বাসের বেপরোয়া গতি ও চালকের অবহেলাই দায়ী
তারেক ও মিশুকের মৃত্যুর ঘটনায় আদালতের পর্যবেক্ষণ
দিদারুল আলম২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ইং
বাসের বেপরোয়া গতি ও চালকের অবহেলাই দায়ী
‘বৃষ্টির মধ্যে বেপরোয়া গতিতে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোর কারণেই সৃষ্ট দুর্ঘটনায় ঝরে যায় মূল্যবান পাঁচটি প্রাণ। এদের মধ্যে ছিলেন দেশের মিডিয়া জগতের প্রথিতযশা দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র তারেক মাসুদ ও মিশুক মনির। এ মৃত্যু দেশ ও জাতির জন্য অপরিমেয় ক্ষতি। আর এই মৃত্যুর জন্য বাস চালক আসামি জমিরের বেপরোয়া গাড়ি চালানো ও অবহেলাই একমাত্র দায়ী মর্মে রায় দিয়েছে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত।

রায়ে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের বাসটির স্পিড গভর্নর সিল ট্যাম্পার্ড (কারসাজি) করে নিজের ইচ্ছেমতো গাড়ির নিয়ন্ত্রিত গতির চেয়ে অধিক গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল চালক মো. জামির হোসেন ওরফে জমির ড্রাইভার। গাড়ির ফিটনেস এবং চালকের নাবয়নকৃত ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিলো না। ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ ঘটনার প্রায় তিন বত্সর পূর্বে শেষ হয়ে যায়। এরপরেও আসামি লাইসেন্স নবায়ন না করে ভুয়া আবেদন স্লিপ ব্যবহার করে গাড়ি চালাচ্ছিল। ঘটনার সময় বৃষ্টি হচ্ছিল এবং ফিটনেস বিহীন ঘাতক বাসটিকে সড়কের বাঁকের মধ্যে অবহেলার সাথে বেপরোয়া গতিতে চালিয়ে একটি মিনিবাসকে ওভারটেক করে তারেক ও মিশুককে বহনকারী মাইক্রেবাসটিকে নির্মম ভাবে আঘাত করে। ফলে ঘটনাস্থলেই ৫ জনের মৃত্যু ঘটে। এতে বাংলাদেশের মিডিয়া জগত্ ব্যাপক ভাবে ক্ষিতগ্রস্ত হয়। গতকাল বুধবার মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত দায়রা জজ আল-মাহমুদ ফায়জুল কবীর তার রায়ে এই পর্যবেক্ষণ দেন। রায়ে আসামি জমির ড্রাইভারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত।

৫৫ পৃষ্ঠার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক ফায়জুল কবীর বলেছেন, রাষ্ট্রপক্ষের ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, এজাহার, তদন্ত প্রতিবেদন এবং দালিলিক সাক্ষ্যসমূহ বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট ঘটনাস্থলে তারেক মাসুদ ও মিশুক মনিরসহ মোট ৫ জন মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। মাইক্রোবাসে মোট ১০ জন আরোহীর মধ্যে তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদসহ অন্য আরোহীরা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। তারেক মাসুদ ছিলেন একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্র নাট্যকার, লেখক এবং গীতিকার। অন্যদিকে মিশুর মনির ছিলেন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক, সম্প্রচার কিংবদন্তী, টেলিভিশন সাংবাদিকতার পথিকৃত ও বিশিষ্ট চিত্র গ্রাহক। মিশুক মনির ছিলেন শহীদ বুদ্ধিজীবী ও নাট্যকার মুনির চৌধুরীর ছেলে এবং এ.টি.এন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। এ দুই গুণী সৃজনশীল মানুষের মৃত্যুতে মিডিয়া জগতে গভীর শোক নেমে আসে। এ দুইজন গুণী ব্যক্তি ছাড়াও আরো তিনজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। সাক্ষীদের সাক্ষ্য থেকে তাদের মর্মান্তিক মৃত্যুর করুণ কাহিনী ফুটে উঠে।

রায়ে বলা হয়, এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হলেন, তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ, ঢালি আল মামুন, দিলারা বেগম জলি ও সাইদুল ইসলাম। কেননা, তারা দুর্ঘটনা কবলিত মাইক্রোবাসের অভ্যন্তরে দশ জন যাত্রীর অন্যতম ছিলেন। তাদের চোখের সামনেই বহনকারী মাইক্রোবাসটির সাথে বিপরীত দিক থেকে আসা ঘাতক বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। কাজেই, কথিত ঘটনা বা দুর্ঘটনার বিষয়ে এই চারজন অপেক্ষা উত্কৃষ্টতর আর কোনো সাক্ষী থাকতে পারে না।

সাক্ষীদের সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে বিচারক বলেন, চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের ঘাতক বাসটি তার নির্ধারিত ট্র্যাকের বাইরে গিয়ে বেআইনিভাবে মাইক্রোবাসটিকে আঘাত করে। এরপরই বাসটি দক্ষিণ দিকে অর্থাত্ তার চলার পথের সঠিক ট্র্যাক তথা বাম দিকে চলে যায়। কেননা, ঘাতক বাসটিকে জব্দ করার সময় সেটিকে দক্ষিণ পাশে থেমে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায়। একই সময়ে দুর্ঘটনা কবলিত মাইক্রোবাসটি রাস্তার উত্তর পাশে ছিল। উভয় পরিবহন তাদের স্ব-স্ব সঠিক ট্র্যাকে থাকলে সংঘর্ষ বা দুর্ঘটনা হওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। এছাড়া সাক্ষীদের অভিন্ন ও অকাট্য সাক্ষ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আসামি রাস্তার বাঁকে বৃষ্টির মধ্যেও স্পিড কমানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি, বরং, এরূপ প্রতিকূল অবস্থাতেও আসামি যেনে শুনে বেপরোয়া গতিতে বাস চালাচ্ছিল। বাঁক ঘুরার সময় রং সাইডে গিয়ে মাইক্রোবাসটিকে আঘাত করে। এতে আসামির ইচ্ছাকৃত অবহেলা এবং বেপরোয়া গতিতে বাস চালানোর প্রমাণ পাওয়া যায়।

মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী বি.আর.টি,এ এর উপ-পরিচালক মোঃ আঃ সাত্তারের দাখিলকৃত প্রতিবেদন তুলে ধরে রায়ে বলা হয়, বাসের স্পিড গভর্নর সিল টেম্পারড (কারসাজি) থাকলে ড্রাইভার ইচ্ছে করলে তার বাসে উল্লেখিত সর্বোচ্চ গতির চেয়েও বেশি গতিতে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাতে পারেন। এ কারণে বাসটির স্পিড গভর্নর সিল ট্যাম্পারড থাকায় এটা প্রতীয়মান হয় যে, আসামি সব সময়ই ঘাতক বাসটিকে বেপরোয়া ও দ্রুতগতিতে চালাত। আসামি জমির ড্রাইভার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ঘাতক বাসটিকে বেপরোয়া গতিতে চালানোর মানসিকতা পোষণ না করত তাহলে এই দুর্ঘটনা ঘটত না।

রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক ঘটনা দ্বারা আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা ও ৪২৭ ধারার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। কাজেই, এ ধরনের অপরাধ সংঘটনকারী আসামিকে দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে নমনীয়তা প্রদর্শনের কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। এমতাবস্থায় আসামিকে দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় (খুন বলিয়া গণ্য নয় কিন্তু নরহত্যা করে) দোষী সাব্যস্ত করে ক্রমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দণ্ডবিধির ৪২৭ ধারায় (পঞ্চাশ টাকা বা তদূর্ধ্ব পরিমাণ ক্ষতি করে অনিষ্ট সাধন) দোষী সাব্যস্ত ক্রমে ২ বত্সরের সশ্রম কারাদণ্ড ও দুই হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হলো।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ইং
ফজর৫:১০
যোহর১২:১৩
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৪
সূর্যোদয় - ৬:২৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
পড়ুন