বিজ্ঞানই প্রমাণ করেছে মায়ের ভাষা মধুর থেকেও মধুর
ড. এজাজ মামুন২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ইং
বিজ্ঞানই প্রমাণ করেছে মায়ের ভাষা মধুর থেকেও মধুর
ভা ষার মাধ্যমে যোগাযোগ তৈরির সক্ষমতা হলো একমাত্র মানবীয় গুণাবলী যা অন্য প্রাণীর মাঝে নেই। কবে, কখন, কিভাবে ভাষার সৃষ্টি হয়েছে তা এখনো আমাদের অজানা। সারাবিশ্বে সাত হাজারের মতো ভাষা থাকলেও এর উত্পত্তি কিভাবে হলো, কেনইবা হলো, এর প্রয়োজনীয়তাইবাকি তা এখনো আমরা সঠিকভাবে জানিনি। কিন্তু আমাদের মায়ের ভাষার যে মায়াজাল আমাদের জড়িয়ে আছে তা আমরা যুগপত্ হূদয় ও মনন দিয়ে উপলব্ধি করি । 

যোগাযোগ, ভালোবাসা, অনুবেদন, একাত্মতার মধ্য দিয়েই শিশু ও জনক-জননীর মাঝে যোগসূত্র রচনা হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন এর মাঝে সবচে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনকজননী ও শিশুর মধ্যকার কথোপকথন,  ভাষার আদান-প্রদান। পৃথিবীকে পরিচিত করবার প্রথম প্রয়াস মায়ের কণ্ঠ শিশুকে কাছে ডেকে নেয়, মায়ের আত্মার বাঁধন জড়িয়ে নেয়। শিশুটিও তখন থেকেই বুঝে নেয় এই তার মায়ের ভাষা।  আর এই মায়ের ভাষাই শিশুর মানসিকতা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রথম খোরাক। শিশুও তার অজান্তেই মায়ের এই ভাষায় কথা বলে, তার হূদয়ের আকুতি জানায়। সে সেভাবেই তৈরি হয়।  শুধু তাই নয়, শিশুর জন্মের আগেই মাতৃগর্ভে থাকার সময় মায়ের যে ভাষা আর অনাবিল শব্দগুলো সে শুনেছে সেগুলোও তার চিন্তা আর আবেগ তৈরিতে অনন্য ভূমিকা পালন করে। শিশুকালে হূদয়ের মাঝে গড়ে উঠা ভাষা সারাজীবনের জন্য বেঁচে থাকে । যা সঠিকভাবে প্রমাণিতও হয়েছে। ইতালির মিলানের একদল বিজ্ঞানী প্রমাণ করেছেন শিশু প্রথম মায়ের মুখে যে ভাষাশুনে সে ভাষায় সে পরবর্তীতে কথা বলুক আর না বলুক তা তার মগজে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে সারাজীবনের জন্য। আর তাই হয়তো যেখানেই থাকি না কেন, সময়ের সব স্রোতকে অতিক্রম করে মায়ের ভাষা দিয়েই আমরা আমাদের আবেগ, চিন্তা ও স্বপ্নগুলো সাজাতে সবচে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

মায়ের ভাষার অকৃত্রিম আকর্ষণের পরেও দ্বিতীয় বা অন্য ভাষাকে আমরা যোগাযোগ ছাড়াও আমাদের আবেগ, অনুভূতি, স্বপ্নগুলো সাজাবার একমাত্র মাধ্যম করে গড়ে তুলছি। অথচ সেটাতে কখনোই আত্মার তৃষ্ণা মিটছে না। বিশেষতঃ বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের মায়ের ভাষাকে দূরে সরিয়ে রাখছি কিছুটা অবস্থার স্বীকার হয়ে, কিছুটা আমাদের মানসিক অবস্থান ও অজানা ভয়ে। সন্তানটি প্রবাস জীবনের নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারবে কিনা প্রবাসে অনেকেই এটা নিয়ে ভীত থাকেন। দেশে ও প্রবাসে আমাদের প্রজন্মকে দূরে সরিয়ে রাখছি তার জীবনের শুরুতে ভালোবাসায় গড়া ভাষা থেকে, যা দিয়ে তার আবেগ, ব্যক্তিত্ব ও স্বপ্নগুলো গড়ে উঠেছে।  অথচ বিজ্ঞানই প্রমাণ করছে মায়ের ভাষার অপরিসীম গুরুত্বের কথা। মায়ের ভাষা অথবা দ্বিতীয় কোনো ভাষা মানুষের জ্ঞান অর্জন কিংবা প্রতিনিয়ত কাজের ভাষার সঙ্গে কিংবা কারো কর্ম দক্ষতার  সঙ্গে যে সাংঘর্ষিক নয় এটা এখন প্রমাণিত সত্য।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন পৃথিবীর তাবত্ভাষায় সব মিলিয়ে ৮০০ টি ভাষা শব্দের (phoneme) ব্যবহার হয়। গড়ে মাত্র ৪০টি ভাষা শব্দ ব্যবহার করে একটি ভাষার জন্ম হয়। পৃথক পৃথক সমাহারে এই ভাষা শব্দগুলোই এক ভাষা থেকে অন্য ভাষাকে আলাদা করে। মজার ব্যাপার হলো একটি শিশু এই ৮০০টি ভাষা শব্দের প্রতিটির পার্থক্য বুঝবার এক অনবদ্য দক্ষতা নিয়ে জন্মগ্রহণই করে। অর্থাত্ একজন শিশু একাধিক যে কোনো ভাষা সহজে শিখবার ক্ষমতা রাখে। তাই শিশু যে ভাষার সংস্পর্শে আসবে তাই সে শিখবে। তাই দেশে কিংবা প্রবাসে যে যেখানেই বেড়ে উঠুক না কেনো প্রচলিত ভাষা শেখা ও ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের ভাষা শেখা ও জানতে কোনো বাধা নেই। স্নায়ু মনোরোগ বিজ্ঞানীরা মায়ের ভাষা কিংবা একাধিক ভাষা শিখবার বিষয় নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন আর আমরা জেনেছি মায়ের ভাষা শিখবার পক্ষে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

ছোটবেলা থেকে যারা একাধিক ভাষা জানা ও বলার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠেছে তাদের বিশ্লেষণ করবার ক্ষমতা এক ভাষায় কথা বলা মানুষদের চাইতে অনেক বেশি। শিক্ষার্থীদের মাঝে দেখা গেছে, যারা একাধিক ভাষা জানে তাদের শিক্ষাজীবনের সার্থকতা অনেক বেশি। একাধিক ভাষা জানার সঙ্গে মানুষের জ্ঞান অর্জন করবার পদ্ধতিগত (cognitive) সক্ষমতাও বেড়ে যায়। ভাষা সংস্কৃতির প্রধান উপাদান। যেখানেই বেড়ে উঠুক না কেন মায়ের ভাষা জানার সঙ্গে সঙ্গে অকৃত্রিম বন্ধন তৈরি হয় তার নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে, তার জাতিসত্তা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে। একাধিক ভাষা জানা মানেই এই বিশ্বায়নের যুগে সংস্কৃতি ও জাতিগত বৈচিত্র্যের যে সমাজ গড়ে উঠছে সেটাকে আপন করে নেওয়া। নিজের ভাষার সঙ্গে অন্যের মায়ের ভাষাকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে অন্যকে বুঝতে শেখা। এই সমাজে সঙ্গতি ও ঐকতান তৈরি করা। নিজেকে আরো সামাজিক করে গড়ে তোলা।

সবচে বড় কথা হলো, জীবন নামের এই বহতা নদীর যে গতি রয়েছে তাকে সহজে চলতে দেবার জন্য, আমাদের ভালোবাসা, ভালোলাগা, আবেগ ও অনুভূতিগুলো একান্তই নিজের মতো করে প্রকাশ করবার জন্য মায়ের ভাষার কোনো বিকল্প নেই, বিকল্প হতে পারে না। 

লেখক :প্রবাসীবিজ্ঞানী

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ইং
ফজর৫:১০
যোহর১২:১৩
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৪
সূর্যোদয় - ৬:২৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
পড়ুন