ভর্তিযুদ্ধ ও শিশুযোদ্ধা
চিররঞ্জন সরকার০৮ ডিসেম্বর, ২০১৬ ইং
ভর্তিযুদ্ধ ও শিশুযোদ্ধা
লেখাপড়া শিখে যে কিছু হয় না— একথা চিরকালই লোকে জানতো। তাই কোনো যুগেই চালাক লোকেরা খুব একটা লেখাপড়া করেনি। সেই যে ছড়া ছিলো, যা একসময় প্রাথমিক শ্রেণিতে পড়ানো হতো—‘লেখাপড়া করে যে/গাড়ি ঘোড়া চড়ে সেই’—এটা যে একটা ডাহা মিথ্যে, এটা সবাই জানে। আমাদের সমাজে কজন মাস্টারের গাড়ি আছে, নিজের গাড়ি চড়েন? সবচাইতে নামকরা যে মাস্টার তাকেও জেলি কিংবা মাখন ছাড়া পাউরুটি চিবোতে হয়। গাড়ি তো অনেক দূরের কথা। অথচ তার চেয়ে কম লেখাপড়া জানা একজন ব্যবসায়ীর গাড়ি আছে, একটি নয় বহুক্ষেত্রে একাধিক। তবু অবশ্য মানুষ শেখে। শুধু লেখাপড়াই নয়, অনেক কিছুই শেখে। দেখে শেখে, ঠেকে শেখে। একেকজন একেক রকমভাবে শেখে। এই দেখার, শেখার বা জানার শেষ নেই।

বর্তমান যুগে অবশ্য লেখাপড়া সিরিয়াস বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এখন যেনতেনভাবে শিখলে বা পড়লে কাজ চলে না। এখন ‘উন্নত’ ও ‘আধুনিক’ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হয়। এজন্য অবশ্য আলাদা ব্যবস্থা আছে। আছে ‘ভালো’ স্কুল। তবে এসব ‘ভালো স্কুলে’ ভর্তি হওয়া সহজ ব্যাপার নয়। কারণ ভালো স্কুলের সংখ্যার তুলনায় এসব স্কুলে ভর্তি হতে, পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। প্রত্যেক অভিভাবকই চায় তার সন্তান সবচাইতে ভালো স্কুলে পড়ুক, তার সন্তান শ্রেষ্ঠ সন্তানে পরিণত হোক। এজন্য শিশুদের ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকতে পারলে তবেই ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ মেলে। কোমলমতি শিশুদের স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই তাই একজন ‘যোদ্ধায়’ পরিণত হতে হয়। এজন্য এখন আর শিশুদের মধ্যে ‘শিশুত্ব’ দেখা যায় না। মায়ের পেট থেকে বের হয়েই ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য তাদের প্রস্তুত হতে হয়। সহযোদ্ধাদের হারিয়ে সে যেন বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারে—এজন্য দক্ষ যোদ্ধায় পরিণত হওয়ার সাধনা চলে। এতোসব ঝক্কি-ঝামেলার পর শিশুদের মধ্যে আর ‘শিশুত্ব’ থাকেই বা কীভাবে? একালের শিশুরা পরিণত মানুষের মতো কথা বলে, আচরণ করে। বর্তমানে এই শিশুরা ব্যাপক তত্পর হয়ে উঠেছে।

ঢাকা শহরের স্কুলগুলোতে একদিকে চলছে বার্ষিক পরীক্ষা; অন্যদিকে চলছে ভর্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। এ যুদ্ধ যে সবকটি স্কুলে চলছে তা নয়, হাতেগোনা কয়েকটি ভালো বা নামকরা স্কুলেই এ যুদ্ধ সীমাবদ্ধ। অন্য স্কুলগুলো সাধারণ মানের। ওগুলোতে কে ভর্তি হলো আর কে হলো না, সে খবর কেউ রাখে না। আর ওসব স্কুলের খবর রাখার মতো ‘অসাধারণরা’ আসেও না। ওসব স্কুলে ভর্তি হয় নিম্নবিত্ত কিংবা নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানরা। তাদের আর পরিবারে আদর কতোটুকু? তাদের অভিভাবকদেরও হয়তো সাধ আছে ভালো স্কুলে পড়ানোর। কিন্তু সেই সাধ্য তাদের নেই। তাদের সন্তানদের সেই যোগ্যতাও নেই। কারণ ‘যোগ্যতা’ হলো তৈরি করার ব্যাপার। এজন্য প্রাইভেট টিউটর লাগে, কোচিং সেন্টারে ভর্তি করতে হয়। ভালো খাবার ভালো পরিবেশসহ আরো অনেক কিছুই লাগে। আর এসবের জন্য চাই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। যাদের পেটের চিন্তায়ই মাথায় টাক পড়ে যায়, তারা আর কীভাবে সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়ানোর স্বপ্ন দেখবে? কাজেই নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়া, সেই ভর্তির জন্য যুদ্ধ করা একেবারেই অবান্তর। যেনতেন একটি স্কুলে নামটা কোনো মতে তুলে দিতে পাড়লেই এই শ্রেণির অভিভাবকরা বর্তে যায়। সেই স্কুলে লেখাপড়া হলো কী হলো না, পাস করলো না ফেল করলো—তাতে তাদের কিছুই যায় আসে না।

