নির্বাচিত উপন্যাস
না মানুষি জীবন
জাজাফী০৪ জুলাই, ২০১৬ ইং
না মানুষি জীবন
দমকা হাওয়ায় হারিকেনের আলোটা কিছুক্ষণ আগেই নিভে গেছে। ওটা আর জ্বালাতে ইচ্ছে করছে না। রাত যদিও খুব একটা হয়নি তার পরও জেগে থাকতেও ইচ্ছে হচ্ছে না। টিনের চালে অবিরাম বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছে। নূপুরের শব্দের চেয়েও সেটা বেশি মিষ্টি মনে হচ্ছে। একা একা রাত জেগে থেকে আর কী হবে। বাবা-মা কেউ বাড়িতে নেই। পরীর দিঘির মেলা দেখতে বড়দিকে সঙ্গে নিয়ে বাবা-মা ছোট পিসিদের বাড়িতে গেছে। যাওয়ার আগে বলে গেছে তারা আজ ফিরবে না। ওরা বাড়িতে থাকলে আরো কিছুক্ষণ জেগে থাকতে হতো। পড়ি বা না-পড়ি হারিকেন জ্বালিয়ে গুনগুন করলেই মা মনে করত আমি বিদ্যাসাগর হচ্ছি। আদতে আমি তো লবডঙ্কা। পাটখড়ির বেড়ার নিচ দিয়ে বৃষ্টির পানি ঘরের ভিতরে ঢুকছে। চারদিকে ঘন অন্ধকার। অজপাঁড়াগায়ে বিদ্যুতের আলো এসে পৌঁছেনি। ভোটের সময় নেতারা কত আশার বাণী শুনিয়ে গেছে তার কোনো ঠিক নেই, কিন্তু ভোট পার হলেই তারা হারিয়ে গেছে। আমরা জানি, তারা আবার কোনো একদিন ভোট চাইতে আমাদের দুয়ারে ভিখারির বেশে দাঁড়াবে। তারা আগের সব কিছু ভুলে যাবে। আমরাও তাদেরকে ক্ষমা করে তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে আবার তাদের ভোট দিয়ে বিজয়ী করব। সাতপুরুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এটা। রমা কাকি সে দিক থেকে আলাদা। সে কাউকে ভোট দেয় না। নিতাই বাবু তাকে আশা দিয়েছিল ভোটে জিতলে আমাদের গ্রামের জন্যে একটা টিউবওয়েল দিবেন, যেন সবাই সেই টিউবওয়েল থেকে বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারি। নিতাই বাবুকে আমরা ভোট দিয়ে পাস করিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি কথা রাখেননি। তার পর যারাই এসে ভোট চেয়েছে আর আশার বাণী শুনিয়েছে, রমা কাকি কারো কোনো কথা বিশ্বাস করেনি। সে আর মিথ্যা কথায় প্রতারিত হতে চায় না। আমাদের গ্রামের অন্যরা সবাই ঠিকই প্রতারিত হয়। পরিমল কাকার বড় ছেলেটা ঢাকায় থাকে। আসার সময় সে একটা টেলিভিশন কিনে নিয়ে এসেছিল। বিদ্যুত্ না থাকার কারণে তা আর দেখা হতো না কারো। কিন্তু টেলিভিশনটা ওভাবে ফেলে রেখে লাভ কী। তাই শেষে পরিমল কাকা একটা ব্যাটারি কিনে আনলেন। সেই টেলিভিশনে বিরেন শিকদারকেও দেখা যায় হাসিমুখে মুরগির রান খাচ্ছে, কোক খাচ্ছে। সেটা দেখে আমাদের হা-হুতাশ হয়তো বাড়ে না কিন্তু রমা কাকির শরীর জ্বলে যায়। সে খেঁকিয়ে উঠে বলে, ‘দেখ কইছিলাম না এরা নেমক হারাম। ভোটের সময় এসে হাতে পায়ে ধরে ভোট চায় আর ভোট ফুরালে লাপাত্তা। পাস করার পরের পাঁচ বছর তাদেরকে শুধু টিভিতেই দেখা যায়। সেজন্যেই আমি দুমুখো সাপকে বিশ্বাস করি না। রমা কাকির কথায় যুক্তি আছে। এসএসসিতে লেটার মার্কসহ পাস করেছিল সে। কিন্তু গরিব ঘরে জন্ম নিয়ে ওটুকু যে শিখতে পেরেছে এটাই ভাগ্য। পড়ালেখা আর হয়ে ওঠেনি তার।

বিকেল থেকেই আকাশে প্রচণ্ড মেঘ জমেছিল। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই আকাশ কাঁপিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো। কতক্ষণ চলবে তার কোনো ঠিক নেই। বৃষ্টির সঙ্গে সমানে পাল্লা দিয়ে বইছে দমকা হাওয়া। বড়দি বাড়িতে থাকলে বৃষ্টির দিনে ওর মুখ থেকে ভেসে আসত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

‘নীল নব ঘনে আষাঢ় গগণে তিল ঠাঁই আর নাহিরে

ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে’

থেকে থেকে বিদ্যুত্ চমকাচ্ছে। সেই আলোতে চারদিক আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুত্ চমকের সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠছে গোয়ালের গরুটা। তার সঙ্গে হয়তো চমকে উঠছে তার বাছুরটাও। সে হাম্বা হাম্বা করে ডাকছে। ছোটবেলায় যখন বিদ্যুত্ চমকাত আমিও মায়ের আঁচলের তলে মুখ লুকাতাম। আজ মাকে বেশি করে মনে পড়ছে। সারাদিন মা এত বকে, তার পরও আশ্চর্যভাবে এখন মাকেই বেশি মনে পড়ছে। মাত্র একটি দিনের জন্যেই তো মা পিসিদের বাড়িতে গেছে। আমাকে মা বকাবকি করে, আমারও খারাপ লাগে। অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম নিয়ে যে বয়সে আমার কিছু একটা করার কথা, সংসারের হাল ধরার কথা সেই বয়সে আমি বাবার ঘাড়ে ভূতের মতো চেপে বসে আছি। বড়দির বিয়ের সম্বন্ধ আসছে। আমাদের যে অবস্থা তাতে ভালো ঘরে বিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হয়ে যাচ্ছে। দুটো মাত্র ঘর আমাদের বাড়িতে। একটা ছনের চালার রান্নাঘর, আরেকটা টিনের। টিনের ঘরটা যে কীরকম টিনের সেটা টের পাওয়া যায় বৃষ্টি শুরু হলে। মা আর বড়দির ছোটাছুটি শুরু হয়। এখানে সেখানে থালাবাসন পেতে রাখতে হয়। বাবা কষ্ট করে একটা পড়ার টেবিল কিনে দিয়েছিল। সেই ছোট্ট টেবিলটার ওপর আমার আর বড়দির বইখাতা সাজানো আছে। বৃষ্টি এলে সেই বইখাতার উপরে তিন-চারটা থালা বাটি ভর করে। সাধারণভাবে কেউ কিছু বুঝতে পারবে না, কিন্তু চোখটা টিনের চালে নিয়ে গেলে টের পাওয়া যাবে সেই চালে অসংখ্য ছিদ্র। বৃষ্টি এলেই সেই ছিদ্র দিয়ে অবিরামভাবে জল ঢুকে পড়ে। সেই জল যেন আমাদের বই, খাতা, বিছানা ভিজিয়ে না দেয় তার চেষ্টাতে ব্যস্ত থাকে আমার মা আর বড়দি। হঠাত্ মনে পড়ে আজ তো কারো ছোটাছুটি নেই। আজ তো তাহলে বৃষ্টি মনের আনন্দে সব ভিজিয়ে দিতে পারবে। একবার মনে হলো ভিজুক না একটু। পরে ভাবলাম মা আমাকে কত ভালোবাসে, দিদিও ভালোবাসে খুব। একদিনের জন্যে এই বাড়িটা আমার হাতে সঁপে দিয়ে গেছে তারা। সেই দায়িত্বটুকু যদি পালন করতে না পারি তবে আমার ওপর থেকে তাদের সব বিশ্বাস উঠে যাবে। আমি দ্রুত উঠে পড়ি বিছানা ছেড়ে। খুঁজে খুঁজে দু-তিনটা বাটি, থালা, বাসন জোগাড় করি। বাবার বালিশের নিচে একটা দুই ব্যাটারির টর্চ লাইট ছিল, সেটাও খুঁজে পাই। সেটা জ্বালিয়ে প্রথমে টেবিলের কাছে যাই। সকালে বাবা-মা আর দিদি বেরিয়ে যাওয়ার পর আর আমার ঘরে যাওয়া হয়নি। ঘুমানোর জন্যে আমি আজ বাবা-মায়ের বিছানাতেই ঠাঁই নিয়েছিলাম। আমার ঘরে থাকার মতো তেমন কিছু নেই, যা চোরে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু মায়ের কিছু শাড়ি আর দিদির জন্যে কেনা রুপার গয়না আছে দুই জোড়া, যেটা মায়ের ঘরে। সে জন্যেই মায়ের ঘরে থাকা। আমার ঘরের দরজাতে একটা ছোট্ট তালা দেওয়া আছে। সেটা খুলে ভিতরে ঢুকে টর্চের আলো ফেলে থালাবাটি দিতে গিয়ে চমকে উঠি। মা কিংবা দিদি যাওয়ার আগেই জায়গায় জায়গায় থালাবাটি পেতে রেখে গেছে। তাদের দায়িত্ববোধ আমাকে বিস্মিত করেছে। আমি নিশ্চিত জানি, বাকি সব জায়গাতেও তারা একইভাবে পাতিল বসিয়ে গেছে যেন বৃষ্টির জল ভিজিয়ে একাকার করে দিতে না পারে। আমি যে অকর্মা ও অলস সেটা আমার মা কিংবা দিদি বেশ ভালোই অনুভব করে। আমি নিশ্চিন্ত মনে ফিরে এলাম বাবা-মায়ের ঘরে। বাইরে গোয়ালের দিকে টর্চের আলো ফেলে দেখলাম গরুটা আর তার বাছুরটা দাঁড়িয়ে আছে। বিদ্যুত্ চমকানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা ডেকে উঠছে। বেশ কিছুদিন হলো গরুটা তিন সের দুধ দিচ্ছে। সপ্তাহে হয়তো একদিন আমরা এক চুমুক করে দুধ পান করি। বাকিটা বিক্রি করে দিই বাজারে। দিদির বিয়ের কথা চিন্তা করে আমারও খেতে ইচ্ছে করে না। দিদির বিয়েতে কত খরচ হবে! কিন্তু আমি জানি না বাবা একলা কীভাবে সেই খরচ সামলাবেন। বাবার তো আয় বলতে তেমন কিছুই নেই। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিই। বাইরে বৃষ্টির অবিরাম ঝরে পড়া আর টিনের চালে রিমঝিম শব্দ কানে এসে বাজছে। দক্ষিণের জানালাটা খুলতেই চোখে পড়ে পুকুরটা। পুকুরটা আমাদের না। পরিমল কাকার এই পুকুরটাতে সারা বছর পানি থাকে। গ্রীষ্মকালে গাঁয়ের সবাই এখানেই গোসল করে। কিন্তু বছরের বাকি সময়টাতে এখানে খুব একটা কেউ আসে না। জানালাটা বন্ধ করে ঘুমাতে চেষ্টা করি। আশপাশে কোনো বাড়ি নেই। সব থেকে কাছের বাড়িটাও বেশ দূরে। বাবা কেন যে একলা এই নির্জন জায়গাতে বাড়ি করেছিল তা জানি না। প্রতিদিন সবার আগে আমাদের বাড়িতে সন্ধ্যা নামে, আর সবার পরে আমাদের বাড়িতে সুর্যের আলো আসে। এ যেন আলো-অন্ধকারে যাই। ভুতুড়ে মনে হয় জায়গাটাকে। তবে থাকতে থাকতে নির্জনতাকে কীভাবে কীভাবে যেন সবাই ভালোবেসে ফেলেছি। দিদিও দেখি কখনো আর হা-হুতাশ করে না। আমি কোনো দিন এই বাড়িতে একাকী একটা রাত কাটিয়েছি বলে মনে পড়ে না।

 


হঠাত্ ঘুম ভেঙে গেল। বৃষ্টির শব্দের প্রথমে বুঝতে পারিনি তবে কিছুক্ষণ কান খাড়া করে রাখার পর বুঝতে পারলাম দরজায় শব্দ হচ্ছে। রাত কয়টা বাজে অনুমান করতে পারছি না। ঘড়ি না থাকার এই এক সমস্যা। যেখানে দু বেলা খাওয়ার জন্যে চুলায় আগুন জ্বলে না, সেখানে ঘড়ি থাকাটা তো রীতিমতো বিলাসিতা। আমি হাতড়ে হাতড়ে বাবার টর্চ লাইটটা খুঁজে বের করি। কত কাল আগে লাইটে ব্যাটারি লাগানো হয়েছিল তা বোধহয় বাবা নিজেও জানে না। লাইটের আলো কমে গেছে। এখন সেটা টিমটিম করে জ্বলছে। মনে হয় একটা জোনাক পোকা ধরে লাইটের মাথায় বন্দি করে রাখা হয়েছে, সেটাই আলো দিচ্ছে। টর্চ লাইটা বাবা কেনেনি। একটা টর্চ লাইট কেনার সামর্থ্য আমার বাবার নেই বললেই চলে। কোনো এক সন্ধ্যারাতে গঞ্জ থেকে বাড়ি ফেরার পথে কালুকান্দির মাঠে হাঁটার সময় কিছু একটার সঙ্গে বাবা হোঁচট খেয়েছিল। অন্ধকার ছিল বেশ। একটু খোঁজ নিয়ে দেখতে গিয়ে দেখে একটা টর্চ লাইট। বাবা সেদিন টর্চ লাইটটা হাতে নিয়ে সেটা জ্বালিয়ে আশপাশে কেউ আছে কি না দেখতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কাউকেই পাওয়া যায়নি। বাবা মিথ্যা বলেছিল কিনা জানি না। কেউ যদি নাই থাকবে তবে ওখানে একটা টর্চ লাইট কেন থাকবে। কে ফেলে রেখে যাবে একটা টর্চ লাইট। বড় দিদি বলেছিল বাবা কোনোকালে হয়তো এমন কোনো পুণ্য করেছিল যার জন্যে পুরস্কার হিসেবে এই টর্চ লাইটটা পেয়েছে। আমি দিদির কথার কোনো প্রতিবাদ করিনি। সম্ভবত সেই যে টর্চ লাইট পেয়েছিল ব্যাটারিসহ তার পর বাবা হয়তো কোনো দিন লাইটে ব্যাটারি লাগায়নি। লাইটটা জ্বালানোও হতো খুব কম। টিমটিমে আলো জ্বেলে দরজার কাছে যেতে না যেতেই আবার দরজায় করাঘাত পড়ল। বুঝলাম আমি ভুল শুনিনি। নিশ্চয় কেউ এসেছে। কে হতে পারে তা বুঝতে পারছি না। বাবা নিশ্চয় নয়। কারণ সে তো মা ও দিদির সঙ্গে পিসিদের বাড়িতে গেছে। আজ ফেরারও কথা নয়। আবার মনে হলো বাবাই হয়তো ফিরে এসেছে। পিসিদের বাড়িতে থাকার মতো ঘরও তো সেই আমাদেরই মতো। তাছাড়া আমাকে একা রেখে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা হওয়ায় মা-ই হয়তো বাবাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করতে যাব, তখন আবার দরজায় করাঘাত হলো। এবার কথাও শুনতে পেলাম। কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছে। আমি গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম, ‘কে?’ আমার কথা শুনে ওপাশ থেকে আওয়াজ এল, ‘নিখিলেশ দরজা খোলো, আমি সুষমা।’ কণ্ঠ শুনে চিনতে পারলাম। কিন্তু সুষমাদি এত রাতে, এই বৃষ্টির মাধ্যে কেন এসেছে? তাছাড়া আমি তো সব সময় সুষমাদি বলেই তাকে ডাকি। সে পরিচয় দেওয়ার সময় সুষমাদি না বলে শুধু সুষমা বলল কেন?

খুট করে দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। বাইরে তখনো অবিরাম ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। এ বৃষ্টি যেন পণ করেছে সে আর থামবেই না। বৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে সে সারা গ্রাম ভাসিয়ে দেবে। আকাশের কি খুবই মন খারাপ? তার এই কান্না কি তবে থামবে না। টিনের ঘর হলেও আমাদের ঘরের বারান্দার ছাউনি ছনের। ছনের ছাউনি পুরোনো হয়ে যাওয়ায় সেটা গলে মেঝেতে পানি পড়ছে। সেই ভেজা বারান্দায় পড়ে আছে একটা অর্ধ ছেঁড়া কলাপাতা। যে কলাপাতা মাথায় দিয়ে সুষমাদি এসেছে আমাদের বাড়িতে। একটা ছাতা কেনার মতো সামর্থ্য এ গায়ের দু-একজন ছাড়া কারোরই নেই। সবার ভরসা ওই কলাপাতা, নয়তো বড় কচুপাতা। বৃষ্টির মৌসুমটা আমরা এক প্রকার ভিজে ভিজেই কাটিয়ে দিই। আগে জ্বর বাঁধত খুব, এখন সব সয়ে গেছে। সুষমাদির ফেলে রাখা অর্ধ ছেঁড়া কলাপাতা থেকে চোখ সরিয়ে সুষমাদির দিকে চোখ ফেরাই। তার হাতে একটা হারিকেন মিটমিট করে জ্বলছে। হারিকেনে সম্ভবত তেল ফুরিয়ে এসেছে। তবে কি সুষমাদি হারিকেনের জন্যে তেল নিতে এসেছে? ঘরে তেল আছে কি না তাও তো জানা নেই। এ সংসারের কোন জিনিসটা কোথায় রাখা থাকে তাও আমার জানা নেই। দিদি আর মা-ই সব সামলে রাখে। খাবার সময় হলেই কেবল আমাকে পাওয়া যায়। এখন যদি সুষমাদি হারিকেনের জন্যে তেল চায়, তবে সেটা খুঁজে পেতেই আমার রাত পেরিয়ে যাবে।

সুষমাদির হাতে ধরে রাখা হারিকেনের মৃদু আলোয় তার মুখটা খুব মায়াবী মনে হচ্ছে। পরনের শাড়িটা ভিজে একাকার হয়ে গেছে। শরীরের সঙ্গে লেপটে আছে অর্ধ ছেঁড়া মলিন শাড়িটা। বাইরের তুমুল বৃষ্টি। সামান্য কলাপাতা তাকে সেই বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে পারেনি। সুষমাদির খালি পা, ভেজা শরীর থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে মেঝেতে। মাটির মেঝে ভিজে কাদা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের বাড়ি থেকে সুষমাদিদের বাড়ি বেশ খানিকটা দূর। মাঝের পথটুকুতে আর কোনো বাড়ি নেই। জনশূন্য এ পাশটাতে কেবল আমরাই থাকি। হারিকেনের তেল নিতেই যদি সুষমাদি আসবে তাহলে এই রাতে কেন আসতে হবে। রাতটা তো এমনিতেই কাটিয়ে দেওয়া যেত। সকালেই তেল নিয়ে যেতে পারত। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আসায় সে কাঁপছে। আলো-অন্ধকারের মিশেলেও সেই কাঁপুনিটা টের পাওয়া যাচ্ছে। আমি বললাম, ‘সুষমাদি এত রাতে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আসলে যে! মা-দিদি কেউ তো বাড়িতে নেই। বাবাও গেছে তাদের সঙ্গে পরীর দিঘির মেলা দেখতে।’ সুষমাদির কাঁপুনি বেড়েই চলছে। কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, ‘কাকিমা যাওয়ার সময় আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বলেছে আজ নাকি ফিরবে না।’

হঠাত্ করে ঝড়ো বাতাস এসে সুষমাদির হাতে ধরে থাকা হারিকেনটি নিভিয়ে দিল। সেই সঙ্গে বিদ্যুত্ চমকে উঠলে সুষমাদিকে কেমন যেন ঘোর লাগা মনে হলো। সুষমাদির বয়স যখন পনের বছর, তখন তার বিয়ে হয়েছিল। সেই ঘরে একটা ফুটফুটে মেয়েও জন্ম নিল। মেয়েটির নাম সুকন্যা। সুকন্যার কপালে বোধহয় সুখ লেখা ছিল না। সুকন্যার বাবার ভাই-বোন কেউ ছিল না। পরিবারে কেউ না থাকলেও সুষমাদি সুখের কোনো অভাব বোধ করেনি। সুকন্যাকে নিয়ে সুষমাদি আর তার স্বামীর ছিল সুখের সংসার। এক সকালে গঞ্জ থেকে ফেরার পর কী এক অসুখে পড়ল সে। বেশ কিছুদিন ভুগে মারা গেল। সুষমাদির কপালের সিঁদুর মুছে গেল সতের বছর বয়স হতে না হতেই। সুকন্যার বয়স তখন দেড় বছর। সুষমাদি মেয়েকে নিয়ে ফিরে এল বাবার ঘরে। বাবা ছাড়া সুষমাদির আর কেউ ছিল না। জ্ঞাতি-গোষ্ঠীও কেউ ছিল না। বাবার কাছে শুনেছি তারা নাকি দূর কোনো গাঁ থেকে এসে এখানে বাড়ি করেছিল। তাই তাদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠী না থাকাই স্বাভাবিক। আস্তে আস্তে মিশতে মিশতে আমরাই তাদের আত্মীয়র মতো হয়ে উঠেছিলাম।

সুষমাদির স্বামী মারা যাওয়ার পর সে যখন বাপের বাড়ি চলে এল, তার বাবা তখন এক প্রকার বিছানায়। দীর্ঘ দিন ধরে তিনি হাঁপানি রোগে কাতরাচ্ছেন। মাঝরাত হবে হয়তো। ঘড়ি নেই তাই বুঝতে পারছি না ঠিক কত রাত হয়েছে। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি আর আকাশে মেঘের কান ফাটানো শব্দ ছাড়া কোথাও কিছু চোখে পড়ছে না। এই বৃষ্টি ভেজা ঘোর অন্ধকার রাতে বাড়িতে আমি একা। আমার সামনে খোলা চুল, খালি পা, ভেজা শরীরে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে সুষমাদি। আমি কী বলব বুঝতে পারছি না। সুষমাদি হঠাত্ সেই অন্ধকারে হাতড়ে আমার হাতটা চেপে ধরল। আমার সারা শরীর কেঁপে উঠল। সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল, ‘নিখিলেশ আমাকে বাঁচা।’ আমি বুঝতেই পারিনি কী হচ্ছে এবং কী হতে চলেছে। আমি নিজেকে সামলে নিয়ে সুষমাদির হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু সে আরো জোরে চেপে ধরল। আমি মনকে প্রবোধ দিয়ে সুষমাদিকে শান্ত হয়ে সব খুলে বলতে বললাম। সুষমাদি আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘আমার একমাত্র মেয়ে সুকন্যা বোধহয় আর বাঁচবে না।’ আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। আমি জানতে চাইলাম, ‘কী হয়েছে ওর।’ সুষমাদি জানাল সন্ধ্যা থেকে খুব জ্বর, সঙ্গে প্রচণ্ড বমি করতে করতে মেয়েটা একেবারে বিছানা ধরেছে। প্রচণ্ড এই বৃষ্টির রাতে মেয়েটাকে নিয়ে কী করবে সে ভেবে পায়নি তাই আমার কাছে এসেছে। আমি জানি আমিও নিরুপায়। এই মধ্যরাতে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে সব ভেসে যাচ্ছে। এর মাঝে আমার আর করার কিইবা থাকে। আমি সুষমাদিকে সান্ত্বনা দিলাম। বললাম, ‘আমাকে কী করতে হবে বলো।’ সে আমাকে তার সঙ্গে বাড়িতে যেতে বলল। বাবা-মা আমাকে আমাদের বাড়িটা দেখে রাখতে বলে গেছে, এখন এই বাড়ি ফেলে ঘোর অন্ধকার বৃষ্টি বিঘ্নিত এই রাতে কীভাবে আমি যাই ভেবে পাই না।

সুষমাদিকে বারান্দায় রেখে আমি ঘরের ভিতরে যাই। বৃষ্টির শব্দে এত কাছ থেকেও যেন একজন আরেকজনের কথা ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছি না। আশপাশে কোথাও কোনো বাড়ি নেই, কোনো মানুষ নেই। আমাদের বাড়িটা যেন কোনো এক নিঝুম দ্বীপে। সুষমাদিকে বললাম, ‘তুমি দাঁড়াও আমি ঘরে তালা মেরে আসি।’ অন্ধকারে মিটমিট করে জ্বলা টর্চ লাইটের আলোয় চাবি খুঁজলাম। চাবি হাতে নিয়ে ফিরতেই কার যেন গরম নিঃশ্বাস আমার কাঁধে এসে পড়ল। আমি চমকে টর্চ ফেলতেই ভেসে উঠল সুষমাদির মুখ। সে মুখে বড় মায়া, যেন সেই মায়া কাটিয়ে কেউ চোখ ফেরাতে পারবে না। আমি বললাম, ‘সুষমাদি তুমি এখানে কখন এলে?’ সে বলল, ‘বাইরে অন্ধকারে ভীষণ ভয় করছিল, তাই তুমি ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আমিও ঢুকেছি।’ আমি সুষমাদিকে নিয়ে ঘর থেকে বারান্দায় নেমে এলাম। ঘরের দরজায় তালাটা ভালো করে আটকে দিলাম। বারান্দার এক কোনায় একটা মাথাল ছিল, কিন্তু সেটা আর খুঁজে পেলাম না। বাবা এই মাথালটা নিজে বানিয়েছিলেন। রোদ-বৃষ্টিতে ওই মাথালটাই ছিল আমাদের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু দরকারের সময় তা পাওয়া গেল না। এই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই যেতে হবে। বেরোনোর আগে সুষমাদির হারিকেনটা আবার জ্বালিয়ে নিলাম। জানি না কতক্ষণ সেটা জ্বলবে। বাইরে যে দমকা বাতাস তাতে মুহূর্তেই হারিকেন নিভে যাবে এটা নিশ্চিত।

মাথায় একটা গামছা পেঁচিয়ে সুষমাদির সঙ্গে তার বাড়ির দিকে রওনা হলাম। পিছনে পড়ে থাকল আমাদের বাড়িটি। যে বাড়িতে আজই প্রথম আমি একাকী রাত কাটাতে চলেছিলাম। গ্রামের শেষ মাথায় আমাদের বাড়ি। আমাদের বাড়ির আগের বাড়িটাই সুষমাদিদের। সেই বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ির দূরত্ব অনেক। মাঝখানে জন মানুষের বসবাসের চিহ্ন নেই। সে জন্যেই রাস্তাও সেভাবে তৈরি হয়নি। রিলিফের টাকায় রাস্তা হওয়ার কথা ছিল, তার পরিবর্তে সেই রিলিফের টাকায় মেম্বারের বাড়িতে উঠেছে পাকা দালান। আমাদের কথা আর কে ভাবে! সুষমাদি আমার পাশে পাশে হাঁটছে। এত কাছাকাছি অবস্থানে আমি কোনো দিন কারো সঙ্গে হাঁটিনি। না বাবা-মায়ের সঙ্গে, না অন্য কারো সঙ্গে। সুষমাদির ভেজা শরীর আমার শরীরের সঙ্গে লেপ্টে যাওয়ার মতো অবস্থা। আমি সে সবে গা করছি না। মনের মধ্যে একটাই চিন্তা—সুষমাদির একমাত্র কন্যা সুকন্যা এখন কেমন আছে। যে পরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে তাতে মাথার উপর ছাতা থাকলেও ভেজা থেকে শরীর বাঁচানো যেত না। সেখানে সুষমাদি এক হাতে হারিকেন অন্য হাতে কলাপাতা ধরে রেখেছে মাথার উপর। সেই কলাপাতা বাতাসে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে। আমরা দুজনই সমানে ভিজছি। বৃষ্টিতে ভিজে আমার গেঞ্জি শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। পরনের লুঙ্গিটা পায়ের সঙ্গে ভিজে জড়িয়ে গেছে, তাই হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে। অন্ধকারে না তাকালেও বোঝা যায় সুষমাদিরও হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে। আমার পায়ে প্লাস্টিকের জুতো। সুষমাদি খালি পায়ে হাঁটছে। দুজনের পায়ের নিচ থেকে ছলাত্ শব্দে কাদা পানি ছিটকে সরে যাচ্ছে। বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে গেছি। শরীরটা হালকা কাঁপতে শুরু করেছে। সুষমাদিও কাঁপছে, তবে সেটা ভয়ে না বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডায় তা বুঝতে পারছি না। আগের বারের মতো দমকা হাওয়ায় হারিকেন নিভে যায়নি বলে সেই আলোতে পথ কেটে কেটে এগিয়ে যাচ্ছি। মনের মধ্যে নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।


অবিরাম বর্ষণ আর মেঘের বিকট গর্জনের সঙ্গে সমানে চলছে বিদ্যুত্ চমক। ওরা যেন একে অন্যের সঙ্গে শক্তির পরীক্ষায় নেমেছে। এই দুর্যোগ ঘন রাতে কোথাও কেউ জেগে নেই। আকাশে মেঘ দেখলেই সবাই যে যার ঘরে ফিরে যায়। তা না হলে হয়তো এই রাতেও এক দুজনকে দেখা যেত গঞ্জ থেকে ফিরছে। মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম কমে যায়। সুখেন বাবুরও ঘুম কমে গেছে। মালোপাড়ার শেষ মাথায় সুখেন বাবুর বাড়ি। তিনি আমাদের গায়ের একমাত্র ডাক্তার। কোনো বিশেষজ্ঞ কেউ নন, তবে অবহেলিত এই তল্লাটে তিনিই সবার কাছে বিশেষজ্ঞের চেয়েও বেশি কিছু। মানুষের বিপদে আপদে তাকে সব সময় পাশে পাওয়া যায়। চিকিত্সার জন্যে তিনি কোনো ফি নেন না কখনো। ওষুধের টাকাও সবাই সময়মতো দিতে পারে এমন রেকর্ড নেই। এসব বোঝা যায় তার বাড়ির দিকে তাকালেই। আর দশজন মানুষের ঘরের সঙ্গে তার ঘরের কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে না। ডাক্তার বলে যে তার আলিশান বাড়ি থাকবে, কিংবা ভালো খাবে, পরবে তা কিন্তু নয়। তিনি সারা জীবন মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে যাচ্ছেন। তার মতে, ক্ষুদ্র এ জীবনে মানুষকে ভালোবাসা ছাড়া আর কিইবা চাওয়ার থাকতে পারে। সবাইকে তিনি সমান চোখে দেখেন। তার এই সারল্য সবাইকে মুগ্ধ করে। যে যখন পারছে বাকিতে ওষুধ নিয়ে যাচ্ছে, আবার করো হাতে কিছু অতিরিক্ত টাকা থাকলে ডাক্তারকে দিয়ে যাচ্ছে যেন ওষুধ কিনে রাখতে পারে। উঠোনে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিই। ‘সুখী দাদু’ বলে আর ডাকা লাগে না, তিনিই বলে ওঠেন ‘কে?’ আমি বলি, ‘আমি নিখিলেশ।’

ছোট্ট একটা গ্রাম আমাদের। সবাই সবাইকে চেনে। নাম বলতেই তাই তার চিনতে অসুবিধা হয় না। তার বয়স হয়েছে ঢের, আশি-নব্বইয়ের বেশি। চোখে তাই বলে কম দেখেন এমন না। কানাই লাল স্যার যেখানে মোটা পাওয়ারের চশমা পরেন, সুখেন বাবু সেখানে চশমা ছাড়াই দিব্বি দেখতে পান। বড়রা তাকে ‘সুখেন বাবু’ বলেই ডাকে। সবাই মনে করে তার মতো সুখী আর কেউ নেই। তিনি নিজেও সেটা স্বীকার করেন। আর আমরা ছোটরা তাকে ‘সুখী দাদু’ বলে ডাকি। ছেলেপুলে কেউ নেই তার। তিনি একাই থাকেন বাড়িতে। ধীরেনের মা রোজ যা রান্না করে দিয়ে যায়, তা-ই তিনি খান। অনেক বছর হলো সুখেন বাবুর স্ত্রীও মারা গেছে। কেউ নেই বললেও আসলে ডাক্তার দাদুর সবাই আছে। আমার মতো রক্তের সম্পর্কহীন তার অগণিত নাতি-নাতনি আছে, গ্রামের বড়রা সবাই তাকে বাবার সম্মানে রাখে। কেউ বাড়িতে ভালো কিছু রান্না করলেই ডাক্তার দাদুর জন্যে দিয়ে যায়। হারিকেনের সলতেটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে তিনি আমাকে ভিতরে ডাকলেন। এত রাতে কেন এসেছি জানতে চাইলেন। দাদুর হাতে ঘড়ি আছে। সেটা থেকেই জানতে পারলাম রাত তখন পৌনে দুইটা। আমি দাদুকে সবিস্তারে খুলে বললাম। সুকন্যার জ্বর ও বমির কথাও বললাম। দাদু দিনের বেলা হলে হয়তো আমার সঙ্গে ভ্যানে করে হলেও যেতে পারত কিন্তু এই দুযোর্গপূর্ণ রাতে যেখানে আমার মতো মানুষেরই চলাফেরা কঠিন, সেখানে দাদুর ঘর থেকে বেরোনোই অসম্ভব। দাদু কয়েকটা ওষুধ ধরিয়ে দিয়ে কীভাবে খাওয়াতে হবে তার নিয়ম বলে দিলেন। কালকে যেন আমি এসে বলে যাই সুকন্যার কী অবস্থা সেটাও মনে করিয়ে দিলেন। আমি ওষুধ নিয়ে সুষমাদির বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।

রাতে সুষমাদি যখন আমাকে ডাকতে গিয়েছিল আমাদের বাড়িতে, তখন তার সঙ্গে তার বাড়িতে গিয়ে দেখি সুকন্যার অবস্থা খুবই খারাপ। অনেক বার বমি করে সে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। শরীরে যেন কোনো শক্তির লেশ মাত্র নেই। সারা শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ওর বিছানার পাশে বসে কপালে হাত রাখতেই আমি নিজেই ভয় পেয়ে যাই। এই দুর্যোগঘন রাতে ছোট্ট অসুস্থ মেয়েটির জন্যে কিইবা করার আছে আমার। সুষমাদি আমার পাশে বসে কাঁপা কাঁপা হাতে আমার বাহু চেপে ধরে বলল, ‘নিখিলেশ এই মধ্য রাতে তুমিই আমার একমাত্র অবলম্বন।’ আমি তাকে অভয় দিলাম, ‘সুকন্যার কিচ্ছু হবে না।’ সে খুঁজে পেতে একটা গামছা দিল আমাকে। আমি গামছা দিয়ে মাথাটা না মুছেই বেরিয়ে গেলাম সুখেন বাবুর বাড়ির উদ্দেশ্যে। আমার ফেরার অপেক্ষায় হয়তো ঠায় দাঁড়িয়ে রইল কন্যার সুস্থতার আশা বুকে নিয়ে সুষমাদি।

ডাক্তার দাদু একটা পলিথিনে মুড়ে দিয়েছেন ওষুধগুলো যেন ভিজে না যায়। আমি ফিরতে ফিরতে ঘণ্টা খানেক পার হয়ে গেছে। মনের মধ্যে শঙ্কা, সুকন্যা ঠিক আছে তো! দরজায় কড়া নাড়তেই সুষমাদি দরজা খুলে দিল। আমি তার হাতে ওষুধগুলো দিয়ে সুকন্যাকে খাইয়ে দিতে বললাম। ওষুধ খাওয়ানোর পর সে গামছা এনে আমার মাথা মুছে দিল। আমার শরীর ভিজে জবজবে হয়ে আছে। সে গেঞ্জিটা খুলে শরীর মুছে দিতে চাইলে আমি না করলাম। শেষে আমি নিজেই মুছে নিলাম। রান্না ঘর, শোবার ঘর করতে করতে সেও ততক্ষণে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। শরীরের সঙ্গে লেপ্টে গেছে পরনের শাড়ি। আমি সেদিকে না তাকিয়ে সুকন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এক ফাঁকে সুষমাদিকে বললাম, ‘তুমি তো ভিজে একাকার হয়ে আছ। এভাবে বেশিক্ষণ থাকলে নিজেই অসুখে পড়বে, তখন তোমাকে দেখবে কে?’ সে এত কষ্টের মধ্যেও ঠোঁটে হাসির রেখা টেনে বলল, ‘কেন তুমি তো আছই!’ আমি বললাম, ‘ঠাট্টা রেখে মাথা মুছে শাড়ি পাল্টে নাও।’ এর পর কতক্ষণ কেটেছে জানি না। একসময় অনেকটা স্বাভাবিকের মতো সুকন্যা ঘুমিয়ে গেল। কপালে হাত দিয়ে দেখলাম জ্বর কমে এসেছে। রাত হয়তো পোহাতে চলেছে, আর থাকা ঠিক হবে না ভেবে সুষমাদিকে বললাম, ‘এখন আমি যাই, সকাল হয়ে এল।’ সে বলল, ‘এইটুকু তো সময়, থেকেই যাও।’ আমি নানা বিষয় চিন্তা করে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করলাম। পিছন ফিরে তাকালে বিদ্যুত্ চমকানো আলোতে হয়তো দেখতে পেতাম, আমার চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছে সুষমাদি। হয়তো সেটার পরিবর্তে দেখতাম দরজাটা বন্ধ করে ফেলেছে কারো অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে না থেকে।

 


ভোর হতে বেশি বাকি নেই। বৃষ্টির তোড় কিছুটা কমে এসেছে। বাইরে ফর্সা হতে শুরু করেছে। চোখে ঘুম নেই, ক্লান্তিও নেই। এই সামান্য সময়ের জন্যে আর ঘুমাতেও ইচ্ছে করছে না। সুষমাদির মেয়েটার জ্বর কিছুটা কমেছে। বাড়িতে কেউ নেই ভেবে সুষমাদিকে বলে চলে এসেছি। মেয়েটার জন্যে খুব মায়া হচ্ছিল। সুকন্যা ছাড়া সুষমাদি বেঁচে থাকার মতো কোনো আশা দেখতে পায় না। বাবা হাঁপানিতে ভুগছে। যে কোনো দিন তার ডাক এসে যাবে, তখন সুষমাদি একা হয়ে যাবে। মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে সে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। আমি যখন সুকন্যাকে রেখে বাড়িতে ফিরে আসছি, তখন সুষমাদি বলেছিল, ‘তোমাকে এগিয়ে দেই...।’ আমি নিষেধ করেছি। সে অসুস্থ বাবা ও কন্যাকে রেখে এই বৃষ্টির দিনে আমাকে এগিয়ে দিতে আসুক সেটা আমিও চাইনি। তাছাড়া সে এগিয়ে দেওয়া না দেওয়া একই কথা। এমন তো নয় সে ছাতা নিয়ে আসবে আমি যেন না ভিজি। আমাকে ভিজতে ভিজতেই বাড়িতে আসতে হয়েছে। সে যদি এগিয়ে দিতে আসত তবে তাকেও ভিজতে ভিজতেই আসতে হতো। আবার এই গহীন রাতে এতটা পথ তাকে একা একা ফিরে যেতে হতো। তার চেয়ে আমি একা চলে এসেছি এই ভালো। বারান্দায় গামছা ঝোলানো ছিল। সেটা দিয়ে ভালো করে মাথা মুছে সারা শরীর মুছেছি। ভিজে একাকার হয়ে যাওয়ায় লুঙ্গি পাল্টে আরেকটা পরতে হয়েছে। পাশ ফিরে শুতেই বারবার একটু আগের স্মৃতি মনে পড়ছে। সুষমাদির বাড়িতে যাওয়ার পর ঘরে ঢুকে সুষমাদিই প্রথম গামছা দিয়ে আমার মাথা মুছে দিয়েছে। আমি নিজেই মুছতে পারতাম কিন্তু সে জোর করে মাথা মুছে দিয়েছে। গা থেকে গেঞ্জি খুলে শরীরটাও মুছে দিতে চেয়েছিল আমি নিজে শরীর মুছেছি। কিন্তু সেই যে মাথা মুছে দিয়েছিল সেই স্মৃতিটুকুই আমার চোখে ভেসে উঠছে। বৃষ্টি শুধু যে আমাকে ভিজিয়েছিল তা তো নয়। সুষমাদিকেও সমানে ভিজিয়েছে। এই বৃষ্টির কোনো মায়াদয়া নেই। বৃষ্টিতে ভেজার পর বেশিক্ষণ ওভাবে থাকলে নিশ্চিত কোনো রোগ বাঁধিয়ে বসবে। আমি তাকে বললাম, ‘তুমিও মাথা মুছে নাও। আমি ততোক্ষণে সুকন্যার পাশে বসে দেখি কী অবস্থা।’

