উপাচার্যহীন বিশ্ববিদ্যালয় অভিভাবকহীন জীবন
জাজাফী২৫ জুন, ২০১৭ ইং
উপাচার্যহীন বিশ্ববিদ্যালয় অভিভাবকহীন জীবন
আ মাদের জীবনটা হঠাত্ করে লাটাইবিহীন ঘুড়ির মতো হয়ে গেছে। কারো হাতে লাটাই না থাকায় ঘুড়ি যেমন ইচ্ছেমতো যেদিকে খুশি চলে যায়, তেমনি আমরাও কোনো এক অজানার দিকে পা বাড়াচ্ছি। দৈনিক ইত্তেফাকসহ দেশের অন্যান্য পত্রিকায় একটি শিরোনাম দেখলাম— উপাচার্য ছাড়া চলছে ৩৩ বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা হলাম একটা ঘুড়ি যে ঘুড়ির লাটাই থাকার কথা উপাচার্যের হাতে। কিন্তু লাটাইবিহীন ঘুড়ি ঠিকই আছে তবে সেই লাটাই ধরে রাখার কেউ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় আছে, আর আছে অগণিত ছাত্র-ছাত্রী কিন্তু নেই একজন অভিভাবক। আর অভিভাবকহীন জীবন কেমন হতে পারে তা নিশ্চয়ই আমাদের কারো অজানা নয়। আমরা ধানক্ষেতে যখন সেচ দেব বলে শ্যালো মেশিন চালু করি তখন একটা নালার মতো করে পানিকে সঠিক পথে ধান ক্ষেতে নিয়ে যাই। যদি ওই নালা না কাটা হতো তাহলে পানি ধান ক্ষেতে সঠিকভাবে পৌঁছাতে পারতো না। অভিভাবকহীন জীবনটাও ঠিক একই রকম। অভিভাবক না থাকায় তাই আমাদের জীবনটাও সঠিকভাবে এগোচ্ছে বলে মনে করি না।

মাঝিবিহীন নৌকা কি ঠিকভাবে তীরে ভিড়তে পারে? যে সব বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যহীনভাবে মাসের পর মাস কাটিয়ে দিচ্ছে তারা তো অনেকটা মাঝিবিহীন নৌকার মতো। যে নৌকায় অগণিত শিক্ষার্থী উঠেছে কিন্তু তারা অভিভাবকহীন, মাঝিবিহীন। কিন্তু কথা হলো সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়টা যদি একটা নৌকা হতো তাহলে শিক্ষার্থীরাই গান গাইতে পারতো— “তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে..আমরা ক’জন নবীন মাঝি, হাল ধরেছি শক্ত করে”। কিন্তু হায়! আফসোস, এটা এমন একটা নৌকা যেখানে ছাত্ররা নবীন মাঝি হয়ে হাল ধরতে পারছে না। তাদেরকে চলতে হচ্ছে মাকড়শার বাচ্চার মতো। মাকড়শার বাচ্চা জন্ম নেবার পর তাদের কোনো অভিভাবক থাকে না। ফলে নিজেদের মতো করেই বেঁচে থাকতে হয়, বেড়ে ওঠা শিখতে হয়। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই সেখানকার শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রী সবাই নিজেদের মতোই বাঁচতে থাকে।

শিক্ষাজীবন শেষে ছাত্র-ছাত্রীরা যে সনদ লাভ করে তাতে উপাচার্যের সিগনেচার থাকা বাধ্যতামূলক; অন্যথায় সেই সনদের কোনো মূল্য নেই। উপাচার্যহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যারা পাস করে বের হচ্ছে তারা কি তবে সনদ ছাড়াই বেরিয়ে যাচ্ছে? বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিকল্প পথ হিসেবে অস্থায়ী কাউকে হয়তো সেই পদে আসীন করে রেখেছেন যিনি সিগনেচার দিচ্ছেন যা আদতে আইনসিদ্ধ নয়। ফলে যদি বলা হয় কম্পিউটারের দোকান থেকে বানানো কোনো জাল সার্টিফিকেটের সাথে ওই সার্টিফিকেটের কোনো তফাত্ নেই তাহলে কি সেটা খুব বেশি দোষের হবে? আমরা শুনেছি ধোলাইখালে একটা পাজেরো গাড়ির সব পার্টসই তৈরি হচ্ছে কিন্তু একটা পুরো পাজেরো বাংলাদেশে কেন যেন তৈরি হচ্ছে না। ঠিক একইভাবে শুনেছি নীলক্ষেত হলো এমন একটা জায়গা যেখানে অসম্ভব বলে কিছু নেই। কেউ যদি এই সময়ে ওখান থেকে কম্পিউটারে সার্টিফিকেট বানিয়ে নেয় তাহলে তাকে আর কি বলার থাকে। সুতরাং অভিভাবকহীনতার এই সময়ে যারা পাস করছে তাদের ভবিষ্যত্ আমরাই কেমন ঘোলাটে করে রেখেছি।

