লালব্রিজ গণহত্যা :মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায়
ইমরান মাহফুজ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৬ ইং
লালব্রিজ গণহত্যা :মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায়
একাত্তরের নয় মাস পাকিস্তানি ঘাতকদের এক জল্লাদখানা ও বধ্যভূমি আবিষ্কারের চাঞ্চল্যকর সংবাদ সমপ্রতি এক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের এ এক অজানা অধ্যায়।

চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা থানার রেলব্রিজ সংলগ্ন যুদ্ধকালীন পাক ঘাতকরা ট্রেন থামিয়ে স্বাধীনতাকামী প্রায় দুই হাজার নারী-পুরুষকে হত্যা করে রেলব্রিজের পাশে ওয়াপদা ভবনের বাউন্ডারির মধ্যে ও পার্শ্ববর্তী দু’টি বধ্যভূমিতে পুঁতে রাখে। চাঞ্চল্যকর এই তথ্য ও বধ্যভূমির স্থান চিহ্নিত করেছেন আলমডাঙ্গা শহরের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সবেদ আলী এবং গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী বধ্যভূমি পার্শ্ববর্তী কামালপুরের ৭০ বছরের কৃষক আবুল হোসেন। আবুল হোসেন এই নিবন্ধকারকে জানান, তাঁর জমিতেই প্রায় এক হাজার নারী-পুরুষকে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে পুঁতে রেখেছে। আলী আজগর ও ছকো আলীসহ অনেকে জানান, মুক্তিযুদ্ধের পর পাক হানাদারদের নৃশংসতা খুঁজতে গিয়ে ’৭১-এর জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে রেলব্রিজের কাছের ওই বধ্যভূমি খনন করে চার শ’ মানুষের মাথার খুলি ও হাড়গোড় তুলে ছবি তুলে রাখা হয়েছিল। তবে ওখানে আরো প্রায় এক-দেড় হাজার দেহাবশেষ রয়েছে। প্রচণ্ড গ্যাসের কারণে আর না তুলে উত্তোলিত দেহাবশেষ ওখানে পুঁতে রাখা হয়েছে।

পাকিস্তানি হানাদারদের জল্লাদখানা মিরপুরের বধ্যভূমি গেলে স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের মাথার খুলি ও হাড়গোড় খুলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনুরূপভাবে আলমডাঙ্গায় পাক হানাদারদের জল্লাদখানা এবং তার পাশের বধ্যভূমি খনন করলে স্বাধীনতাকামী প্রায় দু’হাজার শহীদের কঙ্কাল উদ্ধার হবে। এতে স্বাধীনতা যুদ্ধের এক ঐতিহাসিক গণকবরের সন্ধান মিলবে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের এক ঐতিহাসক গণকবরের সন্ধান মিলবে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে হানাদার ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বর্বরতার আরো প্রমাণ পাওয়া যাবে।

বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, যুদ্ধকালীন আলমডাঙ্গা রেলব্রিজের পাশের মাছহাটের কাছে পাক হানাদাররা ডাউন ট্রেন থামিয়ে স্বাধীনতাকামী মানুষকে ট্রেন থেকে নামিয়ে পাশেই ওয়াপদার শেডের মধ্যে আটক রেখে সুন্দরী নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাত। পরে তাদের হত্যা করে বধ্যভূমিতে পুঁতে রাখত। পুরুষদের দিয়ে বধ্যভূমির গর্ত খনন শেষে হত্যা করে তার মধ্যে ফেলে দিত।

এই গণহত্যার প্রধান হোতা ছিল মেজর জয়েন্ট, মেজর রানা, মেজর আজম খান, ক্যাপ্টেন নকভি এবং হাবিলদার এনায়েত খান। আবুল হোসেন (কৃষক) জানান, বাঁশের আগা সুচালো করে মানুষকে খুঁচিয়ে হত্যা করত হাবিলদার এনায়েত। আবুল হোসেনের সামনেই প্রায় ২০ জনকে হত্যা করেছে। এই ব্রিজের উত্তর পাশের একটি বাগানেও রয়েছে আরো একটি বধ্যভূমি, যেখানে আরো কয়েক শ’ মানুষকে হত্যা করে পুঁতে রাখা হয়। সম্প্রতি বধ্যভূমির খনন এবং সেখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায়ে আলমডাঙ্গাতে পাক হানাদারদের বর্বরতার আরেকটি প্রমাণ।

