ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নে ব্যাংকিং সেক্টরে পরিবর্তন জরুরি
প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী২৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নে ব্যাংকিং সেক্টরে পরিবর্তন জরুরি

বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থা নিয়ে যত নেতিবাচক কথা চলছে, তার সবকিছু কিন্তু সঠিক নয়। এখন সময় এসেছে ব্যাংকিং সেক্টরে পরিবর্তন আনার। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকিং সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন  কর্মকর্তার অভাব রয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকিংএ দক্ষ একজন স্ট্র্যাটেজিক লিডার থাকলে তার পক্ষে দ্রুত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা সম্ভব। ব্যাংকিং সেক্টরে সমস্যাগুলো কখনো একদিনে তৈরি হয়নি। এগুলো বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে একটি মাফিয়া নেক্সাস গড়ে উঠেছে। ব্যাংকার আমলা-ব্যবসায়ী আর উচ্চ পর্যায়ে যারা ঋণ মঞ্জুিরর সাথে জড়িত তারা সরকারের সদিচ্ছাকে তুচ্ছ করে নিজেদের আখের গোছাচ্ছেন। মানুষের মধ্যে ভোগবিলাসের প্রতি এত লোভ-লালসা জাগ্রত হয়েছে যাতে ভুখানাঙ্গা মানুষের চাহিদাও এদের কাছে তুচ্ছ। ফলে তারা ব্যাংকের অর্থ আত্মসাত্ করে। তবে দুঃখজনক হলো, কোনো কোনো ব্যাংকে এত  উচ্চ বেতন দেয়া হয় যে এতে তাদের নৈতিক মনোবল নষ্ট হতে পারে। এত উচ্চ বেতন যে দেয় সেটা কীভাবে দেয়? ব্যাংকের আয়ের মূল উত্স হচ্ছে ঋণের সুদের হার। বিশ্বব্যাপী যেখানে দেখা যায় ঋণ আদায় ও আমানতের উপর সুদের হার ২%, সেখানে বাংলাদেশে ব্যাংকিং সেক্টরে এটি ৫ থেকে ৭ শতাংশ। এত উচ্চ সুদের হারের মধ্যকার পার্থক্য (Spread) অতিরিক্ত হয়ে যাওয়াটা  সত্যিই দুঃখজনক। এটি কমাতে হলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ সাজ-সজ্জার খরচ এবং অপারেটিভ ও লজিস্টিক কস্টও কমাতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সার্কুলারে বলা আছে যে, সর্বোচ্চ ১৫ লক্ষ টাকা খরচ করা যাবে। বাস্তবতা হলো প্রায় দেড় কোটি থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ করা হয়ে থাকে এসব খাতে। মূলত এই খরচের জন্যে ঋণের সুদসহ আনুষঙ্গিক খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায় যে, কোনো কোনো বেসরকারি ব্যাংকের এমডি সকল সুযোগ- সুবিধা ও বেতন-ভাতাদিসহ যে বেতন পেয়ে থাকেন—যা একজন সিনিয়র সচিব যে পরিমাণ বেতন পান তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এত উচ্চ বেতন দেয়ার প্রতিযোগিতা বন্ধ করার জন্যে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি শক্তিশালী নির্দেশনা প্রয়োজন। একই অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে ব্যাংকের অভ্যন্তরে এবং শুধু বাইরের সাজসজ্জার খরচ কমানোর উপর গুরুত্ব আরোপ করলেই হবে না, বরং যারা নির্দেশনা লঙ্ঘন করবে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দেখা যায় যে, ব্যাংকাররা বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অনুদান দিয়ে তার দায় চাপায় সাধারণ গ্রাহকের উপর। অথচ বাড়তি সুবিধা নেন তাদের নিজেদের ক্ষেত্রে। ফলে গ্রাহক সেবার বদলে গ্রাহকের ক্ষেত্রে এক ধরনের ফাঁস তৈরি হয়।

