পটকা মাছের বিষাক্ততা ও জনস্বাস্থ্য
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৬ ইং
পটকা মাছের বিষাক্ততা ও জনস্বাস্থ্য
সিলেটের জৈন্তাপুরে পটকা মাছ খেয়ে দুই শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যুর খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আরও ১২ জন একই কারণে আশঙ্কাজনক অবস্থ্ায় হাসপাতালে চিকিত্সাধীন -যা উদ্বেগজনক। এ ধরনের খবর প্রায় প্রতিবছরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে থাকে।  অথচ পটকা মাছ জাপানে একটি দামি ও সুস্বাদু মাছ হিসাবে পরিচিত। জাপানিদের নিকট পটকা মাছ তাদের ঐতিহ্যের একটি অংশ। সাধারণত বড় বড় পার্টিতে স্লাইস (slice) করে কাঁচা (raw) পটকা মাছ উপস্থাপন করা হয়। জাপানি ভাষায় এটাকে “ছাসিমি” বলে। কোনো কোনো জাপানি পটকা মাছকে কাজের উদ্যম সৃষ্টির প্রতীক হিসেবে মনে করে। তবুও পটকা মাছ খেয়ে জাপানিরা মারা যায়-যদিও এর সংখ্যা পূর্বের তুলনায় এখন খুবই কম। জাপান ছাড়াও কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, চীন, মেক্সিকো ইত্যাদি দেশে পটকা মাছ খেয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে থাকে। পটকা খেয়ে দুর্ঘটনা ঘটার কারণে এর বিষাক্ততা এবং বিষক্রিয়া সম্পর্কে জাপানে গবেষণা শুরু হয়েছে প্রায় দু’শ’ বছর ধরে। সমগ্র জাপান সাগর এবং এর শাখা প্রশাখা জাপানি বিজ্ঞানীরা চষে বেড়িয়েছে পটকা মাছের বিষাক্ত প্রজাতির সন্ধানে এবং আবিষ্কার করেছে পটকা মাছের বিষের উত্স এবং বিষের মৌলিক উপাদান। জাপানিজ বিষাক্ত পটকার চামড়া (skin), যকৃত (liver) এবং ডিম্বাশয়ে (ovary) সবচেয়ে বেশি বিষ থাকে। পটকা মাছ নিজের জীবন রক্ষার্থে এসব বিষ নিঃসরণ করে থাকে।

বাংলাদেশে সাধারণত দু্ই ধরনের পটকা মাছ পাওয়া যায়, যেমন: স্বাদু পানির পটকা ও লোনা পানির পটকা। স্বাদু পানির পটকা নদ-নদী, খাল-বিল, ডোবা ইত্যাদিতে পাওয়া যায় এবং লোনা পানির পটকা সমুদ্রে পাওয়া যায়। স্বাদু পানির পটকা আকারে লোনাপানির পটকার চেয়ে অপেক্ষাকৃত অনেক ছোট। আমাদের দেশে স্বাদু পানিতে এ পর্যন্ত দুই প্রজাতির পটকা (Tetraodon cutcutia ‰es Chelenodon patoca) পাওয়া গেছে; উভয় প্রজাতির পটকাই সারাবছর কমবেশি বিষাক্ত। কিন্তু আমাদের সামুদ্রিক পটকার প্রজাতির সংখ্যা জানা নেই। তবে সমুদ্রেও বিষাক্ত পটকার সংখ্যা অনেক।  পটকা মাছের বিষ সায়ানাইড (Cyanide) এর চেয়েও অধিকতর বিষাক্ত এবং জীবননাশক। গবেষণায় দেখা গেছে যে, কোনো কোনো সামুদ্রিক পটকা প্রতি গ্রামে ৪০০০ MU পর্যন্ত বিষ (TTX) বহন করে থাকে অর্থাত্ একজন সুস্থ-সবল ব্যক্তি এরূপ বিষাক্ত পটকার তিন গ্রাম খেলেই বিষাক্রান্ত হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যাবে। অনেকের ধারণা পটকা মাছ রান্না করলে এর বিষাক্ততা নষ্ট হয়ে যায়। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। অত্যধিক তাপে বিষের উপাদান (Chemical Structure) এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তর হতে পারে-কিন্তু এতে বিষাক্ততার খুব একটা তারতম্য হয় না।    

রোগীর দেহে পটকা মাছের বিষক্রিয়ার মাত্রা গৃহীত বিষের পরিমাণের উপর নির্ভর করে। স্বাদু পানি এবং মিঠাপানির পটকার বিষাক্ততার লক্ষণ রোগীর দেহে প্রায় একইরকম। পটকা মাছের বিষকে Neurotoxin কিংবা Sodium channel blocker বলা হয়। পটকা মাছের বিষ মানব দেহের নার্ভ  সেলের Voltage-gated sodium ion channel-এর সাথে শক্তিশালী বন্ধন তৈরি করে। ফলে সোডিয়াম প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এতে মানবদেহে ইলেকট্রোলইটিক্যাল ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয় ও ভোক্তা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পটকা মাছের বিষাক্ততায় একঘন্টার মধ্যে পর্যায়ক্রমে রোগীর  ঠোঁট ও জিহবায় জড়তা,  মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, মুখে শুষ্কতা, মাংসপেশীতে ব্যথা ইত্যাদি নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পর্যায়ক্রমে রোগী  পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে থাকে। পরিণামে চার থেকে ছয় ঘন্টার মধ্যে শ্বাসকষ্টে মৃত্যুও হতে পারে। তাই রোগীর প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে স্থানীয় হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে এবং চিকিত্সা গ্রহণ করতে হবে।

পটকা মাছের বিষ (টেট্রোডোটক্সিন) শুধুমাত্রা পটকা মাছেই নয় অন্যান্য জীবেও পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে: কতিপয় প্রজাতির অকটোপাস, স্টার ফিশ, শামুক, আফ্রিকান ব্যাঙ, ঝিনুক, নিউট, ফ্লাটওয়ার্ম, ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদি। বিভিন্ন প্রজাতিতে টেট্রোডোটক্সিন এর এরূপ উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের নিকট এখনও রহস্যময়। 

n লেখক: বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন বিজ্ঞানী


এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ নভেম্বর, ২০২০ ইং
ফজর৫:০৭
যোহর১১:৫১
আসর৩:৩৬
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩৩
সূর্যোদয় - ৬:২৭সূর্যাস্ত - ০৫:১০
পড়ুন