রায় নিয়ে রাজনীতি করবেন না
ষোড়শ সংশোধনী বাতিল নিয়ে প্রধান বিচারপতি
ইত্তেফাক রিপোর্ট১১ আগষ্ট, ২০১৭ ইং
রায় নিয়ে রাজনীতি করবেন না
রায়ের বিচার করবে ইতিহাস ** কারো ফাঁদে পা দেব না ** গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানাই

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে কেউ রাজনীতি করবেন না। আপিল বিভাগের সাতজন বিচারক অনেক চিন্তাভাবনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ওই রায় দিয়েছেন। শুধু এটুকু বলব, বিচার বিভাগকে রক্ষা করুন। এখানে কোনো পক্ষ রাজনীতি টেনে আনবেন না। আমরা কারো ফাঁদে (ট্র্যাপ) পা দেব না।

ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য আদালত অবমাননাকর— সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির এমন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি গতকাল বৃহস্পতিবার এসব কথা বলেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট বারের আবেদন আমলে নেননি প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, আমরা যে রায় দিয়েছি তার বিচার ইতিহাস করবে। তবে রায়ের গঠনমূলক যে কোনো সমালোচনাকে আমরা স্বাগত জানাই।

 বুধবার আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে বক্তব্য রাখেন। কমিশন কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করায় বিচারকদের জবাবদিহিতা রইল কোথায়? কারণ জনগণের কাছে তো তাদের জবাবদিহিতা থাকছে না। এখন আমার মনে হচ্ছে ‘উই আর নো লংগার ইন পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ, উই আর রাদার ইন দ্যা জাজেস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’।

তিনি বলেন, রায়ে পার্লামেন্টকে অপরিপক্ক বলে সমালোচনা করা হয়েছে। এটাতো উচিত নয়। প্রধান বিচারপতি যদি বলেন, পার্লামেন্ট অপরিপক্ক তাহলেতো আমাকেও বলতে হয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা অপরিপক্ক। আমরা লক্ষ্য করেছি এ রায় হওয়ার অনেক আগে থেকে অনেক বিচারপতি এমপিদের বিষয়ে বিভিন্ন সেমিনারে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। এতে মনে হয় অনেক আগে থেকেই এ রায়ের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা ছিল।

তার এই বক্তব্য বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্বলিত ওইসব পত্রিকা আপিল বিভাগের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। এ সময় বার সভাপতির সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও অ্যাডভোকেট এজে মোহাম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, বার সম্পাদক ব্যারিস্টার এম মাহবুবউদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল প্রমুখ।

বার সভাপতি জয়নুল আবেদীন আদালতে বলেন, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি। তিনি ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে বলেছেন, ওই রায় ছিল বিচারপতিদের পূর্বধারণা প্রসূত। জনগণের নয়, বিচারকের প্রজাতন্ত্রে আছি বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখার জন্য তার ওই বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া উচিত আদালতের। এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনারা বারের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। আপনারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কথা বলছেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর এর গঠনমূলক সমালোচনা করা যায়। সেই গঠনমূলক সমালোচনাকে আমরা গ্রহণ করি।

বার সভাপতি বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের রায় ও বিচারকদের নিয়ে যে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছে তা গুরুতর আদালত অবমাননাকর। প্রধান বিচারপতি  বলেন, আমি শুধু এটুকু বলব আপনারা (সরকার ও বিরোধী পক্ষ আইনজীবী) বিচার বিভাগকে রক্ষা করুন। কোনো পক্ষ বিচার বিভাগে রাজনীতি টেনে আনবেন না। আমরা ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে যে রায় দিয়েছি তা ইতিহাস বিচার করবে। আমরা কোনো প্রতিবাদ দেব না।

এ সময় ডায়াসের পেছনের বেঞ্চে বসা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম দাঁড়িয়ে বলেন, বারে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফলে তাদের বক্তব্য বারের বক্তব্য হতে পারে না। সরকার দলীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, তাদের বক্তব্য জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের। এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা সচেতন, আমরা বিষয়টি দেখছি।

বার সম্পাদক ব্যারিস্টার এম মাহবুবউদ্দিন খোকন বলেন, বিচারপতি খায়রুল হক যে বক্তব্য দিয়েছেন তা বিচার বিভাগকে হেয় প্রতিপন্ন করেছে। সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদাকে কেউ খাটো করতে পারে না। যদি কেউ করে তাহলে এ বিষয়ে আদালতের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি অনুরোধ করছি আপনারা সংযত আচরণ করুন। আমরা সচেতন আছি, কারো ট্র্যাপে (ফাঁদ) আমরা পড়ব না। আপিল বিভাগের সাতজন বিচারক চিন্তাভাবনা করে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় দিয়েছেন। রায় নিয়ে কেউ রাজনীতি করবেন না।

বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, কোর্টকে স্ক্যান্ডালাইজ (কুত্সা রটানো) করার কারণেই মাহমুদুর রহমানকে সাজা দেওয়া হয়েছিলো। সুপ্রিম কোর্ট ও বিচারকদের কেউ স্ক্যান্ডালাইজ করলে তা হবে আদালত অবমাননার শামিল। এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, মাহমুদুর রহমান তার পত্রিকায় লিখেছিলেন ‘চেম্বার জজ মানে স্টে’। ওই প্রতিবেদনটি ছিলো আদালত অবমাননাকর। তিনি বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে যে রায় দিয়েছি তার প্রতি আমরা অটল রয়েছি। এখানে বারের সভাপতিসহ সিনিয়র আইনজীবীরা আছেন। আপনাদের বলছি এই রায় নিয়ে সংযত আচরণ করুন। যাতে কেউ ফায়দা লুটতে না পারে।’

এ সময়ে ডায়াসের বাম পাশে দাঁড়ানো ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও মোমতাজউদ্দিন ফকির। মোতাজউদ্দিন ফকির বলেন, বার এ বিষয়ে কোন রেজ্যুলেশন গ্রহণ না করেই বক্তব্য রাখছে। এ পর্যায়ে তার উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আদালতের পরিবেশ বজায় রেখে চলবেন। আমি তো তাদের বক্তব্যের জবাব দিচ্ছি। আপনি কেন দাঁড়িয়েছেন?’

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, বিচারপতি খায়রুল হকের বক্তব্য আদালত অবমাননাকর। কারণ তিনি বলেছেন রায় ছিলো পূর্ব ধারণাপ্রসূত। প্রধান বিচারপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রীও যদি রায়ের গঠনমূলক সমালোচনা করেন তাহলে আমরা সেটিকে গ্রহণ করব।

বার সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, অর্থমন্ত্রী রায় নিয়ে কটাক্ষপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু আদালতের নজরে আনিনি। কিন্তু একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি আইন কমিশনের দায়িত্বশীল পদে আছেন। তিনি কি এভাবে রায়ের সমালোচনা করতে পারেন? প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা সচেতন (উই কনসার্ন) আছি।’

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ আগষ্ট, ২০২০ ইং
ফজর৪:১১
যোহর১২:০৪
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৩৮
এশা৭:৫৬
সূর্যোদয় - ৫:৩২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৩
পড়ুন