যে সন্তানের বাবার পরিচয় নেই আমাদের সমাজ সেই সন্তানকে অবৈধ বলে ঘোষণা করতে দ্বিধা করে না। যে সম্পত্তির আয়ের কোনো হিসাব নেই, সেটাকে আমরা অনায়াসেই অবৈধ বলে ঘোষণা দেই। সুতরাং একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলা যেতে পারে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈধ কোনো উপাচার্য নেই সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইস্যুকৃত সনদও কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না। এক্ষেত্রে বিপদে পড়তে পারে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী। আমরাই তাদের জীবনটাকে দোটানার মধ্যে ফেলে দিয়েছি।

কিন্ডারগার্টেন স্কুলও যেখানে প্রধান শিক্ষক ছাড়া চালানো সম্ভব নয়, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় নাম নিয়ে কোনো কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কী করে চার বছর উপাচার্যহীনভাবে চলতে পারে তা আমাদের দেশকে না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না। তেত্রিশটা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই— এটা যেমন পরিতাপের বিষয় তেমনি এই দেশে উপাচার্য হওয়ার মতো যথেষ্ট যোগ্য লোকের অভাব আছে বলেও আমাদের বিশ্বাস হয় না। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে সেসব ব্যক্তিকে আমরা বেছে নিতে পারি না। এমনও দেখেছি কোনো কোনো ব্যক্তির অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজের ডক্টরেট থাকার পরও আমাদের কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে তাদেরকে গ্রহণই করেনি; অথচ সেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের চেয়েও তারা যথেষ্ট যোগ্যতা রাখেন।

রাস্তায় যেতে যেতে আপনি আমি দেখি অগণিত পথশিশু যারা বোতল কুড়াচ্ছে, কেউবা দিন শেষে নেশা করছে আর রাস্তায় যেখানে সেখানেই রাত কাটিয়ে দিচ্ছে। এর কারণ কি জানেন? কারণ তারাও অভিভাবকহীন। আপনার সন্তান কি কোনোদিন রাস্তায় ঘুমায়? কিংবা ঘুমাতে চাইলেও কি ঘুমাতে পারবে? পারবে না কারণ আপনি অভিভাবক হিসেবে তা হতে দিতে চাইবেন না। প্রতিটি অভিভাবক চায় তার সন্তান ভালো থাকুক আর অভিভাবকহীনরা অনাদরে অবহেলায় জীবনটাকে দেখে ভিন্ন চোখে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলো সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক। যখন সেখানে শূন্যতা তৈরি হয় তখন ছাত্র-ছাত্রীরা ওই সব অনাদরে বড় হওয়া মানুষদের মতোই হয়ে যায়। বছর পার করতে করতে তারা ঠিকই একটা সনদ লাভ করে কিন্তু সেই সনদটা ঠিক চাহিদানুযায়ী হয় না।

কথার পিঠে কথা আসে। ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে আর অনেক কিছুই আমরা আলোচনায় শুনতে পাচ্ছি। এক চাওয়ালা তিনিও রাষ্ট্রপতি নিবার্চনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরকম একটা ঘটনার পরও কিন্তু কেউ সেভাবে কথা তোলেনি। তাহলে আমাদের দেশের ওই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা কি উপাচার্য পেতে পারি না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রায় তিন হাজারের বেশি শিক্ষক আছেন। দেশের বাকি সব বিশ্ববিদ্যালয়েও অনেক নামকরা শিক্ষক আছেন যাদের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। তাহলে এতো কিছুর পরও কেন ৩৩টা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য শূন্য থাকে সেটা আমাদের বোধগম্য নয়।

টিনের চালে একটা ফুটো হলেই সেটা বন্ধ করে ফেলা উচিত। কারণ একটা ফুটো বন্ধ করা সহজ। কিন্তু যখন অগণিত ফুটো হয়ে যায় তখন সেই চালাটা আর ঠিক করা সম্ভব হয় না। আজকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটা দুটো ছিদ্র আছে যা চাইলেই আমরা বন্ধ করতে পারি। কিন্তু আমরা যেভাবে অবহেলা করছি তাতে সেই দিন আসতে বেশি দেরি নেই যেদিন অগণিত ফুটো দেখা দেবে এবং আমরা কোনটা রেখে কোনটা বন্ধ করবো তা নিয়েই বেদিশা হয়ে পড়বো।

আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই তো পরশুদিন থাকবে না কোনো কোনো শিক্ষক। এভাবেই দিন দিন বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, ছাত্র-ছাত্রী থাকবে আর থাকবে বিরাট সব দালানকোঠা শুধু থাকবে না অভিভাবক। এটা কি করে বিশ্বাস করবো যে যোগ্য লোকের অভাবে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ১৫ হাজারের বেশি শিক্ষক রয়েছেন যাদের মধ্য থেকে মাত্র ৩৩ জন যোগ্য শিক্ষক পাওয়া যাবে না এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাই সংশ্লিষ্ট বিভাগের উচিত খুব দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাতে অবিলম্বে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয় তা নিশ্চিত করা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৫ জুন, ২০২০ ইং
ফজর৩:৪৫
যোহর১২:০১
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৫২
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৪৭
পড়ুন