মিয়ানমারকেই সমস্যার সমাধান করতে হবে
রোহিঙ্গা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিনিধি দল
মিয়ানমারকেই সমস্যার সমাধান করতে হবে
জাতিসংঘের ক্ষমতাধর নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টির উত্স মিয়ানমারে। তাই মিয়ানমারকেই এ সংকটের দীর্ঘস্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধান দিতে হবে। এজন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে মিয়ানমার সরকারকে কাজ করতে হবে। গতকাল রবিবার কক্সবাজারে বিশ্বের সর্ববৃহত্ উদ্বাস্তু শিবির উখিয়ার কুতুপালং-বালুখালী পরিদর্শন শেষে নিরাপত্তা পরিষদের সফররত প্রতিনিধি দলের সদস্যরা এ কথা বলেছেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিনে দেখে প্রতিনিধি দল উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে সেখানে প্রাকৃতিক বিপর্যয়েরও আশঙ্কা করছেন তারা।

গতকাল দুপুরে কুতুপালং ২নং ক্যাম্পের ডি-৫ ব্লকের একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত প্রেস ব্রিফ্রিংয়ের শুরুতে বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের চলতি এপ্রিল সেশনের জন্য নির্বাচিত সভাপতি পেরুর স্থায়ী রাষ্ট্রদূত গুস্তাভো মেজা কুয়াদ্রা। তিনি বলেন, আমরা নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের উপায় বের করতে একমত হয়েছি। এ সমস্যা সমাধানে রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় দানকারী বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা সমস্যা সৃষ্টিকারী মিয়ানমার সফরে এসেছি। এত বড় মানবিক সংকটে বাংলাদেশের নানা সমস্যা সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যে মানবিক উদারতা দেখিয়েছে তার জন্য বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রশংসা করেন তিনি। রোহিঙ্গাদের দুর্দশার ব্যাপারে তিনি বলেন, আমরা এই শরণার্থী সংকট দেখে খুব উদ্বিগ্ন। আমরা এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশর পাশে থাকবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সফরের অন্যতম আয়োজক জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের স্থায়ী প্রতিনিধি কারেন

পিয়ার্স বলেন, মানবাধিকার লংঘনের ব্যাপারে আমরা কারো সাথে আপোস করবো না। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা রোহিঙ্গা সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের ব্যাপারে অনেকটা কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সমস্যা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে। আমরা এখান থেকে মিয়ানমারে যাবো। সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কীভাবে তারা যুক্ত হতে পারে তা জানতে চাইবো। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আমরা নিরাপত্তা পরিষদে সমর্থন দেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবো ও রোহিঙ্গাদের উপকারে আসে এমন সিদ্ধান্ত নেবো।

কুয়েতের স্থায়ী প্রতিনিধি মানসুর আল ওতাইবি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার মূল উত্স মিয়ানমারে। তাই এর সমাধান মিয়ানমারকে করতে হবে। তবে তা জাদুকরিভাবে রাতারাতি সম্ভব হবে না। এ ব্যাপারে সময় লাগবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কাছে সমস্যা সম্পর্কে অবগত হওয়া গেছে, এর পর মিয়ানমার সফরে আরো বেশি ভাল কিছু আশা করছি।

অপরদিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের চীন ও রাশিয়া প্রতিনিধিরা বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট নিরসন করতে হবে এবং তারাও এ সমস্যার দ্রত সমাধান চায়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সেখানে উপস্থিত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সংকটের পক্ষ না হয়েও মানবিক কারণে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে ভুগতে হচ্ছে। এ সমস্যার দ্রুত স্থায়ী সমাধান চায় বাংলাদেশ।

গতকাল দুপুর ১টার দিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদল কুতুপালংয়ে পূর্ব নির্ধারিত প্রেস ব্রিফ্রিং করার পূর্বে চার দলে বিভক্ত হয়ে চারটি পৃথক স্থানে মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু কোনারপাড়া জিরো পয়েন্টে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থল পরিদর্শন করেন। সেখানে অবস্থান নেওয়া প্রায় ৬ হাজার রোহিঙ্গাদের নানা ধরনের সমস্যার কথা শোনেন।

প্রায় ঘণ্টাব্যাপী রোহিঙ্গাদের সাথে চলা বৈঠকে কি আলোচনা হয়েছে সে ব্যাপারে তেমন বিস্তারিত কিছু জানাননি প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। তবে বৈঠকে অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, তারা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব নিয়ে স্বদেশে ফিরে যেতে আগ্রহী। বৈঠকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক রাখাইনে হত্যাযজ্ঞ ও গণধর্ষণের শিকার বেশ কয়েকজন নৃশংসতার বর্ণনা দেন। গুলিবিদ্ধ ও আগুনে পুড়ে বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ তাদের ওপর চালানো পৈশাচিক নির্যাতনের বর্ণনা দেন।

তুমব্রু কোনারপাড়া জিরো পয়েন্টে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের নেতা দিল মোহাম্মদ জানান, জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের নিকট জানানো হয়েছে রোহিঙ্গারা শত শত বছর ধরে মিয়ানমারের নাগরিক। মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী বার বার তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে নানাভাবে নির্যাতন ও অত্যাচার করে আসছে। তবে নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা পেলে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে। সফররত জাতিসংঘ প্রতিনিধি দলের সদস্যরা তাদের দাবি শুনে নিরাপদে মিয়ানমার ফিরতে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্সসহ অস্থায়ী ১০টি দেশের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি প্রায় ৩০ জনের মত সদস্য অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এ সময় প্রতিনিধি দলের সাথে ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব খোরশেদ আলম, অতিরিক্ত সচিব ও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান, চট্টগ্রাম পুলিশের রেঞ্জ ডিআইজি মনিরুজ্জামান মনি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ- বিজিবি’র কক্সবাজার রিজিওনাল কমান্ডার কর্নেল রকিবুল হক, বিজিবি’র সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আব্দুল খালেক, ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে.কর্নেল মনজুরুল হাসান খান, উপ-অধিনায়ক মেজর ইকবাল আহমদ, কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন, পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হাসান, উখিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিকারুজ্জামান চৌধুরী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. বাকিবিল্লাহসহ সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ।

গতকাল রবিবার বিকাল সাড়ে ৩টায় বিশেষ বিমানযোগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা ঢাকার উদ্দেশ্যে কক্সবাজার ত্যাগ করেন। রাতে ঢাকায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর আয়োজিত নৈশভোজে অংশগ্রহণ করেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। আজ সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর সাথে প্রতিনিধিদল সাক্ষাত্ শেষে তারা মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেন। তারা দুই দিন মিয়ানমারে সফর করবেন বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ আগস্টে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাজ্য রাখাইনে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। অভিযানের মুখে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। তারা উখিয়া টেকনাফের ৩০টি ক্যাম্পে বসবাস করছে। জাতিসংঘ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্বের অভিযোগ, এই অভিযানের সময় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ‘জাতিগত নিধন’, ‘গণহত্যা’ ও ‘পদ্ধতিগত’ মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। যদিও শুরু থেকেই মিয়ানমার এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার চুক্তি করেছে। তবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২১ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন