স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রেতাত্মারা সুযোগ পেলেই ছোবল মারে :প্রধানমন্ত্রী
আওয়ামী লীগের যৌথ সভায় ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে ক্ষোভ
বিশেষ প্রতিনিধি১১ আগষ্ট, ২০১৭ ইং
স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রেতাত্মারা সুযোগ পেলেই ছোবল মারে :প্রধানমন্ত্রী
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণের একাংশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে ছোট করা হয়েছে দাবি করে তা আইনগতভাবে মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যদের যৌথসভায় রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ কারোর একক নেতৃত্বে আসেনি—এমন বক্তব্যের মধ্যে মূলত বাংলাদেশকে অস্বীকার করা হয়েছে। সার্বভৌম সংসদ নিয়েও রায়ের পর্যবেক্ষণে যা কথা বলা হয়েছে তা অগ্রহণযোগ্য। কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রচণ্ড দাবির মুখে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে ছোট করা হয়েছে, এটা দুঃখজনক। আইনগতভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করা হবে।

এদিকে বৈঠকের সূচনা বক্তৃতায় দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে আবার যাতে ষড়যন্ত্র ‘দানা বাঁধতে’  না পারে সে বিষয়ে দেশবাসীকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা স্বাধীনতা বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ চায়নি, তাদের প্রেতাত্মা এখনো এদেশে রয়ে গেছে। তারা সুযোগ পেলে ছোবল মারে। এ ব্যাপারে বাঙালি জাতিকে সতর্ক থাকতে হবে। কারা তাদের কল্যাণে কাজ করে এ বিষয়টি জনগণকে বোঝাতে হবে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যদের যৌথসভায় সূচনা বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ১৫ আগস্টের কালো দিবস যদি না আসতো তবে ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ হতো। দুর্ভাগ্য বাঙালির যারাই এ জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কাজ করে, যারাই এদেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে কাজ করে, যখনই মানুষ সুফল পেতে শুরু করে তখনই ষড়যন্ত্র আরো দানা বেঁধে উঠে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পঁচিশ বছর ধরে ইতিহাস থেকে জাতির পিতার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। কেউ কেউ একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলছেন, একক নেতৃত্বে স্বাধীনতা আসেনি। একক চেষ্টায় কোনো কিছু হয় না। কিন্তু সব কিছুর পেছনে লক্ষ্য থাকে, আদর্শ থাকে, স্বপ্ন থাকে, প্রেরণা থাকে, নেতৃত্ব থাকে, শক্তি থাকে; সেই শক্তি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ অবশ্যই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এসেছে। তবে কাউকে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে। কিছু কিছু লোক থাকে, তারা সুযোগ পেলে বিকৃত ইতিহাস সামনে তুলে নিয়ে আসে। কিন্তু বিকৃত ইতিহাস এখন আর কেউ বিশ্বাস করাতে পারে না। ইতিহাস চাপা দিয়ে রাখতে পারে না।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা ও পরবর্তীতে দলটির নেতাদের আচরণের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে গিয়েছিল তাকে তো বাঙালিরা ব্যারিকেড দিয়ে আটকও করেছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির অধিকার আদায়, স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ত্যাগ ও অবদানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা যদি জীবনে এত ত্যাগ স্বীকার না করতেন তাহলে জাতির ৮০ ভাগ মানুষ দরিদ্র্যসীমার নিচে বাস করতো, এই দেশের মানুষের জীর্ণ শীর্ণ শরীর, বিদেশ থেকে কাপড় এনে পরতে হতো। এই রকম একটা পরিবেশ, এই রকম একটা জাতিকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন জাতির পিতা। তিনি বলেন, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাকিস্তানের শাসক ইয়াহিয়া গ্রেফতার করেন জাতির পিতাকে। শুধু তাই না ২৬ মার্চ ইয়াহিয়া যে ভাষণ দিয়েছিলো সেখানে বঙ্গবন্ধুর কথাই বলেছিলো, তাকে পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলো এবং তার বিচার সে করবে এই ঘোষণাও সে দিয়েছিলো। ইয়াহিয়া তার ঘোষণায় আর কারো নাম বলেনি। স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়াটাই ছিলো জাতির পিতার বড় অন্যায়। সেই অপরাধে ইয়াহিয়া অপরাধী করেছে জাতির পিতাকে। জিয়াউর রহমানও একজন মেজর ছিলো। তাকে কি গ্রেফতার করেছে, তার কি চাকুরি গিয়েছিলো? কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তার বিচার করে ফাঁসির রায়ে সইও করেছিলো ইয়াহিয়া।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বার বার প্রচার হচ্ছিল। আমাদের চট্টগ্রামের এক নেতা তিনি বললেন সেনাবাহিনীর কাউকে নিয়ে আসো। যেহেতু এটা যুদ্ধ, সেনাবাহিনীর কাউকে দিয়ে বলালে যেন যুদ্ধ যুদ্ধ মনে হয়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা হচ্ছিল। মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা হান্নান সাহেবসহ একে একে আমাদের অনেকে পাঠ করা শুরু করেন। ২৭ তারিখে জিয়াউর রহমান যখন সোয়াত জাহাজ থেকে পাকিস্তানি শাসকদের জন্য অস্ত্র নামাতে যান তখন আমাদের যারা ভলান্টিয়ার তারা তাকে বেরিকেড দেয়, তারা তাকে আটকায়। পরবর্তীতে যেহেতু একজন সেনা অফিসার দরকার তাকে নিয়ে আসা হয় এবং তাকে দিয়ে ঘোষণা পাঠ করা হয়। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা এসেছে, এটা শুধু দেশে না, আন্তর্জাতিকভাবেও প্রতিষ্ঠিত। এখন আর মানুষের কাছে বিকৃত ইতিহাস বিক্রি করা যায় না। তারপরও সুযোগ পেলে কেউ কেউ এই বিকৃত ইতিহাসকে সামনে আনার চেষ্টা করে।

ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে ক্ষুদ্ধ আওয়ামী লীগ

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ষড়োশ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে চরম ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা। এই সংশোধনী নিয়ে কী করণীয় সে সব বিষয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের মতামত চান দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এসময় প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ড. আবদুর রাজ্জাক, আবদুল মতিন খসরু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান, আইন সম্পাদক শ. ম রেজাউল, সিনিয়র নেতা শেখ আবদুল­াহ প্রমুখ বক্তৃতা করেন। বৈঠকে সিনিয়র নেতারা বলেন, ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংবিধানের ৭০’র অনুচ্ছেদ নিয়ে বলা হয়, পৃথিবীর গণতান্ত্রিক সব দেশে বিচারপতিদের ইমপিচমেন্ট করার ক্ষমতা সংসদের হাতে রয়েছে। একমাত্র সামরিক সরকার শাসিত দেশগুলোতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে। রায়ের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ‘কোনো একক ব্যক্তির কারণে হয়নি’ বলায় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সমালোচনা করে তারা বলেন, জাতির পিতার অবদান অস্বীকার করে তিনি কী বুঝাতে চাইছেন? কারো একক চেষ্টায় কোনো কিছুই হয় না। কিন্তু সব কিছুর পেছনে কারও উদ্যোগ থাকে, প্রেরণা থাকে, সাংগঠনিক ক্ষমতা থাকে এবং মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার শক্তি থাকে। সেই শক্তি ছিল  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের।  ষোড়শ সংধোনীর কয়েকটি পর্যবক্ষেণ আপত্তিকর। রায়ের সঙ্গে এসবের কোনও প্রাসঙ্গিকতা নেই। তবে সুপ্রিম কোর্ট আমাদের প্রতিপক্ষ নয়। কিন্তু বিএনপি ভিন্ন উদ্দেশে আমাদেরকে সুপ্রিম কোর্টের প্রতিপক্ষ বানাতে চাচ্ছে।

 

‘তারা দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে  কি না সন্দেহ’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারো নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অস্বীকারকারীদের দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস রয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে আদালতের রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার গণভবনে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

২০০১ সালে নির্বাচন পরবর্তী এবং ২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর অত্যাচারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্গাপূজার সময় যেন সঠিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা হয় ইতোমধ্যেই সে নির্দেশ দেয়া আছে।

 অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার বলেন, ‘জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী না হলে এস কে সিনহাও প্রধান বিচারপতি হতেন না। উনি (শেখ হাসিনা) আমাদের প্রধান বিচারপতি উপহার দিয়েছেন, আমরা কী দিয়েছি? বাংলাদেশের সনাতনী সমাজ (এস কে সিনহা) তার সঙ্গে নেই।’ এই রায় নিয়ে প্রধান বিচারপতি রাজনীতি করেছেন। ‘পৃথিবীর মানুষ জানে যে কার জন্য এই ভূখণ্ডের জন্ম। যে কথা ড. কামাল হোসেন আর ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সে কথা রায়ে কীভাবে আসে?’

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি জয়ন্ত সেন দীপু, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের সভাপতি দেবাশীষ পালিত, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি ডি এল চ্যাটার্জি, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি রমেশ ঘোষ, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক চন্দন তালুকদার, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তাপস পাল প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ আগষ্ট, ২০২০ ইং
ফজর৪:১১
যোহর১২:০৪
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৩৮
এশা৭:৫৬
সূর্যোদয় - ৫:৩২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৩
পড়ুন