গবেষণার জন্যে সম্প্রতি ব্যাংকারদের মধ্যে একটি জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, প্রায় ৮৫% ব্যাংকার যারা এমটিও থেকে এসএভিপি পর্যায়ে কাজ করে তারা মনে করেন যে, বর্তমানে যেহেতু ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং এসে গেছে, সেহেতু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার মনে রাখার দরকার নেই। কী ভ্রান্ত ধারণায় তারা বিশ্বাসী! ভালো ও দক্ষ ব্যাংকার হতে হলে সার্কুলারগুলো বেদবাক্যের মতো মনে রাখা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা বাঞ্ছনীয়। ব্যাংকে কাজের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় নিজের ডেস্ক সম্পর্কে জ্ঞান না থাকায় অসাধু পরিচালক ও শাখা ব্যবস্থাপকদের দ্বারা ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার অজ্ঞতা ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতিই কেবল করে না, বরং দেশের সুনামহানি ঘটায়। হলমার্ক, বিসমিল্লাহসহ যারা ব্যাংকিং ক্ষেত্রে দুর্নীতি করছে তা দুটো কারণে সম্ভব হয়েছে। একটি ব্যাংকারদের অমিত লোভ, আরেকটি হচ্ছে কাজ না জানা। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের যে অর্থ পাচার হয়ে গেছে তাও কিন্তু অদ্যাবধি ফেরত পাওয়া যায়নি। সমস্যা হলো, দায়িত্বশীল ব্যাংকার বর্তমানে তৈরি হচ্ছে না। আবার ব্যাংকিং সেক্টরে বর্তমানে মহিলা ব্যাংকার কম তৈরি হচ্ছে। নারীর সাম্য ও ক্ষমতায়ন কেবল নিম্নবিত্ত কিংবা উচ্চমধ্যবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মধ্যবিত্তের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। আসলে ব্যাংকিং সেক্টরে সব দেশে বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ঘটে থাকে। এখন রি-স্ট্রাকচারিং করা প্রয়োজন। ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী ক্যাপিটেল এডুকেসি পূরণ করতে হবে। কনভেনশনাল ব্যাংকিং-এ যখন আইনের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে ব্যবসা করা হয় তখন তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে দেখা যায় দুর্বৃত্তায়ন ঘটে থাকে। আবার অনেকে নীতি কথা বলেন,  নৈতিকতার কথা বলেন, কিন্তু দেখা যায় নিজের পছন্দের বেলায় নীতি মানেন না। প্রায় ২৮ বছরের চাকরি জীবনে প্রত্যক্ষভাবে ১৩ বছরের অধিককাল বিভিন্ন পদমর্যাদায় ব্যাংকিং-এ কাজ করছি। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশকে পূর্বতন গভর্নর ড. আতিউর রহমান ফাইন্যান্সিয়্যাল ইনক্লুশানের আওতায় নিতে বিভিন্ন সার্কুলারের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ব্যাংকিং বিভাগকে পাবলিক ব্যাংকিং সেক্টরের খবরদারি থেকে বাঁচাতে হবে। ্এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকে অতিরিক্ত স্বাধীনতা ও কর্মক্ষমতা দেয়ার পাশাপাশি  যোগ্য ব্যাংকার নিয়োগ করা প্রয়োজন। অফসাইট ও অনসাইট সুপারভিশনের মান উন্নত করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এমনও ব্যক্তি আছেন, যিনি একটি পাবলিক লিমিটেড ব্যাংকের গাড়ি নিয়মিত ব্যবহার করেন এবং ঐ গাড়িতে আসা-যাওয়া করেন। অথচ পাবলিক লিমিটেড ব্যাংকের আইন অনুযায়ী বোর্ড মেম্বার শুধুমাত্র বোর্ড মিটিং ছাড়া কেউ এ ধরনের সুবিধা পেতে পারেন না। এদিকে সোনালী, জনতা, রূপালী, অগ্রণী এবং বেসিকের ক্যাপিটাল এডুকেসি সমস্যা সমাধানকল্পে অবশ্যই বণ্ড বাজারে ছাড়া দরকার— বাজেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ না দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সহায়তা করতে হবে। গরিবদের জন্যে কমিউনিটি ব্যাংকিং চালুর বিকল্প নেই।

সম্প্রতি একটি বেসরকারি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড নিয়ে বিদেশে গেলে অন্যায়ভাবে একটি হোটেল ভুলক্রমে টাকা কেটে নেয়। প্রায় মাসখানেক হতে চলল, স্থানীয় ব্যাংকে বিষয়টি জানানো সত্ত্বেও তার সুরাহা হয়নি। ব্যাংকিং সার্ভিস যে খারাপ হয়ে যাচ্ছে তার দায় কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনোমতেই অস্বীকার করতে পারে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আসলে ব্যাংকিং সেক্টরে সমস্যা সৃষ্টি করছে।

বর্তমান সরকারের পেটে-ভাতে রাজনীতির বাস্তবায়নে ব্যাংকিং সেক্টরকে সার্বিকভাবে সবল ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। আইবিবি-এর ডিপ্লোমা পরীক্ষা পদ্ধতি বদলাতে হবে, প্রয়োজনে সার্কুলারসহ দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রমের উপর হাতেকলমে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। আগের গভর্নর সাহেবের আমলে বিদেশে ব্যাংকারদের পাঠানোর ব্যবস্থা ছিল। তার চেয়ে ঢাকা স্কুল অব ইকোনোমিক্স কাস্টমাইজড প্রোগ্রামের আওতায় মাস্টার ডিগ্রি চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি অফ জব ট্রেনিং এবং অন জব ট্রেনিংও জোরদার করা দরকার।

এক পরিবারের হাতে অধিক সংখ্যক ব্যাংকের মালিকানা থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। সরকার প্রধানের কাছে বিনীত অনুরোধ— তার আমলে যে উন্নতি হয়েছে তা টেকসই করার উদ্দেশ্যে এক পরিবার থেকে কেবল একজন সদস্য একটি ব্যাংকের সদস্য হতে পারবেন। নচেত্ এরা অন্যায় কর্মকাণ্ড করার জন্যে কার্টেল  তৈরি করে সরকারকে বিপদে ফেলতে পারে। ই-কমার্সের ক্ষেত্রে ব্যাংকের মাধ্যমে যখন লেনদেন হয় স্বাভাবিক নিয়মে কর দেয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাহাড়ি ও হাওর অঞ্চলে কেবল নতুন ব্যাংকসমূহের শাখা খুলতে দেয়া উচিত। ব্যাংকিং সেক্টরে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং সত্, নির্ভীক ও নৈতিকতাসম্পন্ন ব্যাংকার তৈরির পাশাপাশি সোশ্যাল প্রটেকশনের ব্যবস্থা থাকা দরকার। কেননা ক্ষমতাতন্ত্রের কাছাকাছি থাকার কারণে কোনো কোনো ব্যাংকমালিক নিজেদের আখের গোছান— এমনকি হুমকি-ধামকি দেন। অথচ ব্যাংকিং সেক্টরকে এসডিজি বাস্তবায়নে এবং ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত করার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। আর তাই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চালু করা দরকার। সরকারপ্রধানের নির্দেশনাকে কাজে লাগাতে হবে।

n লেখক:ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়্যাল ইকোনোমিস্ট

ই-মেইল:[email protected]

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৭ নভেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৫:১৮
যোহর১২:০০
আসর৩:৪৪
মাগরিব৫:২৩
এশা৬:৪১
সূর্যোদয় - ৬:৩৯সূর্যাস্ত - ০৫:১৮
পড়ুন