আমাদের বাড়িতে দুটো ঘর থাকলেও সুষমাদির বাড়িতে একটাই ঘর। উঠোনের একপাশে একটা ছাপড়া উঠিয়ে রান্নার কাজ চালিয়ে নেয়। একমাত্র ঘরে দুটো রুম। একরুমে তার হাঁপানিতে কাতর বাবা থাকে, অন্যটিতে সুকন্যাকে নিয়ে সে থাকে। আমি যখন সুকন্যার শিয়রের পাশে বসেছি সুষমাদি তখন গামছা দিয়ে ভেজা চুল মুছে নিচ্ছে। তার ঘরের কোনো বারান্দা নেই যে আমি গিয়ে সেখানে দাঁড়াব আর সেই ফাঁকে সুষমাদি ভেজা শাড়ি পাল্টে নেবে। আমার তো মনে হয় পাল্টে নেওয়ার মতো শাড়িও তার আছে কি না সন্দেহ। আমার ঘুম আসছে না। বৃষ্টির দিনে সকালে পাখিরাও ডেকে ওঠে না। সূর্যই যেখানে লুকিয়ে থাকে, সেখানে পাখিরা কেন ডেকে উঠবে। ভোরের অপেক্ষায় আমার চোখ দুটো জেগে আছে। দুই চোখের পাতা এক করলেই সুষমাদির ঘরের ছবি ভেসে উঠছে। কী মনে করে যেন সুষমাদি আমাকে ডাক দিয়ে বলল, ‘নিখিলেশ, গামছাটা দিয়ে আমার পিঠটা একটু মুছে দাও তো।’ আমিও কোনো কিছু না ভেবে বাড়িয়ে দেওয়া গামছাটি নিয়ে তার ভেজা পিঠ আলতো করে মুছে দিলাম। সে হাত দিয়ে তার শাড়ির আঁচল সরিয়ে রেখেছিল। খোলা পিঠ আলো-আঁধারিতে কেমন যেন লাগছিল। কেন যেন সেই দৃশ্যটি চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে। অথচ তখন কোনো কিছুই মনে হয়নি। তার খোলা চুল, বস্ত্রহীন পিঠ কোনো কিছুর প্রতি তখন নজর পড়েনি। এক মনে শুধু সুকন্যা নামের ছোট্ট মেয়েটির অসুখের কথা মাথায় ছিল। আর এখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে কত না কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে, যখন গামছা দিয়ে পিঠ মুছে দিচ্ছিলাম, তখন তার মধ্যে কেমন যেন কাঁপুনি ছিল। মুখে এক ধরনের শব্দও ছিল তার। আমি আর ওসব ভাবতে পারি না। শরীরে শীতল স্রোত বয়ে যায়। বলাইয়ের কথা মনে পড়ে। বলাই হলে কী হতো, সেটা কল্পনা করতেই রক্ত হিম হয়ে আসে। মনে মনে ভাবতে থাকি, সকালে উঠে কী কী কাজ করার আছে। সব কিছুর মাঝে একটা কথা ঠিকই ভেবে রাখি, আর তা হলো সুকন্যাকে একবার গিয়ে দেখে আসা। ছোট্ট রোগগ্রস্ত মেয়েটিকে রাতে যে অবস্থায় রেখে এসেছি, তাতে দিনে একবার না গেলেই নয়। সুস্থ থাকতে ছোট্ট মেয়েটি আমাদের বাড়িতেই পড়ে থাকত। আমার সঙ্গে তার যেন জনম জনমের সম্পর্ক। সে যেন আমার আত্মার আত্মীয়। আমার সঙ্গেই তার সব খুনসুটি। সে আমাকে দেখলে যেন দুনিয়া ভুলে যায়। বাপ মরা মেয়েটার প্রতি তাই আমারও স্নেহ উথলে ওঠে। কলেজ শেষ করে যখন বাড়ি ফিরি, তখন একবার হলেও সুকন্যাকে দেখে আসি। ছোট্ট মেয়েটি হয়তো তার অসুস্থ নানার পাশে বসে থাকে নিশ্চুপ হয়ে।

বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে কতক্ষণ পেরিয়েছে জানি না। গোয়ালে বাছুরটা সমানে হাম্বা হাম্বা করে ডেকে চলেছে। নিশ্চয় তার বেশ ক্ষুধা লেগেছে। বিছানা ছেড়ে উঠে বসলাম। আড়মোড় ভেঙে দরজা খুলে দেখি বেশ বেলা হয়ে গেছে। আকাশ মেঘলা থাকলেও বৃষ্টি নেই। সারাদিন হয়তো রোদের দেখা পাওয়া যাবে না, তবে বৃষ্টি আসার সম্ভাবনা খুব কম। ভাবছি বাবা, মা ও দিদি কি আজকে ফিরে আসবে? ফিরে না এলে আমাকে না খেয়েই কাটাতে হবে। অবশ্য ঘরে নাড়ু চিড়ে আছে, তা দিয়ে দিন পার করে দেওয়া যাবে। গোয়াল ঘরের দরজা খুলে গাভিটাকে বাইরে এনে খুটার সঙ্গে বাঁধলাম। চাড়িতে জাওন দেওয়া দরকার, কিন্তু কোনো দিন ওসব দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমার নেই। জীবনের রূঢ় বাস্তবতা টের পেতে শুরু করলাম। খুঁজে পেতে গোয়াল ঘরের এক কোণে কিছু খুদ ও কুড়ো পেলাম। সেটা চাড়িতে পানির সঙ্গে গুলিয়ে দিলাম। কিন্তু ওইটুকু খাবারে আর কিইবা হবে। পালা থেকে কিছু খড় নিয়ে এসে ছোট ছোট করে কাটলাম। সেগুলোও কুড়োর সঙ্গে মিশিয়ে দিলাম। গাভিটা বেশ আরাম করে খেতে শুরু করল। বাছুরটাও হাম্মা হাম্বা ডাক বন্ধ করে মায়ের বুকে মুখ লাগিয়ে আয়েশ করে দুধ খেতে শুরু করল। আমি জানি জীবনে প্রথমবারের মতো হলেও আমাকে নিষ্ঠুর হতে হবে। একটু খাওয়ার পরই জোর করে বাছুরটাকে সরিয়ে নিতে হবে। তার পর অপটু হাতে দুধ দোয়াতে হবে। ওর মায়ের দুধ ও খাবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু ওর মায়ের দুধের ওপর আমাদেরও জীবন-জীবিকা নির্ভর করে অনেকাংশে। ওকে ছেড়ে দিয়ে রাখলে সবটুকু দুধ সে নিমিষে শেষ করে ফেলবে। তাই কিছুক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ওর খাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এর পর জোর করে সরিয়ে নিলাম। যে কাজটা কোনো দিন করিনি, আজ আমাকে সেটাই করতে হবে। দুধ দোয়াতে হবে।

মা যখন দুধ দোয়াতো বেশ কয়েক বার কাছে দাঁড়িয়ে সেটা দেখেছি। আশা করি চেষ্টা করলে পারব। বাছুরটাকে একটা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে দুধ দোয়ানোর পাতিলটা নিয়ে এলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, মা সেই সময় কী কী করত। তার পর ভালো করে ওলানে পালানোর পর যখন দুধ দোয়াতে শুরু করব বলে হাত দিয়েছি, তখন অনুভব করলাম কার যেন একটা হাত আমার কাঁধের উপর এসে পড়েছে। চমকে উঠলাম সঙ্গে সঙ্গে। এ সময় এই সকালে কারো তো আসার কথা নয়। বাবা-মা ফিরে আসতে সময় লাগবে। পরীর দিঘি তো অনেক দূর। পিছন ফিরে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম। সুষমাদি দাঁড়িয়ে আছে। আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘সুষমাদি তুমি এখানে, এই সময়ে?’ তার মুখে তেমন কোনো চিন্তার বলি রেখা দেখিনি তখন। তার একমাত্র কন্যা যে গত রাতেও ভীষণ অসুস্থ ছিল, সেরকম কোনো চিন্তাও তার চেহারায় খুঁজে পাইনি। সুষমাদি একটু হেসে দিয়ে বলল, ‘কাল তুমি আমার মেয়ের জন্যে যা করেছ তার ঋণ কোনো দিন শোধ হবে না। মেয়েটা এখন বেশ ভালো আছে। ভাবলাম রাতে একা একা ভিজতে ভিজতে চলে এলে তোমার আবার জ্বরটর বাঁধল কি না দেখেই যাই। সেই সঙ্গে মেয়েটার সুস্থতার খবরটাও দিয়ে যাই।’ আমার মুখ থেকে শুধু ‘ও’ শব্দটি বেরিয়ে এল। আমাকে সরিয়ে দিয়ে সুষমাদি নিজেই দুধ দোয়াতে শুরু করল। মুখে যেন তার কথার ফুলঝুরি, ‘তোমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। তবে রাতে তুমি আমাকে যেভাবে বিপদের সময় পাশে থেকে সাহস দিয়েছ তাইবা কয় জন পারে।’

সুষমাদির যেন কোনো তাড়া নেই। সে তার মতো করে দুধ দোয়াচ্ছে। আমি বললাম, ‘দুধ তো আমিই দোয়াতে পারতাম। তুমি আমার কাছে দিয়ে বাড়ি চলে যাও। আমি একাই পারব। ওদিকে সুকন্যাকে একা রেখে এসেছ।’ সে আমার কথা শুনল না। বলল, ‘ওকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। রাতে বেশি ঘুম হয়নি বলে ও এখন ঘুমাচ্ছে। সকালে উঠে আমি রান্নাও করে রেখে এসেছি। ভাবলাম তোমাকে রান্না করে দেবে কে, তাই তোমাকে বলতে এলাম আমাদের সঙ্গে খেয়ো।’ আমি কোনো কথা বললাম না। সুষমাদি দুধের পাতিলটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তাকে বেশ নির্ভার লাগছে। রাতে ও বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর আমার মাথায় আকাশ সমান এলোমেলো চিন্তা ছিল, এখন তা আর নেই। আমি চাইছি কেউ আসার আগেই সুষমাদি বাড়িতে ফিরে যাক। হয়তো বিধাতা আমার মনের কথা বুঝতে পারলেন। সুষমাদি নিজ থেকে আমাদের উঠোনটা ঝাড়ু দিয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। যাওয়ার সময় বললেন, ‘তুমি গোসল করে সোজা আমাদের বাড়ি চলে আস। এক সঙ্গে খাব।’ আমি সুষমাদির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে না থেকে ঘরে ফিরে গেলাম। রাস্তায় কেউ যদি দেখে সুষমাদি আমাদের বাড়ির দিক থেকে সাত সকালে যাচ্ছে তাহলে কথা শুনতে হবে। আমার হাতে অনেক কাজ। দুধ নষ্ট হয়ে যাবে তাই ঘরে তালা লাগিয়ে রাড়িখালি বাজারের দিকে রওনা দিলাম। সমস্যা একটাই, আমি বাজারে থাকাকালীন যদি বাবা-মা ফিরে আসে তবে ঘরে ঢুকতে পারবে না। চাবি তো থাকবে আমার কাছে। কিন্তু দুধ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমি সঙ্গে সঙ্গেই রওনা হয়ে গেলাম। ভুলে গেলাম সুষমাদির বাড়িতে সকালে খেতে যাওয়ার কথা।

 


বাজারে যাওয়ার পথে হঠাত্ মনে পড়ল, আমি তো দুধের দামদর কিছুই জানি না। তাহলে কীভাবে বিক্রি করব। ষোলো বছর বয়স হয়ে যাওয়ার পরও আমি কোনো দিন কিছু বিক্রি করতে বাজারে গিয়েছি বলে মনে পড়ে না। সাত-পাঁচ ভাবছি আর হাঁটছি। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল যাওয়ার পথে বলাইকে সঙ্গে করে নিয়ে যাই। কিন্তু বলাইয়ের সঙ্গে আমার কথা বলা বন্ধ। সে আমার ভালো বন্ধু ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে আমি ইচ্ছে করেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছি। তাহলে একমাত্র উপায় হলো মহিতোষ জেঠু। বাজারে গিয়ে তার থেকে জেনে নিতে হবে দুধের বর্তমান দাম কত। দুধ দোয়ানোর পর মেপে দেখেছি তিন সের দুধ হয়েছে। যা বিক্রি হবে তার থেকে কিছু টাকা দিয়ে বাজার করতে হবে যেন বাবা-মা-দিদি ফিরে আসার পর রান্না বসাতে পারে। এমনিতেই আমার নাম হয়ে গেছে অলস অকম্মা। একটি মাত্র দিন বাবা-মা আমার হাতে ছোট্ট সংসারটা রেখে গেছে, সেটাই যদি গুছিয়ে সামলে রাখতে না পারি তবে সম্মানের ছিটেফোঁটাও থাকবে না। অবশ্য বাবা-মা কিংবা দিদির সামনে আমার সম্মান-অসম্মানের কিছু নেই। আমি অলস হলেও তারা আমাকে ভালোবাসবে, আমি কর্মঠ হলেও তারা আমাকে ভালোবাসবে। রাজপরিবারে জন্ম নিলে আমি না জানি কোন হালে চলাফেরা করতাম!

বাজারের পথে দুধের ঢালুন নিয়ে হাঁটছি আর লজ্জায় যেন লাল হয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে, কেউ দেখে ফেললেই আমার সম্মানের বারটা বাজবে। কিন্তু আমি এও জানি যে, যত জনই দেখুক কেউ একটু অবাকও হবে না। এখানে, এই গাঁয়ে, এই মাঝি পাড়া থেকে শুরু করে ওদিকের মালোপাড়া পার হয়ে চৌধুরী পাড়া থেকে শুরু করে পুরো গ্রাম চক্কর দিলেও কেউ কিছু মনে করবে না। খেটে খাওয়া মানুষ সবাই। তার পরও কেন যেন সংকোচ বোধ করছিলাম। কানাই লাল স্যারের বাড়ি বাজারে যাওয়ার পথেই পড়ে। স্যার যদি দেখে আমি দুধ বিক্রি করতে যাচ্ছি তবে আর যাই হোক মহা খুশি হবেন। তিনি ধরেই রেখেছেন যে আমাকে দিয়ে কেউ কোনো দিন কিছু করাতে পারবে না। ভুল করে নাকি ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের পরিবর্তে আমার জন্ম হয়েছিল এই দরিদ্র পরিবারে। সত্যি সত্যি আমি যখন কানাই লাল স্যারের বাড়ির কাছাকাছি এসেছি, তখন দেখি বাড়ি থেকে কানাই লাল স্যার বের হয়েছেন বাজারে যাবেন বলে। তার চোখে মোটা কাচের চশমা। চশমার ওপাশে দুটো কোটরাগত চোখ। কিন্তু সেই চোখ আশ্চর্য নির্লিপ্ত মায়া ভরা। কোনো দিন স্যার আমাকে বকেননি। সব সময় আদর করেছেন ভালোবেসেছেন। দরিদ্র পরিবারে আমাদের সবার জন্ম হলেও স্যার আমাদের বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখাতেন। কোনো কিছুকে নেগেটিভলি নিতেন না। আমাকে দেখে তিনি থামতে বললেন। প্রথমে চোখ থেকে চশমাটা খুলে পরনের ধুতিতে কয়েকবার মুছে নিলেন। তার পর চশমাটাকে জায়গামতো বসিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘আরে নিখিলেশ নাকি। কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য! তোমার হাতে দুধের ঢালুন দেখছি। এর চেয়ে ভালো খবর আর কী হতে পারে যে, নিখিলেশ শেষমেশ কিছু একটা বিক্রি করতে বাজারে যাচ্ছে।’ আমি লজ্জায় লাল হয়ে উঠলাম। তিনি ‘কইগো’ বলে তার স্ত্রীকে ডাকলেন। আমার হাত ধরে বাড়ির ভিতর নিয়ে গেলেন। আমার কী করা উচিত বুঝে উঠতে পারছিলাম না। স্যার আমাকে উঠোনে একটা টুলের উপর বসতে বললেন। পাশেই আরেকটা টুল নিয়ে নিজেও বসলেন। আমি আতিউতি করছি ছুটে বের হওয়ার জন্যে। কানাই লাল স্যার অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষ। তিনি বুঝলেন কেন আমি আতিউতি করছি। তিনি কাকিমাকে ডাকলেন। কাকিমা কাছে আসতেই আমি প্রণাম করলাম। কাকিমার সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে কলেজে যাওয়া-আসার পথে কথা হয়। স্যার আগ বাড়িয়ে বললেন, ‘দেখ সূর্য আজ কোনো দিকে উঠেছে। আমাদের নিখিলেশ দুধ বিক্রি করতে বাজারে যাচ্ছে। যাও ওকে ঘর থেকে দুটো নাড়ু-চিড়ে এনে দাও।’ আমি জানি এখন খাওয়ার সময় নয়, তার পরও স্যার যেভাবে ধরেছেন না খেয়ে বের হতে পারব না। কাকিমা নাড়ু-চিড়ে নিয়ে আসার পর আমাকে খেতেই হলো। এক ফাঁকে স্যার বললেন, ‘আমিও বাজারে যাচ্ছিলাম দুধ কিনব বলে। তোমার ঢালুনে কতটুকু আছে?’ আমি জানালাম, তিন সের। কানাই লাল স্যার কিছু একটা ভেবে নিয়ে বললেন, ‘আমার যদিও অত লাগবে না, তার পরও আমাদের নিখিলেশ প্রথম কিছু একটা বিক্রি করতে যাচ্ছে সেই উপলক্ষে তিন সের দুধই আমি কিনে নিলাম।’ স্যারের কথা শুনে আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। অন্তত দুধ নিয়ে বাজারে তো যেতে হচ্ছে না। স্যার আমাকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘তুমি চিন্তা করো না, আমি তোমাকে বাড়িতে পেয়ে ঠকাব না। তুমি তো বাজারে যাবাই তো আমার সঙ্গেই চলো। সেখানে কী দরে বিক্রি হয় সেটা দেখেই তোমাকে দাম মিটিয়ে দেব।’

