পিস্তলের ম্যাগাজিনের সূত্র ধরে লিটন হত্যার রহস্য উদঘাটন
কর্নেল (অব.) কাদের ১০ দিনের রিমান্ডে
পিস্তলের ম্যাগাজিনের সূত্র ধরে লিটন হত্যার রহস্য উদঘাটন
একটি মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনায় ছিনতাইকারীদের ফেলে যাওয়া ৬টি গুলিসহ একটি ম্যাগজিনের সুত্র ধরে ৫২ দিন পর এমপি লিটন হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। এমনকি হত্যাকান্ডে ব্যবহূত পিস্তল, পিস্তলের ম্যাগজিন, শর্টগানের কভার, ১০টি গুলির খোসা, মোবাইলের সিম ও একটি মোটরসাইকেলও উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল সকালে গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপার অফিস চত্বরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর রেঞ্জের ডিইজি খন্দকার গোলাম ফারুক এসব কথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, এমপি লিটন হত্যার মুল পরিকল্পনাকারী ও অর্থ যোগানদাতা ছিলেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) ডা. আব্দুল কাদের খাঁন। বুধবার তাকে ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে এই নৃসংশ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, লিটন হত্যাকান্ডের পর থেকে পারিবারিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং জামাত-শিবিরের টার্গেটসহ নানাদিক নিয়ে তদন্ত ও গ্রেফতার অভিযান চালিয়ে আসছিলো পুলিশ। কিন্তু একটি মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনায় সড়কে কুড়িয়ে পাওয়া ৬টি গুলিসহ একটি পিস্তলের ম্যাগজিন তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হত্যা মামলার সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা (সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমান) জানান, গত ১ ডিসেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কের ধোপাডাঙ্গার নয়া বাজার এলাকায় ফাহিম নামে এক যুবকের একটি মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ছিনতাই শেষে দুর্বৃত্তরা তাড়াহুড়া করে পালাতে গিয়ে অসাবধানতাবশত: ওই এলাকায় ৬টি গুলিসহ একটি ম্যাগজিন ফেলে রেখে যায়। স্থানীয় কয়েকজন ওই ম্যাগজিনটি কুড়িয়ে পেয়ে থানায় জমা দেন। পরে পরীক্ষা করে দেখা যায় এমপি লিটনের শরীর থেকে অপারেশন করে বের করা গুলি এবং তার বাড়িতে হত্যার পর প্রাপ্ত গুলির খোসার সঙ্গে কুড়িয়ে পাওয়া ওই ম্যাগজিনের গুলির মিল রয়েছে। এই সুত্র ধরে সুন্দরগঞ্জ থানা পুলিশ কাদের খাঁনকে তার লাইসেন্সকৃত পিস্তল ও গুলি থানায় জমা দিতে বলে। কিন্তু কাদের খান মোট চল্লিশ রাউন্ড গুলির মধ্যে মাত্র ১০ রাউন্ড থানায় জমা দেন। বাকী গুলি কি করলেন - এ প্রশ্ন করা হলে তার কোন সন্তোষজনক জবাব তিনি দিতে পারেননি। ফলে ওই ছিতনাইকারীদের খোঁজা শুরু হয়। বের হতে থাকে লিটন হত্যাকান্ডের মূল রহস্য।

তিনি আরো জানান, মঙ্গলবার ভোর রাতে জেলা শহরের ব্রিজ রোড এলাকা থেকে ওই ছিনতাইয়ে অংশ নেয়া কর্নেল কাদেরের দুর সস্পর্কের ভাগ্নে ও তার বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক শাহীন মিয়া (২৩), কাজের লোক রাসেদুল ইসলাম ওরফে মেহেদী হাসান (২২) এবং তার গাড়ির চালক আব্দুল হান্নানকে (২৭) আটক করা হয়। পুলিশের কাছে তারা এই হত্যাকান্ডের বর্ণনা দেন। তাদের স্বীকারোক্তি মোতাবেক সাবেক এমপি কর্ণেল (অব.) ডা. আব্দুল কাদের খাঁনকে মঙ্গলবার বিকেলে বগুড়া জেলা শহরের গরীব শাহ ক্লিনিক সংলগ্ন বাসা থেকে আটক করা হয়। পরে ওইদিন রাতেই সাড়ে ৯টার দিকে বগুড়া থেকে কাদের খাঁনকে পুলিশভ্যানে করে গাইবান্ধা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। বুধবার দুপুর ১২টায় ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে গাইবান্ধার আদালতে কাদের খাঁনকে হাজির করা হয়। আদালতের বিচারক অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মইনুল হাসান ইউসুব শুনানি শেষে তার ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