ভর্তিযুদ্ধটা মূলত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানদের। এসব অভিভাবক তাদের সন্তানদের ‘সেরা’ ও ‘ক্ষমতাবান’ বানানোর স্বপ্ন দেখেন, সেরা মানুষ। তাই তো সবচাইতে ভালো স্কুলে সন্তানদের তারা ভর্তি করাতে চান। অর্থবিত্ত, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আর উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে যারা তাদের সন্তাদের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধায় পরিণত করতে পারেন, তারাই এই ভর্তি যুদ্ধে জয়ী হয়। ভালো স্কুলে পড়তে পারাটা বর্তমানে পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। অল্প কয়েকজন সোনার-সন্তান এই সৌভাগ্য অর্জন করে। উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তানরাই বর্তমানে সব ভালো স্কুল দখল করে আছে।

আর একালের উচ্চবিত্ত ঘরের শিশু সন্তানরা একেকটা আজব চিজ। অদ্ভুত তাদের চরিত্র, আচার-আচরণ। তারা কখন যে কিসে খুশি হবে—তা আগে থেকে কিছুই বলা যায় না। দেখা যায়, অনেক দামি জিনিস পেয়েও তারা গোমরা। আবার অনেক সময় সামান্য জিনিসেই মহাখুশি। তবে একালের বড়লোকের-রত্নরা খাওয়ার ব্যাপারে ভীষণ কৃপণ। কিছুতেই ভালো কিছু খাবে না। চিজে অরুচি, আঙুর-আপেল-কমলা ছুঁড়ে মারবে, ডিম, দুধ কিংবা চিকেন সুপ দিলে বমি করবে। খাওয়াতে হলে এখন ঘুষ লাগে। কার্টুন চালাতে হবে। আইসক্রিম, ফ্রেন্স ফ্রাই, ড্রিংকস, চিকেন ফ্রাই চাই। আধুনিক সব খেলনা সামগ্রীর স্তূপ তৈরি করতে হবে। এরপরও দাপাদাপি লাফালাফি। অনেক সাধ্য-সাধনার পর কোনো কিছু মুখে পুরলেও পুরতে পারে। রুটিনমাফিক তাদের জীবন। ব্যাকরণমাফিক তাদের চলাফেরা। এক ঘণ্টা পর টিউটর বদল। মিউজিকের টিচার গেলেন তো ম্যাথমেটিকসের টিচার এলেন। এভাবে একের পর এক ড্রইং, ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ, জেনারেল নলেজ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের বিভিন্ন টিচারের আসা-যাওয়া। সকালে স্কুল তো দুপুরে ড্রইং ক্লাস। বিকেলে সুইমিং তো সন্ধ্যায় মিউজিক। পাঁচ বছরের বাচ্চার স্কুলে ভর্তি হওয়ার যে প্রস্তুতি, তা যেনো বিসিএস পরীক্ষার্থীদেরও হার মানায়। এই শিশুরা ঝকঝকে পোশাক পরে। কাগজ-কলম নয়, ল্যাপটপ-কিংবা ট্যাবে অক্ষরজ্ঞান শেখে। নভোচারীর মতো পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে গম্ভীরভাবে স্কুলে যায়। এরা বেশি কথা বলে না। সারাক্ষণ কবি জীবনানন্দের মতো নির্বাক, উদাসীন। সকাল হলেই এসব আত্মম্ভরী উদাসীন শিশু বাবার গাড়িতে চড়ে একটা অহংকারী স্কুলে যায়। স্কুল শেষে প্রাচুর্যের আলো ঝলকানো মায়ের সঙ্গে ফিরে আসে। এভাবে রাজধানীতে কেমন আলাদাভাবে বেড়ে উঠছে এক বিশেষ নতুন প্রজন্ম। পরিকল্পিত অভিজাত শিক্ষা তাদের খাপছাড়া করে গড়ে তুলছে। শিকড়হীন-মাটিহীন আবছায়া অন্ধকারে বেড়ে ওঠা এই অগ্রসরমান নতুন প্রজন্ম ভবিষ্যতে কেমন মানুষ হবে।

দেশপ্রেমী, বন্ধুবত্সল, সমাজ সচেতন, পরোপকারী, ত্যাগী, দয়ালু, দরিদ্রবান্ধব-এর কোনো একটির বিশেষণ কি আচরণ ও কর্ম দেখে বসানো যাবে তাদের নামের সামনে? বাংলাদেশ কি তাদের ধারণ করতে পারবে, নাকি চিরতরে কোনো এক চির বসন্তের দেশে তারা পাড়ি জমাবে? তারা কি রাজনীতিবিদ হবে, সচিবালয়ের কর্মকর্তা হবে, ব্যাংকের পরিচালক হবে, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ পদে বসবে? নাকি তারা বিল গেটস হবে? স্টিভ জবস হবে? নাকি লাদেন হবে?

নতুন যুগের বড়লোকের বাচ্চাদের নিয়ে আসলে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করা যাচ্ছে না! এ বড় আজব চিজ!

n লেখক :রম্য লেখক

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ নভেম্বর, ২০২০ ইং
ফজর৫:০৭
যোহর১১:৫১
আসর৩:৩৬
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩৩
সূর্যোদয় - ৬:২৭সূর্যাস্ত - ০৫:১০
পড়ুন