বিএনপিতে বহুমত, নিজেদের দুর্বলতায় ক্ষোভ হতাশা
শামছুদ্দীন আহমেদ৩০ এপ্রিল, ২০১৫ ইং
বিএনপিতে বহুমত, নিজেদের দুর্বলতায় ক্ষোভ হতাশা
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভোটের প্রথমার্ধেই বর্জন করে সরে যাওয়া, প্রশ্নবিদ্ধ ভোট ও দিন শেষে ফলাফলসহ সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপিতে বহু মত-প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, তিন সিটি নির্বাচনের প্রায় নব্বই ভাগ ভোট কেন্দ্রেই এজেন্ট দিতে না পারা ও দলীয় কর্মীরা ভোট কেন্দ্রে না যাওয়াসহ নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতায় দলের ভেতরেই সৃষ্টি হয়েছে ক্ষোভের। নির্দলীয় সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে টানা তিন মাসের আন্দোলনে ছেদ ঘটিয়ে সিটি নির্বাচনে যাওয়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন করে হতাশা ভর করেছে দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মাঝে।

বিএনপির কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে গতকাল আলাপ করলে তারা জানান, ‘জিতলেও লাভ, হারলেও লাভ’ অনেকটা এমন একটি সমীকরণ সামনে রেখেই ‘আন্দোলনের অংশ হিসেবে’ দলটি তিন সিটির নির্বাচনে গিয়েছিল। তবে নির্বাচনের প্রচারণাসহ ভোটের দিনের শুরু থেকেই দৃশ্যমান পরিস্থিতিতে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টি আরো তীব্রভাবে ফুটে উঠেছে। সিংহভাগ ভোট কেন্দ্রেই বিএনপি এজেন্ট রাখতে পারেনি। এজেন্ট হিসেবে যাদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল, তাদের অধিকাংশই ভোট কেন্দ্রে যাননি। তারা বরং দলীয় প্রার্থী ও নেতাদের সঙ্গে নিজেদের ‘যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন’ করে রাখেন। সরকারের কৌশল মোকাবেলায় নেতা-কর্মীরা নির্বাচনী মাঠে ছিলেন না, নিজের ভোট দিতেও কেন্দ্রে যাননি। গ্রেফতার ও ঝামেলা এড়িয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে ‘নিরাপদ’ থাকতে ঘরের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত ছিলেন নেতা-কর্মীরা।

প্রসঙ্গত, ভোটের একদিন আগে, অর্থাত্ গত ২৬ এপ্রিল বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ভয় না করে ভোট দিতে ভোট কেন্দ্রে যেতে এবং বিকাল থেকে কেন্দ্র পাহারা দিয়ে গণনা শেষে ফলাফল বুঝে নিয়ে কেন্দ্র ত্যাগের নির্দেশনা দিয়েছিলেন দলীয় নেতা-কর্মীদের।

তবে মাঠের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। কেন্দ্রে পাহারা বসানো তো দূরের কথা, নিজেদের ভোট দিতেই  যাননি নেতা-কর্মীদের সিংহভাগ। ঢাকার কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি কেন্দ্রের সামনেই সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের কর্মীরা চেয়ার-টেবিল পেতে ও চারপাশে বাঁশ দিয়ে নিজ নিজ প্রার্থীর পোস্টার দিয়ে প্রাচীর বানিয়ে আগত ভোটারদের ভোটার নম্বর ও সিরিয়াল নম্বর জানিয়ে দেয়াসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছিলেন। তবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার হাতে গোনা কয়েকটি কেন্দ্র ছাড়া আর কোথাও বিএনপি বা ২০ দল সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে এই কাজটি করতে দেখা যায়নি কাউকে।

কয়েক নেতার মতে, নির্বাচনী প্রচারণাসহ ভোটের দিনের প্রস্তুতিতে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও প্রকটভাবে ধরা পড়ে। ২০ দল শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) যুগ্ম-মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম ইত্তেফাককে জানান, ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সবার চোখেই ধরা পড়েছে। জোট সমর্থিত প্রার্থীরা শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, প্রয়োজনীয় পরামর্শও করেননি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য ইত্তেফাককে জানান, শুধু বিএনপি বা ২০ দলের মধ্যেই সমন্বয়হীনতা নয়, ঢাকা উত্তরে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বর্তমানে বিএনপির অন্যতম শুভাকাঙ্ক্ষী অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পুত্র মাহী বি. চৌধুরীর সঙ্গে সমঝোতারও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এ ব্যাপারে মাহী বি. চৌধুরী ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন ‘এই ঘটনায় জাতীয়তাবাদী শক্তির ভেতরে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। যারা চায় না জাতীয়তাবাদী শক্তি শক্তিশালী হোক, তারা এই দূরত্ব তৈরি করেছে।

ভোটের দিন দুপুর ১২টার মধ্যেই তিন সিটির ভোট বর্জন নিয়েও দলে একাধিক মত দেখা দিয়েছে। একটি অংশ মনে করছে, সরকারি দলের লোকজন ভোরে-ভোরেই ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে ফেলেছে-বিএনপিকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে সম্ভবত কৌশলে এমন প্রচারণা ছড়িয়ে দেয়া হয়। বিএনপি সেই ফাঁদে পা দিয়েছে। এই অংশের মতে, ভোট কেন্দ্র দখল, জাল ভোট ও বর্জনের পরেও তিন সিটিতেই বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের অংক বলছে- বিএনপি শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে থাকলে ফলাফল ভিন্নও হতে পারতো। তবে আরেকটি অংশের দাবি, তারা মনে করেন নির্বাচন গ্রহণযোগ্য দেখাতে বিএনপির প্রার্থীদের এত ভোট দেখানো হয়েছে।

এদিকে, বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মতে- তিন সিটির নির্বাচনে হারলেও কিছু অর্জনও এতে আছে। এ নির্বাচনের ফলে তাদের প্রধান দাবি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি ‘পাকাপোক্ত’ হয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এছাড়া ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত ‘সঠিক’ ছিল-সেটিও সবার কাছে নতুনভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলেও দাবি করছেন বিএনপি নেতারা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘এখনতো  দেশের মানুষ ও গোটা বিশ্বের কাছে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। সবাই এখন উপলব্ধি করবেন যে, আমাদের দাবি কতটা যৌক্তিক।’

জানা গেছে, তিন সিটি নির্বাচনের ঘটনায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন করে হতাশা দেখা দেয়ায় এখন হরতালের মতো কোনো কর্মসূচি না দেয়ারও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। গতকাল বুধবার রাতে খালেদা জিয়া তার গুলশান কার্যালয়ে দলের ও দল সমর্থক পেশাজীবীদের ফোরাম ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলন’-এর কয়েক নেতার সঙ্গে পরামর্শ করে এই সিদ্ধান্ত নেন বলে একটি সূত্র ইত্তেফাককে নিশ্চিত করে।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০১৯ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন