৮ ডিসেম্বর ১৯৭১
ভারতীয় সেনারা ঢাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে
০৮ ডিসেম্বর, ২০১৬ ইং
ভারতীয় সেনারা আজ ঢাকার ভেতর ২৮ মাইল পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে এবং পশ্চিম ফ্রন্টে কাশ্মিরের চাম্বের আশেপাশের একটি বড় অংশ পাকিস্তানি দখলে আছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। দ্য অ্যাসোসিয়েট প্রেসের খবর। এদিকে পূর্ব-পাকিস্তানের দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ শহর যশোর অধিকার করে নেওয়ার ভারতের দাবিকে অস্বীকার করেছে ঢাকায় অবস্থানরত পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ। তারা বলেছে, যশোরসহ পশ্চিম, উত্তর ও পূর্বের ফ্রন্টগুলোতে তুমুল যুদ্ধ হচ্ছে।

নয়াদিল্লিতে একজন ভারতীয় মুখপাত্র বলেছেন, চাম্বের অঞ্চলে এখনো যুদ্ধ চলছে, সেখান থেকে আরো পূর্বে থাকা অবস্থানগুলো রক্ষার জন্য গত মঙ্গলবার চাম্বে অঞ্চলের শহর হতে ভারতীয় সেনারা সরে এসেছে। এটি খু্ব বড় পাকিস্তানি হামলা ছিল। এই হামলায় ছিল পাকিস্তানের একটি পদাতিক ডিভিশন ও ভারি সামরিক সজ্জায় সজ্জিত তিনটি ব্রিগেড। কাশ্মিরের রাজধানী শ্রীনগরের সঙ্গে নয়াদিল্লির প্রধান সড়ক চাম্বে অঞ্চলের পশ্চিমে। পাকিস্তান এই সড়ক দখল করে নয়াদিল্লি থেকে কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়।

কলকাতায় ভারতীয় সেনাদের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ভারতীয় সেনারা তিনটি কলামে পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক থেকে ঢাকা অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে। ঢাকার ২৮ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে দাউদকান্দিতে মেঘনা নদীর তীরে ভারতীয় সেনারা পৌঁছে গেছে। ভারতীয় সেনাদের আরেকটি অংশ যশোর থেকে অগ্রসর হচ্ছে। ঢাকার ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে পূর্ব-পাকিস্তানের শহর যশোর গত মঙ্গলবার ভারতীয়রা অধিকার করেছে। ঢাকার ৫০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে কুমিল্লায় পাকিস্তানি সেনাদের কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে।

তবে যুদ্ধাঞ্চলগুলোতে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ভারত ও পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের দাবিগুলো যাচাই করা যায়নি। কলকাতায় ভারতীয় সেনাদের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের ওই মুখপাত্র আরো জানিয়েছেন, কুমিল্লার পাকিস্তানি ক্যান্টনমেন্ট অধিকারে নেওয়ার জন্য সেখানে ভারতীয় সেনারা তীব্র যুদ্ধ করছে। এ ছাড়া কুমিল্লায় ভারতীয় সেনারা তেমন কোনো বাধার সন্মুখীন হয়নি। ঢাকার দক্ষিণ-পূর্বে চাঁদপুর নৌবন্দর ভারতীয় সেনারা অধিকার করেছে। এখান থেকে নদীপথে ঢাকায় প্রবেশ করা যায়।

তিনি আরো জানিয়েছেন, ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধবিমান চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর, কক্সবাজার ও চালনা সমুদ্র বন্দরে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। চালনায় তিনটি পাকিস্তানি গানবোট ধ্বংস করা হয়েছে। ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধবিমান রাতে চট্টগ্রামের পাকিস্তানি সেনা ব্যারাকে হামলা চালায়। কলকাতার দুইশ মাইল উত্তরে পূর্ব-পাকিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হিলি এলাকায় তুমুল যুদ্ধ হচ্ছে।

পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ পূর্ব-পাকিস্তানে ভারতীয় সেনাদের অগ্রসর হওয়ার কথা স্বীকার করলেও এই বিষয়ে ভারতীয় বর্ণনা অস্বীকার করেছে। রাওয়ালপিণ্ডিতে পাকিস্তানি মুখপাত্র জানিয়েছেন, পূর্ব-পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে বেনাপোল ও চা-বাগান সমৃদ্ধ সিলেটে যাওয়ার মূল সড়কের মধ্যবর্তী অঞ্চল ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে পাকিস্তানি সেনারা সরে আসছে। নয়াদিল্লিতে ভারতীয় মুখপাত্র জানিয়েছেন, পশ্চিম ফ্রন্টের কাশ্মিরের মূল ভারতীয় সামরিক অবস্থানগুলোতে পাকিস্তান এখনো হামলা চালায়নি। মুখপাত্র এই যুদ্ধকে ভারতের জন্য ‘প্রতিরক্ষা যুদ্ধ’ বলে দাবি করেন। তিনি হতাহত নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

ভারতের ইউনাইটেড নিউজকে ভারতীয় সেনাদের একজন কমান্ডার জানিয়েছেন, চাম্বে অঞ্চল বাদে কাশ্মিরের বাকি অংশে ভারতীয় সেনারা অগ্রসর হয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাশ্মিরের দক্ষিণ-পশ্চিমের যুদ্ধে ভারতীয়রা ১৫টি ট্যাংক হারিয়েছে এবং পাকিস্তানের ৩৫টি ট্যাংক ধ্বংস করেছে।

ভারতীয় সেনারা চাম্বে অঞ্চলে সরে এসে তায়ী নদীর পূর্বতীরে ও পাকিস্তানি সেনারা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থান নিয়েছে। রাওয়ালপিণ্ডিতে এক পাকিস্তানি মুখপাত্র দাবি করেছেন, পাকিস্তানি সেনারা নদী অতিক্রম করে পূর্বতীরে ভারতীয় সেনাদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। ১৯৪৮ সালে সংঘটিত প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি যে রেখা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তায়ী নদীর অবস্থান প্রায় সেই রেখা বরাবর।

এদিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ভারতের বেসামরিক বিমানবন্দর ভুজ-এ পাকিস্তান বিমান হামলা করেছে বলে জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই বিমান হামলার ক্ষতির পরিমাণ সামান্য বলে উল্লেখ করেছেন। ভারতীয় মুখপাত্র জানিয়েছেন, পাকিস্তানের করাচিসহ পশ্চিম ও পূর্ব উভয় অংশের পাকিস্তানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ভারতীয় বিমান সেনারা তীব্র হামলা চালাচ্ছে। এই অভিযানে তিনটি পাকিস্তানি বিমান ধ্বংস করা হয়েছে। তবে কোনো ভারতীয় বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এ পর্যন্ত ৬০টি পাকিস্তানি বিমান ধ্বংস করা হয়েছে এবং নিজেরা ২৫টি বিমান হারিয়েছে। অপরদিকে পাকিস্তান বলছে, ৯৮টি ভারতীয় বিমান ধ্বংস করা হয়েছে এবং নিজেরা ছয়টি বিমান হারিয়েছে।

পত্রিকা পরিচিতি:‘রোম নিউজ-ট্রিবিউন’ যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা। ১৮৪৩ সাল থেকে পত্রিকাটি প্রকাশিত হচ্ছে। পত্রিকাটির প্রকাশক দ্য নিউজ পাবলিশিং কোম্পানি।

(মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের সহযোগিতায় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নির্বাচিত প্রতিবেদন নিয়ে ইত্তেফাকের এ আয়োজন। মূল প্রতিবেদনটি সংগ্রহ ও অনুবাদ করেছেন মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের পরিচালক সাব্বির হোসাইন।)

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ নভেম্বর, ২০২০ ইং
ফজর৫:০৭
যোহর১১:৫১
আসর৩:৩৬
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩৩
সূর্যোদয় - ৬:২৭সূর্যাস্ত - ০৫:১০
পড়ুন