আবহাওয়ার পূর্বাভাস, শীত ও শীতের রাজনীতি
চিররঞ্জন সরকার২০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
আবহাওয়ার পূর্বাভাস, শীত ও শীতের রাজনীতি
ধীর পায়ে হলেও শীত আসতে শুরু করেছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস মতে, দুয়েক দিনের মধ্যেই মৃদু শৈত্য প্রবাহ বয়ে যাবে। আর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মাঝারি শৈত্য প্রবাহ। যদিও আমাদের দেশে আবহাওয়ার পূর্বাভাসগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সত্য হয় না। এটা অবশ্য আমাদের একার সমস্যা নয়, জগত্ জুড়েই এ সমস্যা প্রকট। বিজ্ঞানপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু আবহাওয়ার পূর্বাভাস সে অনুযায়ী মিলছে না। এ ব্যাপারে বিলাতের একটি গল্প মনে করা যেতে পারে। ১৯৮৭ সালের ১৫ অক্টোবর, একজন মহিলা ব্রিটেনের টিভি স্টেশনে ফোন করে বলেন, তিনি শুনেছেন যে শীঘ্রই ঝড় উঠবে। আবহাওয়া পূর্বাভাসবিদ বারবার তাকে সাহস দিয়ে বলেছিলেন, “চিন্তা করবেন না। ঝড় হবে না।” কিন্তু, সেই রাতে দক্ষিণ ইংল্যান্ডে প্রচণ্ড দমকা হাওয়া সহ ঝড় হয় আর এর ফলে ১ কোটি ৫০ লাখ গাছ উপড়ে পড়ে, ১৯ জন মারা যায় এবং ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়।

প্রতিদিন সকালে লাখ লাখ ব্যক্তি আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানার জন্য তাদের রেডিও শোনেন ও টেলিভিশন দেখেন। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন মানে কি বৃষ্টি হতে পারে? সকালের রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া কি সারাদিন থাকবে? তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে কি তুষার ও বরফ গলতে শুরু করবে? আবহাওয়ার পূর্বাভাস শুনে আমরা ঠিক করি যে, কেমন কাপড় পরব এবং বের হওয়ার সময় ছাতা সঙ্গে নেব কী নেব না।

কিন্তু, কখনো কখনো আবহাওয়ার পূর্বাভাসগুলো পুরোপুরি ভুল হয়।

আমাদের দেশে শীত ও রাজনীতির মধ্যে একটা বিস্ময়কর সম্পর্ক আছে। যদিও শীত ও রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি প্রসঙ্গ। একটির সঙ্গে অপরটির বৈধ ও যৌক্তিক কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়। শীত হচ্ছে প্রকৃতির খেলা। আর রাজনীতি হলো রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের ক্ষমতায় যাওয়া অথবা ক্ষমতায় টিকে থাকার কলা-কৌশল। শীত আসে আবার শীত চলেও যায়। কিন্তু রাজনীতির ‘প্রহসন’ শেষ হয় না। শীত আমাদের যতই শীতল ও শীতার্ত করুক না কেন এ নিয়ে তেমন কোনো আলাপ-আলোচনা তোলপাড় বা লেখালেখি হয় না। অথচ রাজনীতি নিয়ে আমাদের দেশে কী তোলপাড়ই না হয়! রাজনীতি নিয়ে বক্তৃতা, বিবৃতি, সংবাদ, সংবাদ ভাষ্য, কলাম, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন, সমীক্ষা কতই না আয়োজন।

আমাদের দেশের রাজনীতি অবশ্য প্রধান দুটি শিবিরে বিভক্ত। একপক্ষ অপরপক্ষকে দেখে নেওয়ার চেষ্টায় সারাক্ষণ তত্পর। কে কাকে ঘায়েল করতে পারে, জব্দ করতে পারে রাজনীতি যেন তারই সাধনা! এই রাজনীতি নিয়ে দলাদলি, সংঘর্ষ, কোন্দল, হুমকি-ধমকি কোনো কিছুরই কমতি নেই। রাজনীতি মানেই হচ্ছে উত্তাপ, উত্তেজনা। সেখানে শীত অত্যন্ত উপেক্ষিত ও অবহেলিত ইস্যু। অথচ শীত আমাদের জীবনে কম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নয়। শীতের প্রকোপ বাড়লে জীবনযাত্রা অচল হয়ে যায়। স্থবির হয়ে যায় সব কিছু। শীত মারাত্মক সব উপাদান নিয়ে হাজির হয়। আমাদের সমাজ-সংস্কৃতিতে ভীষণ প্রভাব ফেলে। আমাদের পোশাক, খাদ্য তালিকা, চলাফেরা, ভোগ-দুর্ভোগ সব কিছুই পাল্টে যায়। সেই শীতকে নিয়ে কী নির্মম উদাসীনতা! বাংলা সাহিত্যের ‘বিষণ্নতম’ কবি জীবনানন্দ দাশের কিছু কুয়াশাচ্ছন্ন কবিতা ছাড়া শীতকে নিয়ে তেমন সাহিত্যকর্মও চোখে পড়ে না।