মনে মনে স্যারকে প্রণাম করলাম। মনে হচ্ছিল, স্যারের পা ধরে প্রণাম করি। নাড়ু-চিড়ে মুখে দিয়ে জল পান করে স্যারের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। ভাগ্যিস স্যারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বাজারে কিছু কিনতে গেলে আগে দোকানিই দাম চায়। সেখানে কমবেশি করে কেনা যায়। কিন্তু নিজেই যদি কিছু বিক্রি করতে যাই তবে তো আমাকেই আগে দাম চাইতে হবে। আমি ভেবে উঠতে পারছিলাম না দুধের সের কত করে চাব। কারো কাছে জিজ্ঞেস করার কথাও ভাবতে পারছিলাম না, কারণ সবাই ভাবত কলেজেপড়ুয়া ছেলে দুধের সের কত তাও জানে না। স্যারের কল্যাণে সব লজ্জা থেকেই বেঁচে গেলাম। এমন কি বলাইকেও আর সঙ্গে নেওয়ার চিন্তা করতে হলো না। বাজারে গিয়ে স্যারই নিজে দুধের সেদিনের দর জেনে নিয়ে আমাকে টাকা দিয়ে দিলেন। টাকা নিয়ে স্যারকে প্রণাম জানিয়ে চাল, তেল, লবণ, মরিচ আর সবজি কিনে বাড়ির পথে রওনা হলাম। বাজার থেকে বের হওয়ার পর মনে হলো যাওয়ার পথেই তো সুষমাদির বাড়ি। অসুস্থ সুকন্যাকে রাতে ওই অবস্থায় রেখে আসার পর এখন কী অবস্থায় আছে তা জানি না। বাচ্চাটার জন্যে এক টাকার সন্দেশ কিনে নিয়ে গেলে সে খুশি হবে। আবার ফিরে গিয়ে মহিতোষ জেঠুর দোকান থেকে এক টাকার সন্দেশ কিনে নিলাম। এতক্ষণে বাবা-মা-দিদি নিশ্চয় ফিরে এসেছে। তারা যেভাবে আমার কাছে বাড়ি রেখে গিয়েছিল, এসে দেখবে কোনো কিছুই সেভাবে নেই। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কানাই লাল স্যারের বাড়ির কাছে আসার পর মনে পড়ল দুধের ঢালুনটা নিয়ে যেতে হবে। আমি আবার স্যারের বাড়ির ভিতরে গিয়ে কাকিমা বলে ডাক দিলাম। কাকিমা সম্ভবত রান্না ঘরে ব্যস্ত ছিল। আমার ডাক শুনতে পেল কিনা জানি না, তবে ঘর থেকে উঁকি দিল চৌদ্দ-পনের বছরের এক বালিকা। তার চোখে চোখ পড়তেই সে চোখ সরিয়ে নিল। মেয়েটিকে তো আমি আগে কখনো দেখিনি। মুহূর্তের মধ্যেই ভাবনার সাগরে ডুবে গেলাম আমি। আমি আবার কাকিমা বলে ডাক দিলাম, কিন্তু আমার চোখ ছিল বারান্দায় লাজুক চোখে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বালিকাটির দিকে। এবার কাকিমা আমার ডাক শুনে বেরিয়ে এলেন। ‘ও নিখিলেশ!’ বলে তিনি রান্নাঘর থেকে ঢালুনটা নিয়ে এসে আমার হাতে দিলেন। আমার চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে তার চোখও তখন বারান্দাতে নিবদ্ধ হলো। আমাকে বললেন, ‘আমার মেয়ের ননদ। একটু আগেই এসেছে। এবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে। অঞ্জলি নাম ওর।’ তার পর কাকিমা আমার দিকে দেখিয়ে বলল, ‘এ হলো আমাদের নিখিলেশ, খুব ভালো ছেলে, কলেজে পড়ে।’ আমি মনে মনে ভাবলাম মেঘ না চাইতেই জল। আমি তো কিছুই জানতে চাইনি, কিন্তু কাকিমা আমার মনের কথা পড়ে ফেলে সব বলে দিয়েছে। সেই সঙ্গে আমার প্রশংসাও করেছে।

মনে হচ্ছিল বাড়ি ফিরে গিয়ে আর লাভ কী! এখানেই থেকে যাই। এ আকাশের অসীম ছায়াতলে রোদ বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি কারো জন্যে অনন্ত অপেক্ষায়। কাকিমা আমাকে খোঁচা দিয়ে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি বাড়ি যা, তোর মা আর দিদিকে দেখলাম বাড়ির দিকে যেতে।’ আমি সম্বিত ফিরে তাকিয়ে দেখি বারান্দাটা খাঁ খাঁ শূন্য। একটু আগেও ওখানে যে কেউ একজন ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল তা আর মনেই হচ্ছে না। চপল পায়ে সে হেঁটে চলে গেছে। যাওয়ার আগে রেখে গেছে স্নিগ্ধ পদচিহ্ন। আমি যতই পা চালাই পা যেন আর চলতেই চায় না। বারবার পিছনে ফিরে তাকাই কারো মুখ দেখার আশায়, কিন্তু আমাকে হতাশই হতে হয়। শেষবার যখন তাকিয়েছি, তখন কানাই লাল স্যারের ঘরের জানালায় অবিরাম হাসিমুখ। হাসিমুখে আনন্দ। সব মায়া কাটিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হই। উঠোনে পা রাখতেই মনে পড়ে সুকন্যার কথা। বাচ্চাটাকে সারা দিনে একবারও দেখতে যাওয়া হয়নি। বাজার থেকে আসার সময় মহিতোষ জেঠুর দোকান থেকে আনা এক টাকার সন্দেশও পড়ে আছে পকেটে। আমাকে বাজার নিয়ে ফিরতে দেখে মায়ের মুখে ভুবন ভোলানো হাসি। দিদিকেও খুব খুশি দেখাচ্ছে। বাবা সম্ভবত ফেরেনি। তকে আশপাশে কোথাও দেখছি না। আমার এক হাতে বাজারের ব্যাগ। কাছে যেতেই মা আমার মুখে, শরীরে হাত বুলিয়ে দিয়ে আদর করলেন। বললেন, ‘আহ আমার মানিক চাঁন, এক দিনেই দেখ কেমন শুকিয়ে গেছে। ঠিকমতো ঘুম হয়নি একা একা, তা-ই নারে?’ আমি বলি, ‘মা সুকন্যার খুব অসুখ। রাতে একবার গিয়েছিলাম ওকে দেখতে। তার পর সুখেন বাবুর কাছ থেকে ওর জন্যে ওষুধ এনে দিয়েছি। এখন সম্ভবত একটু ভালো আছে।’ আমার কথা শুনে মায়ের মুখটা যেন আরো উজ্জল হয়ে উঠল। সে আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘আমার ছেলেটা কত ভালো কাজ করেছে। কে বলেছে আমার ছেলেকে দিয়ে কিছু হবে না? সে হলো সোনার টুকরো ছেলে।’ আমি মায়ের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে দিদির হাতে বাজারের ব্যাগটা দিয়ে দুধ বিক্রির বাকি টাকা মায়ের হাতে দিলাম। সেখান থেকে মা আমাকে পাঁচ টাকার একটা নোট দিল। আমি সেটা না নিয়ে ফিরিয়ে দিতে দিতে বললাম, ‘মা রেখে দাও পরে অনেক কাজে লাগবে।’ আনন্দে সম্ভবত মায়ের চোখে জল চলে এল। আমি সেই জল গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষা না করে মাকে বললাম, ‘সুকন্যার জন্যে একটু সন্দেশ এনেছিলাম, সেটা দিয়ে আসি আর ওকে দেখে আসি।’

সুষমাদির বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই টের পেলাম সুকন্যা বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছে। সে মায়ের সঙ্গে আধো আধো বুলিতে কথা বলছে। আমি গলা খাঁকারি দিয়ে সুকন্যার নাম ধরে ডাক দিলাম। শুনতে পেলাম সে বলছে, ‘মামা এসেছে।’ শব্দটা সে হয়তো পুরোটা উচ্চারণ করতে পারেনি, কিন্তু আমার কানে সেটা পুরোটাই শোনা গেছে। ঘরে ঢুকে সুকন্যার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে হাতে সন্দেশ দুটো ধরিয়ে দিতেই তার মুখটা খুশিতে ভরে উঠল। শরীরটা এখনো বেশ ক্লান্ত। ওইটুকু শরীরের উপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। বমি আর জ্বরে সে কাহিল ছিল। সুষমাদির কণ্ঠে তখন অভিমানের সুর। তোমাকে বললাম, ‘গোসল সেরে আমাদের বাড়ি আস, এক সঙ্গে খাব; কিন্তু তোমার টিকিটিরও দেখা পেলাম না।’ আমি সুষমাদিকে সবিস্তার জানালাম। শুধু বাদ রাখলাম কানাই লাল স্যারের ঘরের জানালায় দেখা অবিরাম হাসিমুখের কথা। কথা বলতে বলতে সুষমাদি ভাত বেড়ে আমার সামনে রাখল। আমি না করার পরও সে জোর করল আমাকে খেতেই হবে। শেষমেশ খেয়ে আবার বেরিয়ে গেলাম। রাতে যখন বাড়িতে ফিরলাম, বাবা তখনো ফিরে আসেনি। রাতে বাবা যখন ফিরবে, তখন মা নিশ্চয় বাবাকে তার ছেলের প্রশংসায় ভাসিয়ে দেবে।

 


বলাইয়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছি। ওকে নিষেধ করেছি ও যেন ভুলেও কোনো দিন আমাদের বাড়িতে আর না আসে। ও আসলে আমাদের বাড়িতে আসত অন্য উদ্দেশ্য নিয়ে। প্রথম প্রথম গা করতাম না, কিন্তু একসময় বিরক্তি চরমে উঠলে সরাসরি নিষেধ করে দিলাম। একদিন মা জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁরে বলাই দেখি খুব ঘন ঘন তোর কাছে আসে, ব্যাপার কী? কী নিয়ে এত কথা বলিস তোরা?’ আমি মাকে কী করে বলি। শেষে বলাইকে সরাসরি বললাম, ‘তুই আর আজ থেকে আমার বন্ধু না। আমার সঙ্গে কথা বলবি না, আমাদের বাড়িতেও আর আসবি না।’ আমার কথা শুনে বলাইয়ের মন খারাপ হয়েছিল কি না জানি না কিংবা রাগ করেছিল কি না তাও জানি না। তবে তার পর থেকে সে আমাদের বাড়িতে আর আসেনি। আমি আর বলাই বিনোদপুর কলেজে একসঙ্গেই পড়ি। কলেজে আমি নিয়মিত যাই বা না যাই বলাই ঠিকই নিয়মিত কলেজে যায়। পড়াশোনায় সে আমার থেকে খুব একটা ভালো ছিল না কোনো কালেও, তবে সে কলেজে নিয়মিত যায় অন্য কারণে। বলাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে আমার কেমন যেন ঘেন্না হয়। ভালো কিছু তার মুখে কোনো দিন আসে না। একদিন সে ব্যাগ থেকে দেখি একটা বই বের করেছে। বইয়ের কভারে অরুচিকর ছবি দেওয়া। সে সেই বইটা ক্লাসের অন্যদের দেখিয়ে কত রকম হাসি ঠাট্টা করেছে। রনজু রসিয়ে রসিয়ে বলেছে, ‘কীরে এতদিন শুনেছি মানুষ বীজ গণিতের সুত্র মুখস্থ করে, আর তুই শেষ পযর্ন্ত কামসূত্র মুখস্থ করছিস।’ এটা শুনে অন্যরা তখন সেকি হাসাহাসি।

আমার গা গুলিয়ে আসে। আমি সেই থেকেই ওকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছি। কিন্তু সে আমার বাড়ি পর্যন্ত এসেছে। কানের কাছে বারবার ফুসমন্তর দিয়েছে। সে ওই বইটার চ্যাপ্টারগুলো প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছে। কতই-বা বয়স হবে ওর বা আমার। ষোলোতে পড়েছি আমরা। একদিন বিকেলে আমি বসে আছি আমার ঘরে। জানালা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবছি। সেই সময় কোথা থেকে যেন বলাই এসে হাজির। আমার টেবিলের বসে হুট করে জানালাটা খুলে দিতেই বাইরের স্নিগ্ধ বাতাস ঢুকে গেল। একটু আগে যে ঘরটা অন্ধকার ছিল, সেটা আলোকিত হলো। বলাই আমার দিকে না তাকিয়ে সোজা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘আহ কী অপরূপ দৃশ্য! এমন দৃশ্য জনম জনম ধরে দেখে গেলেও সাধ মেটে না।’ আমি অবাক হয়ে ভাবি এই জানালা দিয়ে আমি তো রোজ তাকিয়ে থাকি, কই আমার কাছে তো সেরকম কিছু মনে হয় না। জানালাটা খুললেই পুকুর, সেই পুকুরে হয়তো স্বচ্ছ নীল জল আছে, হয়তো ভালো করে তাকালে সেই জলের নিচে ভেসে বেড়ানো শোল, গজারের ঝাঁক দেখা যাবে। হয়তো ফুস করে ভেসে উঠতে দেখা যাবে একটা টাকি মাছ, তাকে ধিরে থাকবে তার হাজার খানেক ছানাপোনা। কিংবা দেখা যাবে, দুটো হাঁস সমানে সাঁতার কাটছে। বিকেলের আলোটুকু আছড়ে পড়বে পুকুরের জলে, আর সেটা চিকচিক করবে। এই দৃশ্য দেখে দেখে আমি তো ক্লান্ত। একবার দেখার পর আর দেখতে ইচ্ছে হয় না। আমি বলি, ‘প্রথম দেখছিস তো তাই ওরকম মনে হচ্ছে। দু’দিন দেখলেই দেখবি সব ঘোলাটে হয়ে গেছে। ফোঁড়ন কেটে বলাই বলল, ‘তাহলে তুই নিশ্চয় রোজ দেখিস! একদিনও বলিসনি এটা।’ আমি অবাক হয়ে ভাবি, এটা বলার কী আছে। জানালা খুললেই তো রোজ ওই একই দৃশ্য চোখে পড়ে। আমি পাশ ফিরে শুই। ওর সঙ্গে কথা বলতেই আর ইচ্ছে হয় না। কিছুক্ষণ পর বলাই নিজেই উঠে আসে। জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে আমার বিছানার পাশে এসে বসে। মাথার চুলে বিলি কেটে দিয়ে বলে, ‘দোস্ত তোর এই জানালা খুললে যে সৌন্দর্য দেখা যায়, তা স্বর্গের সৌন্দর্য থেকে কোনো অংশে কম নয়!’ আমি হাসি আর বলি, ‘আমি কী করে জানব স্বর্গের সৌন্দর্য কেমন হয়। আমি তো আগে কখনো সেখানে যাইনি।’ বলাই আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলে, ‘দোস্ত, আমি যদি এই সৌন্দর্য রোজ দেখতে পেতাম!’ তার পরদিন থেকে বলাই রোজ আসতে শুরু করল। একই সময়ে আসে, কিছুক্ষণ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে, তার পর চলে যায়। কোনো কোনো দিন বলে, ‘আজকে বাইরেরটা ধূসর বর্ণহীন!’ আমি বাইরে তাকিয়ে দেখি আর দশটা দিনের সঙ্গে কোনো পার্থক্য নেই। তার পরও বলাইয়ের চোখে তা ধূসর বর্ণহীন লাগে কেন জানি না। সেই একই রকম অন্য একটা দিন জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকার সময় তার যেন চোখের পলকই পড়ে না। কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলে, ‘আহ! বিরক্ত করিস না। এই সৌন্দর্য দেখার সময় বিরক্ত করা ঠিক না। এটা তো আর সূর্য নয় যে, রোজ উঠবে আর দেখব। তাছাড়া সূর্যের মধ্যে সৌন্দর্য বলেও কিছু নেই।’

আমার বেশ অবাক লাগে। কিছুটা সন্দেহ হয়। কী এমন দৃশ্য দেখে বলাই! যা আমি দেখি না, যা আমাকে আকৃষ্ট করে না। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াই। বলাই যে দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, সেদিকে দৃষ্টি ফেলি। যতদূর চোখ যায় সবুজের সমারোহ। পুকুরের জলে তখন দুটো হাঁস অবিরাম সাঁতার কাটছে। এর বাইরে তো আর কিছুই চোখে পড়ে না। আমি ফোঁড়ন কেটে বলি, ‘দেখলাম তো তোর অবিরাম সৌন্দর্য। আমাকে তো মুগ্ধ করতে পারল না।’ এই বলে আমি জানালাটা বন্ধ করে দিলাম। কী একটা কাজে মা ডাক দিতেই বলাইকে রেখে বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম, সুষমাদি ভেজা কাপড়ে আমাদের উঠোন পেরিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। আমার চোখটা সঙ্গে সঙ্গে আমার রুমের দরজায় গিয়ে স্থির হলো। সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে বলাই। বলাইয়ের চোখ তখন সুষমাদির চলে যাওয়া পথের দিকে নিবদ্ধ। আমার আর বুঝতে বাকি রইল না। রোজ সুষমাদি যখন গোসল করে, জানালা খুলে বলাই তার দিকেই তাকিয়ে থাকে। সেই দৃষ্টিতে কাম ছাড়া আর কিছু থাকে না। মা আবার ডাক দিতেই আমি ছুটে যাই। মা আমাকে ডেকে বলাইয়ের কথাই বলে। জানতে চায় রোজ বলাই এই সময়টাতে কেন আসে। কী বলতে চায় সে। আমি কিছু বলতে পারি না। একটু আগে দেখা ঘটনাটা আমাকে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছে, বলাই কেন আসে। কিন্তু সেটা তো মাকে বলা সম্ভব নয়। আমি ঘুরিয়ে বলি, ‘মা ওর কিছু পড়া আমাকে দেখিয়ে দিতে বলে।’ মা খুশি হয়। মনে মনে নিশ্চয় ভাবে, আর যাই হোক ছেলেটা আমার বিদ্যাসাগর হচ্ছে!

