সেনাবাহিনীর নারীরা সুনাম অর্জন করেছেন বিদেশেও
সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে নারীদের আগ্রহ বাড়ছে, বর্তমানে কর্মরত নারী কর্মকর্তা ১২৮০ নারী আছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদেও। নারী সৈনিক আছেন ১ হাজার ৮৬০ শান্তিরক্ষা মিশনে নারী সদস্য আছেন ৬০ জন
আবুল খায়ের১১ মার্চ, ২০১৮ ইং
সেনাবাহিনীর নারীরা সুনাম অর্জন করেছেন বিদেশেও
বাংলাদেশের নারীরা পিছিয়ে নেই। শ্রম, মেধা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছেন তারা। এরই মধ্যে দুঃসাহসী ও চ্যালেঞ্জিং কর্মকান্ডে সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন নারীরা। দেশ রক্ষায় দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুরুষদের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নারী সদস্যরাও পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নারীরা অনেক দিন ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। শুধু দেশের মাটিতে নয়, বিদেশের মাটিতেও একের পর এক সুনাম অর্জন করছেন নারীরা। সেনাবাহিনীর নারী কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে তাদের সাহসিকতা ও দক্ষতার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন। জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে তাঁদের অনেকেই সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং করছেন। এছাড়া দেশে প্রথম নারী ছত্রীসেনা (প্যারাট্রুপার) হিসেবে সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌস ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সফলভাবে ১ হাজার ফুট উঁচু থেকে অবতরণের সম্মান অর্জন করেন। এরপর এপ্রিলে মেজর নুসরত নূর আল চৌধুরী বাংলাদেশের দ্বিতীয় নারী প্যারাট্রুপার হিসেবে সফলভাবে তার পঞ্চম প্যারাস্যুট জাম্প সম্পন্ন করেন।

জানা গেছে, সেনাবাহিনীতে বর্তমানে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা ১ হাজার ২৮০ জন। সর্বোচ্চ  ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে তারা কর্মরত রয়েছেন। মেডিক্যাল কোর ছাড়া নিয়মিত কমিশনে সর্বোচ্চ মেজর পদে আছেন নারীরা। এদিকে বর্তমানে নারী সৈনিকের সংখ্যা ১ হাজার ৮৬০ জন। এ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ২৩০ জন নারী জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে অংশ নিয়েছেন। এরমধ্যে ৬০ জন জন বর্তমানে শান্তি রক্ষা মিশনে আছেন। সূত্র জানায়, বর্তমান সেনাবাহিনী নারীবান্ধব। পুরুষদের সঙ্গে নারীদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করছে। এ কারণে সেনাবাহিনীকে যোগ দিতে নারীদের আগ্রহ বাড়ছে।

এদিকে সেনাবাহিনীর ইতিহাসে যুক্ত হয়েছেন প্রথম দুই নারী পাইলট। তারা হলেন মেজর নাজিয়া নুসরাত হোসেন ও মেজর শাহরীনা বিনতে আনোয়ার। আকাশজয়ী এ গর্বিত দুই নারী সদস্য ২০১৫ সালে তেজগাঁও আর্মি অ্যাভিয়েশন গ্রুপে শিক্ষানবিস পাইলট হিসেবে সফলভাবে প্রশিক্ষণ বিমান ‘সেসনা ১৫২ অ্যারোবাট-’এ একক ও দ্বৈত উড্ডয়ন পরিচালনা করেন। নাজিয়া ২০১৫ সালের ৭ মে উড্ডয়ন দক্ষতা প্রমাণ করতে প্রথম একক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেন। আর শাহরীনা একই বছরের ২১ মে প্রথম একক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেন। এর বাইরে টানা এক বছরের কঠিন প্রশিক্ষণ শেষে ২০১৪ সালের ২৯ জানুজারি টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে অবস্থিত শহীদ সালাউদ্দিন সেনানিবাসের শহীদ বীরউত্তম প্যারেড গ্রাউন্ডে নিজেদের সমাপনী কুচকাওয়াজে দেশের প্রথম নারী সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৮৭৯ জন নারী।

সশস্ত্র বাহিনীকে একবিংশ শতাব্দীর পেশাদার চৌকস বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ব্যাপক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকেই আর্মি মেডিক্যাল কোরে নারী ডাক্তার ও নার্সরা যোগদান করে আসছেন। আর্মি মেডিকেল কোরের পাশাপাশি ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অন্যান্য কোরেও নারী কর্মকর্তা নিয়োগ শুরু হয়। বর্তমানে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সার্ভিসে নারী কর্মকর্তারা দেশে ও বিদেশে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। সেই ধারাবাহিকতায় সেনাবাহিনীতে নারী সৈনিকের অন্তর্ভুক্তি বর্তমান সরকারের যুগান্তকারী উদ্যোগ। জাতির পিতা স্বাধীন দেশে আধুনিক সামরিক বাহিনীর গুরুত্ব অনুভব করেন। ১৯৭৪ সালে প্রণয়ন করেন জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি। তার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজকের এই গৌরবময় অবস্থায়। আর্মি মেডিকেল কোর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কঙ্গো, লাইবেরিয়া, আইভরি কোস্ট, পশ্চিম সাহারা, কুয়েতসহ পাঁচটি দেশে সেবা দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, সাহসী ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন ডা. সেতারা বেগম আমাদের গর্ব ও অহঙ্কার। একাত্তরে নারীরা সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়ে এবং খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে অনুপ্রেরণা ও ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তা ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা জানান।