শীতকালকে আমরা যত উপেক্ষাই করি না কেন, এ সময় রাজনীতি কিন্তু বেশ জমে ওঠে। রাজনীতির ভরা জোয়ার বা তেজকটাল বলা যায় এই শীতকালকে। আমাদের জাতীয় জীবনের সব তাত্পর্যময় দিবসগুলোও এ শীতকালেই। ১৬ ডিসেম্বর, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ সবই হচ্ছে শীতকালীন ঘটনা। এরশাদের বিরুদ্ধে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানও সংঘটিত হয়েছে শীতকালেই।

আসলে শীতকালে এদেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের তেজ চাড়া দিয়ে ওঠে। এর একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে শীতের সবজি। নানা জাতের, নানা স্বাদের বিচিত্র টাটকা সবজি খেয়ে শরীরের মধ্যে এক ধরনের টগবগে ভাব আসা স্বাভাবিক। আর শরীরে তেজ থাকলে, তেল থাকলে তা বের হবেই। এই তেজের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আন্দোলন, মানি না মানবো না— ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। কথায়ও আছে পেটে খেলে পিঠে সয়। আন্দোলন তো এক ধরনের পিঠে সওয়াই। হামলা-মামলা, ধাওয়া, লাঠি-গুলি-টিয়ার গ্যাস, চিত্কার, স্লোগান, দৌড়-ঝাঁপ ইত্যাদি তো শক্তি ক্ষয়ের সম্মিলিত যোগফল। পেটে খাবার না থাকলে, তেজ না থাকলে কি আর এসব করা সম্ভব?

একবার শীতের শাক-সবজির কথা ভাবুন। কই মাছ দিয়ে ফুলকপির তরকারি, চিংড়ি মাছ দিয়ে লাউ বা বাঁধাকপির ঘণ্ট, আলু-বেগুন-শিম-কপি সহযোগে পাঁচফোড়ন দেওয়া তরকারি, ডালের বড়াসহ মাগুর কিংবা বোয়াল মাছের হালকা ঝোল, ধনিয়া পাতা কাঁচামরিচ সহযোগে বাটা, ফুলকপির সঙ্গে বেসন মিশিয়ে বড়া, সর্ষে ফুলের বড়া, পেঁয়াজু, বেগুনি, গরম মুড়ি, মাদকতা মেশানো খেজুর রস ও খেজুর গুড়, নানা জাতের পিঠা, হাঁস কিংবা পাঁঠার মাংস—এমনি অসংখ্য উপাদেয় খাদ্যসুখ আমাদের ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’ উচ্চারণ করতে উত্সাহিত করে। আসলে শীতকালটা হচ্ছে সুখের কাল, উপভোগের কাল (দরিদ্রদের জন্য নয়, অবশ্যই। তাদের নিয়ে এদেশে কেউ কি ভাবে? তাদের জন্য এ লেখাও নয়)!

আমাদের দেশে শীতের রাজনীতি আছে, তবে শীতকে নিয়ে রাজনীতি এখনো শুরু হয়নি। বন্যার সময় যেমন বলা হয় ‘ভারতীয় বন্যা’, শীতকে তেমনভাবে ভারতীয়, পাকিস্তানি কিংবা পশ্চিমা শীত বলার প্রবণতা এখনো শুরু হয়নি। তবে আমাদের দেশের রাজনীতির যে স্বভাব, তাতে অচিরেই শীতকে নিয়ে রাজনীতি শুরু হয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বিএনপি-জামায়াতপন্থিরা বলবে, এই শীত আওয়ামী লীগ সরকারের সীমাহীন অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও লুটপাটেরই ফল। এ সরকারকে ক্ষমতা থেকে না সরালে শীতসহ যাবতীয় সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না। কাজেই আসুন, জনগণের ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলি। এ সরকারকে উত্খাত করার শপথ গ্রহণ করি।

পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ বলবে, এই শীত জঙ্গি শীত, জামায়াত-বিএনপিওয়ালারা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এ অবৈধ শীতকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এটা বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টের চক্রান্ত। একটি মহল শীতের ধোঁয়া তুলে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু জনগণ তা হতে দেবে না।

