তিস্তার পানি বণ্টন ও পাংশায় গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের যৌক্তিকতা
ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল আজিজ১১ অক্টোবর, ২০১৭ ইং
তিস্তার পানি বণ্টন ও পাংশায় গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের যৌক্তিকতা
গত এপ্রিলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চারদিনের দিল্লি সফর করেন। সফরকালীন সময়ে দুই  দেশের  মধ্যে  যে সব সমঝোতা ও চুক্তিসমূহ স্বাক্ষর হয়েছে, দেশে ফিরে গণভবনে তার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তিনি এক সংবাদ সম্মেলন করেন। সমঝোতা ও চুক্তিসমূহের বিভিন্ন ইতিবাচক দিক, দুই দেশের মধ্যে প্রকল্প সাহায্যসমূহ, ঋণ চুক্তিসমূহ ইত্যাদির ব্যাখ্যা দেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান  ট্রান্স-বাউন্ডারি নদীসমূহের পানি ভাগাভাগির কথাও বলেন। বিশেষ করে তিস্তার পানি চুক্তি না হওয়ায়  বাংলাদেশে যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে, সে কথাও সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসে। ওই সংবাদ সম্মেলনের পর  প্রায় গত দুই সপ্তাহে দেশ-বিদেশে পত্র-পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়। তারপরও বিষয়টির ওপর অনেক অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।

তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। এই নদী হিমালয় থেকে  উত্পন্ন হয়ে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে ২৪৯ কি.মি প্রবাহিত হওয়ার পর বাংলাদেশের নীলফামারী জেলায় প্রবেশপূর্বক ১১৭কি.মি প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে এসে পড়েছে। জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের ‘Convention on the law of the non-navigational uses of Inteational Water Courses’  যা ২০১৪ সালে ৪০টি দেশের অনুস্বাক্ষরের পর আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হয়েছে, তাতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক নদীর অববাহিকায় যে সব দেশ রয়েছে তাদের সমতার ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে ওই সব নদীর পানি ব্যবহারে একটি ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং ভারতের অংশে তিস্তা অববাহিকায় যে সেচ ব্যবস্থায় জমি রয়েছে, তার জন্য যে পানির প্রয়োজন, তার দাবি ভারত করতে পারবে।  কিন্তু এ যাবত্কাল বিভিন্ন আলোচনায় ভারত পানির যে দাবি করেছে, আমাদের জানা মতে তার মাত্র চার হাজার কিউসেক পানি গজলডোবা ব্যারেজের বাম ক্যানেলে প্রবাহিত হচ্ছে, যাকে ভারতের প্রকৃত তিস্তা অববাহিকা বলা যায়। এ পানির পরিমাণ অতি সামান্য। সুতরাং প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে ভারত যে তিস্তা প্রকল্পে প্রায় ২০ হাজার কিউসেক পানি দাবি করছে তা কোথায় যাচ্ছে? গুগলের ম্যাপে  দেখা যায়  যে, গজলডোবা ব্যারেজের ভাটিতে নয়, কিছুটা উজানে এবং দক্ষিণে প্রায় ২৫ কি.মি দীর্ঘ একটি লিংক ক্যানেলের মাধ্যমে পানি অপর একটি আন্তর্জাতিক নদী মহানন্দা সংলগ্ন বাংলাদেশের বাংলাবান্ধের ১-১কি.মি দূরে ভারতের মহানন্দা ব্যারেজে প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ভারতের ঐ মহানন্দা ব্যারেজের যে সেচ এলাকা তাকেই ভারত তাদের তিস্তার সেচ প্রকল্প বলে চালিয়ে দিচ্ছে, এটা আন্তর্জাতিক আইনে সম্পূর্ণ বিরোধী।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার এই মেয়াদেই অর্থাত্ ২০১৮ সালের মধ্যেই তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি হয়ে যাবে। এই বণ্টন কিসের ভিত্তিতে  হবে তা কিছুটা অস্পষ্ট। তবে গত কিছুদিন যাবত্ বাংলাদেশ  ও ভারতের পত্র-পত্রিকায় এ বিষয়ে যে সব খবরা-খবর প্রকাশিত হয়েছে তাতে বোঝা যায়, ২০১১ সালে তত্কালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরের সময় চূড়ান্ত পর্যায়ে চুক্তি না হলেও, যে সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তি হতে যাচ্ছিল, সে  সমঝোতাই  হয়ত চূড়ান্ত হয়ে রয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বোঝা যায়, এই চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ ভারতের থেকে প্রায় ৫% পানি কম পাবে। তখন যে কোনো প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এই অসম চুক্তিতে, যদি সম্মত হয়েও  থাকে, তবে কেন হয়েছিল তা কখনও ব্যাখ্যা করা হয়নি। তবে মনে রাখতে হবে, সেটা ছিল ২০১১ সালে । তখন অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টনে ন্যায়নীতি ভিত্তিক কোনো আন্তর্জাতিক আইন বলবত্ ছিল না। সুতরাং, ২০১১ সালে যদি একটি খসড়া সমঝোতায় বাংলাদেশ সম্মত হয়েও থাকে, তাহলেও বর্তমানের বাস্তবতায় তাতে আমাদের রাজি হওয়া মোটেও উচিত হবে না।