গণহত্যা—নির্যাতনের পটভূমি

মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের জন্য ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ৬ এপ্রিলের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যাপকভাবে আকাশ ও স্থলপথে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র আনতে থাকে। পাকিস্তান বাহিনীর ব্যাপক আক্রমণের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা কুষ্টিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। যতদূর জানা যায়—পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কুষ্টিয়া শহর দখল ও ঢাকার গণহত্যার খবর খুব দ্রুত কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা মহকুমা আলমডাঙ্গাসহ গ্রাম পর্যায়েও পৌঁছে যায়।

যশোর সেক্টরের নিয়ন্ত্রণাধীন ৪নং ইপিআর উইংএর সদর দপ্তর ছিল চুয়াডাঙ্গা। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃস্থানীয় সংগঠকসহ সকলেই ধারণা করেছিলেন যে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে। সাধারণ জনগণ যেন হতাশ হয়ে না পড়ে, সেজন্য তাদেরকে উদ্দীপ্ত রাখা, মুক্তিবাহিনীকে শেল্টার তৈরিতে সাহায্য করা, দেশের ভেতরে থেকে যাওয়া; যুব তরুণদের দেশের ভেতরেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, সর্বোপরি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নীতি ও আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মুজিববাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২৬ জুন পাকিস্তানি বাহিনীর অবাধ রেল-যোগাযোগ বন্ধ করার লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধারা আলমডাঙ্গা রেলস্টশনের দক্ষিণে ছোট ব্রিজটি বিস্ফোরকের সাহায্যে উড়িয়ে দেন। এতে রেল-যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ সম্পর্কে আবদুল কুদ্দুস স্মৃতিচারণে লিখেছেন :‘হান্নান আমি টগরসহ ১০-১২ জন বাজিতপুর ব্রিজের পাশে পজিশন নিই। ক্যানেল দিয়ে পাক সেনারা সারিবদ্ধভাবে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসছে। আমরা প্রস্তুত হয়ে আছি। টগর ভাই এলএমজি চালাচ্ছে। ব্রাশফায়ারে বেশ কয়েকজন সেনা নিহত হয়েছিল। ওদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র, বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু করলে হান্নানের নির্দেশে সবাই পিছু হটি। কিন্তু টগর ভাইয়ের এলএমজি জাম করে, সে অস্ত্র গুছিয়ে আনতে যেয়ে পাক সেনাদের আয়ত্তে পড়ে যায়। পাক সেনাদের গুলিতে টগর ভাইয়ের মাথার খুলি উড়ে যায়। তারপর তার দেহ ঝাঁঝরা করে দেয়। আমরা সবাই পালাতে সক্ষম হলাম। পিছনে পড়ে রইল একই সাথে ট্রেনিং নেওয়া বড় ভাই শহীদ টগরের লাশ।’ কথাগুলো বলতে বলতে আব্দুল কুদ্দুসের চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। সে বলে, রাজাকার, আলবদর ও পাক সেনারা শহীদ টগরের লাশ গরুর গাড়ির সঙ্গে বেঁধে আলমডাঙ্গার রাস্তায় ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায়। সেদিন ১৪ আগস্ট। ওরা এতেও ক্ষান্ত হয়নি। আলমডাঙ্গা চারতলার মোড়ে একটি টেলিফোনের পোলের সাথে দু’পা উপরে বেঁধে মাথা নীচু করে প্রায় দুই দিন ঐভাবে রেখে দিয়েছিল। আলমডাঙ্গার পিস কমিটির চেয়ারম্যান ইউসুফ মিয়া, মোল্লা পরিবার, ইব্রাহিম কসাই ও বহু রাজাকার ঐ লাশ নিয়ে আনন্দ মিছিল করেছে বলে শুনেছিলাম। তার এই করুণ কাহিনী সকল মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে তীব্র প্রতিহিংসা জাগিয়ে তোলে।

n লেখক : কবি ও সম্পাদক কালের ধ্বনি

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ নভেম্বর, ২০২০ ইং
ফজর৫:০৭
যোহর১১:৫১
আসর৩:৩৬
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩৩
সূর্যোদয় - ৬:২৭সূর্যাস্ত - ০৫:১০
পড়ুন