নিষ্ঠুরতা বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়তে হবে
আবুল খায়ের০৩ মার্চ, ২০১৬ ইং
কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ এলাকার ইকরা মাদ্রাসা থেকে মিতু (৯) ও মাহি (৭) নামে অপহূত দুই বোনকে ছয় ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত এক নারীকে আটক করা হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকালে চৌদ্দগ্রামের গোমারবাড়ি এলাকা থেকে তাদের উদ্ধার করে র্যাব।

জানা গেছে, সকালে ইকরা মাদ্রাসায় এসে এক নারী নিজেকে শিশু দুটির খালা পরিচয় দিয়ে তাদের নিয়ে যায়। দুপুর ১টায় মোবাইল ফোনে কল করে শিশু দু’টির মায়ের কাছে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। টাকা না দিলে শিশুদের ক্ষতি হবে বলেও হুমকি দেয়া হয়।

অপহূত মিতু ও মাহি কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুরের আলেকদিয়া এলাকার সৌদি প্রবাসী দেলোয়ার হোসেনের সন্তান। টমছমব্রিজ এলাকার ইকরা মাদ্রাসায় মিতু তৃতীয় শ্রেণি ও মাহি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

সম্প্রতি দেশে শিশু নির্যাতন ও হত্যা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। তুচ্ছ কারণে ঘটছে নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা। সিলেটে শিশু রাজন হত্যার ঘটনাটি জনমনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর পরপরই শিশু হত্যার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে। 

এদিকে ফুড পয়জনিং নয়, রামপুরার বনশ্রীতে দুই ভাই-বোনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। নিহত দুই শিশুর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। গত সোমবার বিকালে বনশ্রীর সি ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাসায় তাদের মৃত্যু হয়। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এখনো পুলিশের হাতে আসেনি। প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই শিশুর বাবা-মাকে জামালপুর থেকে ঢাকায় নিয়ে এসেছে র্যাব।

এছাড়া লাকসামে মোবাইলের জন্য এক শিশুকে হত্যা, কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে হবিগঞ্জের বাহুবল এলাকায় নির্মমতার বলি হয়েছে চার শিশু। হত্যার পর এক সঙ্গে বালুচাপা দিয়ে রাখা হয় তাদের। ওই মাসেই গাজীপুরে হত্যা করা হয় এক শিশুকে।

ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে অন্তত ১৮ শিশু। জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ২৯। এই হিসাবে সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ঝরে পড়ছে একটি কোমলমতি শিশুর প্রাণ। এর বাইরেও অনেক ঘটনা ঘটছে। শিশু হত্যা বন্ধে বেগ পেতে হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে।

গত বছরের আলোচিত দুই ঘটনা সিলেটের শিশু রাজন হত্যা ও খুলনায় শিশু রাকিব হত্যায় দ্রুত বিচার শেষে আদালত খুনিদের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে। এমন দৃষ্টান্ত স্থাপনেও কমছে না শিশুদের ওপর নির্মমতা।

দিনে দিনে বাড়ছে খুনের এই সংখ্যা। ভয়াবহ নির্মমতার শিকার হচ্ছে শিশুরা। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, পরকীয়া প্রেম, বাবা-মায়ের ওপর প্রতিশোধ নিতে টার্গেট করা হচ্ছে শিশুদের। অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়ের জন্য বলি হতে হচ্ছে শিশুদের। নিজেকে রক্ষার জন্য ধর্ষণের পরও শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে।

বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বলেন, দেশে নিষ্ঠুরতা, পাশবিকতা এবং নির্মমতা ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। এর জন্য দায়ী মাদক। দেখা গেছে, শিশুদের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই মাদকাসক্ত। এছাড়া শিশুরা নিরীহ, প্রতিরোধ করতে পারে না। তাই প্রতিহিংসার সহজ লক্ষ্য হয় শিশু। মাদক ছাড়াও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে এই নিষ্ঠুরতা বেড়েছে।

তিনি বলেন, দেশকে অস্থির করার পাঁয়তারা হিসেবে কেউ এটি করছে কিনা এটাও খতিয়ে দেখা দরকার। আধুনিক সভ্য সমাজে এটা মেনে নেয়া যায় না। শিশু হত্যা বন্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই শিশু হত্যাকাণ্ড বেড়ে চলেছে। দ্রুত বিচার আইনে বিচার করা গেলে দৃষ্টান্ত স্থাপন হতো। আমাদেরকেও এক সপ্তাহের মধ্যে চার্জশিট দেয়ার চেষ্টা করতে হবে।

রামপুরায় দুই শিশু হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত তদন্তে যা বেরিয়ে এসেছে তাতে সন্দেহের তীর স্বজনদের দিকেই যায়। মায়ের সঙ্গে ঘুমায় দুই শিশু। দরজা বন্ধ দেখে দাদী দরজা খুলতে বলেন। দরজা খুলে দেখা যায় বিছানায় পড়ে আছে দুই শিশু।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, শিশু হত্যা আগেও হয়েছে, এখনো হচ্ছে। তবে হঠাত্ করে শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বেড়ে গেছে। পারিবারিক দ্বন্দ্বের নির্মম বলি হচ্ছে শিশুরা। এসব নির্মমতার বিচার দ্রুত বিচার আইনে করতে হবে।

এদিকে সামাজিক প্রাণী হিসেবে মানুষের অবস্থানও প্রশ্নবিদ্ধ। কারও বিপদেও কেউ এখন আর এগিয়ে আসে না। উত্তরার একটি বাসায় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি গ্যাস লিকেজ থেকে ভয়াবহ আগুন লাগার ওই ঘটনায় আগুনে পুড়ে মারা গেছেন সুমাইয়া আক্তারের স্বামী শাহীন শাহনেওয়াজ এবং তাদের দুই সন্তান পনের বছরের শার্লিন আর ১৬ মাস বয়সী জায়ান।

স্বজনদের সাথে আলাপকালে সুমাইয়া আক্তার বলেন, চিত্কার দিয়ে নামতেছি- আগুন লাগছে সাহায্য করেন। বাঁচান বাঁচান। গায়ে তো আগুন। তিন আর চার নম্বর ফ্লোর থেকে দরজা খুলছে। আমাদের দেখে দরজা বন্ধ করে দিছে। স্পষ্ট মনে আছে। সাত তলা থেকে নামছি। তিন তলার লোকেরা একটা তোশক দিয়ে যদি জড়িয়ে ধরতো। একটা তোশক না হয় পুড়তো। আমার বাচ্চাগুলো তো বাঁচতো।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩ মার্চ, ২০২১ ইং
ফজর৫:০৪
যোহর১২:১১
আসর৪:২৪
মাগরিব৬:০৫
এশা৭:১৮
সূর্যোদয় - ৬:১৯সূর্যাস্ত - ০৬:০০
পড়ুন