রাজনীতির চক্রে প্রশাসন
শ্যামল সরকার১৫ জুন, ২০১৫ ইং
রাজনীতির চক্রে প্রশাসন
অকালে চাকরিহারা দুই শতাধিক কর্মকর্তা

Åকাউকে বাধ্যতামূলক অবসর, অনেকে স্বেচ্ছা অবসরে

Åরাজনীতিতে যোগ দিতেও চাকরি ছাড়ার নজির আছে

Åনিয়োগ-বদলিতে পক্ষপাতের অভিযোগ দীর্ঘদিনের

Åবিএনপি আমলেও ঘটেছে এসব অনিয়ম

নিয়োগ-পদোন্নতি-বদলিতে পক্ষপাতিত্ব, যোগ্যদের যথাযথ মূল্যায়ন না করা, আন্তঃব্যাচ দলাদলি সর্বোপরি একজন-আরেকজনকে রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের বলে চিহ্নিত করে হয়রানিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়ায় জনপ্রশাসন থেকে সচিবসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তারা স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ছেন। আবার অনেককে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে একই রকম কারণে। বিগত বিএনপি সরকারের ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক চাকরিচ্যুতির’ ধারায় বর্তমান সরকারের আমলেও ঘটেছে এসব ঘটনা। অবশ্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী  ইত্তেফাককে বলেছেন, হয়রানিমূলক কোন ব্যবস্থার কারণে কাউকে চাকরি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে এ সরকারের আমলে এমন উদাহরণ নেই।

ইত্তেফাকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কেউ কেউ ভিন্ন ক্যাডার থেকে জনপ্রশাসনে নিয়োগ লাভ করেও কিছুদিনের মধ্যে আবার আগের ক্যাডারে ফিরে গেছেন।  ২০০১ সাল থেকে ২০১৪ সালের বিভিন্ন সময়ে দুই শতাধিক কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন অথবা তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে। কারো কারো আবার রাজনীতি করার উদ্দেশ্যে আগেভাগে চাকরি ছাড়ার নজির রয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে পড়াশোনা শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করছে এমন মেধাবীদের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রশাসন বিমুখ হয়ে পড়ছে। ফলে প্রশাসন মেধাশূন্য হয়ে এক সময় সুশাসন বাধাগ্রস্ত হতে পারে এমন আশংকা বিশেষজ্ঞদের।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর তত্কালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার একদিনেই সচিবসহ ৪৬ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তারা ১৯৯৬ সালে প্রেস ক্লাবের সামনে তৈরি জনতার মঞ্চে যোগ দিয়ে চাকরির শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন। একই কারণ দেখিয়ে শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকেও চাকরি থেকে বিদায় দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, ‘জনতার মঞ্চের কর্মকর্তা’ আখ্যা দিয়ে কয়েকশ’ কর্মকর্তার পদোন্নতিও আটকে রাখা হয় বিএনপি-জামায়াতের পুরো শাসনকাল।

অপরদিকে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর হয়রানিমূলক বদলির প্রতিবাদে অন্তত তিনজন সচিব যথাক্রমে মোহাম্মদ মহসীন, হুমায়ুন কবীর এবং দেলোয়ার হোসেন চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে চলে যান। এ সময়ের মধ্যে সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকারের একান্ত সচিব এবং অতিরিক্ত সচিব নাসিমূল গণিকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। এই অবসরটি নিতান্তই প্রতিহিংসার কারণে দেয়া হয়—এই অভিযোগ প্রবল। এ ছাড়া যুগ্ম সচিব ড. আব্দুল মোমেন, এ কে এম জাহাঙ্গীর হোসেনকেও বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। এ দু’জনকে বিএনপি-জামায়াতপন্থি কর্মকর্তা হিসাবে চিহ্নিত করার অভিযোগ রয়েছে।

দুইজন সচিব নিয়াজউদ্দিন মিয়া ও এ কে এম আমীর হোসেন এ সরকারের আমলে নিকট অতীতে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। সরকারি দলের ঘরানার পরিচিত এই দু’জনের  বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তারা চাকরিতে প্রবেশকালে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ঘোষণা না করেও পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধার সনদ গ্রহণ করেন। যদিও এটি অপরাধ বলে বিবেচিত হবে না মর্মে পরে সরকার সিদ্ধান্ত জানায়।

১৯৭৪ সালের গণকর্মচারীর অবসর আইন অনুযায়ী চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে যে কেউ স্বেচ্ছায় অবসরে যেতে পারেন কিংবা সম্পূর্ণ সুযোগ-সুবিধাসহ সরকার তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দিতে পারে। কিন্তু ২৫ বছরের আগে স্বেচ্ছা অবসর নিলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয় না। এ সত্ত্বেও অনেকেই ২৫ বছরের আগেই স্বেচ্ছা অবসরে চলে যাচ্ছেন।   

