, অসেচতনতা ইত্যাদি এ দূরত্বের প্রধান নিয়ামক। চিকিত্সা সেবা গ্রহণ এবং গমনের জন্য অর্থের যেমন প্রয়োজন (Money Cost) তেমনি নিজের বা পরিবারের কোনো সদস্যকে চিকিত্সা কেন্দ্রে নেবার জন্য কাজ বন্ধ রাখতে হয় (Time Cost)। চিকিত্সা গ্রহণের বিষয়ে অসচেতনতা বা প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো চিকিত্সা গ্রহণ না করার প্রবণতাও (Awareness Cost) এ দূরত্ব সৃজনে ভূমিকা রাখে। এই Money Cost, Time Cost ও Awareness Cost কমিয়ে সেবা প্রদান ও সেবা গ্রহণের মধ্যকার দূরত্ব কমানোর জন্যই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি অন্যতম প্রধান উদ্যোগ কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা। চিকিত্সা সেবা গ্রাম পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্থায়ী কেন্দ্রের মাধ্যমে সেবা প্রদানের প্রয়োজনে প্রতি ৬০০০ পরিবারের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ১৩২০০ কমিউনিটি ক্লিনিক। প্রকল্পের মাধ্যমে সৃজিত এসব কমিউনিটি ক্লিনিকে একজন করে কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা কর্মী (Community Health Care Provider) আছেন। প্রতি কমিউনিটি ক্লিনিকের এলাকায় আছে কমিউনিটি গ্রুপ ও সাব-গ্রুপ। প্রকল্প শেষে স্বাস্থ্য বিভাগের অপারেশন প্ল্যানের আওতায় বর্তমানে এসব কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালিত হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসব কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনার  জন্য একটি ট্রাস্ট গঠনের নির্দেশনা দিয়েছেন যা প্রক্রিয়াধীন আছে।

কাজেই, পল্লী অঞ্চলে তৃণমূল পর্যায়ে সৃজিত ও পরিচালিত কমিউনিটি ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করাই এখন প্রধান কাজ। আমাদের দেশের অধিকাংশ জনগণ এখনও গ্রামে বাস করেন। স্বাধীনতার সুফল হিসেবে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের সাথে গ্রামের সমাজ জীবনের ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যেখানে দরিদ্র ছিল ৮২% তা আজ ২২.৫% নেমে এসেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সর্বক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন মাপকাঠীতে বাংলাদেশ এখন অনেক দেশের চেয়ে অগ্রগামী। এসব উন্নয়নের পরেও গ্রামাঞ্চলে কম হলেও শোষণ, বঞ্চনা, অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিভাজন এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাত আছে- এগুলো যেমন সত্য। তেমনি আরও বেশি সত্য যে গ্রামীণ জনপদে সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সমবেদনা ও সমঝোতার একটি শক্ত জমিন আছে। বিভিন্ন ধনী-দরিদ্র্য, দক্ষ-অদক্ষ নানা শ্রেণি ও পেশার এবং বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষের অবস্থান হলেও গ্রামাঞ্চলে তাদের মধ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক এবং ঐতিহ্যগত একটি ঐক্যের দৃশ্যমান উপস্থিতি আছে। এই ঐক্য এক সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য, বসবাসযোগ্য ও উন্নয়নের পরিবেশ সৃজনে প্রধান ভূমিকা রাখে। শিক্ষা, কর্ম বা অন্য যেকোনো কারণে গ্রাম ছেড়ে যারা শহরে বা দূরদেশে অবস্থান করেন, এই সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত ঐক্যের জন্যই তারা যেকোনো সার্বজনীন উত্সব সকলের সাথে ভাগাভাগি করে উদযাপনের জন্য শত কষ্ট উপেক্ষা করে গ্রামে ফিরে যান। গ্রামের আত্মীয়, নিকটাত্মীয় বা অনাত্মীয় লোকজনের সাথে আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করা বা তাদের উন্নয়নে কাজ করা বা তৃপ্তি লাভ করার জন্য যে দায় কাজ করে, তাকে বলা হয় Individual Social Responsibility (ISR)| এই ISR হচ্ছে Corporate Social Responsibility (CSR) এর ভিত্তি। এই ISR এর কারণেই আমরা হূদয়ের মধ্যে স্বদেশের একটি সুন্দর চিত্র লালন করি। আর তা হলো আমাদের নিজ নিজ গ্রাম। ব্যক্তি জীবনের এই ISR এবং পল্লী অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ঐতিহ্যগত বুনন যত শক্তিশালী হবে, সমাজ শরীর তত সুস্থ থাকবে, প্রবৃদ্ধি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাবে ও তা আরো বেশি টেকসই হবে।