একবার মনে হলো সুষমাদিকে বলি এই পুকুরে গোসল করতে না আসতে। আবার মনে হলো পুকুরটা তো আমাদের না। কেন তবে সুষমাদিকে নিষেধ করব। তাছাড়া এখানে গোসল না করলে সুষমাদি কোথায় গোসল করবে। আশপাশে তো আর কোনো পুকুর নেই। তাকে যেতে হবে মালো পাড়াতে মুখুজ্জদের পুকুরে। সেখানে একসঙ্গে কত ছেলে-বুড়ো গোসল করে তার ঠিক নেই। তাদের কারো কারো বাঁকা চাহনি সুষমাদিকে কুরে কুরে খাবে। তার থেকে বরং ভালো হয় বলাইকেই আসতে নিষেধ করলে। পরদিন কলেজে গিয়ে বলাইকে নিষেধ করি, ‘তুই আর আমাদের বাড়িতে আসবি না। মা নিষেধ করেছে তুই যেন আমাদের বাড়িতে না যাস।’ আমি মুখের উপর একটা মিথ্যে কথা বলে দিই। এছাড়া আর করার কিছু ছিল না আমার। আমার মা যে বলাইকে যেতে নিষেধ করতে পারে এটা বলাইও বিশ্বাস করত না। তার পরও সে আর কোনো কথা বাড়ায়নি। তাই বলে সে আসা থামিয়ে দেয়নি। সে বরং সুষমাদিদের বাড়ির কাছাকাছি এসে কাউকে না কাউকে পাঠিয়ে দিত আমাকে ডাকার জন্যে। আমার ইচ্ছে করত না ওর সঙ্গে দেখা করতে। তার পরও যেতাম। বলাইয়ের চোখ সারাক্ষণ সুষমাদির উঠোনে নিবদ্ধ থাকত। একদিন সুষমাদি উঠোনে বসে কী যেন করছিল। তার পরনে ছিল একটা ছেঁড়া শাড়ি। সেই শাড়ির আঁচল দিয়ে শরীরটা কোনো মতো ঢাকতে পারলেও পিঠ খালিই থেকে যায়। যেখানে পেট পুরে দু’বেলা খাবারের জন্যে চুলোই জ্বলে না, সেখানে এর বেশি আর কিইবা করতে পারত সুষমাদি। বলাইয়ের কামুক চোখে সেই দৃশ্য মধুর লাগে। সে দৃষ্টি যেন ফেরাতেই পারে না। বিষয়টা আমার চোখ এড়ায়নি। আমি জোর করে ওকে সরিয়ে নিয়ে যাই। এখন আমার হাতে একটাই মাত্র পথ খোলা আর তা হলো লজ্জার মাথা খেয়ে বলাইয়ের বাবাকে সব খুলে বলা। বলাই কথায় কথায় অনেকবার সুষমাদির শরীর টেনে এনেছে, আমি কিছু বলিনি। আমি কিছু বলতে গেলে সেটা আরো বেশি ঘোলা করে ফেলবে ভেবেই বলিনি। কিন্তু ওর দৃষ্টি আমার মোটেও সহ্য হতো না। সুষমাদির বয়স আর কত হবে, আঠারতে পড়েছে সবে মাত্র। বিয়ের তিন বছরের মাথায় তার স্বামী মারা যায়। বাবাও না থাকার মতো অবস্থা। চোখে কম দেখে, কানেও শোনে না বলা চলে। সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে শেষ বিদায়ের প্রহর গোনে। বাড়ির পাশের জমিটুকুতে শাকসবজি আবাদ করে নিজেদের খাওয়ার কাজ চালিয়ে বাকিটা বাজারে বিক্রি করে কিছু টাকা পাওয়া যায়, যা দিয়ে সংসার চলে না। তাই সুষমাদি মাঝে মাঝে এখানে সেখানে এর ওর বাড়িতে সাংসারিক কাজ করে কিছু কিছু আয় করতে চেষ্টা করে। কিন্তু সেই সামান্য আয় দিয়ে তিনজনের সংসার আর কতইবা চলে। তার ওপর ঘরে একজন অসুস্থ রোগী। যে বয়সে স্বামী সোহাগে থাকার কথা, সেই বয়সে সংসারের ঘানি টানতেই তার দিন পার হয়। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাকে কাজ করতে হয়। মানুষের লোলুপ দৃষ্টি এড়িয়ে বেঁচে থাকাও দুরূহ ব্যাপার। রমা কাকি কয়েকবার বলেছে আরেকটা বিয়ের কথা, কিন্তু সুষমাদি কানে তোলেনি। শেষমেশ রমা কাকিও বলা ছেড়ে দিয়েছে। সে এক কথার মানুষ। ভালো কথা বলার পর যদি কেউ না শোনে তবে রমা কাকি আর সেধে তাকে বলতে যায় না। তার ভাষায়, ‘নিজের খেয়ে পরে বনের মোষ তাড়িয়ে লাভ কী?’ কিন্তু দিন সব সময় একরকম যায় না। আকাশের রং যেমন ক্ষণে ক্ষণে বদলায়, তেমনি মানুষের জীবনের রংও বদলায়। মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ পাশাপাশি অবস্থান করে। তবে কারো কারো জীবনে সম্ভবত দুটোর যেকোনো একটার উপস্থিতিই চোখে পড়ে। এ গাঁয়ের মানুষের মনে সুখ কতটা আছে, তা কেউ বলতে পারবে না। সবাই সুখে থাকার অভিনয় করে চলেছে নিরন্তর। সুখে থাকার অভিনয়ের মধ্যেই যেন সব সুখ লুকিয়ে আছে। এক সকালে সবাইকে মুক্তি দিয়ে সুষমাদির বাবা বিদায় নিলে তার দুই কুলে আর কেউ রইল না। ঘরে সামর্থ্যহীন বাবা ছিল, তাতেই তার ভরসার একটা জায়গা ছিল। নেকড়েগুলো ভিড়তে সাহস পেত না। চিতায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাই তার চিন্তা আরো বেড়ে গেল। সেই চিন্তাটা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চিন্তা। শশ্মান থেকে আমরা যখন ফিরে এসেছি, সে তখন পা ছড়িয়ে বসেছিল। তার একমাত্র মেয়ে সুকন্যা পাশে বসে নির্বাক চোখে তাকে দেখছিল। আকাশে এক ঝাঁক বুনো পায়রা ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক খা-খা শূন্যতা যেন গ্রাস করে নিতে শুরু করল। দূর থেকে ভেসে আসতে লাগল ডাহুকের সকরুণ সুরে ডাক।

 


আমাদের দুধের গাভিটাকে অবশেষে বিক্রি করে দিতে হলো। এ ছাড়া বাবার হাতে আর কোনো উপায় ছিল না। দিদির বিয়ে ঠিক হয়েছে। যৌতুকের কোনো বিষয় নেই, তার পরও বর পক্ষকে আপ্যায়নের জন্যে খরচ তো কম নয়। তারা বলেছে ত্রিশজন আসবে। যেখানে তিনজনের পেট পুরে খাবার জোগাড় করার সামর্থ্যই আমাদের নেই, সেখানে ত্রিশজন নতুন মেহমানকে খাওয়ানোর ক্ষমতা বাবা কোথায় পাবে। শেষে কোনো উপায়ান্ত না দেখে আমাদের আয়ের অন্যতম উত্স দুধেল গাভিটাকেই বিক্রি করে দিতে হলো। মা নিজ হাতে গরুটিকে যত্ন করে গোসল করিয়ে দিল। দিদি তখন পাশেই দাঁড়িয়েছিল। টাকা-পয়সার অভাবে দিদির বিয়েটা অনেক দেরি হয়ে গেছে। অনেকবার বিয়ের কথা উঠলেও দিদি সংসারের নানা চিন্তা করে অমত করেছে। সেই করতে করতে বয়স আঠারো হয়ে গেছে। গরিব ঘরে চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সী মেয়েই বোঝা, সেখানে আঠারো তো ঢের বেশি। বাবা-মা তাই আর দেরি করতে রাজি হয়নি। ভালো সম্বন্ধ দেখে দিদির বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। গরুটাকে গোসল করানোর সময় মায়ের চোখে জল ছিল, দিদির চোখেও জল চিকচিক করছিল। এত আদরের ছিল গাভিটা যে, তার জন্যে সবার মনেই মায়া জন্মে গেছে। সে যে শুধু দুধ দিত তাই নয়, সে দুধ দিয়ে এ পরিবারের চারজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখত।

আমি যখন গরুটার রশি ধরে হাটের দিকে হাঁটতে শুরু করেছি দিদি আর মা বেশ কিছুদূর হাঁটতে হাঁটতে আমাদের পিছু পিছু এল। শত্রুজিত্পুর হাটে যাওয়ার পর আমাদের খুব বেশি দেরি করতে হয়নি। নারানপুরের আব্দুল করিম শেখ আমাদের গরুটিকে কিনে নিয়ে গেল। সম্ভবত গরুটিরও আমাদের প্রতি মায়া পড়ে গিয়েছিল। সে বার কয়েক হাম্বা হাম্বা করে ডাক দিল। যেন বলতে চাইল, এভাবে আমাকে পর করে দিলে। কিংবা হতে পারে সে তার একমাত্র বাছুরটিকে ছেড়ে যাচ্ছে বলে তার কষ্ট হচ্ছে। মানুষ বড়ই নিষ্ঠুর হয়ে তার চোখে ধরা পড়ছে। মা ও সন্তানকে আলাদা করে দেওয়ায় নিশ্চয় তার মনে অনেক ক্ষোভ। আমার চেয়েও সম্ভবত বাবার মনে দুঃখটা বেশি। গরু বিক্রি করতে আসার সময় শেষবারের মতো ঢালুনে করে দুধটুকুও নিয়ে এসেছিলাম। দুধ বিক্রির পর বাবা ঢালুনটা আর বাড়িতে নিলেন না। বুঝলাম বাবার অনেক কষ্ট হচ্ছে। দিদির জন্যে লাল বেনারসি শাড়ি কেনা হলো। পায়ে দেওয়ার জন্যে আলতা কেনা হলো। এক গোছা রেশমি চুড়িও কেনা হলো। বরপক্ষ বলেছে তারা হাতের চুড়ি আর গলার হার দেবে। আমাদের গরিবের সংসারে সবটাই বিলাসদ্রব্য। বাবা দিদির জন্যে একটা নাকফুল বানাতে দিয়েছিলেন, সেটা নিলেন। বরের জন্যে একটা আংটিও কেনা হলো। সব মিলিয়ে সাধের গাভিটি বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া গিয়েছিল, তার অর্ধেকটাই শেষ হয়ে গেল। বিয়ে বাড়িতে খরচের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। লিস্ট ধরে ধরে বাকি সব কেনা হলো। বিয়ের আগের দিন রাত পর্যন্ত সুষমাদি নিজে সঙ্গে থেকে সব কিছু করলেন। দিদিকে সাজিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে মাকে নানা কাজে সহযোগিতা করলেন। তার মতো ভালো মনের মানুষ এক জীবনে আমি খুব কম দেখেছি। তার চোখে বড়ই মায়া। মুখের হাসিতে কোনো কৃপণতা নেই।

বিয়ের দিন সকালে দেখি বলাই এসে হাজির। তাকে এ বাড়িতে আসতে নিষেধ করার পরও সে এসেছে। যেহেতু একমাত্র দিদির বিয়ে তাই আমি আর তাকে কিছু বলতে পারিনি। তার সঙ্গে সঙ্গে শাশ্বত, অনিমেষ, নিমাই ওরাও এসেছে। যদিও আমি ওদের কাউকেই দাওয়াত দিইনি। সামান্য আয়োজনে ওদেরকে দাওয়াত দেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না আমার। যা আয়োজন করেছি, তা আগত মেহমানদেরকেই আপ্যায়ন করতে পারব কি না সেটা নিয়েই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলাম। অনিমেষ আমাকে বাড়ির এক কোনায় ডেকে নিয়ে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে বলেছিল, ‘তুই আমাদের দাওয়াত করিসনি, তার পরও চলে এসেছি বলে মনখারাপ করিস না। আমরা জানি, দাওয়াত করার মতো অবস্থায় তোদের নেই। আমরাও এখানে এসে খাওয়ার জন্যে মনস্থির করে রাখিনি। আমরা ভাবলাম তোর এই কঠিন মুহূর্তে বন্ধু হয়ে যদি তোর পাশেই না থাকতে পারি তবে কীসের বন্ধুত্ব। তোকে পুরো অনুষ্ঠানে সাহায্য করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।’ আমি অনিমেষকে বুকে টেনে নিই। চোখে জল এসে যায়। বলাইয়ের উপর থেকে মুহূর্তেই রাগ নেমে যায়। সবাই মিলে দিদির বিয়ের পুরো অনুষ্ঠানকে পরিপাটি করে তুলি। গেট সাজানো থেকে শুরু করে বরের বসার জায়গা সাজানো এবং বাকি সব কাজ আমরা আনন্দের সঙ্গেই করতে থাকি। আমাদের ছুটোছুটি চলছে সমানে। কয়েকটা বাচ্চার সঙ্গে দেখি সুকন্যা বসে কী যেন খাচ্ছে। ওর মাও নিশ্চয় হয়তো কোনো না কোনো কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছে। বর আসতেই হইচই পড়ে গেল। আমরা গেট ধরে দাঁড়িয়ে গেলাম। তবে বড়দের কথামতো আমরা বেশি উচ্চবাচ্য করলাম না। বরপক্ষ যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদেরকে খুশি করেই উঠোনে প্রবেশ করল। খাওয়াদাওয়া শেষে বিয়ের যাবতীয় কাজ হয়ে গেলে একসময় চোখের জলে ভাসিয়ে আমার একমাত্র দিদি শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। তার সঙ্গে আমার যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যাওয়া হলো না। আমার বদলে আমার ছোট পিসির ছেলে অনন্ত আর আমাদের এক ঠাকুর মা গেল। দিদি হাউমাউ করে কেঁদেছিল। সেটা দেখে আমার চোখেও জল এসে গেল। উঠোনটা ফাঁকা পড়ে থাকবে। যে উঠোনে সারাদিনমান দিদি হেঁটে বেড়াত। ছোটবেলায় এই উঠোনে দিদির সঙ্গে দাঁড়িয়াবান্ধা খেলতাম, লুকোচুরি খেলতাম। কতশত খুনসুটি হতো। সেসব দেখতে দেখতে চোখের পলকে স্মৃতির খাতায় আটকে গেল। কোনো দিন আর সেই সব মুহূর্ত ফিরে আসবে না।

আকাশে মেঘ করলে কোনো দিন দিদি দৌড়ে এসে আমার পড়ার টেবিলে উপরে থালাবাসন পেতে দেবে না। কোনো দিন মাথার চুলে বিলি কেটে দেবে না। বাছুরটা সকাল থেকে হাম্বা হাম্বা করে ডেকে চলেছে। মায়ের অনুপস্থিতি তার বুকে যন্ত্রণার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে, সেটা আমি অনুভব করতে পারছি দিদি চলে যাওয়ার পর থেকে। আপনজন কাছে না থাকার যন্ত্রণা যে কত কঠিন, তা উপলব্ধি করছি। দিদিকে বিদায় দিয়ে খাওয়া-নাওয়ার কথা ভুলে গেছি। বলাইরাও ফিরে গেছে। আমি আহাম্মকের মতো তাদেরকে একটি বারের জন্যেও খেয়ে যেতে বলিনি। মেহমানরা ত্রিশজন আসার কথা বলে ছিল কিন্তু তারা মাত্র বিশজন এসেছিল। খাবারের কোনো কমতি ছিল না। অথচ আমার যে বন্ধুরা বিনা নিমন্ত্রণে এসে দিদির বিয়ের আয়োজনকে সুন্দর করে দিয়ে গেছে, তাদেরকে খালি মুখে ফিরে যেতে দেখেও আমার মধ্যে কোনো বোধ শক্তি কাজ করেনি। এখন আর কোনো কিছুই ভালো লাগছে না। আশ্চর্য! আমার একমাত্র দিদির বিয়েতে সারাদিন সুষমাদির ছায়াটুকুও দেখলাম না। কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে ঘরে চলে গেলাম। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই মনে হচ্ছিল রাজ্যের ক্লান্তি চোখে মুখে ভর করছে। সেই ক্লান্তি আসলে প্রিয়জন চলে যাওয়ার ক্লান্তি। দিদিই ছিল আমার সব থেকে ভালো বন্ধু। সে কত দিন মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। সেই ঋণ আমি কোনো কালেও শোধ করতে পারব না। সাত-পাঁচ ভাবছি, আমার চোখ বন্ধ। সেই বন্ধ চোখে স্বপ্নের মতো ভেসে ভেসে আসছে অতীতের সব সুখ স্মৃতি। হঠাত্ কারো পায়ের শব্দে চোখ খুলে তাকাতেই দেখি বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। মুখটা বিষণ্ন, তবে নির্ভার। বিবাহযোগ্য কন্যাকে বিয়ে দিতে পেরে তিনি আজ অনেকটাই ভারমুক্ত হয়েছেন বলেই তাকে নির্ভার লাগছে। অন্যদিকে প্রাণপ্রিয় কন্যাকে বিদায় দিয়ে মনটাও বেশ ভারাক্রান্ত। আমার পাশে বসে কিছুক্ষণ কথা বললেন। তার পর বললেন, ‘তোর বন্ধুরা সবাই এত খাটাখাটনি করল, শেষে না খেয়েই চলে গেল। যা গিয়ে ওদেরকে ডেকে নিয়ে আয়। অনেক খাবার তো বেঁচেই আছে। একসঙ্গে দুটো খাবি। তোরও তো খাওয়া হয়নি কিছু। সারাদিন ধকল তো কম যায়নি।’ আমারও বেশ খারাপ লাগল। যারা আমার একমাত্র দিদির বিয়ের জন্যে এত কষ্ট করল, তাদেরকে অভুক্ত অবস্থায় চলে যেতে দেওয়া আমার উচিত হয়নি। বাবার কথামতো ওদেরকে ডেকে আনতে গেলাম। মনে মনে ভেবেছিলাম, ওরা কেউ আসবে না। প্রথমত দাওয়াত দিইনি, তার উপর চলে আসার সময়ও একবার মুখ ফুটে বলিনি, ‘তোরা খেয়ে যা।’ কোনো মুখে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াব বুঝতে পারছিলাম না। যাওয়ার পথে সুষমাদিকে দেখলাম রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। তার উপর আমার ভীষণ রাগ হচ্ছে। আমার একমাত্র দিদির বিয়ের দিন তাকে একটিবারের জন্যেও আমাদের বাড়িতে দেখিনি। অথচ তার থাকার কথা ছিল। সে আর আমার দিদি তো ভালো বান্ধবী ছিল। একসঙ্গে হেসে খেলেই তারা বড় হয়েছিল।

সে আমার পথ আগলে দাঁড়াল। মুখে একরাশ হাসি টেনে বলল, ‘নিখিলেশ তোমার দিদির রাজকপাল। তার স্বামীও দেখতে রাজপুত্রের মতো। আর শুনেছি বংশও ভালো।’ আমি কোনো কথা বললাম না। আমি কয়েকবার তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু সে আমাকে যেতে দিল না। যেন আমার অভিমান ভাঙাতে চায় সে। আমার মনের মধ্যে সীমাহীন ভাবনা। আমি তাকে হাত দিয়ে ঠেলে পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম। একবারও পিছন ফিরে তাকালাম না। তাকালেই দেখতে পেতাম, সে অপলোক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে মুখে রাগ নেই, কিন্তু অভিমান ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। পথে যেতে যেতে বারবার মনে হলো, কেন সুষমাদি আমার পথ আগলে দাঁড়াল? কেন সে দিদির বিয়ের দিন আমাদের বাড়িতে গেল না? তার একমাত্র মেয়ে সুকন্যাকে দেখেছিলাম, কিন্তু তাকে দেখিনি। প্রথমে ভেবেছিলাম, সে কোনো না কোনো কাজে আছে তাই চোখে পড়ছে না, কিন্তু এখন মনে হলো, আমাদের তো রাজপ্রাসাদের মতো আলিশান বাড়ি নয় যে সহজে চোখে পড়বে না। পরে মনে হলো, বিয়ে বাড়িতে পরে যাওয়ার মতো তার কোনো কাপড়ই ছিল না। মনটা ভেঙে যেতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে আমি ততক্ষণে অনেক দূরে চলে এসেছি। মনে হচ্ছিল এক দৌড়ে ছুটে গিয়ে সুষমাদিকে বলি, ‘তুমি আমাকে ক্ষমা করো। তুমি আসনি বলে আমি তোমার ওপর না জেনে না বুঝে অভিমান করেছিলাম বলে আমাকে ক্ষমা করো।’ কিন্তু আমার আর ফিরে যাওয়া হয়নি। ভাবলাম পরে একসময় এটা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলব।

এখন আমার চারদিকে শূন্যতা। কানাই লাল স্যারের বাড়ির কাছে আসতেই চোখ দুটো আপনা থেকেই খোলা জানালায় নিবদ্ধ হয়। চোখ দুটো বারবার আমার সঙ্গে প্রতারণা করছে। সে জানে ওই খোলা জানালায় কেউ তার জন্যে পথ চেয়ে বসে নেই, তার পরও সে সেদিকে দৃষ্টি ফেরাবেই। একদিন এক মুহূর্তের জন্যে ওই জানালায় অবিরাম হাসিমুখ দেখা গিয়েছিল, কিন্তু সে যেন হ্যালির ধূমকেতুর মতো মিলিয়ে গেছে। তার পর আর কোনো দিন তাকে দেখা যায়নি। অথচ এই পথ দিয়ে যতবার যাওয়া আসা করি, আমার নিজের অজান্তেই চোখদুটো কাকে যেন খুঁজে ফেরে সেই খোলা জানালায়। জানালাটার প্রতি আমার ক্ষোভ জমে গেছে। হয়তো কোনো একদিন দা-কুড়াল এনে জানালাটাকে খুন করে রেখে যাব। সে কোন সাহসে বারবার আমার সঙ্গে প্রতারণা করবে, মরীচিকার মতো সে আমার চোখ দুটোকে কেন টানবে। পোড়া চোখ যুক্তি শোনে না। কোনো একদিন ওই জানালায় এক চিলতে হাসি নিয়ে পূর্ণচন্দ্রের মতো দেখা গিয়েছিল এক চন্দ্রমুখী। তার ছিল দীঘল কালো চুল, অপূর্ব সুন্দর মায়াকাড়া হরিণীর চোখ, আর হূদয়-খুন-করা হাসি। যে হাসিটা এক নিমিষে খুন করতে পারে হাজারো নিখিলেশ, অনিমেষদের। তার পর সব স্মৃতির পাতায় আটকা পড়ে আছে। মনে অজান্তে যতবারই খোলা জানালায় দৃষ্টি পড়েছে কেবলই সেখানে শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাইনি। কোনো এক বিকেলে অস্তমান সূর্যের সঙ্গে সঙ্গে সেও অস্ত নিয়েছে। সূর্যটা প্রতিদিন একই নিয়মে উদয় হলেও সেই হাসিমুখ আর কোনো দিন খোলা জানালায় দেখা যায়নি। হয়তো আর কোনো দিন দেখাও যাবে না।

 


কোন অলক্ষণেই যে একটা কবিতা লিখতে গিয়েছিলাম জানি না। কী একটা লিস্ট করবে বলে কলেজে একদিন অনিমেষ আমার কাছে একটা কাগজ চাইল। আমি ঝন্টু স্যারের সঙ্গে কথা বলছিলাম বলে ওকে বলেছিলাম আমার খাতা থেকে ছিঁড়ে নে। স্যারের সঙ্গে কথা বলা শেষ করে যখন ক্লাস রুমে ফিরেছি, দেখি সবাই আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। একসময় মুচকি হাসিটা হো-হো শব্দে ফেটে পড়ল। আমি বুঝেই উঠতে পারিনি তারা কী নিয়ে হাসছে। তার পর অনিমেষ তার পিছনে লুকিয়ে রাখা খাতাটি বের করে শব্দ করে পড়তে শুরু করল।

‘তোমার খোলা চুল, স্নিগ্ধ হাসি/বড় মায়াকাড়া, বড় ভালোবাসি/

খোলা জানালায় অবিরাম হাসিমুখ/সে মুখে তাকিয়ে খুঁজি জীবনের সব সুখ’

আমার আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, ওরা আমার খাতাটা ঘেটে ঘেটে কবিতাটি পেয়েছে। তার পর ক্ষ্যাপানো শুরু করল। বলাইয়ের আগের সব অপরাধ আমি ক্ষমা করে দিয়েছিলাম দিদির বিয়ের দিন। কিন্তু সেদিন বলাই জন্মের মতো আমার শত্রু হয়ে গেল। আমি ওকে ইতোর বলে গালি দিলাম। তাতে তার কিছুই গেল এল না। সে তার মতো করে বলতে লাগল। সে বারবার বলতে লাগল

 ‘সুষমাদি তোমার খোলা চুল, স্নিগ্ধ হাসি/বড় মায়া কাড়া, বড় ভালোবাসি

খোলা জানালায় অবিরাম সুষমাদির হাসিমুখ/সে মুখে তাকিয়ে খুঁজি জীবনের সব সুখ’

রাগে আমার শরীর থেকে থেকে কেঁপে উঠছিল। মনে হচ্ছিল বলাইকে খুন করে ফেলি। ক্লাসের সবাই আমাদের গাঁয়ের ছিল না বলে তারা জানত না সুষমাদি কে। আমি হাত থেকে কবিতাটি নিয়ে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলি। কাগজে লেখা কবিতা কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলা যায়, কিন্তু বুকের মধ্যে যে কবিতা লেখা ছিল, তা কি আর ছিঁড়ে ফেলা যায় কখনো! আমার জানা ছিল না যে, কবিতাটা আরো কোথাও লিখে রেখেছি। সেদিন রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি ফিরে আসি। পথে সুষমাদির সঙ্গে দেখা হয়। রাগ দেখিয়ে বলি, ‘যত্তসব ভাল্লাগে না কিছু আর!’ সে কি বুঝল জানি না, বাড়ি ফেরার পর আমারও মন খারাপ হয়ে গেল। সে বেচারির তো কোনো দোষ নেই। নিজের বন্ধুদের আহাম্মকির কারণে শুধু শুধু তাকে রাগ দেখিয়ে এসেছি। দুপুরে না খেয়েই ঘুমিয়ে গেলাম। যখন ঘুম ভেঙেছে, তখন সন্ধ্যা হয় হয়। আড়মোড় ভেঙে বিছানায় উঠে বসতেই দেখি হাসি হাসি মুখ করে সুষমাদি টেবিলের উপর ঝুঁকে আছে। আমি আবারও চমকে উঠি। দরজা খোলাই ছিল। ঘর থেকেই দেখা যাচ্ছে মা রান্না করছে। রান্নাঘর থেকে আমার রুমটা বেশ ভালোভাবেই দেখা যায়। আমি উঠে দেখি সুষমাদির হাতে আমার ডায়েরি। যে পাতাটা খোলা সেখানে সেই কবিতাটি! আশ্চর্য এ কবিতা ডায়েরিতে এল কী করে! সুষমাদি ম্যাট্রিক পাস করেছিল সেকেন্ড ডিভিশনে। বিয়ের পর আর পড়ালেখা করা হয়নি। গরিব ঘরের ছেলেমেয়েদের বিয়ের পর আর পড়ালেখা হয়ে ওঠে না। সে কবিতাটা আমার সামনেই শব্দ করে পড়ে শোনাল। আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম যখন সে আবৃত্তি করল

‘সুষমাদি তোমার খোলা চুল, স্নিগ্ধ হাসি/বড় মায়াকাড়া বড় ভালোবাসি

খোলা জানালায় অবিরাম সুষমাদির হাসিমুখ/সে মুখে তাকিয়ে খুঁজি জীবনের সব সুখ’

আমি তো এ কবিতা লিখিনি। কবিতার কোথাও সুষমাদির কথা লেখা ছিল না, তার নামও ছিল না। কিন্তু সে যে কবিতাটা আবৃত্তি করল তাতে স্পষ্ট তার নাম আছে, তার খোলা চুলের কথা আছে। আমি ছোবল দিয়ে তার হাত থেকে ডায়েরিটা নিয়ে কবিতাতে চোখ বুলালাম। নাহ সেখানে সুষমাদির নাম তো নেই! তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাঁকা হাসি ঠোঁটে লেগে আছে। আমি তাকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বললাম, ‘সুষমাদি এটা মোটেও ঠিক হলো না। আমাকে এভাবে ভড়কে দেওয়া উচিত হয়নি।’ সে কিছু বলল না। তার মুখের হাসি আরো বিস্তৃত হলো। কবিতার প্রশংসাও করল, আর বলল কবিতা লেখা ছেড়ে না দিতে। আমি অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম যে, আমি তো কবিতা লিখতেই শুরু করিনি, তাহলে ছাড়ার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে।

দুপুরে খাইনি বলে পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা ছিল। ঘর থেকে বেরিয়ে পুকুর ঘাটে গিয়ে গোসল সেরে এলাম। বার কয়েক এপাড় ওপাড় সাঁতার কাটার পর মনটা বেশ ফুরফুরে লাগল। গোসল সেরে কাপড় পাল্টে খেতে বসলাম। সুষমাদি তখনো আমাদের বাড়িতেই ছিল। তার বাবা মারা যাওয়ার পর অধিকাংশ সময় কাজ না থাকলে সে আমাদের বাড়িতেই থাকে। মায়ের সঙ্গে গল্প করে সময় কাটায়। আমি আমার মতো করে এখানে ওখানে ঘুরিফিরি। যেদিন সুষমাদির মুখে নিজের লেখা কবিতা শুনেছিলাম, সেদিনই সন্ধ্যার একটু পর মায়ের কথামতো সুষমাদি ও সুকন্যাকে বাড়িতে দিয়ে আসতে গেলাম। সুষমাদি যে কথাটি বলল, তা শুনে আমি আরো একবার চমকে উঠলাম। নিখিলেশ তোমার ঘরের জানালা খুলতেই দেখি অবিরাম সৌন্দর্য। যেন পৃথিবীর তাবত্ সৌন্দর্য সেদিন সেই বিকেলে তোমার জানালা ঠিকরে ভিতরে প্রবেশ করছিল। আমি কোনো কথা না বাড়িয়ে ফিরে যাই বাড়িতে। আরো একবার সেই অন্ধকারে জানালা খুলে বাইরে তাকাই। আমার চোখে ঘন অন্ধকার ছাড়া কোথাও কোনো সৌন্দর্য ধরা পড়ে না। মনে পড়ে যায় বলাইয়ের কথা। যার চোখ আটকে ছিল পুকুর ঘাটে অজানা কোনো সৌন্দর্যের মোহে।

 


বেশ কিছুদিন ধরে দিদিকে একটা কথা বলব বলব করে বলা হয়নি। কীভাবে বলব সেটাই ভেবে পাচ্ছিলাম না। আবার না বলতে পারলেও খারাপ লাগছিল। কিছুদিন হলো দিদির বিয়ে হয়েছে। জামাইবাবু বেশ ভালো। দিদিকে আদরে আহ্লাদেই রাখে। আমার দিদিও অনেক ভালো। শিমুলিয়া গ্রামে যে কয়টা ঘর অবস্থাসম্পন্ন, দিদিরা সেই ঘরগুলোর মধ্যে অন্যতম। শুধু অবস্থাসম্পন্নই নয়, নামে যশেও তাদের খ্যাতি আছে। তৃতীয়বারের মতো দিদি যখন শ্বশুরবাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে এল, তখন দিদিকে নিয়ে পুকুর ঘাটে হাঁটতে গেলাম। হাঁটতে হাঁটতে ছোটবেলার অনেক কথাই বললাম। তার পর আমতা আমতা করে দিদিকে বললাম, ‘দিদি তোকে একটা কথা বলার ছিল।’ দিদি বলল, ‘একটা কেন হাজারটা বল! তাতে তো দোষ নেই। কতদিন পর এলাম বাড়িতে। তোর জমিয়ে রাখা সব কথা শুনব বলেই তো আমি অস্থির হয়ে আছি।’ আমি দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বললাম, ‘দিদি আমার আর কোনো কিছুই ভালো লাগে না। এই গাঁ, এই গাঁয়ের মানুষ এবং তাদের চালচলন ভালো লাগে না। তাদের চোখের দৃষ্টি আমার ভালো লাগে না, তাদের মুখের কথাও আমার ভালো লাগে না।’ দিদি আমার কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না। সে আমার একটু কাছে এসে বলল, ‘কী হয়েছে খুলে বল।’ আমি বললাম, ‘দিদি তোর তো অনেক গুলো কাপড় তার থেকে একটা যদি সুষমাদিকে দিয়ে আসতি।’ ওটুকু বলেই আমি আর অপেক্ষা না করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম। হাঁটতে হাঁটতে নকখোলার বিলে চলে গেলাম।

নকখোলার বিলে অগণিত মাছরাঙা পাখি আছে, আর আছে সাদা রঙের বক। নিজের পানিতে তাকালেই দেখা যায় কই, ডাইনকানা আর টাকি মাছের সারি। একটা কলার ভেলায় চেপে মন যেদিকে যায় হাল বেয়ে চলে যেতে থাকি। মনে হয় জীবনানন্দ দাশের ‘হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা’-এর মতো আমিও হারিয়ে যাই কোনো সুদূরে। আমি জানি, আমার কথা শুনে আকাশ-পাতাল কিছু ভাববে না আমার দিদি। দারিদ্র্যতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েই তো বড় হয়েছে দিদি। তার সঙ্গেই বেড়ে ওঠা সুষমাদির অবস্থা দিদির চেয়ে ভালো আর কারো জানার কথাও নয়। আমি কথাটুকু বলেই তার সামনে থেকে সরে এসেছি লজ্জায়। যে কথাটা আমার বলার ছিল না, সেটাই আমি তাকে বলে এসেছি। এ সমাজে এর দায় ছিল সকলের। টিভি খুললেই নিতাই রায়দের মুখ যেমন ভেসে আসে, তেমনি তার থেকে বেশি ভেসে আসে বীরেন শিকদারদের মুখ। যারা ভাগ্য বদলে দেবে বলে দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চেয়েছিল। কিন্তু বাঙালির ভাগ্য ফেরেনি। একটা মাছরাঙাকে দেখলাম ফুস করে জলের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে আবার বেরিয়ে এল। তার মুখে তখন একটা বড় পুঁটি মাছ। একটা ঢোঁড়া সাপ এঁকেবেঁকে পানির ওপর দিয়ে সাঁতার কেটে চলে গেল। কয়েকটা বালিহাঁস সাঁতার কাটছে মনের আনন্দে। যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি। এই বিলটা কত মানুষের রুজি রুটির ব্যবস্থা করে তার কোনো হিসেব নেই। আবার এই বিল কত যে প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

বিলে সারা বছর পানি থাকে। কোথাও কোমর পানি তো কোথাও ঠাঁই নেই। কলিম মাঝির ছোট ছেলে এই বিলের পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল বলে শোনা যায়। এর পরও কত মানুষের জীবন এই পানি-কাদায় হারিয়ে গেছে, তা জানা নেই। রাজা লক্ষনেশ্বর শায়েস্তা খাঁর আমলে এই বিল খনন করেছিল বলে শুনেছি, কিন্তু সত্যি না মিথ্যা জানা হয়নি। সূর্য ডুবে গেছে অনেক আগে। আকাশে সাদা মেঘের ভেলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়ে চলেছে একঝাঁক বক। আস্তে আস্তে অন্ধকার চারদিক থেকে ঘিরে ধরছে। আমি ইচ্ছে করেই দেরি করছি। যেন দিদিকে বলে আসা বিষয়টা দিদির মাথা থেকে চলে যায়। আর দেরি করা ঠিক হবে না ভেবে ভেলাটা তীরের দিকে বাইতে শুরু করি। দূর থেকে কে যেন ‘নিখিলেশ’ নাম ধরে ডাক দেয়। আমি ফিরে তাকাই না। আমি জানি ওটা ভ্রম ছিল। একটু এগোতেই কারো কান্নার শব্দ পাই। কেউ যেন ইনিয়ে বানিয়ে কাঁদছে আর ‘নিখিলেশ আমাকে নিয়ে যা’ বলে ডাকছে। আমি জানি আমার ফিরে তাকানো মানেই সর্বনাশ ডেকে আনা। ওই ফাঁদে পা দিয়ে নকখোলার বিলে কত তাজা প্রাণ নিমিশে স্মৃতি হয়ে গেছে, তা কারো অজানা নয়। নকখোলার বিলের মাঝে মাঝে খুঁটিতে সতর্কবাণী লেখা আছে—কেউ ডাকলে পিছন ফিরে তাকানো যাবে না। বিগত দুই বছরে কেউ এই ভুলটা করেনি। তাই নকখোলার বিল কারো পরিবারে কান্নার কারণ হয়ে উঠেনি। পিছন থেকে যতই ডাক আসুক, আমি ভুলেও সেই ডাকে সাড়া দেব না।

পিছনের সেই মায়াবী ডাক উপেক্ষা করে ভেলাটা তীরে নিয়ে আসি। যেখান থেকে ভেলাটা নিয়েছিলাম, সেখানে রাখা হয়নি। ভেলার মালিক ভেলাটা জায়গা মতো না পেয়ে মরিয়া হয়ে খুঁজবে আর গালিগালাজ করবে। তা করুক! আমি তো আর সেই গালি শুনছি না। ভেলাটাকে খুটায় বেঁধে রেখে হাঁটতে থাকি বাড়ির দিকে। আমার সাহসের কোনো অভাব নেই, তার পরও পিছন ফিরে তাকাইনি একটি বারও। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, জীবনের উপর যেদিন বিতৃষ্ণা এসে যাবে, সেদিন সন্ধ্যায় নকখোলার বিলে যাব একাকী। তার পর যতদূর চোখ যায় ভেলা নিয়ে ভেসে বেড়াব। কেউ পিছন থেকে ডাকলে ফিরে তাকাব। সেদিন কোনো পিছুটান থাকবে না আমার, সব মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে চলে গেলেও আমার জন্যে কারো চোখে জল ঝরবে না। বাবা-মা-দিদি ছাড়া কাঁদার মতো এ ভুবনে আমার আর কেইবা আছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবনটা বেশ আনন্দের। বর্ষার দিন গাঁয়ের রাস্তায় হাঁটুজল থাকে, আর গ্রীষ্মের সময় সেখানে ধুলোর আস্তরণ চোখে পড়ে। কাদামাটি আর ধুলোর রাজ্যে আমাদের বসবাস। কখনো খেয়ে থাকি, কখনো না খেয়ে থাকি তাতে কিছু আসে যায় না, কিন্তু আমাদের নিত্যদিন ধুলোর সঙ্গে মাখামাখি থাকেই। কত রাত হয়েছে বোঝা যাচ্ছে না। ইচ্ছে করেই দেরি করে ফিরছি। এতক্ষণে সবাই হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। সুষমাদির বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম তার ঘরে বাতি জ্বলছে। মনে হলো একবার দেখা করে যাই। যেহেতু বাতি জ্বলছে, তার মানে সে জেগেই আছে। আমি দরজায় কড়া নাড়তেই ‘কে কে’ বলে কথা বলে উঠল সে। আমি নাম বলতেই খুট করে দরজাটা খুলে গেল। তার মুখটা হাসি হাসি। আমার হাত ধরে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল। বিছানায় বেঘোরে ঘুমোচ্ছে সুকন্যা। সে কেন ঘুমায়নি বুঝতে পারিনি। সে কি ভেবে রেখেছিল আমি আসব? তার অমলিন হাসিমুখ, দীঘল কালো চুলের সৌন্দর্য পেরিয়ে আমার চোখ দুটো আটকে আছে পরনের নতুন শাড়িটার দিকে। দিদি সত্যি সত্যিই তাকে একটা শাড়ি আর ব্লাউজ দিয়ে গেছে, যা সুষমাদি পরে আছে। আমার যেন কী হয়ে গেছে আমি জানি না। সে ভাত বেড়ে দিলে আমি অপলক তার দিকে তাকিয়ে খেতে শুরু করি। একবারও মনে হয়নি, আমি কেন এই রাতে একাকী তার ঘরে বসে তার বেড়ে দেওয়া ভাত খাব। তার যেন খাওয়াতেই আনন্দ। খাওয়া শেষে মুখ হাত মুছব বলে আমি যখন গামছা খুঁজছি, সে তখন এগিয়ে দিল। মুখ মুছে ফেরত দিতে গিয়ে খেয়াল হলো সেটা গামছা ছিল না, সেটা ছিল সুষমাদির পরনের শাড়ির আঁচল। সেও হয়তো তা খেয়াল করেনি আগে। যখন টের পেল, সে যেন লজ্জায় লাল হয়ে গেল।

আমি বেরিয়ে গেলাম বাড়ির পথে। মনে মনে দিদিকে কৃতজ্ঞতা জানালাম। উঠোনে পা রাখতেই টের পেলাম মা ঘুমায়নি। সে নিশ্চয় এখনো না খেয়েই আছে। গলা খাঁকারি দিতেই মা দরজা খুলে বেরিয়ে এল। আমি আগে কখনো এরকম রাত করে বাড়ি ফিরিনি। সে আমাকে রান্নাঘরে নিয়ে পাটি পেতে দিল, নিজ হাতে ভাত মেখে মুখে তুলে দিল। একটু আগেই আমি যে খেয়ে এসেছি তার পরও খাওয়ার অভিনয় করতে হলো। মাকে কষ্ট দিতে মন চাইছে না। আমি বললাম, ‘মা তুমিও খেয়ে নাও।’ মায়ের খাওয়া হয় খুব কমই। দিদি ঘুমিয়েছে কি না জানতে চাই। ঘুমোতে যাওয়ার আগে খোলা জানালা দিয়ে দেখি দিদির মুখটি। অসম্ভব সারল্যভরা সেই মুখটির প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ে। আকাশ থেকে অবিরাম ঝরে পড়া জোছনা পুকুরের পানিতে রহস্যময়তা সৃষ্টি করে রেখেছে। সেদিকে তাকিয়ে কত কিছু মনে পড়ছে। জীবনটা বড়ই বৈচিত্র্যময়।

