উড়োজাহাজের উড়ো চিঠি
‘সোমনামবুলিজম’
শামীম শাহেদ০৮ আগষ্ট, ২০১৬ ইং
‘সোমনামবুলিজম’
খাবারের আড্ডায় প্রথম খবরটা দিলেন জাহিদ হাসান। মানে আমাদের জাহিদ ভাই। আ খ ম হাসানের ঘুমের মধ্যে হাঁটাহাঁটির অভ্যেস আছে। রাতে ঘুমের মধ্যেই ঘর থেকে বেড়িয়ে যান, হাঁটাহাঁটি শেষ করে আবার এসে শুয়ে পড়েন। সকালে কেউ তাকে দেখে বুঝবেনই না যে, রাতভর তিনি হাঁটাহাঁটি করেছেন।

—বলেন কি? তাই নাকি! টেবিল ভর্তি সবাই অবাক। কাতারের মাটিতে এসে রাতে হাঁটতে বের হলে আর যদি ফিরে না আসে। অথবা যদি অন্য কারো বাড়িতে হানা দেয়। চিন্তিত হয়ে পড়ে টিমের সবাই। কাতারে বাঙালিদের আমন্ত্রণে কনসার্ট করতে সবাই এসেছেন দোহা শহরে। জাহিদ হাসান ছাড়াও এই টিমে আছেন মোশাররফ করিম, নিপুণ, ইলিয়াস কাঞ্চন, শামীমা নাজনীন, আ খ ম হাসান, কামাল হোসেন বাবার, রোবেনা রেজা জুই, তারিক স্বপন ও পরিচালক মাসুদ সেজান। সঙ্গে বেশ ক’জন গানের শিল্পী।

জাহিদ হাসানের কথা শুনে আ খ ম হাসান অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলেন, ‘আমি ঘুমের মধ্যে হাঁটি না, ঘুমের মধ্যে হাঁটে তারিক স্বপন। তিনি শুধু ঘুমের মধ্যে হাঁটেন-ই না, আশেপাশের সবাইকে মারধরও করেন।’

এবার সবাই একযোগে হেসে উঠল। আর আমার সঙ্গে সঙ্গে তিন-চারটা জোকস মনে পড়ে গেল। তার মধ্যে একটি আবার আমার সামনে দেখা সত্য ঘটনা। আমার মামার ঘটনা।

রাতে হাঁটাহাঁটির এই অভ্যেসকে বলে ‘সোমনামবুলিজম’। বাংলায় বলে ঘুমের ঘোরে হাঁটা। অনেক সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষেরও এই অভ্যেস আছে। তিনি বুঝতেই পারেন না যে, রাতে ঘুমের মধ্যে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। হাঁটাহাঁটি শেষ করে অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। এমনও অনেকে আছেন যারা রাতে ঘুমের মধ্যে বাসার জিনিসপত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় রেখে দেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে মেলাতে পারেন না। চোর এসেছে চোর এসেছে বলে চিত্কার চেঁচামেচি শুরু করে দেন।

এই ঘটনা কাতারে ঘটলে তো বিরাট সমস্যা। যদি হোটেল রুম চিনতে না পেরে অন্য কারো বাড়িতে ঢুকে যান। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো দু’জনকেই চোখে চোখে রাখা হবে। তারপর থেকে দেখা গেল কেউ না কেউ তাদেরকে গার্ড দিয়ে রেখেছেন। টয়লেটেও একা যেতে দেওয়া হচ্ছে না। অন্তত কাতারের মাটিতে এই ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে না।

কাতার চমত্কার জায়গা। কাতারের রাজধানী দোহা তো আরো সুন্দর। যারা একবার কাতার ঘুরে এসেছেন তাদের পক্ষে কাতারকে ভুলে থাকা কঠিন। পুরো কাতারের বাড়িঘরগুলো এক ছাঁচে গড়া। বেশিরভাগই অফ হোয়ায়েট বা ক্রিম কালারের। মাটির রঙটাও তেমন। আমাদের বালির সঙ্গে একদমই মেলে না। প্রথম প্রথম খুব মন খারাপ হয়। তারপর মনের মধ্যে গেঁথে যায়।