দারিদ্র্য শুধুমাত্র দরিদ্র মানুষের সাথে বাস করে। কিন্তু রোগ ধনী-দরিদ্র বিচার করে না। বরং কিছু সংক্রামক রোগ নির্মূল হওয়ায় বা এসব রোগের প্রতিকার ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ায় এবং গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ায় সচ্ছল মানুষের মধ্যে অনেক রোগের প্রবণতা এখন বেশি। সেক্ষেত্রে এরূপ সার্বজনীন স্বাস্থ্য সমবায়ের মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলের জনগণকে সংগঠিত করে কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত করা গেলে তা কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনায় স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করবে এবং একইসঙ্গে কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিত্সা সেবা প্রদান ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যেটুকু ব্যবধান এখনও আছে তা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। এ ব্যবস্থাপনা যেমনি ব্যক্তি ও পরিবারে চিকিত্সা সেবা গ্রহণে তথা সুস্থ জীবন-যাপনে অবদান রাখবে, একই সঙ্গে  পল্লী অঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মধ্যে প্রবাহিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় করবে। এসব কমিউনিটি স্বাস্থ্য সেবা সমবায় সমিতির মাধ্যমে প্রত্যেক উপজেলায় প্রতি বছর স্বাস্থ্য মেলার আয়োজন করার সুযোগ আছে। এ সামাজিক ঐক্য বৃদ্ধির এরূপ স্বাস্থ্য মেলার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সম্পর্কিত তৃণমূল পর্যায়ের সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ অবদান রাখবে। কারণ সচেতনতা বৃদ্ধিতে মেলা আবহমান গ্রাম-বাংলার একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার।  সে প্রেক্ষাপটে সরকারের অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় বিবেচনাধীন ৬৫০০ সমন্বিত গ্রাম উন্নয়ন সমবায় গঠনের জন্য প্রণীত সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্পের সমবায় সমিতিসমূহ কমিউনিটি ক্লিনিকভিত্তিক সৃজন ও পরিচালনা করা যেতে পারে। সমিতির নাম সার্বিক কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য নাম প্রদান করা যেতে পারে। কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনায় জনগণের সম্পৃক্তকরণ ও অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করার প্রক্রিয়া বর্তমানে পরীক্ষাধীন আছে। অপরদিকে সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায়ের মাধ্যমে সমাজ শরীরের ঐতিহ্যগত ঐক্য বৃদ্ধি ও দারিদ্র্র্য বিমোচন প্রমাণিত হয়েছে। কাজেই বিবেচনাধীন প্রকল্পটিকে কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত করে ব্যক্তি ও সামাজিক সুস্থতায় বিশেষ অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি অত্যন্ত যৌক্তিক। এ কার্যক্রমে সমাজের সকলের অংশগ্রহণ ব্যক্তির সুস্থতা যেমন নিশ্চিত করবে, তেমনি সমাজ শরীরের সুস্থতায় তা দৃশ্যমান অবদান রাখবে। একই সঙ্গে তা দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখবে, যা একটি টেকসই উন্নয়নের জন্য অতীব জরুরি। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক এরূপ সকল সমবায়কে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে পারবে।

n লেখক :সাবেক সচিব, চেয়ারম্যান পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক


এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ আগষ্ট, ২০১৯ ইং
ফজর৪:০৯
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৪০
এশা৭:৫৯
সূর্যোদয় - ৫:৩১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
পড়ুন