সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল অত্যন্ত অস্বচ্ছ ও নাজুক
১১ আগষ্ট, ২০১৭ ইং
সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি অত্যন্ত অস্বচ্ছ এবং নাজুক। তাই এটি পরিবর্তন করে সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের স্বাধীনতা এবং তাঁদের চাকুরীর নিশ্চয়তা রক্ষা করা হয়েছিল সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী দ্বারা। জাতীয় সংসদ বিচার বিভাগের সাথে কোনো পাওয়ার কনটেস্টে অবতীর্ণ হয়নি। বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সুদৃঢ় করার প্রচেষ্টাই করেছে। 

আনিসুল হক বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি তার রায়ে অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা যেটা এই মামলার যে ফ্যাক্ট ইন ইস্যুর সাথে একদমই সম্পর্কিত না- সেরকম বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি জাতীয় সংসদ সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন এবং এই প্রতিষ্ঠানকে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন। আমি মনে করি, ওসব সকল রাজনৈতিক প্রশ্ন আদালত কর্তৃক বিচার্য বিষয় হতে পারে না।’

তিনি বলেন, আমরা প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে দুঃখিত। উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে অর্পণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণার রায় রিভিউয়ের বিষয়ে রায়ের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিতে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ কথা বলেন। এ সময় আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মোঃ জহিরুল হক উপস্থিত ছিলেন।

এই রায় রিভিউ করার বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যেহেতু এই রায়ে সংক্ষুব্ধ, তাই আমরা নিশ্চয়ই চিন্তাভাবনা করছি, এই রায় রিভিউ করা হবে কিনা? আমরা এখনো কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হইনি। কারণ রায়ের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো এখনো নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, সর্বোচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছে তার সাথে আমাদের দ্বিমত থাকলেও রায়ের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। যে যুক্তিতে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করেছেন সেইসব যুক্তি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সরকার এবং জাতীয় সংসদের কোনো দিনই এই অভিপ্রায় ছিল না যে, কোনো সংশোধনী দ্বারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন বা খর্ব করা হবে।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের বিবেচনায় ষোড়শ সংশোধনী দ্বারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরো সুদৃঢ় এবং স্বচ্ছ হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করে গণতন্ত্রের মৌলিক মন্ত্র চেক এন্ড ব্যালেন্স পদ্ধতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্দেশে ষোড়শ সংশোধনী পাস করা হয়। তিনি বলেন, ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত গণপরিষদে পাসকৃত সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারককে অপসারণ করা হয়নি। ১৯৭৭ সালের সামরিক শাসনামলে সংশোধিত ৯৬ অনুচ্ছেদ থাকা সত্ত্বেও সুপ্রিমকোর্টের অনেক বিচারককে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলে না নিয়েও চাকুরী থেকে অপসারণ করা হয়েছে রাজনৈতিক কারণে।

আইনমন্ত্রী বলেন, ১৯৭২ সালে গণপরিষদ কর্তৃক প্রণীত মূল সংবিধান যেটাকে বুকে ধারণ করে জন্ম নিয়েছে সেটা অসাংবিধানিক হতে পারে না। সংসদের মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণের বিধান ভারত, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ কমনওয়েলথভুক্ত ৩৮ শতাংশ দেশে বিদ্যমান রয়েছে। তবে আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদ নিজে তদন্ত করে না তৃতীয় কোনোপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত প্রমাণের দায়িত্ব প্রদান করে থাকে যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থী নয়। আমরাও অনুরূপ একটা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তির কারণে হয়নি। কারো নাম উল্লেখ না করে আইনমন্ত্রী এ বিষয়ে বলেন, তার ওই বক্তব্যে আমরা মর্মাহত। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যে আন্দোলনগুলো হয়েছে তারই ফলশ্রুতিতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন কিন্তু তারই নেতৃত্বে তারই আদর্শে নির্দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল।

আইনমন্ত্রী বলেন, জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য বঙ্গবন্ধু ছাড়া এ দেশের আর কেউ ১৩ বছরের অধিক কারাভোগ করেননি। তাই প্রধান বিচারপতির বক্তব্য আমাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। ইতিহাস এ কথাও বলে যে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে স্বাধীকার আন্দোলন শুরু হয়েছিল এবং ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জনগণের দেওয়া ক্ষমতায় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আজ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এই বাস্তব সত্যকে পুনরাবৃত্তি করতে হচ্ছে সেটাই অনেক কষ্টের এবং লজ্জার। তাই আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি, আমাদের নিরীক্ষায় প্রধান বিচারপতির রায়ে যেসব আপত্তিকর এবং অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য আছে সেগুলো এক্সপাঞ্জ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘দেশকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অপরাধীদের নৈরাজ্য, অপসংস্কৃতি এবং গণতন্ত্রকে ভুলুণ্ঠিত করার প্রথা থেকে শেখ হাসিনার সরকারই মুক্ত করেছে। তাই রায়ে যখন উল্লেখ থাকে যে, আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করছি ষোড়শ সংশোধনী দ্বারা, তখন ব্যথিত হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না।’ আনিসুল হক বলেন, ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড় এবং প্রতিষ্ঠানের চেয়ে দেশ বড়। এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, রায়ের পরপরই তড়িঘড়ি করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বৈঠক ডাকা দুঃখজনক। রায়কে রাজনৈতিকভাবে নয়, আইনগতভাবে মোকাবিলা করা হবে।

ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের সমালোচনা করায় বিএনপি নেতাদের সমালোচনারও জবাব দেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, যে দলের প্রধান জামিনে থাকা অবস্থায় বিদেশে যান অথচ আদালতের অনুমতি নেন না। তাদের দলের নেতাদের মুখে আইনের কথা মানায় না। তারা নিজেরা আগে আইন মানুক, তারপর এসে বক্তব্য দিক, তখন আমরা সেই বক্তব্য শুনব।

উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে অর্পণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় গত ১ আগস্ট প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ আগষ্ট, ২০২০ ইং
ফজর৪:১১
যোহর১২:০৪
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৩৮
এশা৭:৫৬
সূর্যোদয় - ৫:৩২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৩
পড়ুন