দুর্ঘটনারোধে কঠোর হউন
২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ইং
মানিকগঞ্জের ঘিওরে সড়ক দুর্ঘটনায় বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও এটিএন নিউজের বার্তা সম্পাদক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজনের নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলায় বাসচালকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ হইয়াছে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হইয়াছিল ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট। ব্যক্তিবিশেষের গাফিলতি বা দায়িত্বহীনতার কারণে সম্ভাবনাময় যে-জীবনপ্রদীপ নিভিয়া গিয়াছে তাহার ক্ষতি কখনো পূরণ হইবার নহে। তাহার পরও সান্ত্বনা এইটুকু যে, দীর্ঘ অর্ধযুগ পর হইলেও সেই মামলার একটি সুরাহা হইয়াছে, কিন্তু দেশব্যাপী প্রতিনিয়ত যে অজানাসংখ্যক জীবন অকালে ঝরিয়া পড়িতেছে তাহার ন্যূনতম কোনো সান্ত্বনা নাই। প্রতিকার দূরে থাক, কেহই তাহাদের কোনো খোঁজই রাখেন না। শুধু ভুক্তভোগী পরিবার বা ভাগ্যক্রমে বাঁচিয়া যাওয়া পরিবারের সদস্যদের নীরব আর্তনাদের মধ্যেই নিরন্তর ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হইতে থাকে স্বজনহারানোর এই শূন্যতা। 

প্রতিদিনই দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটিয়াই চলিয়াছে। সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী, কেবল গত ১২ দিনেই মোট ১৩৭ জন প্রাণ হারাইয়াছেন মহাসড়কে। অন্যদিকে গত বুধবার টাঙ্গাইলে একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া রাস্তার পাশের দোকানে ঢুকিয়া পড়িলে কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়। আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনায় রহিয়াছে গুরুতর ত্রুটি। রাস্তাগুলি নামেই কেবল মহাসড়ক। দুই-একটি ব্যতিক্রম বাদে দুই লেনের এই মহাসড়কগুলিতে নাই ডিভাইডার। উপরন্তু এই মহাসড়কেই চলে ধীরগতির ও দ্রুতগতির যানবাহন। ইহার বাহিরে অনেক যানের স্টিয়ারিং রহিয়াছে লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার অথবা ভিন্ন পথে হাতে লাইসেন্স পাওয়া ড্রাইভারের হস্তে। জানা যায়, প্রায় ১০ লক্ষ ড্রাইভারের বৈধ লাইসেন্স নাই। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) তাহাদের গবেষণায় জানাইতেছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালাইবার জন্য। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। অপর এক গবেষণায় দেখা গিয়াছে, দেশে দুই-তৃতীয়াংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হইল বাস ও ট্রাক।

প্রশ্ন হইল, এই পরিস্থিতির উন্নতি হইবে কী প্রকারে? সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ১৯৯৭ সাল হইতে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় তিন বছর মেয়াদি সাতটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছে। সর্বশেষ পরিকল্পনায় ২০২৪ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমাইয়া আনিবার কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা সড়ক দুর্ঘটনার যে হিসাব প্রকাশ করিয়াছে, তাহাতে ইহার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় নাই। জাতিসংঘ ২০২০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেক কমাইয়া আনিবার ঘোষণা দিয়াছে। বাংলাদেশও এই ঘোষণাপত্রে সই করিয়াছে। জাতিসংঘ সদস্যদেশগুলোকে ভবিষ্যত্ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয়ের এক হইতে ১০ শতাংশ সড়ক নিরাপত্তার কাজে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়াছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তার ব্যয় তেমন বৃদ্ধি করে নাই, প্রাণহানি অর্ধেক কমাইয়া আনিবার ক্ষেত্রেও কোনো অগ্রগতি নাই।

প্রতিটি মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্পিডগান ও চালক লাইসেন্স পরীক্ষার যন্ত্র দিতে হইবে। এক-দুই কিলোমিটার পরপর বিশেষ ক্যামেরা স্থাপন করিতে হইবে যাহাতে ক্যামেরার তথ্য বিশ্লেষণ করিয়া আইনি ব্যবস্থা লওয়া যায়। রাস্তার বাঁকগুলি সোজা করিতে হইবে। সকল মহাসড়ককেই ন্যূনতম চার লেনে উন্নীত করিতে হইবে, ডিভাইডারসহ। অন্যদিকে উপজেলা-ইউনিয়ন-গ্রাম হইতে আগত রাস্তা সরাসরি মহাসড়কে আসিয়া মেশে, ইহারও বিকল্প ব্যবস্থা রাখিতে হইবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে যাবতীয় দুর্নীতি বন্ধ করিতে হইবে। মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তা হইতে উঠাইয়া লইতে হইবে। গড়িয়া তুলিতে হইবে একটি সার্বক্ষণিক তদারকি পদ্ধতি। সর্বোপরি, দুর্ঘটনারোধে নীতিনির্ধারক মহলকে কঠোর হইতে হইবে। গ্রহণ করিতে হইবে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ইং
ফজর৫:১০
যোহর১২:১৩
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৪
সূর্যোদয় - ৬:২৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
পড়ুন