সমাদৃত নাট্যকার
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ইং
সমাদৃত নাট্যকার
আবদুন্ নূর

বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনে রক্ত ঝরার সাথে সাথে সেই রক্তের তপ্ততায় হয়তো বাংলাদেশে আমাদের মঞ্চে অপেশাদারি নাটক উপস্থাপনের প্রয়াস দ্রুততর হলো। পঞ্চাশ দশক পর্যন্ত নাট্যআন্দোলন ঢাকায় পেশাদারিতে স্তিমিত ছিল। গতানুগতিক ঐতিহাসিক নাটক মঞ্চস্থ হতো বারংবার। নতুন প্রবাহ সৃষ্টি হয়নি।

তিন জন নাট্যকারের অবদান সেই সময়ে বাংলা নাট্যসাহিত্যকে শুধু বলিষ্ঠ করেনি; উজ্জ্বলও করেছে। নাট্যকার নুরুল মোমেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। তেমনি অধ্যাপনায় রত ছিলেন মুনীর চৌধুরী। আসকার ইবনে শাইখ। ওঁরা হয়েছেন বাংলার নাট্যসাহিত্যে অগ্রধারার পরিচায়ক।

নাট্যকার নুরুল মোমেন এলেন মঞ্চে তাঁর কালজয়ী নাটক ‘নেমেসিস’ নিয়ে হঠাত্ করে। কী অপূর্ব প্রযোজনার আঙ্গিক। কী উজ্জ্বল উদ্দীপনাময় কথোপকথন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মফস্বলের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি যে কথা বলতে চেয়েছিলেন ষাটের দশকে, আজ একবিংশ শতাব্দীতে সেই কথা সেই ভাষ্য এখনো প্রযোজ্য। মর্মস্পর্শী নাটক একের পর এক লিখে তিনি কালের ঊর্ধ্বে সময়ের ঊর্ধ্বে যেতে পেরেছিলেন।

মুনীর চৌধুরী তাঁর ‘কবর’ নাটকের মাধ্যমে বাংলা নাটকের স্তম্ভ রচনা করেছেন। শুনেছি কারাগারে বসে লিখেছিলেন। এছাড়া ভাষান্তর করেছেন ইংরেজি সাহিত্যের নাটক। আসকার ইবনে শাইখের নাটক ইতিহাস-আশ্রিত। মঞ্চে ভেসে ওঠে তাঁর ঐতিহাসিক চরিত্রের মাঝে আমাদের আধুনিক জীবনের বিভিন্ন সংজ্ঞা। ভেসে ওঠে তাঁর বক্তব্য। জীবন হলে হবে সুন্দর ও ন্যায়নিষ্ঠ।

 

২.

নাটক মঞ্চস্থ হতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে এবং মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটে। নওয়াবপুর রোড ক্রসিংয়ের সাথে ফুলবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন পাড়ি দিয়ে। বিশেষ ভাগ সংস্কৃতিমনা ঢাকাবাসীর ঘরবাড়ি সেই সময়ে ছিল কায়েতটুলীতে অথবা আগাহ মাসিহ লেন। জিন্দাবাজার। আরমানীটোলা। অন্য পাশে ওয়ারী। গেন্ডারিয়া। নারিন্দা। কিছু দূরেই সদর ঘাট। রাতে নাটক শেষ হলে অনায়াসে হেঁটে হেঁটে ঘরে ফেরা যেত। রিকশা অপ্রতুল ছিল। দুটো কারণে ছাত্রজীবনে সেই তিন জন নাট্যকারের বলিষ্ঠ নাটকগুলো আমরা বার বার দেখতে যেতাম। এক তাঁদের রচিত নাটক বুদ্ধিদীপ্ত সংস্কৃতির ধারক। দুই নাট্যকারের উপস্থিতি। অধীর প্রতীক্ষায় অপেক্ষা করতাম। নাটক শেষে ওরা মঞ্চে আসবেন। কথা বলবেন।

নুরুল মোমেন দর্শকদের বাহবা কুড়োতে ভালোবাসতেন। তাঁর দর্শক দুর্বলতা ছিল। নুরুল মোমেন চাইতেন দর্শক তাঁকে চিনুক। তাঁকে বাহবা দিক। দর্শক সেই দুর্বলতার কথা জানত। নাটক শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তিনি মঞ্চে প্রবেশ করতেন। জোরে জোরে বারংবার করতালি হতো। করতালি তাঁর যথাযথ প্রাপ্য। অথচ তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শক করতালির সময়ক্ষণ নিরিখ করতেন। হেসে বলতেন, আজ মাত্র ষাট সেকেন্ড করতালি দিলে। গেল বার একই নাটকে একশো বিশ সেকেন্ড। আগামী কাল শেষ প্রদর্শন। নিশ্চয়ই দুশো চল্লিশ সেকেন্ড হবে। নুরুল মোমেনের বক্তব্যে রসিকতা ছিল। কিন্তু কেন যেন আমি অনুভব করেছি নিভৃত বক্তব্য। আমি রচয়িতা, হয়তো রসিকতা করতে পারি। কিন্তু আমার নাটকে আছে যথার্থতা। আমি কথা বলতে চেয়েছি দীপ্ত ও আন্তরিক। সেই সত্য অবধারণ করো।

অন্যদিকে মুনীর চৌধুরীর মঞ্চে উপস্থিতি হতো গুরুগম্ভীর। এমনিতে তিনি সদা হাস্যরত। তাঁর ঠোঁটে সবসময় হাসি। যখন তিনি অধ্যাপনায় রত ক্লাসরুমে, তখনো। যখন তিনি ঢাকা বেতার কেন্দ্রের খেলাঘর অনুষ্ঠানে আসতেন রনেন কুশারী প্রযোজিত ধারাবাহিক শিশু নাটক হুতোম প্যাঁচার দেশে অংশ গ্রহণে, তখনো। নাটকটি প্রচারিত হয়েছে ছয় মাস ধরে। সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন সমর দাস। লেখা আমার। আবার তাঁকে দেখেছি ভাষা আন্দোলনের নানা পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে বক্তৃতা দিতে। অথবা বিভিন্ন হল আয়োজিত আন্তহল সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিচারক হয়ে আসতে। হাসি যেন তাঁর নেশা। তাঁর রচিত ও প্রযোজিত নাটক শেষে তিনি মঞ্চে প্রবেশ করতেন আশ্চর্য রহস্যময়তায় নিজেকে ঘিরে রেখে। তিনি নাটক সৃষ্টি করেছেন। সে নাটক তিনি দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর প্রিয় শিল্পীরা প্রাণ দিয়ে তার নাটককে রূপায়িত করেছে। সুন্দরতম কণ্ঠে ডায়ালগ প্রক্ষেপ করেছে। অনুভব করতে পারতাম তিনি অতি স্নেহে ও আবেগে প্রতিটি শিল্পীকে প্রতিটি মঞ্চকর্মীকে তাঁর শুভ্র মনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। কিন্তু মঞ্চে দেয়া তাঁর বক্তব্যে আমি কখনো বুঝতে পারিনি সেই মঞ্চায়িত নাটকে তিনি কি মুগ্ধ হয়েছেন!

অন্যদিকে আসকার ইবনে শাইখ নিভৃত নাট্যচারী। নাটক মঞ্চায়নের পর ওঁকে আমি কদাচিত্ মঞ্চে আসতে দেখেছি। তিনি নাটকের হলে দূরের চেয়ারে বসেই তাঁর মঞ্চস্থ নাটক দেখতেন। নাট্য রচয়িতা হলে উপস্থিত সে কথা তিনি দর্শকদের জানাতে চাইতেন না। দর্শকদের ভাব-অনুভাব তিনি পশ্চাতে থেকেই পর্যালোচনা করতেন। নাটক শেষ হওয়ার পরপরই অন্যান্য দর্শকের সাথে সারি মিলিয়ে তিনি হল থেকে বেরিয়ে যেতেন। নিভৃতে। নাট্য প্রযোজকদের অনেকেই জানত আসকার ইবনে শাইখের মঞ্চে না আসার অনিচ্ছা রয়েছে। তা সত্ত্বেও ওরা বহু অনুরোধ করে মঞ্চে নিয়ে আসত। মঞ্চে দাঁড়ালে তিনি অবশ্যই নম্র কণ্ঠে উজার করে তাঁর মনের প্রশংসা বার্তা কুশলীদের প্রদান করতেন। তাঁর কথা শুনতে শুনতে তবু ভাবতাম, কেন তাঁর কণ্ঠে প্রচ্ছন্ন অনীহা নিহিত রয়েছে!

 

৩.

নাটক শেষ হয়ে যাওয়ার পর কলাকুশলীদের মঞ্চে আসার প্রথা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। আমি মনে করি এটি একটি সুন্দর প্রথা। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, কুশলীরা নাটক আমাদের জন্য মঞ্চস্থ করলেন। আমরা দর্শক শ্রেণিতে বসে মঞ্চায়িত নাটক দেখলাম। নাটক শেষে আমাদের কি উচিত নয় তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। এবং বেশি ভালো লাগলে দাঁড়িয়ে তাঁদের সম্মান দেখানো? আমরা কি পারি না সামান্য সময় ধরে রেখে করতালি দিয়ে তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে!

ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে ২০১৩ ও ২০১৪ সালের মার্চ এবং এপ্রিল মাসে বেশ কয়েকটি নাটক দেখলাম। দুটো মিলনায়তনেই। অত্যন্ত সুন্দর সেইসব প্রযোজনা। কিন্তু লক্ষ করলাম, নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার সাথে সাথেই দর্শকদের মাঝে তাড়া পড়ে যায় বাইরে বেরোনোর, হল ত্যাগ করার। কেন এই তাড়া? আমি তো আশা করি শিল্পীরা আসবেন মঞ্চে। তাঁদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। পরিচালককে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। সেটা কখনো হয়েছে। কখনো হয়নি। রীতিটা উপেক্ষিত। দর্শকরা শিল্পীদের আগে উপেক্ষা করেছেন বলেই কি এই রীতি এখন উপেক্ষিত?

একই সময়ে কলকাতায় মঞ্চস্থ হয়েছিল ঢাকার নাটক ‘বেহুলার ভাসান’। দর্শকদের কাছে ভীষণ আদৃত হয়েছিল। শিল্পীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নাটকের যিনি প্রযোজক যিনি নির্দেশক যিনি মূল চিন্তার নায়ক তিনি দর্শকদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও মঞ্চে প্রবেশ করতে রাজি হননি। তিনি মঞ্চে আসেননি। সফল মঞ্চায়িত নাটক ‘বেহুলার ভাসান’। আমার প্রশ্ন থেকে গেছে। অধ্যাপক জামিল আহমেদের মঞ্চে দর্শকদের কাছে আসার অনীহা কেন এল? এর পেছনে কি কোনো কারণ রয়েছে? প্রযোজক হিসেবে কোনো দুঃখ রয়েছে? কোনো অপ্রাপ্তি আছে?

কিংবা হয়তো নাট্যকর্মীরা কি তাঁদের প্রাপ্য স্বীকৃতি পান মঞ্চে তাঁদের নিজ নিজ কাজ সফল উপস্থাপন করেই! ওদের মনের প্রাপ্তি ওদের সৃজনী কুশলতায়। ওদের ফিরে ফিরে মঞ্চে এসে প্রাণহীন বাহবা প্রাপ্তিতে নয়!

 

৪.

২০১৫ সালেও ঢাকায় ছিলাম। জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে নাটক দেখতে যাইনি। পয়লা কারণ ঢাকায় তখন অবিরল অবরোধ। শিল্পচর্চা রুদ্ধ থেকেছে। যাতায়াতের অসুবিধা। ঠিকমতো ঘরে ফিরতে পারব কিনা জানি না। পরের কারণ, যে কয়েকটি নাটক জেনেছি মঞ্চস্থ হবে তার বেশির ভাগই ভাষান্তরিত নাটক। নতুন সৃজনীমূলক নাটকের নাম খুঁজে পাইনি।

রাজনৈতিক অবরোধে ঘরে বসে বার বার ভেবেছি, আমাদের এই সমাজ প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন আমাদের ঐতিহ্যকে তুলে ধরার। প্রয়োজন ইতিহাসকে নতুনের চোখে নিরিখ করার। মনে পড়ছে নাটক ‘নেমেসিস’। মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ সজাগ করবে আমাদের বিবেক। সেইসব নাটকের মাধ্যমে আমাদের আজকের বিভাজিত সময়ে হবে আদৃত দিকদর্শন। আমরা শেক্সপিয়রের কাছে ফিরে গিয়েছি। আমরা ম্যলিয়র রূপান্তর করছি। ভালো কথা। নন্দিত সেই সব প্রয়াস। কিন্তু সাথে সাথে কেন নয় নুরুল মোমেন? কেন নয় আসকার ইবনে শাইখ?

গত চার দশকে আমাদের নাট্য আন্দোলন এগিয়ে নিয়েছেন রামেন্দু মজুমদার, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, তারিক আনাম খান, মুহম্মদ হামিদ, জামিল আহমেদ প্রমুখ। তাঁদের প্রতি আন্তরিক অনুরোধ, আপনারা আমাদের প্রবীণ নাট্যকারদের উপস্থাপন করুন। আমাদের প্রজন্মের কাছে নিয়ে আসুন। ওরা ফিরে দেখুক!

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং
ফজর৪:২৪
যোহর১১:৫৮
আসর৪:২৭
মাগরিব৬:১৭
এশা৭:৩১
সূর্যোদয় - ৫:৪১সূর্যাস্ত - ০৬:১২
পড়ুন