মানুষ সন্ত্রাসী হয়ে জন্মায় না
জাজাফী০৬ জুন, ২০১৭ ইং
মানুষ সন্ত্রাসী হয়ে জন্মায় না
আধুনিক সভ্যতার পরম উত্কর্ষের এই যুগে বিশ্বের প্রায় তিনশ’ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। বর্তমান বিশ্ব ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অপুষ্টি, নিরক্ষরতা, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে আলোচনার শীর্ষে সন্ত্রাসবাদ। বলা হয়ে থাকে, যে একজনের কাছে সন্ত্রাসী, অন্যজনের কাছে সে মুক্তিযোদ্ধা। ইসরাইলি বাহিনী যখন নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালিয়ে নিরপরাধ লোকদের হত্যা করে, তাদের বাড়িঘর ধ্বংস করে তখন তা বিবেচিত হয় আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে। পক্ষান্তরে, ফিলিস্তিনিরা পাল্টা আক্রমণ করলে তা সন্ত্রাসবাদ বলে উচ্চবাচ্য করা হয়। মার্কিন তাঁবেদারী না করলে কিছু রাষ্ট্র হয় সন্ত্রাসীদের মদদদাতা। পক্ষান্তরে, বিভিন্ন গুপ্তহত্যা ও গণহত্যার জন্য তারা যখন সামরিক সহায়তা দেয় তখন তাদেরকে সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করা হয় না। সভ্যতার মুখোশ পরা ক্ষমতাধররা ইসরাইলের মতো একটি আগ্রাসী রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। মূলত যতদিন পর্যন্ত বিশ্বে মৌলিক মানবাধিকার ও সবার জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন পর্যন্ত সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসবাদের সীমারেখা নিরূপণ সম্ভব হবে না।

সন্ত্রাসবাদ বা ‘টেরোরিজম’ শব্দটির উদ্ভব হয় ফ্রান্সে ১৭৮৯-১৭৯৯ সালে ফরাসি বিপ্লব চলাকালীন সময়ে। অনেকেই মনে করেন সন্ত্রাসবাদের কারণ নিয়ে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক। কারণ সন্ত্রাস একটি অশুভ শক্তি এবং একে নির্মূল করাই মূল কথা। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালালে তা আরো সন্ত্রাসের জন্ম দেবে। কেননা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমনকি ধমীর্য় কারণেও সন্ত্রাসবাদের জন্ম হতে পারে। অনেক ধর্মীয় গোষ্ঠী আছে যাদের ধারণা তাদের বিরোধীদের হত্যা করে নির্মূল করতে পারা পুণ্যের কাজ। ফলে এরাই জড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাসবাদে। আমরা কেবল সন্ত্রাসবাদ সন্ত্রাসবাদ করে গলা ফাটাই। সন্ত্রাসবাদকে চিরতরে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য লাখ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করতেও দ্বিধা করি না। কিন্তু কখনো ভেবে দেখি না কেন সন্ত্রাসবাদের জন্ম হয়। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে বৃহত্ রাষ্ট্রগুলো যখন তাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে অন্যায় কর্মকাণ্ডে অর্থনৈতিক ও সামরিক মদদ জোগায় তখন নিরস্ত্র নির্যাতিত জনগণ অনন্যোপায় হয়ে সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়।

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে শুধু ধর্ম ও বর্ণের কারণে অনেক মানুষ প্রতিনিয়ত বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কোনো অঞ্চলের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যখন ধর্মীয় ও বর্ণগত কারণে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তখন মারাত্মক সামাজিক অসন্তোষ ও সন্ত্রাসবাদের জন্ম হয়। অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রগুলোর আগ্রাসন ব্যাপক সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিয়ে গোটা বিশ্বকে বিপজ্জনক করে তুলেছে। ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগে আমরা এর বিকাশ লক্ষ করেছি। এমনকি একবিংশ শতাব্দীতে সভ্যতার চরম উত্কর্ষের এই যুগে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আফগানিস্তান, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে চালানো আগ্রাসন গোটা বিশ্বকে সন্ত্রাসবাদের লীলাভূমিতে পরিণত করেছে। ফলে জন্ম নিয়েছে তালেবান, আল-কায়েদা কিংবা আইএসের মতো সংগঠনগুলো।

যুক্তরাজ্যের অধ্যাপক ড. এন্ড্রু সিল্কের মতে, পাল্টা সন্ত্রাস তথা সন্ত্রাসের মাধ্যমে সন্ত্রাস দমননীতির ফলে সন্ত্রাসবাদ বন্ধ হওয়া তো দূরের কথা, বরং তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। প্রতিটি সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ সন্ত্রাসবাদকে ঘৃণা করে। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তারা বাধ্য হয়ে সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়। তাই যেসব পরিস্থিতির কারণে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্ম হয় সেসব চিহ্নিত করে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে পারলেই কেবল সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করা সম্ভব। বিশ্ব এখন এমন এক সময় পার করছে যখন সন্ত্রাস মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। অধিকারহারা মানুষ অধিকারের জন্য সন্ত্রাসের পথ বেছে নিচ্ছে। আর সেই মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের সন্ত্রাসের পথে ঠেলে দিয়ে আবার সন্ত্রাস দমনের নামেও রাষ্ট্র নিজেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যাচ্ছে।

মানুষ কখনো সন্ত্রাসী হয়ে জন্মায় না, পরিস্থিতিই তাকে সন্ত্রাসী করে তোলে। বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হলে সন্ত্রাসবাদ আপনা-আপনি কমে যাবে। মহাত্মা গান্ধীর ভাষায়: ‘চোখের বদলে চোখ নেওয়ার রীতি গোটা জাতিকে অন্ধ করে দিচ্ছে’। আমরা একটি শান্তিময় বিশ্বের স্বপ্ন দেখি। আগামীর বিশ্ব হোক সন্ত্রাসমুক্ত। নূর হোসেন বেঁচে থাকলে হয়তো নতুন করে বুকে-পিঠে লিখতেন: ‘সন্ত্রাসবাদ নিপাত যাক, গোটা বিশ্ব শান্তি পাক’।

n  লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৬ জুন, ২০২০ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৪৬
এশা৮:১০
সূর্যোদয় - ৫:১০সূর্যাস্ত - ০৬:৪১
পড়ুন