 

১০

অনেক চেষ্টা করে শেষে চার লাইনের একটা কবিতা লিখতে পেরেছিলাম। কানাই লাল স্যারের বাড়িতে রেখে আসা ঢালুন আনতে গিয়ে যে চাঁদ মুখ দেখেছিলাম, সেটা চোখে লেগে আছে। ফিরে আসার সময় খোলা জানালায় চন্দ্রমুখীর মতো বাঁকা হাসি নিয়ে সে যে ইঙ্গিত দিয়েছিল তাতে প্রেম ছিল, সুখ ছিল, আর ছিল স্বপ্নের সিঁড়ি। সুকন্যার অসুখের খোঁজ নেওয়া, বাজার থেকে ওর জন্যে আনা দুই টুকরা সন্দেশ, বাড়িতে বাবা-মা-দিদি ফিরে এসেছে সেই চিন্তা আর হাতে বাজারের ব্যাগের চিন্তাকে পাশ কাটিয়ে কখন যেন তাই ক্ষণিকের জন্যে উদয় হওয়া চাঁদ হাসি প্রাধান্য পায় আমার কাছে। দিদির হাতে বাজারের ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে মাকে বলে সুকন্যার জন্যে আনা দুই টুকরো সন্দেশ দিতে সুষমাদির বাড়িতে পা রাখি। মনটা চঞ্চল হয়ে ওঠে, সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে ইচ্ছে করে না। সুকন্যার হাতে সন্দেশ দুটো ধরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। প্রথমে রাস্তায় কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করি মাথা শান্ত করার জন্যে, কিন্তু কোনো কিছুই ভাবতে পারি না।

সন্ধ্যার অন্ধকার তখন চারদিক থেকে ধেয়ে এসেছে। হাঁটতে হাঁটতে কানাই লাল স্যারের বাড়ি পর্যন্ত চলে যাই। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি রাস্তায়। আমার চোখ দুটো কী যেন খুঁজছে, কাকে যেন খুঁজে মরছে। দৃষ্টি আপনাআপনি চলে যায় কানাই লাল স্যারের ঘরের জানালায়। একটু আগে যে জানালায় অবিরাম হাসিমুখ ছিল, আর ছিল রহস্যময় চাহনির পাশাপাশি বাঁকা হাসি। এখন সেই জানালা বন্ধ। পাটকাঠির বেড়ার ফাঁক গলে ক্ষীণ আলো ঠিকরে বেরিয়ে এলেও সেই অমলিন হাসিমুখ আর দেখা হয়ে ওঠে না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভাবতে থাকি, কোন উছিলা নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢোকা যায়। মনে পড়তেই ছুটে যাই বাড়িতে। টেবিল থেকে একটা বই আর খাতা নিয়ে আবার ছুটি হাসিমুখের খোঁজে। উপরে দেখাই পড়া বুঝতে যাচ্ছি। কানাই লাল স্যারের উঠোনে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলি, ‘স্যার বাড়িতে আছেন?’ স্যারের কোনো উত্তর পাই না। উত্তর আসে কাকিমার কাছ থেকে। স্যারের হাঁপানিটা হঠাত্ বেড়েছে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তাই বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছে। কাকিমা ঘরের ভিতরে যেতে বলায় স্যারের পাশে গিয়ে বসি। মাথায় হাত বুলিয়ে দিই সে পরম আনন্দ পায়। আমার হাতে বই দেখে তার চোখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস নিয়ে স্যার বলেন, ‘তুই পড়তে এসেছিস, আর দেখ আজই আমি অসুখে পড়েছি। অসুখটা তেমন কঠিন কিছু না। যেকোনো সময় ঠিক হয়ে যাবে। তুই বরং কাল আসিস।’ মনে মনে বলি, ওহে নিখিলেশ তোমার অপেক্ষা বাড়ল আরো। চলে যাওয়ার কথা মুখ দিয়ে না বলা পযর্ন্ত নড়ব না বলে পণ করে বসে থাকি। এটা ওটা বলে স্যারের সঙ্গে কথা চালিয়ে যেতে থাকি। উদ্দেশ্য একটাই, যদি তব দেখা পাই হে প্রিয়ে। কিন্তু সে আর আসে না। তার হাসির শব্দ শুনি, পাটকাঠির বেড়ার ফাঁক গলে অন্য রুম থেকে আলো এসে ঠিকরে পড়ছে সঙ্গে বয়ে আনছে সেই হাসি, যে হাসিতে খুন হতে হয় অবিরাম। কিন্তু কতক্ষণ আর বসে থাকা যায়, কাকিমা বললেন, ‘রাত অনেক হয়েছে এবার বাড়ি যা, কাল আসিস।’ নিরাসক্ত মুখে আমি উঠে দাঁড়াই। পা চলতে চায় না। মনে হয় জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। যদি একবার জানালা খুলে যায়, ভেসে ওঠে সেই মুখ।

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে পথ কেটে এগিয়ে যেতে থাকি। পিছনে পড়ে থাকে কানাই লাল স্যারের বাড়ি, দোচালা টিনের ঘর, আর দক্ষিণের জানালা। বার কয়েক ফিরে তাকাই। কিন্তু সেখানে আমার হা-হুতাশ ছাড়া কিছু দেখতে পাই না। রাতে খাবারের পর চোখে আর ঘুম আসে না। কেবলই মনে পড়ে ক্ষণিক দেখা একটি মুখের ছবি। ঘুমোতে যাওয়ার আগে ডায়েরির পাতায় জমে ওঠে চার লাইনের একটি কবিতা, আত্মপ্রকাশ ঘটে এক কবির। সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে জেগে উঠি। আমার টেবিলের সামনে যে টুলটা পাতা আছে, সেখানে বসে আছেন কানাই লাল স্যার। আমি প্রণাম জানিয়ে কখন এসেছেন সেটা জানতে চাই। তার শরীর এখন কেমন সেটাও প্রশ্ন করতে ভুলি না। স্যার হাসি মুখে জানান, তিনি ভালো আছেন এবং হাঁপানি আর নেই এখন। গত দিন বেশ হাঁটাহাঁটি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে হাঁপানিটা বেড়েছিল। বলেন, ‘কাল তুই বই নিয়ে আশা করে কিছু একটা পড়া বুঝতে গিয়েছিলি, আমি তোকে দেখাতে পারিনি বলে খারাপ লাগছিল। তাই ভাবলাম, যাই তোর পড়াটা দেখিয়ে দিয়ে আসি।’ আমি আমতা আমতা করতে থাকি। পড়ার নামে আমার তো চাঁদমুখ দেখার শখ ছিল, কিন্তু সব ভেস্তে গেল। হাতমুখ ধুয়ে এসে অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্যারের কাছে একটা দুটো অধ্যায় বুঝে নিই। মন পড়ে থাকে কানাই লাল স্যারের দোচালা টিনের ঘরের দক্ষিণ জানালায়। ভাবতে থাকি এখন তবে কী উপায় করা যায়। পড়া শেষে স্যার যখন বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করেছেন, আমিও পাশে গিয়ে হাঁটি। বলি, ‘স্যার আপনি কষ্ট করে এলেন, আমি আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’ স্যার আমার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন যেন একজীবনে তিনি কোনো দিন আমার মতো কোনো শিক্ষাগুরু ভক্ত ছাত্র দেখেননি। স্যার ধীরে ধীরে পা চালান। আমার মনে হয়, আমি যেন খরগোশ-কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতায় আছি। চলতি পথে কত শত কথা হয়, যার সবটাই হয় পড়াশোনা নিয়ে। ইচ্ছায় অনিচ্ছায় জেনে না জেনে সেগুলোর উত্তর দিতে থাকি, আর ভাবি, আর কত দূর। যখন চোখের সামনে আবছাভাবে ভেসে ওঠে স্যারের দোচালা ঘর, তখন মনের মধ্যে ফাগুনের হাওয়া বইতে শুরু হয়। মুখে যেন হাসির ফোয়ারা বয়ে যায়। আর তো কিছুটা সময়, তার পর দিনের আলোতেই দেখা হবে চাঁদমুখ। যে মুখের হাসির সামনে বিমলিন হয়ে যায় তিনশ তেত্রিশটা পূর্ণচন্দ্র আর নিরানব্বইটা সূর্য। স্যার কি বুঝতে পেরেছিলেন আমার মনের কথাটা? অবশ্য না বুঝারও কোনো কারণ ছিল না। আমার ইতিউতি চাহনি, আমার ছটফটানির মধ্যেই তো অনেক কিছু ছিল।

কোনো একদিন হয়তো আমারই মতো কানাই লাল স্যারও কারো না কারো জন্যে এমনই ভাবে ছটফট করেছিলেন, তা কে জানে। স্যারর উঠোনে পা রাখতেই কাকিমা জানালেন আরেকটু আগে আসতে পারতেন! মেয়েটা চলে গেল বাবার সঙ্গে কথাও বলে যেতে পারল না। ঠিক সেই সময় আমার মুখের দিকে তাকালে যে কেউ বলে দিতে পারত আমি বুঝি সদ্য রাজ্যহীন কোনো রাজা। বুকের মধ্যে কোথায় যেন চিনচিন ব্যথা অনুভব করলাম। যে চাঁদ দিগন্তের কাছে পূর্ণ আভা নিয়ে সমুজ্জ্বল ছিল সে আর নেই। যেন হ্যালির ধূমকেতুর মতো দেখা দিয়ে আজীবনের মতো হারিয়ে গেছে। এক জীবনে মানুষের ভাগ্যে দুবার হ্যালির ধূমকেতু দেখার সৌভাগ্য হয় না, আমারও কি তাই? উঠোনটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, সেই সঙ্গে বাড়িটাও। কেমন যেন শশ্মানের মতো নির্জন মনে হচ্ছে, অথচ আমার সামনে কাকিমা আছে, কানাই লাল স্যারও আছেন। আমাকে একটা টুল দিয়ে কাকিমা বসতে বললেন। কিন্তু আমার আর বসে লাভ কী! ‘যে জীবন ঘাসফড়িংয়ের, শালিকের, দোয়েলের সে জীবন হয় নাকো দেখা।’ টুলটা সামনে শূন্যই পড়ে থাকে। টুলের ওপর রাখা সদ্য কাকিমার এনে দেওয়া নাড়ু-চিড়ে আমাকে টানে না। যেন লাটাই থেকে সুতো ছিঁড়ে ঘুড়িটা দূর নীলিমায় হারিয়ে গেছে, আর আমি শূন্য লাটাই হাতে বসে আছি। জীবনটা আনন্দের চেয়ে বেদনার রং দিয়েই বেশিটা সাজানো। যে সাজিয়েছে তার মনেও কি বেদনা ছিল? নাহ সে তো আনন্দ-বেদনার বহু ঊর্ধ্বে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটা নাড়ু মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। দুই চোখে শূন্যতা নিয়ে যে দিকে তাকাই আমাকে নিরাশা গ্রাস করে নিতে থাকে। আকাশ, বাতাস, এই শান্ত নদীর স্বচ্ছ জল, হিজল, তলাম, লতাগুল্ম কোনো কিছুই আর আমাকে টানে না। হঠাত্ মনে হয়, নকখোলার বিল আমাকে ডাকছে, আমাকে সেখানেই ছুটে যেতে হবে। যেতে যেতে বুক পকেটে হাত রাখি। সেখানে চার ভাঁজ করা যে কাগজটি আছে, তার মাঝে বহু যত্ন করে চার লাইনের একটা কবিতা লেখা হয়েছিল। কবিতা কারো শোনা হয়ে ওঠার আগেই মরে গেল, সেই সঙ্গে বুঝিবা কবিরও মৃত্যু হলো। বুক পকেট থেকে ভাঁজ করা কবিতাটি বের করে চোখের সামনে মেলে ধরি, ঘোলাটে হয়ে আসে চোখের সামনে মেলে ধরা কাগজটি। চোখে সম্ভবত কিছু একটা পড়েছিল তাই জল টলমল করে ওঠে। আমি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে জলটুকু মুছে ফেলি।

হাঁটতে হাঁটতে অজানার পথে বিরামহীন হেঁটে চলেছি। এ চলার যেন শেষ নেই। নকখোলার বিলের কথা বেশ মনে পড়ে যায়। সে যেন দূর থেকে আমাকে ডাকছে তার নীল ঘোলা জলে ভেলায় ভেসে যেতে। আমি হাঁটতে হাঁটতে বিলের ধারে চলে যাই। আগের দিন যেখান থেকে ভেলা নিয়েছিলাম আজ আর সেখানে কোনো ভেলা বাঁধা নেই। ভেলার মালিক হয়তো সেদিন খুঁজে না পেয়ে অনেক গালিগালাজ করেছিল। একটু খুঁজে পেতেই একটা ভেলা চোখে পড়ল। খুটায় বাঁধা রশিটা খুলে ভাসিয়ে দিলাম ভেলা। আজ আর কোনো পিছুটান নেই। যতদূর চোখ যায় ভেসে যাব। কোনো দিন যে হিজলতলায় কেউ যেতে সাহস করেনি, আজ সেখানেও যেতে আমার কোনো বাঁধা নেই। যে হাসির রেখা অজান্তেই মিলিয়ে গেছে, সে হাসি আর কোনো দিন ফিরে আসবে কি না জানি না। কোথাও কোনো জনমানুষের চিহ্ন নেই। সবাই যে যার বাড়িতে ফিরে গেছে। ভেলায় ভাসতে ভাসতে একসময় হিজলতলা চলে যাই। যে হিজল গাছটি নিয়ে কত না গল্প আছে। কেউ কোনো দিন হিজলতলায় ভুলেও যায় না। সেখান থেকে কারো ফিরে আসার কোনো নজির নেই। আমি দিব্বি সেখানে এসে আমার ভেলাটা থামিয়েছি। আশ্চর্য রকম স্বচ্ছ সেই পানি। মনে হয় নিচে কোনো মাটি নেই। কোনো একটা কাচের পাতিলের মধ্যে স্বচ্ছ পানি রাখা, আর আমি সেই পানিতে ভেলা ভাসিয়ে রেখেছি। পকেট থেকে ভাঁজ করা কবিতার কাগজটি বের করে ছেলেবেলার মতো করে নৌকা বানাই। ভাসিয়ে দিই হিজলতলার সেই স্বচ্ছ জলে।

কাগজের নৌকাটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি যতই পানিতে ঢেউ তুলে সেটা সরিয়ে দিতে চাই, সে সরে না। যাকে দেওয়ার ছিল তাকেই দিতে পারিনি বলেই কিনা জানি না কবিতাটি হিজলতলার জলও গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। যাকে ভাসিয়ে দিয়েছি, তাকে আর ফিরিয়ে লাভ নেই। অনাদি অনন্তকাল সে ভেসে থাক তার মতো করে। কিংবা ভেসে যাক মন যেদিকে চায়। রাত হয়ে গেছে বেশ আগে। কোথাও কোনো আলো নেই। কিছু জোনাকি মিটমিট করে জ্বলছে, সেই সঙ্গে আকাশে জ্বলে আছে পূর্ণ চাঁদ তাকে ঘিরে আছে অগণিত তারা। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, কেউ আমাকে ডাকছে না। আমি ভেলাটা ভাসিয়ে নিয়ে তীরের দিকে বাইতে থাকি, কিন্তু তার পরও কেউ পিছু ডাকে না। যে মায়াবিনীর ডাকে সাড়া দিয়ে চিরকালের মতো স্মৃতি হয়ে গেছে অনেক মানুষ এই নকখোলার বিলে, সেই মায়াবিনীও কি তবে নিখিলেশকে ত্যাগ করেছে। নিখিলেশ কি তবে এতটাই অচ্ছুত্!

ভেলা তীরের দিকে বাইতে বাইতে কতবার যে পিছনে ফিরে তাকিয়েছি তার ঠিক নেই। যতদূর চোখ গেছে শুধু ঘোলা জল আর জ্বলে থাকা জোনাকি ছাড়া কিছু চোখে পড়েনি। কবিতার সেই কাগজের নৌকাটি হয়তো এখনো অবিরাম আমারই মতো ভেসে আছে হিজলতলার স্বচ্ছ জলে। তীর খুঁজে পেতে ভেলা থেকে নেমে বাড়ির পথে হাঁটছি। আমার সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে চলেছে আকাশের মস্ত চাঁদ। সে কি তবে আমাকে পাহারা দিচ্ছে? কার ভয়ে পাহারা দিতে হবে আমাকে?

 

 

১১

সকাল থেকে মাকে দেখিনি। কোথায় গেছে তা আমাকে বলে যায়নি। তার ঘরে তালা লাগানো। মাকে খুঁজতেই হোক আর এমনিই হোক আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি। যখন সুষমাদির বাড়ির কাছাকাছি এসেছি তখন সানাইয়ের সুর আমার কানে এসে শুল হয়ে বিঁধল। ও বাড়িতে সানাইয়ের সুর বাজা মানে একমাত্র সুষমাদিরই বিয়ের সানাই হবে, এটা বুঝতে বাকি থাকে না। বাড়িতে দুটো মাত্র প্রাণ। তিন বছরের সুকন্যা আর সুষমাদি। তবে কি সুষমাদির বিয়ে হচ্ছে? কার সঙ্গে হচ্ছে, কেন হচ্ছে? এত দিন যে মানুষটি বিয়ে করেনি এখন কেন করতে হচ্ছে। বাবা মারা যাওয়ার পর দুনিয়াতে একমাত্র মেয়ে ছাড়া সুষমাদির আর কেউ ছিল না। মেয়ে ও নিজের বেঁচে থাকার জন্যে তাকে কাজ করতে হতো। মানুষের দৃষ্টিতে সে রোজ খুন হতো। তার বাবা বেঁচে থাকতেও তার বিয়ে নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু বৃদ্ধ বাবার কথা চিন্তা করে সে রাজি হয়নি। কাঁপাকাঁপা পায়ে সুষমাদির বাড়ির উঠোনে পা রাখি। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বুঝতে চেষ্টা করি। এর মাঝে সাজুগুজু করে সুষমাদি বেরিয়ে আসে। তার পাশে আমার মাও ছিল। আমি হতবাক হয়ে যাই। বুঝতে বাকি থাকে না কিছু। একবার সুষমাদি সম্ভবত আমার দিকে তাকিয়েছিল আড়চোখে। সে চোখের দৃষ্টি যেন আমাকে খুন করতে চায়। আমি বেরিয়ে যাই। আমি হাঁটছি দিগন্তের পথে। কোথায় যাচ্ছি তার ঠিক নেই। হয়তো এই যাওয়ার কোনো শেষ নেই। হয়তো এই পথ চিরকালের মতো অচেনা হতে চলেছে।

কানাই লাল স্যারের ঘরের যে জানালায় আমার চোখ কারো হাসিমুখ খুঁজে ফিরত, সেই জানালাটাও হয়তো খোলাই ছিল। কিন্তু আমার পোড়া চোখ সেদিকে ভুলেও একবার তাকাল না। পথে যেতে যেতে কত জনের সঙ্গে দেখা হলো। তারা হয়তো আমার চোখে বিষণ্নতা দেখেছিল, দেখেছিল কোনো এক গভীর শূন্যতা। আমার হাত ধরে দু-একজন থামিয়ে কুশলাদি জানতে চেয়েছিল, আমি বলেছি ভালো আছি। কিংবা ভালো থাকার অবিরাম অভিনয় করে চলেছি। হাঁটতে হাঁটতে নবগঙ্গা নদীর ধার ধরে কত দূর গিয়েছি জানি না। আমি এতটা দূরে যেতে চাইছি, যেখানে সানাইয়ের সুর নেই, মেহেদির রং নেই, কাজল কালো হরিণী চোখে তাকিয়ে কেউ আমাকে খুন করবে না। অনেক আগেই আমি সেই দূরত্ব অতিক্রম করে এসেছি। কিন্তু পোড়া চোখের পাতায় ভেসে আসছে কপালে লাল টিপ, আলতা রাঙা পা, শাঁখা-সিঁদুরের ছবি। কানে অবিরাম বেজে চলেছে সানাইয়ের সুর। একটা ছোট্ট মাটির ঢিলাকেও অসহ্য লাগছে। পথ থেকে সেই ঢিলাটা কুড়িয়ে ছুড়ে মারছি নবগঙ্গার জলে। জল ছিটকে পড়ছে চার দিকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি সে আকাশে কোনো মেঘ নেই, সে আকাশে উজ্জ্বল সূর্য যেন সবটুকু তেজ ঢেলে দিয়ে আমাকে পোড়াতে চায়। যদি ঢিল ছুড়ে আকাশাকে ছোঁয়া যেত, তবে একটা ঢিল ছুড়ে আকাশের বুকটা ছিন্নভিন্ন করে দিতাম। কেন আজ তার চোখে জল নেই, কেন সে কান্নার বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে না আজ। এক নিখিলেশ কেন অবিরাম অভিমানে জ্বলতে থাকবে!