সুক ওয়াকিফ বলে একটি জায়গা আছে, যেটা এখন থেকে কয়েকশ’ বছরের পুরোনো ঐতিহ্য গড়া। অনেকে এটাকে ওল্ডসুক-ও বলে। এটি একটি বাজার। ভেতর দিয়ে হাঁটলে মনে হয় পাঁচশ’ বছরের পুরোনো কোনো সময়ে ফিরে গেছি।  দোহা খুব ছোট্ট একটি শহর। কিন্তু অসাধারণ। পর্যটক আকর্ষণের সব ব্যবস্থাই তারা করে রেখেছে। আমি প্রথম যখন কাতারে যাই তখন আমাকে পুরো কাতার ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছিল রিয়া। আমাদের বিখ্যাত মডেল ফারজানা রিয়া চৌধুরী। তাকে কাতার বিশারদ বলা যেতে পারে। দোহা শহরের প্রতিটি কোনা-কাঞ্চি তার চেনা। আমার দেখা আরেকজন কাতার বিশারদ হলেন লিসা জামান। এই দু’জনের কল্যাণে আমার পুরো দোহা দেখা শেষ। কর্নিশ, ভিলাজিও, পার্ল, ওল্ডসুক, ওয়াকরা, বানান আইল্যান্ড সব।

কাতারের কোথায় কোন খাবারের দোকান আছে সেটা মুখস্থ বাবর আঙ্কেলের। অভিনেতা কামাল হোসেন বাবর, আমার চাচার বন্ধু। তাই আমাদের সবার আঙ্কেল। বাবর আঙ্কেল এমন মানুষ যিনি এক মুখ টেস্টি শর্মা খেতে চারশ’ কিলোমিটার ড্রাইভ করে যেতে রাজি।

কাতারে এক ঘণ্টা যাত্রা বিরতি করলেও আমি বলবো কর্নিশ না দেখে ফিরবেন না। দোহা শহরের কোল ঘেঁষে শহরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে এক টুকরো সমুদ্র। টলটলে সবুজ পানি। নম্র-ভদ্র ঢেউ। চুলে বিলি কাটা সুন্দর মৃদু বাতাস। যতদূর চোখ যায় ছোট ছোট নৌকা ভাসছে। দূরে সমুদ্র বেয়ে চলে যাচ্ছে বড় বড় জাহাজ। এই হলো কর্নিশ। তবে এর সঙ্গে বোনাস হিসেবে মাথার ওপরে থাকে টগবগে একটি সূর্য। এটুকু অবশ্য মেনে নিতেই হবে। মধ্যপ্রাচ্য ঘুরতে যাবেন আর সূর্যের হালুম দেখবেন না এটা কি হয়।

যা হোক চমত্কার অনুভূতির মধ্য দিয়ে শেষ হলো কাতার কনসার্ট। জাহিদ হাসান, মোশাররফ করিম থাকলে আর কিছু লাগে! দু’জনেই পাঁঁচশ’। বিশেষ নজরদারির কারণে অবশ্য সেই রাতে আ খ ম হাসান কিংবা তারিক স্বপন কেউই কোনো অঘটন ঘটাতে পারেননি।

রাতে হাঁটাহাঁটির কারণে অঘটন ঘটিয়েছিলেন আমার এক মামা। তারও ঘুমের মধ্যে হাঁটাহাঁটির অভ্যেস। পনেরো-বিশ বছর আগের ঘটনা। আমি তখন কলেজে পড়ি। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের শান্তিনগরের বাসায় সেদিন শুধু আমি আর মামা। সন্ধ্যার পর থেকেই আমার একটু ভয় ভয় করছিল। মামা গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছেন, যদি রাতের বেলা ঘুমের মধ্যে বাসা থেকে বের হয়ে যান ফিরবেন কিভাবে। কিছুই তো চেনেন না। আমি ভয়ে ভয়ে ইন্টারকমে ফোন দিলাম।—‘দারোয়ান চাচা, গ্রাম থেকে আমার এক মামা এসেছে।

ঘুমের মধ্যে তার হাঁটার অভ্যেস আছে। একবার বের হয়ে গেলে কিন্তু আর ফেরত আসতে পারবেন না। বিরাট কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।’

—স্যার আপনি কোনো চিন্তা কইরেন না। আমি সারারাত সজাগ আছি।

রাত এগারোটার দিকে আমাদের মনে হলো, বাসায় তো অ্যারোসল নেই। মামা বললেন, তুমি থাকো আমি সামনের দোকান থেকে নিয়ে আসি।

একটু পরেই দারোয়ান চাচার ফোন, ‘স্যার, তাড়াতাড়ি নিচে আসেন। মামা রে ধরসি।’

 

৫ আগস্ট, ২০১৬

লুন্ড, সুইডেন

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ আগষ্ট, ২০১৯ ইং
ফজর৪:০৯
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৪০
এশা৭:৫৯
সূর্যোদয় - ৫:৩১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
পড়ুন