তিস্তা ভারত অংশে প্রায় সম্পূর্ণ একটি পাহাড়িয়া নদী।  সেখানে সেচযোগ্য জমির পরিমাণ খুবই নগণ্য। ফলে অববাহিকা ভিত্তিক পানি বণ্টনে ভারতের ভাগে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পানি প্রাপ্য হতেই পারে না। বাংলাদেশের তিস্তা অববাহিকার যে বিশাল আকার তাতে বাংলাদেশ অন্তত তিস্তার ৭০% পানির প্রাপ্যতা দাবি করতে পারে। ভারতের তিস্তা প্রকল্প নামে যে প্রকল্প, যাতে ভারতে তিস্তার ডান ক্যানালে যে প্রায় ১৬ হাজার কিউসেক পানির দাবি করা হচ্ছে, তা তিস্তা অববাহিকাই নয়।  তা অন্য একটি আন্তর্জাতিক নদী, মহানন্দা নদীর অববাহিকা। ফলে তিস্তা আলোচনায় ঐ মহানন্দা অববাহিকা এলাকা বাদ দিতে হবে। এই দাবি নতুন করে উপস্থাপন করলেই কেবল তিস্তার পানির ওপর বাংলাদেশের দাবির ন্যায্যতা জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। সকল বিবেচনায় এর জন্য মহানন্দা নদীর পানির ন্যায্য হিসসা জোরালোভাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে উত্থাপন করতে হবে। মনে রাখা দরকার, মহানন্দা নদীর ন্যায্য পানির অভাবে প্রায় সমগ্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাই সেচের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সুতরাং, মহানন্দার পানির দাবি কতটা জোরালোভাবে করা যাবে, তার ওপর হয়ত বাংলাদেশের তিস্তার পানি প্রাপ্তি বহুলাংশে নির্ভর করবে।

প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের আরো একটি অংশে রয়েছে গঙ্গা ব্যারেজ প্রসঙ্গ। তাতে মনে হয় একটু হতাশাব্যঞ্জক চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশের আমলে গঙ্গা ব্যারেজের যেটুকু অগ্রগতি, তার প্রায় সবটুকু এই সরকারের গত ৮ বছরে অর্জিত হয়েছে। এ সময়ে ব্যারেজের সম্ভাব্যতা যাচাই ও ডিটেইলড ডিজাইন সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি এখন বাস্তবায়নের জন্য দরপত্র আহ্বানের পর্যায়ে রয়েছে। অথচ ঐ সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় এসবই নাকি ভুলের কারণে হয়েছে। এজন্য ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশের যাতে উপকারে আসে তেমন জায়গায় গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের পক্ষে মত দেওয়া হয়। বিষয়টি ব্যাখ্যা করা দরকার। ব্যারেজ সমতল এলাকার নদীতে নির্মাণ করা হয়। যাতে নদীর পানির উচ্চতা পার্শ্ববর্তী কৃষি জমি থেকে উঁচু করে গ্রাভিটিতে অববাহিকার জমিতে সেচ দেওয়া যায়। ফলে উপকারভোগী এলাকা প্রধানত ব্যারেজের ভাটিতেই হয়। আন্তর্জাতিক সীমান্তের মাত্র ৬ কি:মি: উজানে ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ। সুতরাং, ভারতের জন্য গ্রাভিটি সেচকাজে ব্যবহূত হতে তেমন আরেকটি ব্যারেজ গঙ্গায় নির্মাণের জন্য কোনো জায়গাই আর ভারতে নেই। তাছাড়া গঙ্গায় যত সেচ অবকাঠামো তার সবই ভারতের। শুল্ক মৌসুমে গঙ্গায় যে ৮০ হাজার কিউসেক পানি ছিল, তার ৪০ হাজার কিউসেক ভারত ফারাক্কায় একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। যে ২০-২৫ কিউসেক পানি হয়ত থাকে তার থেকে ভারতকে দেওয়ার তো কিছু নেই।

