অবশেষে সেই জবেদ আলী কারামুক্ত
হাইকোর্টের রায়ের ১৩ বছর পর অবশেষে কারাগার থেকে মুক্তি মিলল জবেদ আলীর। হাইকোর্টের খালাসের আদেশ নিম্ন আদালত থেকে কারাগারে না পৌঁছানোয় তাকে এতোদিন কারাভোগ করতে হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে সাতক্ষীরা জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক আশরাফুল ইসলাম শুনানি শেষে জবেদ আলীকে মুক্তির নির্দেশ দেন। পরে এ সংক্রান্ত আদেশের কপি কারাগারে পৌছলে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সাতক্ষীরা জেল কর্তৃপক্ষ জবেদ আলীকে মুক্তি দেয়। 

কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর জবেদ আলীর মা ছখিনা বেগম আবেগে আপ্লুত হয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। বলেন, যারা তোর জীবনের ১৩টি বছর নিয়ে গেল তাদের সাজা হওয়া উচিত। তা না হলে আল্লাহ তাদের বিচার করবে। এ সময় জবেদ আলী বলেন কারো বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ নেই। যাদের জন্য আমার এ অবস্থা তাদের বিচার আল্লাহ করবেন। সেসময় উপস্থিত ছিলেন জবেদ আলীর ছোট মেয়ে রেক্সোনা, ভাই ইয়ার আলীসহ আত্মীয়-স্বজনরা।

প্রসঙ্গত: গত বুধবার ‘হাইকোর্ট খালাস দিলেও ১৩ বছর কারাগারে জবেদ আলী’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি সাতক্ষীরাসহ  দেশের আদালত অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত হয়।

জবেদ আলী কিভাবে এতদিন জেল হাজতে ছিলেন শুনে গতকাল বিচারক আশরাফুল ইসলাম বিস্মিত হন। হাইকোর্টের আদেশ যথাযথভাবে পালনে ত্রুটির জন্য নিজেই হতাশা ব্যক্ত করেন। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, যার ভুল অথবা অবহেলার কারণে তাকে এতদিন কারাভোগ করতে হল তাদেরও বিচার হওয়া দরকার। তাদের বিচার আল্লাহ করবে। এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়ানো জবেদ আলী কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এদিকে, জবেদ আলীর ১৩ বছর কারাভোগের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন সাতক্ষীরা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওসমান গণি। তিনি বলেন, খালাস পাওয়ার পরও ১৩ বছর কারাভোগের ঘটনা দুঃখজনক। এ ঘটনায় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।

সাতক্ষীরা কারাগারের জেলার আবু তালেব জানান, জবেদ আলী বিশ্বাসকে গতকাল বিকালে মুক্তি দেয়া হয়েছে।

জবেদ আলী জেল থেকে বের হয়ে সন্ধ্যায় কলারোয়ার কয়রা গ্রামের নিজের পরিত্যক্ত বাড়িতে যান। পোকা মাকড়ের অসংখ্য বাসা বাঁধা বাড়ির উঠানে দাঁড়াতেই ছুটে আসে গ্রামের লোকজন জবেদ আলীকে এক নজর দেখার জন্য।

কারামুক্ত জবেদ আলীর ভাই ইয়ার আলী জানান, উচ্চ আদালতে ভাইয়ের মামলাটি খারিজ হয়ে গেছে শুনে আমরা খুশি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ভাই দ্রুত ছাড়া পেয়ে আবার সংসার জীবন শুরু করবে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে রায়ের কপি জেলখানায় না আসায় তাকে মুক্ত করতে পারিনি। আদালতের বারান্দায় দিনের পর দিন ঘোরাঘুরি করেও তাকে যে হাইকোর্ট থেকে খালাস দেয়া হয়েছে তা  নিশ্চিত হতে পারিনি। তখন মনে হয়েছিলো প্রতিপক্ষরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। এরপর সংসারের অভাব অনটনের কারণে এলাকা ছেড়ে শার্শা উপজেলায় যেয়ে বসবাস শুরু করি। সম্প্রতি বিষয়টি জানতে পেরে আবারও আইন আদালত করে তাকে গতকাল মুক্ত করতে পেরেছি।

