মোগল আমলের গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড
২১ জুন, ২০১৬ ইং
ইতিহাস বা ঐতিহ্য সংরক্ষণকারী জাতি হিসেবে আমাদের সুখ্যাতি কোনোকালেই ছিল না। বহু ঐতিহ্যবাহী সৌধ, ভবন, বা শিল্প নিদর্শন অনাদরে হারাইয়া গিয়াছে। তদ্রূপ, কালের আবর্তে হারাইয়া যাইতেছে এশিয়ার প্রাচীন ও দীর্ঘতম ‘সড়ক এ আজম’ বা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। সুপ্রাচীন এই সড়কটি বাংলাদেশ অংশে অস্তিত্ব সংকটে পড়িলেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্তত ৩টি দেশে ব্যবহূত হইতেছে এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে। বাংলাদেশে ইহা শের শাহ সড়ক নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম হইতে ঢাকার সোনারগাঁ হইয়া যশোর হইতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া ও পাকিস্তানের পেশোয়ারের মধ্য দিয়া আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই সড়কটি। শের শাহর তত্ত্বাবধানে নির্মিত মোট আড়াই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি সেই সময় উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশকে সংযুক্ত করিয়াছিল এবং প্রধান সড়ক হিসেবে ব্যবহূত হইত। সড়কটি কেন্দ্র করিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে বিভিন্ন জনপদ, নগর ও ব্যবসা কেন্দ্র। শের শাহ এই সড়কের ধারে নির্দিষ্ট দূরত্বে সরাইখানা, মসজিদ, মন্দির প্রতিষ্ঠা ও সরাইখানা করিয়া সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করেন। কালের স্রোতে সরাইখানা বিলীন হইয়াছে, তেমনি বিলীন হইতে চলিয়াছে বাংলাদেশ অংশে সড়কের অস্তিত্ব।

উল্লেখ্য, শের শাহ ছিলেন ভারতবর্ষের সম্রাট ও শুর বংশের প্রতিষ্ঠাতা। ১৫৩৭ সালে মোগল সম্রাট হুমায়ুনের সেনানায়ক হিসেবে শের শাহ বাংলা জয় করেন। ১৫৪১ থেকে ১৫৪৫ সালের মধ্যে মাত্র পাঁচ বত্সরের শাসনামলে শের শাহ মৌর্য যুগের প্রাচীন সড়কটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করিয়া ‘সড়ক এ আজম’ নামকরণ করেন এবং কাবুল হইতে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পর্যন্ত এক সুতায় গাঁথিয়া দেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে সড়কটির নাম পরিবর্তন করিয়া গ্র্যান্ড ট্র্যাংক রোড রাখা হয়। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে শের শাহর নির্মিত এই সড়কটি এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে ব্যবহার হইতেছে। অথচ বাংলাদেশের চিত্র উল্টা। ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত যশোরের বেনাপোল হইতে ঢাকার সোনারগাঁ হইয়া চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত এই সড়কের অস্তিত্ব আছে এখন কেবল যশোরের বাঘারপাড়ায়। শের শাহ সড়ক নামে ইহা উপজেলার প্রবেশমুখ হইতে বিপরীত দিকের শেষ সীমানা পর্যন্ত মাত্র ৩৭ কিলোমিটার বিস্তৃত। বর্তমানে আঞ্চলিক সড়ক হিসেবে ইহা ব্যবহূত হইতেছে।

ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটাইতে বরাবরই আমরা দায়িত্বহীনতা ও অসচেতনতার পরিচয় দিয়াছি। নূতন নির্মাণ আমরা করিয়াছি অনেক, কিন্তু পুরাতনের সঙ্গে সকল সংযোগ রাখিতে পারি নাই, বরং দূরে ঠেলিয়াছি। অথচ ঐতিহ্যের স্মারকগুলি বারবার নবায়নের মাধ্যমেই আধুনিক জীবন শেকড়সংলগ্ন তো বটেই, অধিকতর আধুনিকও হইয়া ওঠে। পুরাতন স্মৃতিগুলি জীবন্ত হইয়া চিন্তা ও মননে নূতন নূতন সাংস্কৃতিক সৃজনে উদ্বুদ্ধ করে। স্বাধীন বাংলাদেশে সড়ক ও জনপথের বিপুল উন্নতি ঘটিয়াছে। প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ছোট-বড় পাকা সড়কে সংযুক্ত হইয়াছে। কিন্তু এশিয়ার দীর্ঘতম এই সড়কের উন্নয়নে কোনো সরকারই কাজ করেননি। অথচ সড়কটির উন্নয়ন হইলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার দূরত্ব ৫০-৬০ কিলোমিটার কমিয়া যাইত। আর, সচল থাকিলে কেবল যাতায়াতের সুবিধাই হইত না, বরং যাতায়াত ও অন্যান্য সূত্রে মানুষের মনে এই জনপদের দীর্ঘ ঐতিহ্যময় ইতিহাসের স্মৃতি উদ্রেক করিতে পারিত।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন