বড় ভূমিকম্পে মাটিতে দেবে যাওয়ার ঝুঁকিতে ঢাকার বাড়িঘর!
বিবিসি বাংলা০৬ অক্টোবর, ২০১৮ ইং
ধরুন আপনার পায়ের নিচের যে শক্ত মাটি তার প্রকৃতি হঠাত্ বদলে গেল। এটি তরল পদার্থের মতো আচরণ শুরু করল। যে মাটির ওপর আপনি দাঁড়িয়ে আছেন সেটিতে ঢেউ খেলতে শুরু করল। মাটির ওপরের সব বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, স্কুল, হাসপাতাল, সেতু ভেসে যেতে শুরু করল। তারপর ধসে গিয়ে ডুবে গেল জল-কাদা-বালির এক সমুদ্রে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এরকম ঘটনা সত্যিই ঘটেছে। গত সপ্তাহেই ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ার পালুতেই দেখা গেছে এ দৃশ্য। এলাকার প্রায় ১ হাজার ৭শ বাড়িঘর কার্যত মাটিতে দেবে গিয়েছিল। তার আগে অতি সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডে, চিলিতে, আরও আগে জাপান এবং বিশ্বের আরও অনেক দেশে দেখা গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এমনটি ঘটার আশঙ্কা কতটা?

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ড. আফতাব আলম খান বলেন, ‘ঢাকার অবস্থা খুবই নাজুক। পুরো ঢাকা শহরের ৬০ শতাংশ ভূমির গঠনপ্রকৃতি এমন যে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে এরকম ঘটনা ঢাকাতেও ঘটতে পারে।’ বিজ্ঞানীরা এ ধরনের ঘটনাকে বলেন ‘লিকুইফেকশন।’ সহজ বাংলায় বলা যেতে পারে মাটির তরলীকরণ।

যেভাবে লিকুইফেকশন হয় :লিকুইফেকশন তখনই ঘটে, যখন পলিমাটি বা বালু মাটির নিচে কম গভীরতায় থাকে একুইফার বা পানির স্তর। ড. আফতাব আলম খান বলেন, যখন ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি জায়গায় কোনো ফল্ট লাইন বা ফাটল বা চ্যুতি পরস্পরের সাপেক্ষে নড়াচড়া করে তখন সেটাকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় ‘ফল্ট রাপচার’ বলা হয়। যখন ফল্ট লাইন বা ফাটল রেখাটি নড়াচড়া করে, তখন যে সিসমিক ওয়েভ বা ভূকম্পন তরঙ্গ তৈরি হয় এবং এই তরঙ্গ যখন লিকুইফেকশন জোনে এসে পৌঁছায়, তখন সেখানকার মাটি তরল পদার্থের মতো আচরণ করে।

ড. আফতাব আলম খানের মতে, বাংলাদেশে যদি বর্ষাকালে বড় ভূমিকম্প হয়, তখন লিকুইফেকশনের ঝুঁকি বেশি। কারণ তখন বৃষ্টির পানিতে ভূগর্ভের পানির স্তর থাকে পরিপূর্ণ। সেই তুলনায় শীতকালের ভূমিকম্পে লিকুইফেকশনের ঝুঁকিটা অনেক কম।

বাংলাদেশে লিকুইফেকশন ঝুঁকি কতটা :‘বাংলাদেশের যে ভূ-কাঠামো, তাতে এরকম ঘটনা ঘটার ঝুঁকি অনেক। এটা একটা মারাত্মক সমস্যা। বাংলাদেশ খুবই নাজুক অবস্থানে’— বলেছেন ড. আফতাব আলম খান। ‘ভূমিকম্প হলেই যে লিকুইফেকশন হবে, ব্যাপারটা তা নয়। কয়েকটি ব্যাপার একসঙ্গে ঘটতে হবে। এটি নির্ভর করবে ভূমিকম্পটি কতটা শক্তিশালী, মাটির কতটা গভীরে এটি ঘটছে এবং সেখানে যে একুইফার বা পানির স্তর আছে, সেটিতে কতটা পানি আছে তার ওপর।’ তার মতে যদি ভূমিকম্প ছয় মাত্রার কাছাকাছি বা তার চেয়ে শক্তিশালী হয় এবং এর উত্পত্তিস্থল যদি দশ হতে পনের কিলোমিটার গভীরতার মধ্যে হয়, তাহলে লিকুইফেকশনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

ঝুঁকিতে বৃহত্তর ঢাকার বেশির ভাগ অংশ :ড. আফতাব আলম খানের মতে, পুরো বাংলাদেশের বেশির ভাগটাই যেহেতু গড়ে উঠেছে নদী বিধৌত পলিমাটিতে, তাই এরকম লিকুইফেকশনের ঝুঁকি কম বেশি অনেক জায়গাতেই আছে। তার মতে ঢাকা শহরের অন্তত ষাট ভাগ এলাকা এরকম লিকুইফেকশন অঞ্চলে পড়েছে, যেখানে এরকম বিপদ ঘটার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। তিনি এই ঝুঁকির ভিত্তিতে ঢাকাকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা-পুরান ঢাকা-মতিঝিল থেকে শ্যামলী পর্যন্ত এলাকা।

ভূমিকম্প প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা কাজ করবে : এক প্রশ্নের জবাবে ড. আফতাব আলম খান বলেন, ঢাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি মাপার ক্ষেত্রে লিকুইফেকশনের ব্যাপারটি দশ বছর আগেও বিবেচনায় নেয়া হয়নি। ফলে তখন বাংলাদেশের যে সাইসমিক জোনিং করা হয়েছে, সেখানে ঢাকাকে একটা মধ্যম ঝুঁকির সাইসমিক জোনের মধ্যে ফেলা হয়েছে। কিন্তু পরে যখন মাইক্রোজোনিং করে এই লিকুইফেকশনের ব্যাপারটি বেরিয়ে আসল, তখন এসব জোনে যেসব দালানকোঠা আগে থেকে গড়ে উঠেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকিটা কতটা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে, সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বিল্ডিং কোডে এই লিকুইফেকশনের বিষয়টি কতটা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৬ অক্টোবর, ২০২১ ইং
ফজর৪:৩৬
যোহর১১:৪৭
আসর৪:০৩
মাগরিব৫:৪৫
এশা৬:৫৬
সূর্যোদয় - ৫:৫১সূর্যাস্ত - ০৫:৪০
পড়ুন