কর্নেল কাদেরের দুর সস্পর্কের ভাগ্নে ও তার বাড়ির তত্তাবধায়ক শাহীন মিয়া সুন্দরগঞ্জ উপজেলার উত্তর সমস কবিরাজটারী গ্রামের ওসমান গনি ভুট্টুর ছেলে। কাজের লোক রাসেদুল ইসলাম ওরফে মেহেদী হাসান একই গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে। গাড়ীর চালক আব্দুল হান্নান বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার কামারপাড়ার আব্দুর রহমান প্রামানিকের ছেলে। কাদেরের ঘনিষ্টজন হিসাবে পরিচিত আব্দুল হান্নান দীর্ঘ ৮ বছর থেকে তার গাড়ির চালক হিসাবে কর্মরত আছেন।

সংবাদ সম্মেলনে ডিইজি খন্দকার গোলাম ফারুক আরো জানান, কর্ণেল কাদের খাঁনের গাড়ি চালক আবদুল হান্নান হত্যাকান্ডের পর কিলারদের পালিয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করেন। হত্যাকান্ডে তার ভাগ্নে কাম ও বাড়ির তত্তাবধায়ক শাহীন মিয়া, কাজের লোক বলে পরিচিত রাসেদুল ইসলাম ওরফে মেহেদী হাসানসহ চারজন অংশ নেয়। এরমধ্যে রানা নামে একজন পলাতক রয়েছে।

পুলিশ লিটনের হত্যার পরিকল্পনাকারী ও খুনিদের গ্রেফতার করায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী লিটনের বোন ফাহমিদা বুলবুল কাকলী। লিটনের স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদ জাহান স্মৃতি ও উপস্থিত একাধিক জেলা আওয়ামী লীগ নেতারাও অনুরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

জেলা জজ আদালতের সরকার পক্ষের পিপি অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম শফি বলেন, চাঞ্চল্যকর এমপি লিটন খুনের মামলাটি জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত বিচারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সে কারণেই এই মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

কাদের খানই লিটন হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী: আইজিপি

চট্টগ্রাম অফিস জানায়, পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক বলেছেন, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম লিটনকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি আবদুল কাদের খান। তার ইচ্ছা ছিল লিটনকে যদি সরিয়ে দেয়া যায়, তাহলে তার পথ পরিস্কার হবে এবং পরবর্তীতে এমপি হতে পারবেন। আইজিপি বলেন, কাদের খানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ব্যাপারে আমাদের বিন্দুমাত্র কোনো সংশয় নেই। আমরা যাদের শনাক্ত করেছি তারাই খুন করেছে এবং খুনের পরিকল্পনা করেছে। পুরো বিষয়টি উদঘাটন করা হয়েছে। গতকাল বুধবার নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইন মাঠে সিএমপির ?বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুলিশ সমাবেশে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এসব কথা বলেন আইজিপি। এসময় তার সাথে ছিলেন সিএমপি কমিশনার মো. ইকবাল বাহার।

খুনের পর জামায়াতকে দায়ী করা হয়েছিল কেন, জানতে চাইলে একেএম শহীদুল হক বলেন, জামায়াতকে সন্দেহ করাটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ সুন্দরগঞ্জে ২০১৩ সালে ৪ জন পুলিশকে হত্যা করেছিল জামায়াত। সেসময় গাইবান্ধায় যারা নাশকতা করেছে, হত্যাকান্ড করেছে তাদের সবাই জামায়াতের। খুনের পর অনেককেই সন্দেহ করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ একেবারে শতভাগ পেশাদারিত্ব নিয়ে একেবারে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করেছে এবং ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে।

আইজিপি বলেন, তিনজন কিলার মোটর সাইকেলে করে লিটনের বাড়িতে গিয়ে তাকে গুলি করেছে। সেই মোটর সাইকেলটি উদ্ধার হয়েছে এবং তিনজন কিলারকে আমরা গ্রেফতার করেছি। দুইজন মঙ্গলবার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। আরেকজন গ্রেফতার হয়েছে, তাকেও আমরা জবানবন্দি নেয়ার জন্য আদালতে পাঠাবো।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ইং
ফজর৫:১০
যোহর১২:১৩
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৪
সূর্যোদয় - ৬:২৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
পড়ুন