আত্মহত্যা প্রতিরোধ
নিজেকে আরেকবার সুযোগ দিন
ডা. মেখলা সরকার১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং
নিজেকে আরেকবার সুযোগ দিন
বি শ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী সারাবিশ্বে প্রতিবছর প্রায় আট লাখ মানুষ, অর্থাত্ প্রতি সেকেন্ডে ৪০ জন আত্মহত্যা করে। সংস্থাটির মতে আত্মহত্যা বিশ্বে ১৫-২৯ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলেও যে কোনো বয়সেই আত্মহত্যার মত ঘটনা ঘটতে পারে। গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর এক লাখে ৩৯.৬ জন আত্মহত্যা করে যার মধ্যে বিষপান এবং গলায় দড়ি সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত মাধ্যম। বিশ্বব্যাপী ছেলেদের মধ্যে আত্মহত্যার হার প্রায় তিনগুণ বেশি হলেও বাংলাদেশে এই হার মহিলাদের মধ্যে বেশি এবং কম বয়সী মেয়েদের মধ্যে এ হার সবচেয়ে বেশি। গবেষণায় আরো দেখা যায় বাংলাদেশে স্বল্প শিক্ষা, দারিদ্র্য, দাম্পত্য কলহ আত্মহত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। এছাড়া অন্য একটি গবেষণা অনুযায়ী প্রেম সম্পর্কিত জটিলতা, আর্থিক অনটন, দীর্ঘস্থায়ী রোগ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব অন্যতম কারণ।

জীনগতভাবেই আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি (Survival Instinct) থাকার কারণে কঠিন সময়ের মধ্যেও স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ বেঁচে থাকতে চায়। আত্মহত্যা তাই কোনো অবস্থাতেই অসহনীয় পরিস্থিতির প্রতি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া নয়। দেখা গেছে  আত্মহত্যাকারীদের এক বিরাট অংশ আত্মহত্যার সময়ে কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। এর মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব (৫০%), বিষণ্নতা রোগ (৬%), মাদকাসক্তি (বিশেষত এলকোহল) (৭%) ও অন্যান্য জটিল মানসিক রোগ (সিজোফ্রেনিয়া) অন্যতম। কাজেই মানসিক স্বাস্থ্য সেবার সহায়তায় অনেকাংশেই আত্মহত্যা প্রতিরোধ সম্ভব। এছাড়া সমস্যা মোকাবিলায় অদক্ষতা, হীনমন্যতা ইত্যাদি ছাড়াও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি অথবা যারা আবেগের মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় বা সহজে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি থাকে। আর যারা মুখে আত্মহত্যার কথা বলে বা হুমকি দেয় তারা কখনোই আত্মহত্যা করে না।

গবেষণায় দেখা যায়, দুই-তৃতীয়াংশ ব্যক্তি আত্মহত্যার আগে আত্মহত্যা নিয়ে কথা বলেছেন এবং এক-তৃতীয়াংশ ব্যক্তি সুনির্দিষ্টভাবে আত্মহত্যার ইচ্ছার কথা বলেছেন। আত্মহত্যার কথা বলা বা চেষ্টা করা মনের তীব্র কষ্টেরই একরকম বহিঃপ্রকাশ যা শুধুমাত্র মনোযোগ আকর্ষণের জন্য নয়। সুতরাং কখনোই এটা উপেক্ষা করা উচিত নয়।

প্রকৃতপক্ষে দেখা যায়, যারা আত্মহত্যার চিন্তা করছে তাদের এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা মনে করে তাদের কষ্ট অন্যরা ধরতে পারছে যা তাদের তুলনামূলক ভালো বোধ হয় এবং এই সাহায্যের হাত ধরতে চায়।

প্রকৃতপক্ষে যারা আত্মহত্যা করে তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনেকেই সতর্ক সংকেত রেখে যায়। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে যেহেতু একটি বড় অংশ কোনো না কোনো মানসিক কষ্টে ভুগে থাকে, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিলে অনেকাংশেই এ কষ্ট লাঘব হয় এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনা কমানো সম্ভব। শরীরের নানা কষ্ট, যেমন—ঠাণ্ডা, জ্বর, সর্দি, কাশিতে আমরা যেমন  চিকিত্সকের সাহায্য নেই, ঠিক তেমনি মনের নানা কষ্টেও চিকিত্সা সেবা নেয়া যায়। মানসিক চিকিত্সা মানেই শুধু ওষুধের মাধ্যমে চিকিত্সা বা  ‘জটিল রোগের’ চিকিত্সা নয়।

এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় হলো—ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ না দেয়া, পোকা মারার বিষ হাতের নাগালে না রাখা। হাতের কাছে ছুরি, কাঁচি, ওষুধ না রাখা, একা না রাখা। বা পরোক্ষভাবে আত্মহত্যার কথা না বলা। আত্মহত্যার হুমকি দেয়া, একবার বা বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করা, বিষণ্নতা রোগে ভোগা, হঠাত্ সবার কাছ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা ইত্যাদির মাধ্যমে যে কেউ মানসিকভাবে খারাপ আছে বুঝলে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনা এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। অনেকক্ষেত্রে মিডিয়ায় প্রকাশিত অন্যের আত্মহত্যার খবর (বিশেষ করে বহুল প্রচারিত) আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিকে  উস্কে দেয়। তাই যথাসম্ভব আত্মহত্যার বিস্তারিত বিবরণ ও ধরন বর্ণনা থেকে বিরত থাকা উচিত। ক্রাইসিস সেন্টার ও টেলিফোন হটলাইন সারা দেশে চালু করা বাঞ্ছনীয়।

আত্মহত্যা এমন একটা ঘটনা যা একবার ঘটে গেলে আর পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। এ ধরনের শেষ সিদ্ধান্ত নেবার আগে আরেকবার ভাবুন। অন্যের কাছে নিজের কষ্ট প্রকাশ করুন । মনে রাখবেন কোনো কিছুর মতো জীবনের খারাপ সময়ও কখনো চিরস্থায়ী হয় না। সামনে অপেক্ষা করে আছে ভালো-মন্দে মিশানো আনন্দময় ও সফল সময়।

n লেখক :মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক (সাইক্রিয়াট্রি), জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও  হাসপাতাল, ঢাকা

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৪:২৭
যোহর১১:৫৬
আসর৪:২৩
মাগরিব৬:১০
এশা৭:২৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০৫
পড়ুন