জানা গেছে, বাংলাদেশে ২০০০ সালে সেনাবাহিনীর নিয়মিত কমিশনে নারীদের নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে সে সময় ব্যাপক সাড়া মেলে। আবেদনকারী তরুণীর সংখ্যা পৌঁছে যায় ১৪ হাজার ৯০২ জনে। এর মধ্যে প্রাথমিক নির্বাচনী পরীক্ষা, লিখিত পরীক্ষা, আইএসএসবি ও মেডিক্যাল পরীক্ষা শেষে ৪৭ বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের জন্য মনোনীত হন ৩০ জন। দুই বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ শুরু হয় ২০০১ সালের জানুয়ারি থেকে। তাদের মধ্যে ২০ জন সাফল্যের সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষ করে সর্বপ্রথম কমিশন লাভ করেন। ওই কোর্সের বাকি ১০ জনের মধ্যে কয়েকজন ৪৮তম বিএমএ লং কোর্সে অংশ নিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ শেষ করার সুযোগ পান। এরপর থেকে সেনাবাহিনীতে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। যদিও সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে আগে থেকেই নারী কর্মকর্তা ছিলেন।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে প্রথম নারী নেতৃত্ব দেন কর্ণেল নাজমা

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ২০১৬ সালে প্রথম একজন নারী নেতৃত্ব দেন দেন। আইভরিকোস্টে পাঠানো ওই মিশনে ৫৬ সদস্যের মেডিকেল কন্টিনজেন্টে নারী কমান্ডার নেতৃত্ব দেন কর্নেল ডা. নাজমা বেগম। আইভোরিকোস্টে লেভেল-২ হাসপাতালে কন্টিনজেন্টের সদস্যরা চিকিত্সা সেবা দেন। ৫৬ সদস্যের এ দলে ছয়জন নারী ছিলেন। এছাড়া  কর্নেল ডা. নাজমা বেগম সেনাবাহিনীর ইতিহাসে প্রথম নারী অধিনায়ক হিসেবে ২১ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের নেতৃত্ব দেন এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর অব মেডিকেল সার্ভিসেস হিসেবে ১১ পদাতিক ডিভিশনে (বগুড়া সেনানিবাস) কর্মরত ছিলেন।

শান্তি রক্ষা মিশনের নিজস্ব ম্যাগাজিনে এক নারী সেনা কর্মকর্তার সাহসিকতা

এদিকে ২০১১ সালে বাংলাদেশি এক নারী সেনা কর্মকর্তার সাহসী কাজ সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের (আসমিস) নিজস্ব ম্যাগাজিনে। ‘ওমেন ইন আনট্রাডিশনাল জবস ডিমাইনিং’ বা মাইন অপসারণের অপ্রথাগত কাজে নারী শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যাপ্টেন ফেরদৌসী কাশেম মাইন অপসারণের মতো বিপজ্জনক কাজে নিয়োজিত একটি সামরকি প্লাটুনের একমাত্র নারী সদস্য। তবে নারী হিসেবে নয়, একজন দক্ষ বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ হিসেবেই নিজেকে মূল্যায়ন করেন তিনি।

‘সেনাবাহিনীতে যোগদান করে নারীরা গর্বিত’

সম্প্রতি এই প্রতিবেদন সেনাবাহিনীতে যোগদানকারী নারী কর্মকর্তাদের সাক্ষাত্কার গ্রহণ করেন। তার অংশ বিশেষ এখানে দেওয়া হলো। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম নারী প্যারাট্রুপার (প্যারাস্যুট জাম্পার) ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত ২০০৭ সালে বাহিনীতে যোগদান করেন। ২০০৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি কমিশন লাভ করেন। জান্নাত বলেন, সেনাবাহিনীতে যোগদানের আগে অনেকে অনেক কিছু বলেছেন। কিন্তু মনোবল হারাইনি। প্রশিক্ষণে সহকর্মীদের (পুরুষ) ব্যবহার ও সহযোগিতার কারণে ইচ্ছা হয় আবার সেখানে গিয়ে অংশগ্রহণ করি। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। আমরা একটি পরিবারের মধ্যে থাকি। স্বামী-সংসার নিয়ে কোন সমস্যা হয় না। বরং পরিবারের সদস্যরা উত্সাহ বোধ করেন। সেনাবাহিনীতে যোগদান করে এবং প্রথম নারী প্যারাট্রুপার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরে জান্নাত গর্বিত বলে জানান। সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় নারী প্যারাট্রুপার মেজর নুসরত নূর আল চৌধুরী একই মতামত পোষণ করে বলেন, প্রশিক্ষণ যত শক্তিশালী হোক না কেন মনোবল ঠিক থাকলে নারীদের পক্ষে সব কিছুই করা সম্ভব।’

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ মার্চ, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৬
যোহর১২:০৯
আসর৪:২৭
মাগরিব৬:০৯
এশা৭:২১
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৬:০৪
পড়ুন