জবেদ আলীর এক মাত্র মেয়ে রেক্সোনা জানান, মা যখন মারা যায় তখন তার বয়স পাঁচ বছর। মাকে ঠিক মনে পড়ে না। এসময় বাবাও জেলে যায়। বড় বোন লিলিকে হত্যার অভিযোগে বাবার সারা জীবনের জন্য জেল হয়েছে এ কথা জানলে তার বিয়ে হবে না এমন আশংকায় মামারা জানান, তার বাবা জেলে মরে গেছে।

মা-বাবার আদর বঞ্চিত রেক্সোনা বলেন, আমার বিয়ে হয়েছে। সন্তান হয়েছে। নির্দোষ বাবাকে কাছে পেয়ে আমি ধন্য। আমার বাবাই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বাবা। এসময় তার চোখের পাতা ভিজে যায়। ক্ষীণ হয়ে যায় কণ্ঠস্বরও। চোখের পানি সামলে রেক্সোনা তার বাবার জন্য সকলের কাছে দোয়া চান।

আদালতের আদেশ সম্পর্কে সরকারপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট ফাহিমুল হক কিসলু জানান, শুনানি শেষে আদালত জবেদ আলীকে মুক্তির নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘যার ভুল অথবা অবহেলার কারণে তাকে এতদিন কারাভোগ করতে হল তাদেরও বিচার হওয়া দরকার।   

আদালত সূত্রে জানা গেছে, কলারোয়া উপজেলার কয়লা গ্রামের আমজেল আলী বিশ্বাসের ছেলে জবেদ আলী বিশ্বাস। লিলি (৮) ও রেক্সোনা (৫) নামে দুই কন্যা সন্তান রেখে তার স্ত্রী মারা যান। ১৯৯৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জাবেদ আলী মেয়ে লিলিকে তার মামার বাড়ি তালা উপজেলার মানিকহার গ্রাম থেকে বাড়ি নিয়ে আসার নাম করে পার্শ্ববর্তী সেনেরগাতি বাজারে নিয়ে যান। পরদিন লিলি মারা যায়। বিস্কুটের সঙ্গে জবেদ আলী বিষ মিশিয়ে খাইয়ে কন্যা লিলিকে হত্যা করেছেন এমন অভিযোগে লিলির মামা আবুল কাশেম সরদার তালা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় জবেদ আলী বিশ্বাসকে আসামি করা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর জবেদ আলী গ্রেপ্তার হন। সেই থেকে ২২ বছর ধরে তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন। 

২০০১ সালের পহেলা মার্চ জবেদ আলীকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানার নির্দেশ দেন নিম্ন আদালত। রায়ের বিরুদ্ধে জবেদ আলী বিশ্বাস জেল আপিল দায়ের করেন। আপিল শুনানিশেষে ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ নিম্ন আদালতের যাবজ্জীবন সাজা বাতিল করে হাইকোর্ট তাকে খালাস দেন। হাইকোর্টের স্মারক অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মামলার মূল নথি জেলা ও দায়রা জজ সাতক্ষীরার দ্বিতীয় আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। সে অনুযায়ী তত্কালীন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক তাপস কুমার দে উচ্চ আদালতের রায় ও আদেশের কপি শামিল করে সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রার নোট করে বিধি মোতাবেক নথিটি রেকর্ডরুমে পাঠানো হোক মর্মে  ২০০৩ সালের ৩ এপ্রিল এক আদেশ দেন।

সম্প্রতি সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক আশরাফুল ইসলামের গোচরে জবেদ আলীর মুক্তির বিষয়টি আনেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান ও অ্যাডভোকেট ফাহিমুল হক কিসলু।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩ মার্চ, ২০২১ ইং
ফজর৫:০৪
যোহর১২:১১
আসর৪:২৪
মাগরিব৬:০৫
এশা৭:১৮
সূর্যোদয় - ৬:১৯সূর্যাস্ত - ০৬:০০
পড়ুন