শরণার্থী সংকটের শেষ কোথায়
০৩ মার্চ, ২০১৬ ইং
গ্রিস-মেসিডোনিয়া সীমান্তে সমপ্রতি প্রবল সংঘর্ষ হইয়াছে শরণার্থী ও সীমান্ত-প্রহরীদের মধ্যে। ‘আমি এখানে নিদারুণ কষ্টে আছি। ধীরে ধীরে ধাবিত হইতেছি মৃত্যুর দিকে। জানি না, আমি কী করিব’—সিরিয়ার আলেপ্পো হইতে আসা একজন শরণার্থী আবদুল্লাহ’র আর্তনাদ ইহা। তাহার মতো আট সহস্রাধিক রহিয়াছেন সীমান্তে আইডোমেনি গ্রামে, যাহারা মেসিডোনিয়া সীমান্ত পার হইয়া একটু ভালো করিয়া বাঁচিবার তরে পৌঁছাইতে চাহে পশ্চিম ইউরোপে। সমুদ্রের বালুকাবেলায় সিরীয় শিশু আয়লানের মুখ থুবরাইয়া পড়িয়া থাকিবার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হইয়াছিল বলিয়া তাহা লইয়া শোরগোল উঠিয়াছিল বিশ্বজুড়িয়া। কিন্তু কত শত আয়লান এখনও প্রাণ হারাইতেছে এবং আরো কত সহস্র শিশু অভিভাবকহীন হইয়া নিখোঁজ রহিয়াছে, তাহার ইয়ত্তা নাই। ধারণা করা হয়, অভিভাবকহীন ১০ হাজারের অধিক নিখোঁজ শরণার্থী শিশু ইউরোপ হইতেই সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়িয়াছে। এবং তাহাদের যৌনকাজে ও ক্রীতদাস হিসাবে ব্যবহার করিবার আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অপরাধ বিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থা ইউরোপোল।

মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীদের গ্রহণের ব্যাপারে বহুপূর্বেই দ্বিধাবিভক্ত ইউরোপ। হাঙ্গেরি, ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়ার মতো দেশ শরণার্থীদের অবরুদ্ধ করিয়া পার্শ্ববর্তী দেশে ঠেলিয়া দেওয়ার প্রবণতা দেখা গিয়াছে। শরণার্থী-বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সকল দেশের সহিত এশিয়া আফ্রিকার সহিত কোনো ঔপনিবেশিক ইতিহাস নাই। তাই তাহারা ‘শরণার্থী-উত্পাত’ গ্রহণ করিতে চাহে না। অন্যদিকে পশ্চিম ইউরোপের দেশসমূহের ঔপনিবেশিক ইতিহাস রহিয়াছে, যাহারা এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা শাসন করিয়াছে অতীতে—বর্তমান সংকটে তাহাদের মানবিক দায়িত্বও রহিয়াছে বটে। ইতোমধ্যে ১০ লক্ষ শরণার্থীকে জার্মানি আশ্রয় দেওয়ার পরও জার্মানির এই মানবিক অবস্থান তুলনারহিত। যদিও এখন লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ইউরোপে প্রবেশ করিতে চাহিতেছে। ফলে ফ্রান্স ও জার্মানির মতো দেশকেও এখন আতঙ্কিত হইতে দেখা যাইতেছে। তবে উদ্বেগ আর বিরোধিতার সুর বৃদ্ধি পাইলেও শরণার্থীদের জন্য দেশের ‘দরজা খোলা’ রাখিবার অবস্থানেই অনড় রহিয়াছেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। ‘একতরফা ভাবে সীমান্ত বন্ধ করিয়া এই সমস্যার সমাধান করা যাইবে না’—মার্কেলের এই ভাবনা সবিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। এইদিকে শীতকাল প্রায় শেষ। ভালো আবহাওয়ার সুযোগে আরও শরণার্থী ঢোকার চেষ্টা চালাইবেন ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে। ইউরোপকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, আর মানবতার দৃষ্টান্ত রাখার কাজটি এক্ষণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার দায়িত্ব নিজেদের মধ্যে যুক্তিসম্মত ভাবে ভাগ করিবার ব্যাপারে আগামী ৭ মার্চ বৈঠক হইবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও তুরস্কের মধ্যে। তাহার পর ১৮ ও ১৯ মার্চ শরণার্থী প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আসর বসিবে। মানবিক সমাধান বা উদার উপায় কি বাহির হইবে এইসকল বৈঠক হইতে? ইউরোপের বহু দেশই শরণার্থীদের সম্পর্কে খুব বেশি ‘উদার’ নহে। শরণার্থীদের জার্মানিতে পৌঁছানোর শেষ ধাপ অস্ট্রিয়া এবং বলকান অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ সম্প্রতি নিজেদের সীমান্ত বন্ধ করিবার সিদ্ধান্ত লইয়াছে। ফলে ইউরোপে ঢোকার প্রধানতম প্রবেশপথ গ্রিসে সহস্রাধিক শরণার্থী আটকা পড়িয়াছে। তাহাতে নূতন করিয়া বিশৃঙ্খলায় পড়িতেছে গ্রিস। মার্কেল যতই এইসকল বিষয়ের সমালোচনা করুন, তাহার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি যতই অনড় থাকুক, সমীক্ষা বলিতেছে, বর্তমানে জার্মানির অধিকাংশ মানুষ চাহিতেছে—শরণার্থী গ্রহণের বিষয়ে রাশ টানুক জার্মানি।

কাহাদের কারণে এই ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি হইল, তাহা আজ আর অজানা নহে। মধ্যপ্রাচ্যের সিংহভাগ শরণার্থীর ছিল সোনালি-সমৃদ্ধ জীবন-সংসার। তাহারা জলবায়ু উদ্বাস্তু নহেন, তাহারা অর্থনৈতিক উদ্বাস্তুও নহেন। তাহাদের চোখে-মুখে স্পষ্ট ফুটিয়া উঠে—দাও ফিরে সে জীবন, লও এই পূতিগন্ধময় শিবির। ঘোলা জলে মত্স্য-শিকার শেষ হইতে আর কত বিলম্ব—তাহা কে জানে?

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩ মার্চ, ২০২১ ইং
ফজর৫:০৪
যোহর১২:১১
আসর৪:২৪
মাগরিব৬:০৫
এশা৭:১৮
সূর্যোদয় - ৬:১৯সূর্যাস্ত - ০৬:০০
পড়ুন