এখন বাংলাদেশের কোথায় গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণ করা যায় সে বিষয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। বাংলাদেশে গঙ্গার যে অবস্থান তাতে হয়ত হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ভাটিতে নির্মাণ করা যায়, তাতে বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে কৃষি জমিতে সেচ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেখানে ব্যারেজ নির্মাণ করলে এবং পানির উচ্চতা বাড়ালে যে ‘ব্যাক ওয়াটার কার্ব’ হবে তা ফারাক্কা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকার ফারাক্কা ব্যারেজকে অকেজো করে দেবে। এর পর গড়াই মুখে তালবাড়িয়াতে নতুন অবস্থানে ব্যারেজের সমীক্ষা চালানো হয়। সেখানেও দেখা যায় যে ব্যাক ওয়াটার কার্ব ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে যায়। তাতে সঙ্গত কারণে আপত্তি আসতে পারে। তাছাড়া প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারেজের অন্তত অর্ধেক সুবিধাভোগী এলাকা বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা। এই জেলায় গঙ্গার পানি ব্যবহার করতে হলে কারিগরি কারণে গড়াই নদী পার হয়ে আরও ভাটিতে ব্যারেজের অবস্থান নির্ধারণ করতে হয়। সে জন্যই বহু সমীক্ষার পর পাংশাতে ব্যারেজের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। এতে করে ব্যারেজের ‘ব্যাক ওয়াটার কার্ব’ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তের মধ্যেই থাকবে। ফলে ভারতের এ বিষয়ে আপত্তি দেওয়ার সুযোগ কম থাকবে। এই পাংশা ছাড়া বাংলাদেশ অংশে আর উজানে তো কোনো  ব্যারেজের অবস্থান  নেই। ফলে এখন এই ৫০ বছর সমীক্ষার পর ব্যারেজের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির কোনো সুযোগ মনে হয় নেই।

অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ ও বিশ্বের উষ্ণতা উল্লেখজনকভাবে বৃদ্ধির যে বিরূপ প্রভাব সারা বিশ্বের ওপর পড়েছে, তার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ বাংলাদেশ। উষ্ণতার কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। লবণাক্ততা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে গ্রাস করেছে। ইতোমধ্যে বৃহত্তর খুলনা অঞ্চল ছাড়িয়ে যশোহরে লবণাক্ততা প্রবেশ করেছে। বাগেরহাট, নাজিরপুর, এমনকি টুঙ্গিপাড়ার নদীতেও লবণাক্ততা ঢুকে পড়েছে। কৃষি জমি উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উদ্বাস্ত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা ভবিষ্যতে আরো প্রকট আকার ধারণ করবে। এই বিপর্যয় মোকাবিলা করতে  হলে গড়াইতে মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

এদিকে সুন্দরবন নিয়ে যে এত মাতামাতি, অথচ মিষ্টি পানির অভাবে গত ৪২ বছরে সুন্দরবন কার্যত মরে গেছে। সুন্দরবনে আর সুন্দুরি গাছ নেই বললেই চলে। এ বিশ্ব ঐতিহ্য কে রক্ষা করতে হলে সুন্দরবন অঞ্চলে পশ্চিম থেকে বেতনা, কপোতাক্ষ, শিবসা ও পশুর নদীতে মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি করতে হবে। এর জন্য গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণ করে গড়াইতে ও মাথাভাঙ্গায় মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে। তাই নিজেদের অস্তিত্বকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়ে গঙ্গা ব্যারেজের পরিত্যক্ত করা হঠকারি কাজ হবে।

n লেখক : অবসর প্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাপরিচালক, বাংলাদেশ

পানি উন্নয়ন বোর্ড

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ অক্টোবর, ২০২১ ইং
ফজর৪:৩৯
যোহর১১:৪৬
আসর৩:৫৮
মাগরিব৫:৪০
এশা৬:৫১
সূর্যোদয় - ৫:৫৪সূর্যাস্ত - ০৫:৩৫
পড়ুন