কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা জরুরি
নাঈমা জান্নাত১১ অক্টোবর, ২০১৭ ইং
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা জরুরি
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়ে গেল গত ১০ অক্টোবর। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য’। মানসিক স্বাস্থ্য হলো আমাদের চিন্তা, মন ও আবেগের সুস্থতা, শৃঙ্খলা ও সামর্থ্য। এটা এমন ভালো থাকা, যাতে একজন ব্যক্তি নিজের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পারে, জীবনের স্বাভাবিক চাপ মোকাবিলা করে সাফল্যের সাথে সৃষ্টিশীল কাজ করে যেতে পারে এবং সামাজিক অঙ্গনে অবদান রাখতে পারে। মানসিক সুস্থতার সাথে একটি জীবনের সাফল্য এবং ব্যাপক অর্থে গোটা সমাজের ভালো-মন্দ জড়িত। কারণ মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের চিন্তা, অনুভূতি ও কাজে প্রভাব ফেলে।

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আমরা আসলে কতটুকু সচেতন তা আমাদের অফিস পাড়ার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। সুস্থতার অর্থ হলো শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকা। এক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য রেখেই মানুষকে চলতে হয়। এ কথাও ঠিক যে, সুস্থ কর্মক্ষেত্র থাকলেই সব ধরনের মানসিক সমস্যা দূর হয়ে যাবে, এমনটি নয়। এখানে মানসিক সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকাটা জরুরি। কারণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নীরব ঘাতকের মতো ব্যক্তির ক্ষতি করতে থাকে। সচেতন থাকলে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

কর্মীরাই কর্মক্ষেত্রের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষায় প্রতিষ্ঠানকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। সুস্থ কর্মপরিবেশে সাধারণ কিছু বিষয় থাকে। যেমন—উত্ফুল্ল চিত্তে কর্মীরা কাজে যোগ দেন এবং সবাই একে অন্যের সঙ্গে সুস্থ প্রতিযোগিতা করেন, মানসিক চাপ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যুগুলো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নজরে রাখেন, মানসিক সমস্যায় পড়লে সেই কর্মী শারীরিক সমস্যার মতোই সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার ভোগ করেন।

কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তির উপর যেসব বিষয় মানসিক চাপ তৈরি করে, সেগুলো হলো—একটানা লম্বা সময় ধরে কাজ করা বা বাড়তি সময় কাজ করা, অফিসের কাজ বাড়িতে নিয়ে আসা, শিফটিং ডিউটি, অল্প সময়ে কাজ শেষ করার তাগিদ, দ্রুত ও বেশি কঠিন কাজের ভার, অবাস্তব লক্ষ্য, কাজের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকা, প্রতিষ্ঠানে নিজের সিদ্ধান্ত দিতে না পারা, ঊর্ধ্বতন বা সহকর্মীদের যথার্থ সহযোগিতা না পাওয়া, চাকরি হারানোর ভয়, প্রতিষ্ঠানের গুরুদায়িত্বে থাকলেও নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে অসচেতনতা, কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত যোগাযোগ না থাকা, দ্বন্দ্ব, বুলিং, কাজে যথাযথ পুরস্কার বা স্বীকৃতি না থাকা, বিরক্তি আসে এমন কাজ করা, অনেক বেশি মানসিক শ্রমের কাজ করা, ন্যায় বিচারের অভাব, অযাচিত পরিবর্তন, লিঙ্গ-বৈষম্য বা জাতিগত বিভাজন।

অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি পাঁচজন কর্মীর একজন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। আমাদের দেশেও এই সংখ্যা কম থাকার কথা না। সাধারণত যেসব কর্মী জরুরি সেবায় নিয়োজিত, যারা স্বাস্থ্য সেবা দেন অথবা যারা ছোট ব্যবসায়ী, তাদের মানসিক সমস্যায় পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত সমস্যা ও আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তবে এই সব সমস্যা মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। যেমন— বোঝাপড়ার উন্নয়ন, ঝুঁকি নিরূপণ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করা, বুলিং প্রতিরোধের সংস্কৃতি তৈরি, মানসিক স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ তৈরি, ইতিবাচক আচরণকে উত্সাহিত করা বা পুরস্কার দেওয়া, মানসিক রোগ নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার দূর করা, কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হলে সহযোগিতা করা এবং চিকিত্সার ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মাধ্যমে নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা।

কর্মক্ষেত্রে নিজেকে ভালো রাখতে নিজেকেই উদ্যোগী হতে হবে। যেমন— নিজের যত্ন নেওয়া, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণগুলো চেনা, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের উপায় খোঁজা, নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা, প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতনের সহায়তা নেওয়া, সহকর্মীর প্রতি সহযোগিতার মনোভাব রাখা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে নিজে জানা, অন্যকে জানানো ও মেনে চলা।

সুস্থ কর্মক্ষেত্রের কাঠামো তৈরিতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো— কাজ সম্পর্কিত শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি নির্ণয়ের ব্যবস্থা থাকা, সুস্থ আচরণের প্রকাশ্য সমর্থন ও সংস্কৃতি গড়ে তোলা, সমাজ ও পরিবেশের উত্তরোত্তর উন্নতি হবে এমন কর্মকাঠামো প্রণয়ন করা। আমরা যদি চিন্তা করি যে, এমন কোনো কর্মীকে দিয়ে ভারী কাজ করাচ্ছি, যিনি সমস্যার কারণে সারারাত ঘুমাতে পারেননি। তাহলে কী ঘটতে পারে? সেক্ষেত্রে বড় কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়। তবে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা থাকলে এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে আমরা সহজেই পরিত্রাণ পেতে পারি। কারণ খোলাখুলি আলোচনার পরিবেশ পেলে কর্মী নিজেই তার সমস্যার কথা ঊর্ধ্বতনকে জানাবেন। আমরা অনেকেই মনেকরি, মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিকে দিয়ে কোনো কাজ হবে না, সে অক্ষম। কিন্তু বাস্তবতা হলো— সঠিক চিকিত্সার মাধ্যমে যেকোনো সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি কর্মক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারেন। এমনকি যার মানসিক সমস্যা নেই, তার চাইতেও বেশি কর্মদক্ষতা দেখাতে পারেন ক্ষেত্রবিশেষে। মানসিক সুস্থতার যে স্তরেই আমরা থাকি না কেন, যেকোনো সময়ে তা অসুস্থতার স্তরে নেমে যেতে পারে। তাই সহকর্মী দুর্ঘটনায় পা ভেঙে ফেললে যেমন আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি, কবে তিনি সুস্থ হয়ে কাজে ফিরবেন, তার সুস্থতায় অনেক সময় ফুল দিয়েও তাকে বরণ করি। একইভাবে মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রেও সহকর্মীরা সমআচরণ পাওয়ার অধিকারী।

n লেখক: চিকিত্সা মনোবিজ্ঞানী, ব্রেন অ্যান্ড লাইফ হসপিটাল, ঢাকা

ই-মেইল: [email protected]

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ অক্টোবর, ২০২১ ইং
ফজর৪:৩৯
যোহর১১:৪৬
আসর৩:৫৮
মাগরিব৫:৪০
এশা৬:৫১
সূর্যোদয় - ৫:৫৪সূর্যাস্ত - ০৫:৩৫
পড়ুন