আজ বোধহয় আমার সেই দিন। আজও কি তবে নকখোলার বিল আমাকে আশ্রয় দেবে না? সেও কি সবার মতো আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। সুষমাদির বাড়িতে যে সানাইয়ের সুর বাজছে, সে বড়ই করুণ মনে হয় আমার কাছে। এর চেয়ে ভালো ছিল বধিরতা, তাহলে সেই সুর শুনতে হতো না কোনো দিন। এর চেয়ে ভালো ছিল অন্ধ হওয়া, তাহলে দেখতে হতো না সেই আলতা রাঙা পা, কপালের লাল টিপ, বেনারসিতে জড়ানো চিরচেনা মুখখানি।

মায়ের কথা মনে পড়ছে খুব, সেই সঙ্গে দিদির কথাও। এই যে আমি হাঁটছি নকখোলার বিলের দিকে, এ আমার অনন্তের পথে হেঁটে যাওয়া। এই পথ কিছুক্ষণের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে। হয়তো কোনো দিন শোনা হবে না দিদির আদুরে ডাক, মায়ের স্নেহ মাখা বুলি। বাবা গঞ্জ থেকে ফিরে এসে যখন ‘নিখিলেশ’ বলে ডাক দিবে, তখন কেবল শূন্যতা ছাড়া আর কিছু ফিরে আসবে না। ঘরখানা আজীবনের মতো শূন্য হয়ে পড়ে থাকবে। কিন্তু যে মায়াবিনীর ডাক শুনতে আজ ছুটে চলেছি নকখোলার বিলের দিকে সে কি তবে সেদিনের মতোই নিরব থাকবে, যেদিন আকাশে পূর্ণ চাঁদ ছিল আর ছিল শত কোটি তারার মেলা। সেই জোছনার আলোয় চারদিক ছিল আলোকিত।

ভেলা নিয়ে হিজলতলা পেরিয়ে সপ্তসিন্ধু নামে যে জায়গাটি ছিল সেটিও পেরিয়ে এসেছি। আজও সেদিনের মতো ভরা জোছনা চারদিক আলোকিত করে রেখেছে। বিলের জলে ভেলা ভাসানোর আগেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। সানাইয়ের সুর থেমে গেছে সেই কবে, কিন্তু আমার কানে সেটা বেজে চলেছে অবিরাম। সে যেন আমাকে শোনাতেই ব্যস্ত। যে মুখ প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা আমার সামনে ভেসে উঠত গোচরে অগোচরে সে এখন অতি দূর নক্ষত্রের পথে আজীবনের মতো হারিয়ে গেছে। যাওয়ার বেলায় তার সঙ্গে কথা হয়নি, হয়তো আর কোনো দিন সেই চিরচেনা কণ্ঠটি শোনা হবে না।

দ্বিতীয়বারের মতো নকখোলার বিলের মায়াবিনী আমার সঙ্গে ছলনা করল। সারা রাত বিলের পানিতে ভেলা ভাসিয়ে বেড়ানোর পরও সে একটিবারের জন্যেও আমাকে ডাকল না। কেন ডাকল না কে জানে! কেবলই মনে হতে লাগল, মানুষ যা বলেছিল সব ভুল ছিল, সব ছিল রটনা। এই ঘোলা জলের নকখোলার বিল, দূরে হিজলতলার স্বচ্ছ পানি, কারো সঙ্গে প্রতারণা করেনি কখনো। মানুষ বিনা দোষে কলঙ্ক তিলক পরিয়ে রেখেছে যুগের পর যুগ।

কারো একজনের ধাক্কায় ঘুম ভাঙতেই ধড়ফড়িয়ে উঠি। ভেলার উপরই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভেলাটা ভাসতে ভাসতে তীরে এসে থেমে গেছে। কিন্তু বিলেতো কোনো স্রোত নেই। আর যতদূর মনে পড়ে আমি তো বিলের মাঝামাঝিতেই ছিলাম যতক্ষণ জেগে ছিলাম। কখন ঘুমিয়েছি, কীভাবে তীরে এসেছি তা জানা হয়নি। যে আমাকে ধাক্কা দিয়েছে, তাকে আমি চিনি না। সম্ভবত অন্য কোনো গাঁয়ের লোক সে। তবে সে ছিল ভেলাটির মালিক। তার কথাতে বুঝলাম সে যেখানে ভেলাটি রেখেছিল সেখানে না পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে এদিকে এসে পেয়ে গেছে। সারা রাত আমি ভেলাতে ভেসে কাটিয়ে দিয়েছি শুনে তার যেন বিস্ময়ের সীমা নেই। আমি জানি সে চারদিক রটিয়ে দেবে। এও জানি সে যেহেতু আমাকে চেনে না তাই যাই বলে বেড়াক তাতে কারো কিছু আসে যায় না। হয়তো যুগের পর যুগ নকখোলার বিল নিয়ে মানুষের যে ভ্রান্ত ধারণাা ছিল, সেটার মতোই আরো নতুন কোনো ভ্রান্ত ধারণার জন্ম নেবে।

বেলা হয়ে এসেছে। সারা রাত বাড়িতে ফিরিনি দেখে বাবা-মা হয়তো চারদিকে খোঁজ নিয়েছে। যে বিল আমাকে ধরে রাখতে পারেনি, ফিরিয়ে দিয়েছে বারবার, সে জীবন বিলিয়ে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। আমি ফিরে যাই মায়ের কোলে, নিজ বাড়িতে। সুষমাদির বাড়ির কাছে যেতেই দেখতে পাই, একদল লোক গরুর গাড়ি থামিয়ে বাড়িটি ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। জানতে পারি, বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটি বিক্রি করে দিয়ে গেছে সুষমাদি। কত সহজেই মায়ার বাঁধন মানুষ ছিন্ন করতে পারে তা ভেবে বিষণ্ন হয়ে পড়ি। এ ভবসংসারে কেবল একজন নিখিলেশ মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বাড়িতে ফেরার পর মা-বাবা বুকে জড়িয়ে ধরে যে আদর করেছিল, তাতে মনে হয়েছিল হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে তারা ফিরে পেয়েছে। বারান্দায় পাটি পেতে মায়ের পাশে বসে থাকি নীরবে। শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকি পথটার দিকে। যে পথে কোনো দিন ফিরে আসবে না বাঁধন ছিন্ন করে যে চলে গেছে।

 

১২

বলাই নেই তিন বছর হতে চলল। এই তিনবছরে জীবনের রং পাল্টেছে বহুবার। সে চোখের আড়াল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনেরও আড়াল হতে চলেছে। বলাইয়ের সঙ্গে আমার কত হাসি কান্নার স্মৃতি মিশে আছে। একসঙ্গে স্কুল-কলেজ যাওয়া, নকখোলার বিলে ভেলায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো, আরো কত কী। সেই বলাই এখন আর নেই। ভাগ্যের সন্ধানে সে তার বাপের শেষ সম্বল চাষের জমিটুকু বিক্রি করে মালদ্বীপ গেছে। তিন বছর হয়ে গেছে, কিন্তু বলাইয়ের কোনো খোঁজ পাইনি। প্রথম দিকে সে কিছু কিছু টাকা পাঠাত তার পর তাও বন্ধ হয়ে গেছে। বলাইয়ের বাবা-মা একমাত্র ছেলের জন্যে পাগলপ্রায়। তাদের একটাই চাওয়া ছেলেটা ভালোভাবে দেশে ফিরে আসুক। বলাইয়ের কী হয়েছে তা আমার জানা নেই। মাঝে মাঝে মনে হতো সে বুঝি ইচ্ছে করেই আড়াল হয়ে গেছে, ইচ্ছে করেই হারিয়ে গেছে। যতই ঘৃণা করি না কেন বিদেশ যাওয়ার সময় তার সঙ্গে শেষ দেখাটা করতে ভুলিনি। আমি কিছু বলার আগে স্বভাবমতো সে বলেছিল, এই দেশে, এই গাঁয়ে থেকে আর কী হবে? যেখানে দু মুঠো ভাত জোটে না, ঘুমানোর জন্যে ঘর জোটে না, সেখানে আর থাকতে চাই না। ওর অভিমানী কথায় মনটা ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু যে খোঁচা দিতে শিখেছে, সে খোঁচা না দিয়ে কথা বলার মানুষ না। যেতে যেতেও সে জ্বালিয়ে যায় তার অনলে। আক্ষেপ করে বলেছিল, ‘তোমার খোলা চুল, স্নিগ্ধ হাসি/বড় মায়া কাড়া, বড় ভালোবাসি।’ আমি জানি সে মনে মনে সুষমাদিকে ভালোবাসত। সুষমাদির একাকীত্ব তাকে ভাবাত এবং তার দৃষ্টি সারাক্ষণ সুষমাদিকে খুঁজত। যেতে যেতে তাই তার কণ্ঠে আক্ষেপ ঝরে পড়ে। যে বাতাসে আর কোনো দিন সুষমার খোলা চুল উড়বে না, যে পুকুরে সে আর কোনো দিন অবাধ সাঁতারে মেতে উঠবে না, যে পথে কোনো দিন সে হাঁটবে না, সে বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে আমার কষ্ট হয়, সে পুকুরে সাঁতার কাটতে আমার বিষাদ লাগে, সেই পথে হেঁটে যেতে আমার ক্লান্তি লাগে।

বলাইয়ের মনে যে ভালোবাসা জন্মেছিল তার কারণে সে কোনো দিন সুষমাদিকে দিদি বলে ডাকেনি। তিন বছরের ছোট ছিল বলাই। সুষমাদির বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বলাইকে ছন্নছাড়ার মতো ঘুরে বেড়াতে দেখতাম। কলেজে যেত না ঠিকমতো। তার পর একদিন কোনো ভূত ঘাড়ে চেপে বসল, সে দেশান্তরী হবে। সেই যে সে দেশান্তরী হলো এখন আর তাকে খুঁজে পাই না। নকখোলার বিলের পানিতে পানকৌড়ি ভেসে বেড়ায়, ভেলায় চড়ে কত বিকেল পার করে দিই, শুধু ভেলার অন্য প্রান্তে বলাই নেই। হয়তো কোনো দিনও তাকে আর ভেলার অন্য প্রান্তে খুঁজে পাব না।

পড়াশোনার পাট চুকিয়ে কানাই লাল স্যারের চেষ্টায় অম্বিকাপুর হাইস্কুলে চাকরি পেয়ে গেলাম। দিদির বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বাড়িতে মানুষ কমে গেল, সেই সঙ্গে খরচও কমল কিছুটা। কিন্তু সারাদিন মায়ের কথা বলার মতো মানুষের খুব অভাব ছিল। দিদি থাকতে মা সারাদিন দিদির সঙ্গে গল্প করত। দিদির বিয়ের পর কিছুদিন সুষমাদির সঙ্গে গল্প হতো। এর পর আমি চাকরি পাওয়ায় সংসারে সুখ আসতে শুরু করেছে। বাবাকে পরিশ্রম কমিয়ে দিতে বলেছি। গোপিনাথপুর থেকে একটা ভালো সম্বন্ধ এসেছিল আমার জন্যে। বাবা, মা, দিদি, জামাইবাবু সবাই মিলে কনে দেখে এসে জানাল তাদের বেশ পছন্দ মেয়েটিকে। আমি আর অমত করিনি বড়দের কথায়।

বিয়েতে বলাই ছাড়া আর সবাই ছিল। অনিমেষ ছিল, পঙ্কজ ছিল, নিমাই ছিল, শুধু বলাই ছিল না। তার থাকার কথাও না। সে তো দূর বিদেশে দেশান্তরী হয়েছে। বাসর রাতে বিছানায় ঘোমটা মাথায় যে আমার জন্যে অপেক্ষায় ছিল তাকে প্রথমবার দেখেই চমকে উঠেছি। তার গলার স্বর আমার চেনা, তার হাসিটাও আমার চেনা। শরীর থেকে যে মিষ্টি সুবাশ ছড়িয়ে পড়ছিল সেটাও যেন আমার চেনা। ঘোমটার আড়ালে যেন অতি পরিচিত কারো মুখ লুকিয়ে রাখা। সেই মুখটা কার? জানালায় অবিরাম হাসি মুখের সেই আলো-ছায়ার রানি নাকি অন্য কেউ যার অবাধ সাঁতারের মধ্যে কেউ কেউ খুঁজে পেত পৃথিবীর তিন ভাগ সৌন্দর্য। ঘোমটা সরাতেই যেন তেত্রিশটা সূর্য একসঙ্গে আমার চোখের সামনে আলো দিয়ে উঠল। যেন নিরানব্বইটা পূর্ণ চাঁদ একসঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল। কিন্তু সেই আলোর ধারায় কার যেন ছায়া পড়েছে। তুমি সুতোয় বেঁধেছ শাপলার ফুল নাকি তোমার মন, বলে তার মুখটা উঁচু করে ধরলাম। সেই প্রথম কথা বলে উঠল।

তার হাসিতে প্রেম ছিল, তার কথায় জাদু ছিল। সে আমাকে প্রথম যে কথাটা বলেছিল এখনো বেশ মনে পড়ে। বিয়ের দেড় বছর পর সেটা মনে পড়তে বাধ্য করেছে আমাকে। সেদিনের মতোই আরো একবার আমি চমকে উঠেছি। জীবনে না জানি আরো কতবার চমকাতে হবে আমাকে। আমি তাকে কোনো নামে ডাকব সেটা সে জানতে চেয়েছিল। তার নাম ছিল তমালিকা। আমি তাকে বলেছিলাম তোমাকে আমি তমালিকা বলেই ডাকব। সে যখন বলল তার আরো একটা নাম আছে আমি সেটা ধরেও চাইলে ডাকতে পারি। আমি তখন সেই নামটা শোনার জন্যে অপেক্ষায় ছিলাম। সে বলেছিল তার নাম ‘সুষমা’! ভীষণ রকম চমকে উঠেছিলাম সেদিন। বিষম খেলাম বেশ। একজনের সঙ্গে আরেকজনের নাম মিলতেই পারে, তবে তার সেই চোখ, সেই নাক, সেই বাঁকা হাসিও যে মিলতে পারে তা ভাবিনি। কিংবা হয়তো আমার চোখ নিজের মতো করে দৃশ্য সাজিয়ে নিয়েছে। বিছানা ছেড়ে নেমে সে জগ থেকে পানি ঢালতে ঢালতে বলল, ‘অমন চমকে উঠলে যে!’ আমার তখন কী আর বলার থাকতে পারে। যেন নকখোলার বিলে একাকী ভেলায় চড়ে ভেসে আছি আর পিছন থেকে মায়াবিনী সেই রাক্ষুসী আমাকে ডাকছে আর আমি নিরুত্তর ভেসে চলেছি কূলের দিকে।

দুজন দুজনাতে একাকার হয়ে কত কথা হয়েছিল সেদিন। ওর খুব কবিতার প্রেম ছিল। বিয়ের প্রথম রাতেই ও আমাকে কবিতা শুনিয়েছিল। সে তার প্রিয় কবিতার দুটো লাইন যখন শুনিয়েছিল তার পর থেকে কবিতা শুনতে আর ইচ্ছে হয়নি। সে আচমকা আমাকে চমকে দিয়ে আবৃত্তি করে উঠল—

‘সুষমাদি তোমার খোলা চুল, স্ন্নিগ্ধ হাসি/বড় মায়াকাড়া, বড় ভালোবাসি,

খোলা জানালায় অবিরাম সুষমাদির হাসিমুখ/সে মুখে তাকিয়ে খুঁজি জীবনের সব সুখ’।

জীবন বড়ই বৈচিত্র্যময়। কবিতা শুনে আমি চমকে উঠে কথা হারিয়ে ফেলি। তার মুখে তখন অবিরাম বাঁকা হাসি। বলতে পারি না তোমার বাঁকা হাসিতেও প্রেম আছে। ঘোরলাগা কণ্ঠে বলি, এ কবিতা কোথায় পেলে? সে হাসে, উত্তর দেয় না। পরদিন সকালে বেশ বেলা করে আমার ঘুম ভাঙে। আড়মোড় ভেঙে বিছানা ছাড়তে গিয়ে বালিশের নিচে কিছুর অস্তিত্ব খুঁজে পাই। বের করে দেখি একটা ডায়েরি, আমার লেখা। খুলে দেখি তেমন কিছুই লেখা নেই সেটাতে। শুধু মাঝখানে একটা পৃষ্ঠাতে ওই কবিতার চরণদুটি। সেখানে সুষমাদির নাম লেখা নেই, কিন্তু তমালিকা কী করে নাম জুড়ে দিয়ে আবৃত্তি করেছিল, তা জানা হয় না।

দেড় বছর পর আমাদের ঘর আলো করে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হলো। বাবা, মা, দিদি সবাই অনেক খুশি। আমারও অনেক ভালোলাগা ভালোবাসার ফসল ছিল সে। আঁতুড় ঘর থেকে বের হওয়ার পর যখন নাম রাখার সময় এল সবাই তাদের পছন্দমতো নাম বলতে লাগল। আমি তমালিকাকে বললাম, কী নাম রাখবা মেয়ের? সে বাসর রাতের মতো সেই বাঁকা হাসি হেসে জানাল, ‘মেয়েটির নাম রাখলাম সুকন্যা!’ আমি তখন ঠায় দাঁড়িয়ে নির্বাক চোখে একবার তমালিকার দিকে আরেকবার তার কোলের শিশুকন্যার দিকে তাকিয়ে জীবনের রহস্য খুঁজতে লাগলাম। ক্রমাগত আমি রহস্যের অতল গভীরে হারিয়ে যেতে যেতেও কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পেলাম না। তবে কি তমালিকার মধ্যে সুষমা ফিরে এসেছে? তবে কি সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটির মধ্যে সুকন্যা ফিরে এসেছে। সবার মতামতের ভিত্তিতে মেয়েটার নাম সুকন্যাই রাখা হলো। অনেক বছর পর হয়তো পরিচিত নামটা ফিরে এল এই ঘরে, এই আঙিনায়।

সুষমা কোথায় আছে আমি জানি না। শুনেছি সে তার স্বামীর সঙ্গে একমাত্র কন্যাকে নিয়ে কলকাতা চলে গেছে। কিন্তু আমি জানি সে আছে এই আঙিনাতে, আমার আশপাশেই। বারান্দায় খেজুর পাতার পাটি পেতে একমাত্র মেয়ে সুকন্যাকে যে দুধ খাওয়াচ্ছে হয়তো সেই সুষমা, হয়তো সে তমালিকা নয়। তার মুখের দিকে তাকিয়ে কত অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজি, কিন্তু সদুত্তর পাই না। যে হাসিমুখ আমার অন্তরকে প্রশমিত করে সে তমালিকা কিংবা সুষমা হতে পারে, কিন্তু সে সুষমাদি নয়। n

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৪ জুলাই, ২০২০ ইং
ফজর৩:৪৮
যোহর১২:০৩
আসর৪:৪৩
মাগরিব৬:৫৩
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১৫সূর্যাস্ত - ০৬:৪৮
পড়ুন