যাহোক, শীতের আরেকটি বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, মানুষের মাথার নার্ভগুলো এ সময় কেন জানি ঢিলা হয়ে যায়। হাইকোর্টের সামনের মোড়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাগলের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। রাস্তাঘাটে ‘শ্রীপুরের বটিকা’সহ নানা রকম চুলকানির মলম, জটিল-কঠিন-দুরারোগ্য সব রোগের ওষুধ, সালসা, তাবিজ ইত্যাদি নিয়ে ক্যানভাসাররা আবির্ভূত হয়। বিরোধী দল ও জোটের আন্দোলন আন্দোলন খেলা, চূড়ান্ত আন্দোলনের হুমকি, ক্ষমতাসীনদের যথেচ্ছাচারের উত্সব, বই মেলা, পিকনিক, বিয়ে, সম্মেলন, খুন-হত্যা-সড়ক দুর্ঘটনা, নারী নির্যাতন, ছিনতাই ইত্যাদি শীতকালে প্রকট হয়ে দেখা দেয়। পুরনো বাতের ব্যথা, অম্লতা, পিত্তশূল, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিসসহ নানা রকম কোল্ড-ডিজিজ শীতের অতিথি পাখির মতো ব্যাপকভাবে আবির্ভূত হয়।

আজ থেকে বহু বছর আগে এক শীতপ্রধান দেশের মহাকবি লিখেছিলেন, ‘শীতের বাতাস তুমি বও, তুমি বও/মানুষের অকৃতজ্ঞতার মতো তুমি নির্দয় নও।’ কবির সেই দেশে মানুষ ছিল। সে মানুষের মধ্যে অকৃতজ্ঞতাও ছিল যা নিয়ে কবি ক্ষুব্ধ কবিতা লিখেছিলেন। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে তেমন ‘মানুষ’ নেই। এখানে একদল আছে নেতা, অপরদল জনতা। একদল প্রভু, অন্যরা ভৃত্য। প্রভুদের জীবনে শীত স্পর্শ করে না, স্পর্শ করে রাজনীতি। এই রাজনীতিকে পুঁজি করে তারা সব কিছু বাগিয়ে নেয়। ভোগ-লালসা, সুখ-সচ্ছলতা, আনন্দ-উত্সব সব কিছু। কিন্তু এই রাজনীতি জনতারূপী ভৃত্যদের স্পর্শ করে না। তাদের জীবনে বঞ্চনা ছাড়া অন্য কোনো যৌতুক নেই। কোটরাবদ্ধ ব্যাঙের মতো গুটিসুটি মেরে কোনোরকমে নিশ্চুপ তাদের বেঁচে থাকা!

পুনশ্চ: পরিশেষে আবহাওয়া বিষয়ক একটি পুরনো কৌতুক!

এক রাজা বেরিয়েছেন শিকারে। তিনি তাঁর মন্ত্রীদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আজকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস কী? ঝড়বৃষ্টি কি হবে?’ মন্ত্রীরা বললেন, ‘জি না হুজুর, আজ আবহাওয়া চমত্কার। ঝড়বৃষ্টি হবে না।’

রাজা চলেছেন। পথে দেখা একজন ধোপার সঙ্গে। রাজাকে তিনি বললেন, ‘রাজামশাই, আপনি যে সামনে এগোচ্ছেন, সামনে তো ঝড়বৃষ্টি হবে।’

রাজা তার কথা শুনলেন না। এগোতে লাগলেন। খানিক পরে সত্যি সত্যি ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।

রাজা ফিরে এলেন। বললেন, ‘আবহাওয়ামন্ত্রীকে বরখাস্ত করো। ধরে নিয়ে এসো ওই ধোপাকে। ওকেই মন্ত্রী করব।’

রাজা ধোপাকে মন্ত্রী করলেন।

রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, তুমি কেমন করে বললে, সামনে ঝড়বৃষ্টি হবে?’

ধোপা বলল, ‘যখন ঝড়বৃষ্টি আসন্ন, তখন আমার গাধার কান নড়ে। তখন আমার গাধার কান নড়ছিল। সেটা দেখে আমি বুঝলাম, একটু পরেই ঝড়বৃষ্টি শুরু হবে।’

রাজা বললেন, ‘তাহলে আর তোমাকে মন্ত্রী করব কেন? তুমি বরখাস্ত। যাও, নিয়ে এসো সেই গাধাকে। তাকেই আমি মন্ত্রী বানাব।’

রাজা গাধাকেই মন্ত্রী বানালেন!

n লেখক :রম্য লেখক

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২০ নভেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৫:১৪
যোহর১১:৫৬
আসর৩:৪০
মাগরিব৫:১৯
এশা৬:৩৭
সূর্যোদয় - ৬:৩৫সূর্যাস্ত - ০৫:১৪
পড়ুন