অকারণে ব্যাকরণ
২৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
অকারণে ব্যাকরণ
হোসনে আরা বেগম

পৃথিবীর কোনো কিছুই বিনা কারণে ঘটে না। আমাদের চারপাশে যা ঘটছে—তা কোনো না কোনো কারণ-সূত্রে বাঁধা। তাই ব্যাকরণও অকারণে নয়।

ব্যাকরণের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে কোনো কোনো বইয়ে এখনো লেখা হয়, ‘যে বই পড়লে বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে বলতে, পড়তে ও লিখতে পারা যায়, তাকে বাংলা ব্যাকরণ বলে।’

আমরা অনেকেই ছোট সময়ে এই সংজ্ঞাটি তোতা পাখির মতো মুখস্থ করেছি। এটা ঠিক কি ঠিক নয়, তা কখনো চিন্তা করিনি। প্রকৃতপক্ষে এটা একটা ভুল সূত্র। কারণ অক্ষরজ্ঞান নেই, এমন বহু মানুষ বাংলা ব্যাকরণ বই পাঠ না করেই ভাষা শুদ্ধরূপে বলতে পারে। একইভাবে, শুধুমাত্র অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ ব্যাকরণ বই ছাড়াই বাংলা ভাষা শুদ্ধরূপে পড়তে ও লিখতে পারে। তবে বোর্ডের বইতে ব্যাকরণের সংজ্ঞা হলো, ‘যে শাস্ত্রে কোনো ভাষার বিভিন্ন উপাদানের প্রকৃতি ও স্বরূপের বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় এবং বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক নির্ণয় ও প্রয়োগবিধি বিশদভাবে আলোচিত হয়, তাকে ব্যাকরণ বলে।’ এ সূত্র অনুযায়ী, ব্যাকরণ পড়ে ভাষার বিভিন্ন উপাদানের গঠন প্রকৃতি ও সে সবের সুষ্ঠু ব্যবহারবিধি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। অতএব ব্যাকরণকে একেবারে অকারণ বলা যায় না।

যারা গান গায়, তাদের গানের স্বরলিপি জানা আবশ্যক। কিন্তু যারা গান গায় না বা গানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, তাদের গানের স্বরলিপি জানারও প্রয়োজন নেই। ঠিক তেমনিভাবে যারা ভাষা নিয়ে গবেষণা করবেন, শুধুমাত্র তাদের কাছে ব্যাকরণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক। তাদের কাছে ব্যাকরণ অকারণে নয়। কিন্তু যাদের কোনোদিন ভাষা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করার দরকারই হয় না, তাদের কাছে আমরা ব্যাকরণের চুলচেরা বিশ্লেষণগুলো কেন চাপিয়ে দেব? যে শিশু বড় হয়ে কী হবে জানে না, সে শিশুকেও ব্যাকরণ পড়তে হচ্ছে।

 জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড চতুর্থ শ্রেণি থেকে ব্যাকরণকে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আবার এককাঠি উপর দিয়ে যায়। চতুর্থ শ্রেণির বই তৃতীয় শ্রেণিতে পাঠ্য করে দিয়ে সিলেবাস এগিয়ে রাখার কসরত করে। শুধু কি তাই? কেউ কেউ দ্বিতীয় শ্রেণিতেও ব্যাকরণ বই পাঠ্য করে। এই যে কোমলমতি শিশুদের পড়াশুনায় এত চাপ দেওয়া হচ্ছে, এতে তাদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বিশেষজ্ঞগণ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ বিকাশকে সর্ব্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের আরো আগ্রহী, কৌতূহলী ও মনোযোগী করার জন্যে বইয়ের বিষয়বস্তুকে আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করেছেন। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এ ভাষা হেলাফেলার বিষয় নয়। এ ভাষার মাধ্যমেই শিশুদের সকল বিষয় শেখানো হয়। তাই উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞগণ যৌক্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির ধারাবাহিক মূল্যায়ন করে শিশুদের মেধা, বয়স, গ্রহণ করার ক্ষমতা ইত্যাদি বিচার-বিশ্লেষণ করেই বিভিন্ন শ্রেণির ধারাবাহিক সংস্কার করেন। তাই যত্রতত্র যেকোনো শ্রেণিতে ব্যাকরণ বই-এর মতো একটা কঠিন বিষয় শিশুদের মাথার বোঝা করে দেওয়া ঠিক নয়। এক ভদ্রলোকের সঙ্গে ব্যাকরণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘ব্যাকরণের কথা মনে হলে আমার এখনো বুক ঢিপ্ ঢিপ্ করে। এ বিষয়টার জন্যে কত যে মার খেয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই।’ ব্যাকরণ শিক্ষককে ভয় পায় না, এমন বুকের পাটা কয়জনের আছে? এক সময়ে যিনি তুখোড় ছাত্র ছিলেন, ক্লাসে ফার্স্ট বয় বলে সবাই স্নেহ-আদর করত—যিনি ব্যাকরণ বুঝে না বুঝে কণ্ঠস্থ করে সবার চোখে তাক লাগিয়ে দিতেন, তাকেও যদি হঠাত্ করে জিজ্ঞেস করা হয়— ব্যতিহার কর্তা, অনির্দিষ্ট লিঙ্গক, অনুকার অব্যয়, সমুচ্চয়ী অব্যয়, বিগ্রহ বাক্য ইত্যাদি ইত্যাদি কাকে বলে— তাহলে নির্ঘাত হিমশিম খাবেন। অথচ তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এমন শত শত সংজ্ঞা মুখস্থ করতে গিয়ে প্রাণান্ত হবার জোগাড়।  বই ব্যবসাকে চাঙ্গা করার জন্যে কোনো কোনো শ্রেণিতে একাধিক ব্যাকরণ ও বিরচনের বই চাপিয়ে দেওয়া হয়। এতে একদিকে যেমন মা-বাবার অর্থ ব্যয়, অন্যদিকে একটা বিদঘুটে বই চাপিয়ে দিয়ে শিশুদের পড়াশোনাকে একটা বোঝা করে তোলা হচ্ছে।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর মুখবন্ধে বলেছেন, ‘জোর-জবরদস্তি করে শিক্ষাদান নয়, শিশুদের শিক্ষার পরিবেশ, পাঠদান পদ্ধতি ও বিষয়বস্তু আকর্ষণীয় ও আনন্দময় করে তুলতে হবে।’ আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘শিক্ষাক্রম উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।’ সময় ও সমাজের চাহিদার প্রেক্ষিতে এর পরিমার্জন, পরিবর্তন ও উন্নয়ন একটি স্বাভাবিক কর্মধারা।

 মজার ব্যাপার হলো, ব্যাকরণের বিষয়টা কিন্তু প্রথম শ্রেণি থেকেই পাঠ্যপুস্তকে সন্নিবেশিত হয়েছে। উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের সাধুবাদ জানাই, তারা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যাকরণের বর্ণ, শব্দ, বাক্য ইত্যাদি শিশুদের শোনা, বলা, পড়া ও লেখার দক্ষতা অর্জনের ভেতর দিয়ে তাদের নাগালের মাঝে নিয়ে আসতে পেরেছেন। প্রথম শ্রেণিতে শিশুরা ডট্ ডট্ দিয়ে বাংলা বর্ণমালা, স্বরবর্ণের মাধ্যমে আকার—এসব লিখতে শেখে।

যেখানে তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণিতে যুক্তবর্ণ, বিপরীত শব্দ ইত্যাদি শেখানো হয়, সেখানে তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণিতেই কেন অকারণে ব্যাকরণের একটা আস্ত বই মাথায় চাপিয়ে দিয়ে পড়াশুনার আগ্রহটাকে একেবারে ভোঁতা করে দেওয়া হচ্ছে? শিশুদের পড়াশুনাকে আনন্দময় করে তোলার জন্যে উচ্চ পর্যায়ের বিষয় বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীদের মেধা, বয়স ইত্যাদি বিচার-বিশ্লেষণ করেই বাংলা পাঠ্য বই রচনা করতে হবে।

n লেখক: প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ভিকারুননিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ

প্রাক্তন অধ্যক্ষ, আজিমপুর গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৭ নভেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৫:১৮
যোহর১২:০০
আসর৩:৪৪
মাগরিব৫:২৩
এশা৬:৪১
সূর্যোদয় - ৬:৩৯সূর্যাস্ত - ০৫:১৮
পড়ুন