ভোটে কাজে লাগে না আইডি কার্ড
জাল ভোট ঠেকাতে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নেয়া হয়েছিল এ প্রকল্প
ভোটে কাজে লাগে না আইডি কার্ড
ভোটে কোন কাজে লাগে না ভোটার আইডি কার্ড। অথচ ২০০৭ সালে ভুয়া এবং জালভোট ঠেকাতে গ্রহণ করা হয়েছিল ভোটার আইডি কার্ড প্রকল্প। বর্তমানে এই আইডি কার্ডের নাম দেয়া হয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র। আর এই পরিচয়পত্রও ভোট দিতে লাগে না। এছাড়া জাল ভোট ঠেকাতে ভোটার আইডি কার্ড প্রকল্পের আওতায় প্রণয়ন করা হয় ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা; কিন্তু কোনটিই জাল ভোট ঠেকাতে পারেনি। অথচ এটি করতে তত্কালীন সময় সরকারের ব্যয় হয়েছিল ৫শ কোটি টাকা। ভোটার আইডি কার্ড দেয়ার কথা বলে ২০০৭ সালে নির্বাচন পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল প্রায় দুই বছর; কিন্তু ভোটার আইডি কার্ড না দিয়ে করা হয় ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা। ওই তালিকা আবার দেয়া হয় না পোলিং এজেন্টদের। থাকে শুধু ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের হাতে। ফলে অপরিচিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারেন না পোলিং এজেন্টরা। যদিও জাল ভোটে আপত্তি দেয়ার দায়িত্ব তাদের।

বিগত বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে বিচারপতি এম এ আজিজ ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ সম্পন্ন করার পর এ নিয়ে বিতর্ক উঠে। আওয়ামী লীগ দাবি করে- ওই তালিকায় এক কোটি ২৫ লাখ ভুয়া ভোটার রয়েছে। তত্কালীন সরকারি দল বিএনপি ওই ভুয়া তালিকা ব্যবহার করে জালভোট দেবে এমন অভিযোগও সে সময় উঠে। আওয়ামী লীগসহ সুশীল সমাজ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ ভোটার আইডি কার্ড প্রণয়নের দাবি জানায়। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশে জরুরি অবস্থা জারির পর ভোটার আইডি কার্ড প্রণয়নের কারণ দেখিয়ে জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে দেয়। সে সময় নাগরিকদের ধারণা দেয়া হয়েছিল- ভোটার আইডি কার্ড প্রণয়ন করা হলে একজনের ভোট অন্যজন দিতে পারবে না। দাবি করা হয়েছিল- একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ভোটার আইডি কার্ডের কোন বিকল্প নেই। ভোটার আইডি কার্ড প্রণয়ন না করা পর্যন্ত নির্বাচন দেয়াও সম্ভব নয় বলে জানানো হয়েছিল।

তত্কালীন ড. এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন থেকে জানানো হয়, সারাদেশের যোগ্য ভোটারকে ভোটার আইডি প্রদান করতে আঠারো মাস সময় লাগবে। জাল ভোট ঠেকাতে এবং ভোটার তালিকা থেকে ভুয়া ভোটার বাদ দিতে ৫শ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়; কিন্তু পরবর্তীতে ভোটারদের আইডি কার্ড না দিয়ে দেয়া হয় জাতীয় পরিচয়পত্র। সে সময়ে ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়, ভোট দিতে জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজন পড়বে না। যদিও ভোটের প্রয়োজনে এটা করা হয়েছিল; কিন্তু ভোটার আইডি কার্ড না দিয়ে করা হয় ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা। বিগত জাতীয় সংসদ, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং সর্বশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ব্যাপকহারে জাল ভোট পড়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কোথাও কোথাও কেন্দ্র দখল করে সিল মারার ঘটনাও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও জাল ভোট পড়ার অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ সংস্থা থেকে শুরু করে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন এমনি যদি হয় তাহলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে কেন এ প্রকল্প নেয়া হলো। কেনই বা নির্বাচন (২০০৭ সালের জাতীয় নির্বাচন) দুই বছর পেছানো হলো।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, সূক্ষ্ম কারচুপি রোধ করার জন্য ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা করা হয়েছিল; কিন্তু বিগত কয়েকটি নির্বাচনে আমরা ব্যাপকহারে জাল ভোট প্রদানের ঘটনা দেখেছি। কেন্দ্র দখলের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা দিয়ে  কি হবে? এটা রেখে লাভ কি? এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নির্বাচন কমিশন এবং সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। আইন সংস্কার করলেও নির্বাচন কমিশনের শক্তিশালী ভূমিকা, প্রশাসনের নিরপক্ষেতা এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে কোনভাবেই নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব নয়।

প্রসঙ্গত, ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের কাছে দেয়ার দাবি উঠেছিল সে সময়ে; কিন্তু শামসুল হুদার কমিশন ঠুনকো অজুহাত তুলে এ দাবি নাকচ করে দেন। এটিএম শামসুল হুদা দাবি করেছিলেন, ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রার্থীদের হাতে দিলে এই ছবি অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার হতে পারে; কিন্তু প্রার্থীদের হাতে না দেয়ারও বিকল্প ছিল। নির্বাচন নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনগুলো প্রস্তাব করেছিল ভোটের দিন ভোট গ্রহণের সময়কাল পর্যন্ত কমিশন প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের কাছে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা সরবরাহ এবং ভোট শেষে তা নিয়ে যেতে পারতো। সে প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়নি। যদি এটা করা হতো তাহলে অপরিচিত ভোটারদের ছবি দেখে শনাক্ত করার সুযোগ পেতেন পোলিং এজেন্টরা। বাস্তবে এই তালিকা কাউকে দেয়া হয় না, এটির উপকারিতা কি সেটিও বোঝা যায় না। অথচ প্রতি বছর এর জন্য সরকারের খরচ হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

বর্তমান নির্বাচন কমিশন ভোটার আইডি কার্ড প্রকল্পকে নতুন রূপ দিয়েছে। ২০১১ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় নাগরিকদের স্মার্ট কার্ড প্রদানের প্রকল্প। আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেমস ফর ইনহেন্সিং অ্যান্ড এক্সেস টু সার্ভিস (আইডিয়া) প্রকল্পের আওতায় দেশের সব নাগরিককে জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। নাগরিককে জাতীয় পরিচয়পত্রের মতই একটি স্মার্ট কার্ড দেয়া হবে। প্রায় চার বছর আগে শুরু হওয়া এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ৫ বছর। বিদ্যমান জাতীয় পরিচয়পত্র রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কাজে লাগছে। কাজে লাগছে না শুধু ভোটে।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০১৯ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন