শোকাবহ আগস্ট
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নসাধ জনগণের ঐক্য
কামাল লোহানী০৮ আগষ্ট, ২০১৬ ইং
মাসটা শোকের। ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ -এ বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারকে যে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার পরিণতি সেদিন কেউ ঠাহর করতে না পারলেও আজ ২০১৬ সালে দাঁড়িয়ে মৌলবাদী, সাম্প্রাদায়িক অপশক্তির আস্ফাালন কিংবা তারই চূড়ান্ত প্রকাশ জঙ্গিবাদের যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করছি, তাই আমাদের ভাবিয়ে তোলে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধ উত্তর বাংলাদেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করবার উদ্দেশ্যেই দেশবাসীর কাছে তিন বছরের সময় চেয়ে নিজের স্বপ্নস্বাদ সোনার বাংলা গড়ে তোলা এবং দুঃখী  মানুষের মুখে হাসি ফোঁটানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। এমনই সময় সেই হায়নার দল যারা খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পুরো সময় ধরে কেবলই ষড়যন্ত্রের জাল বুনে চলছিল বিদেশি পরাশক্তির মদদ পুষ্ট হয়ে, তারা আর যাই করুক দেশকে যে ভালোবাসেননি তাই প্রকট হয়ে দেখা দিল ১৫ আগস্টে।            এই দিনটি থেকেই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামে প্রতিষ্ঠিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র— এই চারটি মূলনীতির স্তম্ভ নিয়ে গড়ে ওঠা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে পুর্নগঠিত করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু চক্রান্তকারীরা নির্ভৃতে বসে ভিন্ন অংক কষছিলেন এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয় বিরোধী শক্তির সহযোগিতায় এমনই একটি মর্মন্তুদ ইতিহাস সৃষ্টি করলো যা পৃথিবীতে বিরল। আর এই ঘটনার পর থেকেই যাত্রা শুরু করলো মুক্তিযুদ্ধের ‘উল্টোরথ’।

বঙ্গবন্ধুর তিরোধানে গোটা জাতি সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাকশূন্য মানুষরা ভেবে পাচ্ছিলেন না কীভাবে এর প্রতিবাদ করা যায় কিংবা আদৌও প্রতিবাদ করা ঠিক হবে কিনা। এই দ্বন্দ্বের ফাঁক ফোঁকরে বাংলাদেশ বিরোধী এই ‘নবশক্তি’ মাথা তুলে দাঁড়াবার আগেই প্রচন্ড আঘাতে ভূপতিত হলো। স্বল্প সময়ের জন্যে এলো মুক্তিযোদ্ধা সামরিক শক্তি। কিন্তু তাদেরও অপরিকল্পিত ক্ষমতায়নের কারণে আবিভূত হলো এক ফ্যাঙ্ককেনস্টাইনের। বাংলার নবইতিহাস তাকে জেনারেল জিয়াউর রহমান নামেই চেনে। ক্ষমতা দখল করবার পরপরই বঙ্গবন্ধুর যা কিছু জনসম্পৃক্ত রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তুতি, যেমন— ৯ মাসের মধ্যে দেয়া দেশের সংবিধান এবং দেশ গঠনে নানান পরিকল্পনা ধ্বংস করে দিল। শুরু করলো সেনাদর্শনে তার নতুন পথচলা। ফলে বঙ্গবন্ধুর নিষিদ্ধ করা সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে রাষ্ট্র এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে সেই ধর্মীয় উন্মাদনাকে প্রশ্রয় দিয়ে নিজের শাসন ব্যবস্থাকে পোক্ত করতে এবং মৌলবাদী শক্তির সহায়তা সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তার এই বিশ্বাসঘাতকতায় মুক্তিযুদ্ধের সতীর্থরাই তাকে জবাব দিলেন।

জিয়া হত্যা হলো চট্টগ্রামে সেনা বিদ্রোহে। এই সুযোগের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন সুযোগ সন্ধানী এরশাদ। অবশেষে তিনি দেশের শাসনভার নিজ হাতে গ্রহণ করলেন। বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রাণ দিয়ে গেলেন, সেই বাংলায় গণতন্ত্রের দাবিতে নূর হোসেনের প্রাণ গেল। আর সেলিম-দেলোয়ার-বসুনিয়াদের মিছিলে উঠলো এরশাদের প্রাণঘাতী ট্রাক।

নব্বইয়ের দশকে এরশাদের পতনের পর দেশে স্বাভাবিক রাজনীতির পরিবেশ তৈরি করার জন্য যে সমস্ত রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী মিলে যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, তার ফল দেশবাসীর জন্য ‘মর্মান্তিক’ হলো। কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো তাতে সেই জেনারেল জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া জনগণের প্রত্যাশার বাইরে নির্বাচিত হলেন। নির্বাচিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রাদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে তিনি ভূলুণ্ঠিত করলেন। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যে গণসংগ্রাম গড়ে উঠেছিল তাতে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত দেশের মানুষ জেগে উঠলেন। তারা জামায়াত-শিবিরসহ সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

ইতিহাসের যে চালচিত্র লক্ষ্য করলাম, তাতে দেখছি, বঙ্গবন্ধু দেশটাকে যেভাবে গড়তে চেয়েছিলেন তার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে ইতিহাসে এই সমস্ত খণ্ড খণ্ড অঘটন দেশকে পেছনে নিয়ে গেছে। আজ আমরা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্নসাধ পূরণে দেশবাসী সকলে একত্রিত হয়ে যুদ্ধাপরাধ, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সকল মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়েছি। এটাই বোধ হয় বঙ্গবন্ধুর দর্শনের একমাত্র কাম্য— জনগণের ঐক্য।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ আগষ্ট, ২০১৯ ইং
ফজর৪:০৯
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৪০
এশা৭:৫৯
সূর্যোদয় - ৫:৩১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
পড়ুন