মি টু :আসুন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করি
কাজী কাউছার হামিদ০৬ নভেম্বর, ২০১৭ ইং
মি টু :আসুন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করি

মি টু কী? (#MeToo) মি টু  যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি সামাজিক আন্দোলনের নাম। আমাদের দেশে একেবারেই অপরিচিত মনে হলেও পাশ্চাত্যে এই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সকল ক্ষেত্রে খুবই পরিচিত দুটি শব্দ(ফ্রেজ)। সামাজিক কর্মী ও কমিউনিটি আয়োজক (কমিউনিটি অর্গানাইজার) তারানা বার্ক ১৯৯৭ সালে ১৩ বছরের এক কিশোরীর ধর্ষণের ঘটনা শুনে তিনি নির্বাক হয়ে যান। সে থেকেই এই আন্দোলনের জন্ম।  ২০০৬ সালে দি মাইস্পেস সোশাল নেটওয়ার্ক সংগঠনের তৃণমূল কর্মীদের মাঝে দেওয়া ‘সহানুভূতির মাধ্যমে ক্ষমতায়ন’ নামক বক্তবে তিনি এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে আমেরিকান অভিনেত্রী আলেসা মিলান এই উদ্যোগকে সামাজিকভাবে সকল মানুষ বিশেষ করে, যারা যৌন হয়রানির শিকার তাদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তুলেন।

আমার বিভাগের একজন শিক্ষক শ্রেণি পাঠদানের সময় অসহায়ভাবে সমপ্রতি সংঘটিত একটি ধর্ষণের ঘটনা বর্ণনা করেন। রহিমা আক্তার সোনিয়া (১৪) সম্পর্কে তার চাচাত ভাইয়ের মেয়ে। স্থানীয় একটি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী। বাড়ি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায়। মেয়েটির মা প্রায়ই অসুস্থ থাকত। আর তার বাবা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় মেয়েটি প্রায়ই ওষুধের জন্য তাদের বাড়ির পাশেই স্থানীয় গ্রাম্য ডাক্তারের ফার্মাসীতে যেত। ডাক্তারও মহিলাকে চেকআপ করার জন্য প্রায়ই তাদের বাড়িতে আসত। সেই সুবাদে গ্রাম্য ডাক্তার মো. রাজনের সঙ্গে তাদের পরিবারের সুসম্পর্ক ছিল। রাজন মেয়েটিকে নাতনি বলে সম্বোধন    করত। একদিন মেয়েটির মা গুরুতর অসুস্থ হলে তার স্বামীসহ রংপুরে যায়। আর এই সুযোগে কথিত সেই গ্রাম্য ডাক্তার মায়ের ওষুধ দেয়ার নামে নিজের বন্ধুর বাসায় নিয়ে গিয়ে  সে ও তার বন্ধু মিলে মেয়েটিকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে এবং সেই ধর্ষণের কিছু ছবি তুলে তাকে ঘটনা প্রকাশ না করার ভয় দেখায়। এরপর প্রায়ই ডাক্তার বন্ধুর বাসায় তাকে ধর্ষণ করত। একপর্যায়ে মেয়েটি এটা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। সমপ্রতি সাতক্ষীরার শ্যামনগর গ্রামের কলেজ শিক্ষার্থী জয়শ্রী চক্রবর্তী (১৭) বখাটেদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়ে আত্মহত্যা করে। বখাটেরা তার চুল কেটে দেয় ও শারীরিকভাবে হেনস্থা করে।  আগামী মাসেই মেয়েটির বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মেয়েটি এই অপমান সহ্য করতে না পেরে ঠাকুরঘরের আড়ার সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।

অন্যদিকে আমেরিকার অভিনেত্রী আলেসা মিলান চলচ্চিত্র পরিচালক হার্ভি উইনস্টাইনের বিরুদ্ধে তার সঙ্গে করা যৌন হয়রানির বিষয়টি প্রকাশ করে দেন টুইটারে। এরপর হাজার-হাজার মানুষ এই টুইটটিতে তাদের প্রতিক্রিয়া জানান। যার মধ্যে প্যাট্রিসিয়া আরকুইক, গ্রেচচেন কার্লসন,বীর দাশসহ ৩০ জন  সেলিব্রেটি ছিল। কিছু পুরুষ সেলিব্রেটিও ছিলেন-টেরি ক্রস, হেইমেন বেন্ডের ব্রেকসহ অনেকে তাদের প্রতিক্রিয়া জানান। যারা নিজেরা তাদের বিভিন্ন পুরুষ কর্তৃক নারী সহকর্মীদের প্রতি নির্যাতনের কথা স্বীকার করেন। শুধু ১৫ই অক্টোবর ২০১৭তে ফ্রেজটি (মি টু) প্রায় ২ লক্ষবার  ও ১৬ই অক্টোবর ৫ লক্ষেরও বেশিবার টুইট করা হয়েছে। ফেসবুকে প্রায় ১২ মিলিয়ন মানুষ এই হেসটেগটি ব্যবহার করেছে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে।

‘#মি টু’ আন্দোলনে বিশ্বাসীদের কথা হলো, একজন যৌন হয়রানির শিকার নারী চুপ না থেকে উল্টো ঘটনা প্রকাশ করে সেই পুরুষকেই সমাজের মানুষের সামনে লজ্জিত করবে। তার বিরুদ্ধে সামাজিক, সম্মিলিত ও আইনি পদক্ষেপ নিবে। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের প্রায় ৮৫টি দেশে এই হেসটেগের ব্যবহার হচ্ছে। অনেক নামকরা অভিনেত্রী, সংবাদ উপস্থাপিকা তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় করা যৌন হয়রানির বিষয়টি তুলে ধরেছেন । সুইডেনে কয়েকজন নারী টেলিভিশন উপস্থাপিকা সুইডিশ কর্পেটর ও টেলিভিশন উপস্থাপক মার্টিন টিমেলের বিরুদ্ধে এই হেসটেগ(#) এর ব্যবহার করেছেন। ফলে অনেক পশ্চিমা রাজনীতিবিদ, অভিনেতা ও পরিচালক বিচারের সম্মুখীন হন। আবার অনেকেই তাদের কর্মের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশে বর্তমানে যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের ঘটনা পত্রিকায় প্রতিদিনকার চিত্র। যৌন হয়রানির অপমান সহ্য না করতে পেরে আত্মহত্যা করছে অনেক নারী। বাদ যাচ্ছে না ৫ বছরের শিশু কিংবা ৪৫-৫০ বছরের নারীও। এর বড় একটি কারণ আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। কোনো নারী যখন যৌন হয়রানির শিকার হয়, তখন আমরা ছেলেটিকে দোষারোপ না করে দোষারোপ করি মেয়েটিকে, তার পোশাক-পরিচ্ছদকে। কেন মেয়েটি ঘর থেকে বের হলো ও কেন সে এই স্থানে গিয়েছিল, না  গেলেতো এই ঘটনা কি ঘটত এইরূপ প্রশ্নও করি।  কিন্তু আমরা যদি নারীকে দায়ী না করে, দোষী পুরুষকেই দায়ী করতে পারতাম ও সামাজিকভাবে তাকে হেয় করতে পারতাম, তাহলে যৌন হয়রানির সংবাদ প্রতিদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় রঙ্গিন কলামে ছাপা হতো না। কিংবা ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে হারিয়ে যেত না রহিমা কিংবা জয়শ্রীরা।

n লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৬ নভেম্বর, ২০২০ ইং
ফজর৪:৫০
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৪১
মাগরিব৫:২০
এশা৬:৩৫
সূর্যোদয় - ৬:০৮সূর্যাস্ত - ০৫:১৫
পড়ুন