আলোচ্য সময়ের মধ্যে দুই সচিবসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার যেসব কর্মকর্তা স্বেচ্ছা অবসর নিয়েছেন বা জনপ্রশাসন থেকে মূল ক্যাডারে ফিরে গেছেন তাতে তারা কারণ সম্পর্কে ‘ব্যক্তিগত’ বলে উল্লেখ করেছেন। আইন অনুযায়ী পদত্যাগপত্রে বা মূলক্যাডারে ফিরে যেতে অন্য কারণ উল্লেখ করার সুযোগ নেই।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী  ইত্তেফাককে বলেন, যারা অকালীন স্বেচ্ছা অবসর নিয়েছেন তাদের অনেকেই বিদেশি সংস্থায় কর্মরত রয়েছেন। ছুটি নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পরে এসব চাকরি নিচ্ছেন। বারবার তাগিদ দিলেও তারা দেশে ফিরছেন না। এ রকম বাস্তবতায় অনেকে বাধ্য হয়ে চাকরিচ্যুতির আগেই স্বেচ্ছা অবসর নিচ্ছেন। আবার ব্যক্তিগত কারণেও অনেকে চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন।

নিয়োগ, পদোন্নতি বা বদলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা স্বেচ্ছা অবসরের কোনো কারণ কী না—এ প্রশ্নের জবাবে সিনিয়র সচিব বলেন, অবশ্যই না। এ সরকার এমন বিবেচনা থেকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি, করছেও না। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিদেশে বা দেশের বেসরকারি খাতে অনেক বেশি। এ কারণে হয়তো কেউ কেউ চাকরি ছাড়তে পারেন।

জানতে চাইলে সাবেক সচিব এম হাফিজ উদ্দিন খান ইত্তেফাককে বলেন, সরকারি চাকরির বিশেষ করে জনপ্রশাসনের প্রতি মেধাবীদের আকর্ষণ কমে যাচ্ছে এটি অনস্বীকার্য। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ-বদলি, পদোন্নতির ধারা চালু এবং সময়মতো পদোন্নতি না পাওয়াসহ বেতন-ভাতার অপ্রতুলতাই এর উল্লেখযোগ্য কারণ বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে কেউ চাকরি ছেড়ে যেতে পারেন কিন্তু তার সংখ্যা বেশি হবে না। এতে আমলাতন্ত্র মেধাশূন্য হবে। গণতন্ত্রের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে।

বর্তমানে প্রশাসনে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রশাসনে দলীয় পরিচয় না থাকলে বা দলীয় সুপারিশ তদ্বির ছাড়া যোগ্যক্ষেত্রে নিয়োগ, পদোন্নতি বা বদলি হওয়া প্রায় অসম্ভব। এসব কারণে অনেকেই হতাশা থেকে ভালো সুযোগ পেয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। অনেকে শিক্ষাছুটি নিয়ে বিদেশ গিয়ে আর ফিরছেন না। নব্বই দশকের পর থেকে শুরু হওয়া এই প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

যেসব কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় অবসরে গেছেন তার মধ্যে উল্লে­খযোগ্যরা হলেন- মঈন উদ্দিন, রফিক হোসেন, আবদুল লতিফ সরকার, খন্দকার গোলাম ফারুক, শাহ আবদুল জলিল, আবু বক্কর সিদ্দিকী, তুষার খন্দকার, তরিকুল ইসলাম, হাবিব আহমেদ, আবদুল মোতালেব সরকার, মনিরুজ্জামান, মাহবুবুর রহমান, ইসরাত শবনম, দিপ্তীময় চাকমা, জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার, এস এম রেজাউন উল আলম, সুশীল কুমার পোদ্দার, এহসান লতিফ, নাসরিন আখতার, নিলিজামান, তৌহিদুল আলম, জাহাঙ্গীর বিন সরওয়ার প্রমুখ। এরা যুগ্ম সচিব, উপসচিব ও সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তা। 

দেখা যাচ্ছে, এসব কর্মকর্তার স্বাভাবিক অবসরের বয়স ছিল ২০২৩ সাল ২০৩২ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে। এর বেশিরভাগ কর্মকর্তাই যোগদানের পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। জনপ্রশান মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, এদের বেশিরভাগই হয়তো দেশি-বিদেশি বড় বড় সংস্থায় কর্মরত থাকতে পারেন।

রাজনীতিতে যোগদানের জন্য চাকরি ত্যাগ

কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা নিজেরাই রাজনীতিতে যোগদানের জন্য চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। এরমধ্যে উল্লে­খযোগ্য হচ্ছে বর্তমান আওয়ামী লীগের সাংসদ রবিউল আলম মুক্তাদির চৌধুরী, বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব ও সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী বর্তমানে ভারতে অভিবাসন আইনে জামিনে থাকা সালাহউদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিম। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৮৪ ব্যাচের যুগ্ম সচিব আব্দুস সালাম চাকরি থেকে ইস্তফা দেন, যা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। 

আরেক চিত্র: বিএনপি-জামায়াত আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি বঞ্চিত ৫০ জনের বেশি কর্মকর্তা আদালতে মামলা করে এই আমলে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির সুযোগ পেয়েছেন। চাকরিতে না থাকলেও এসব কর্মকর্তা তার অবসরের বয়সসীমার মধ্যে ঊর্ধ্বতন যেসব পদে যেতে পারতেন সেরকম পদে পদোন্নতি পেয়েছেন তারা।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৫ জুন, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১১:৫৯
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১৪
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪
পড়ুন