প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি
১০ নভেম্বর, ২০১৭ ইং
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি
রাসেল মিয়া

সাম্প্রতিক সময়ের অনুষ্ঠিতব্য প্রতিটা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় একটিমাত্র আলোচিত এবং কমন বিষয় প্রশ্নপত্র ফাঁস/ জালিয়াতি, হোক সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা কিংবা কোনো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের চাকরির পরীক্ষা। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস অথবা জালিয়াতি, এর দায় কার তা পর্যালোচনা করার পূর্বে পরীক্ষার প্রাথমিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোচনা করা উচিত।

এই ব্যাপারে আমরা কমবেশি সবাই অবগত। তার পরেও বলছি, যে কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রাথমিক এবং মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- পরীক্ষার্থীদের হতে সম্ভাব্য অধিক মেধাবী এবং যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীদের বাছাই করা। আর এই কাজটি যথাযথভাবে করার জন্যই মূলত পরীক্ষার আয়োজন। কথা হচ্ছে, এসব প্রশ্নপত্র ফাঁস/জালিয়াতির মধ্যদিয়ে সম্পাদিত পরীক্ষার মেধা তালিকা দ্বারা কি পরীক্ষার প্রধান এবং মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হচ্ছে? অবশ্যই নয়। পরীক্ষার প্রধান এবং মূল উদ্দেশ্য অর্জন তো নয়ই বরং এসব ত্রুটিপূর্ণ মেধাতালিকা তৈরির মাধ্যমে সত্যিকারের মেধাবীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। অপরদিকে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী কিন্তু সুযোগসন্ধানী সুবিধাবাদীরা সেই সুযোগ লুফে নিচ্ছে।

এখন দেখার বিষয়, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস/জালিয়াতিতে জড়িত কারা কিংবা সম্ভাব্য কারা এর সাথে জড়িত থাকতে পারে? যেহেতু প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষা গ্রহণ পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন স্তরে অনেক ব্যক্তি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রশ্ন প্রণয়নের সাথে জড়িত, সেহেতু আমাদের আগে দেখা উচিত কার কার প্রশ্নপত্র ফাঁস/জালিয়াতির সাথে জড়িত থাকার সম্ভাবনা আছে। সেদিক দিয়ে প্রথমে যিনি প্রশ্ন তৈরি করেন অর্থাত্ প্রশ্ন প্রণেতা, প্রশ্ন প্রণয়ন কমিটিতে থাকা যে কোনো সদস্য, দাপ্তরিক কাজে সাহায্যকারী যেকোনো কর্মকর্তা/ কর্মচারী, পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক এবং পরীক্ষার্থী নিজে তার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুযোগ রয়েছে। কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্ন প্রণেতা থেকে শুরু করে পরীক্ষার্থীর যেকোনো একটা পক্ষ যদি নৈতিকতা বর্জিত কাজে লিপ্ত থাকে, তবেই কেবল প্রশ্নপত্র ফাঁসের মত ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটতে পারে।

সাম্প্রতিককালের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, প্রশ্নপত্র ফাঁস দু’ভাবে হচ্ছে—প্রথমত. পরীক্ষার পূর্ব রাতে অর্থাত্ পরীক্ষা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক, দ্বিতীয়ত. পরীক্ষার সময় অর্থাত্ পরীক্ষার হলকেন্দ্রিক। প্রথমটার ক্ষেত্রে মূলত প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে প্রশ্ন প্রণেতা, প্রণয়ন কমিটির যেকোনো সদস্য, প্রশ্ন প্রণয়নে সাহায্যকারী কর্মকর্তা/কর্মচারী কোনো একজনের সরাসরি সম্পৃক্ততায়। দ্বিতীয়টিতে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি কিংবা শিক্ষার্থীদের কোনো একজনের সম্পৃক্ততায়।

এখন প্রতিটা প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব সকল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলো সুষ্ঠু এবং সুন্দরভাবে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ত্রুটিমুক্ত সত্যিকারের মেধাবীদের তালিকা তৈরি করা। প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা জালিয়াতির ক্ষেত্রে প্রশ্ন প্রণয়ন এবং পরীক্ষা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের দিকেই শুধু দায় চাপালে চলবে না। যেহেতু প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষা গ্রহণ পর্যন্ত একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হয় আর সেই প্রক্রিয়ায় হাজারো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে উক্ত প্রক্রিয়ায় যুক্ত, সেহেতু দায়িত্বপ্রাপ্ত সকলকেই নৈতিকতার দিক থেকে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা দায়িত্বপ্রাপ্ত হাজারো ব্যক্তির মাঝে একজনও যদি এই অসত্ কাজটি করে বসে তবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয় সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেওয়ার।

একটি উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর প্রশ্ন জালিয়াতির ঘটনা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর প্রশ্ন জালিয়াতি মূলত পরীক্ষা হলকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। অসাধু পরীক্ষার্থীরা বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তির আধুনিক ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে পরীক্ষা চলাকালীন প্রশ্নপত্র এবং উত্তরপত্র আদান-প্রদান করে। আরেকটি হচ্ছে—পরীক্ষা শুরুর মিনিট ত্রিশেক পূর্বে পরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত অসত্ হল পরিদর্শক কর্তৃক মোবাইল ব্যবহার করে প্রশ্ন বাইরে প্রেরণ করা হচ্ছে (বিগত কয়েকটি ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষায় এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে)।

প্রশ্ন হতে পারে এই প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা জালিয়াতি রোধকল্পে করণীয় কী হতে পারে? প্রথমত. এসব জালিয়াতি রোধ করতে হলে পরীক্ষা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রত্যেক হল পরিদর্শককে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব দেখাতে হবে। পাশাপাশি পরীক্ষার্থীদেরকেও দায়িত্বপ্রাপ্ত হল পরিদর্শক এবং অন্যান্য কর্মকর্তাকে সহযোগিতা করার মানসিকতা দেখাতে হবে। কেননা পরীক্ষা হলকেন্দ্রিক কোনো অসাধু পরীক্ষার্থী প্রশ্ন জালিয়াতি করলে সবার আগে তার আশেপাশের পরীক্ষার্থীরা অবগত হবে। এমনটা হতে দেখলে পরীক্ষার্থীদের উচিত দায়িত্বপ্রাপ্ত হল পরিদর্শক এবং অন্য সকল কর্মকর্তাকে অসঙ্গতির বিষয়টা সম্পর্কে অবগত করা।

সর্বোপরি সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রশাসন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান উদ্দেশ্যটি ঠিক করতে হবে। সেখানে যদি সত্যিকারের মেধাবীরা অবমূল্যায়িত হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই সেটা হবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্নের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

n লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১০ নভেম্বর, ২০২০ ইং
ফজর৪:৫২
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৪০
মাগরিব৫:১৮
এশা৬:৩৩
সূর্যোদয় - ৬:১০সূর্যাস্ত - ০৫:১৩
পড়ুন