জন্মদিনের শুভেচ্ছা
‘বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ইং
‘বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’
সাক্ষাত্কার

ইমদাদুল হক মিলন

ইমদাদুল হক মিলন এ সময়ের একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ ও জনপ্রিয় লেখক। তাঁর রয়েছে একাধিক শিল্পোত্তীর্ণ গল্প-উপন্যাস। জনপ্রিয় এই কথাশিল্পীর শিল্পমানসম্পন্ন, ব্যতিক্রমী ও জীবনঘনিষ্ঠ গল্প-উপন্যাসের সূত্র ধরে তাঁর সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত এই সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মিল্টন বিশ্বাস

মিল্টন বিশ্বাস : সাহিত্যচর্চা তথা লেখা ও লেখা প্রকাশের গল্পটা শুনতে চাই। লেখক হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা পেলেন কোথা থেকে?

ইমদাদুল হক মিলন : লেখক হয়ে ওঠার গল্প আমি বহুবার বলেছি। একই কথা আমার বারবার বলতে ভালো লাগে না। বহুবার বহুভাবে আমি বলেছি যে আমাদের গেন্ডারিয়াতে একটি পাঠাগার ছিল। আমি তো খেলাধুলা কিছুই পারতাম না একটা অপদার্থ টাইপের ছিলাম। খেলাধুলা সাইকেল চালানো মোটকথা ওই বয়সের ছেলেরা যা করে। আমি বিকাল বেলা একটু অবসর পেলে ওই ‘সীমান্ত গ্রন্থাগারে’ গিয়ে বই পড়তাম। সেখানে একজন তরুণ লেখক অমিত যে তখনকার ছোট পত্রিকাগুলোতে লিখত। আমাদের বন্ধুজন। তার লেখা যখনই প্রকাশিত হতো সেটার কাটিং নিয়ে আমাদের কাছে আসত। সে খুব অহংকার করে দেখাত তার লেখা, এটা দেখে আমার মনে হতো, এই ছেলেটা লিখতে পারে, চেষ্টা করলে তো আমিও লিখতে পারি। এই মনোভাব থেকে আমি লিখতে শুরু করি।

 

মি. বি. : স্বতন্ত্র কেউ অনুপ্রাণিত করেনি?

ই. হ. মি. : বেশির ভাগ লেখক এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলেন যে সে একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন মেয়েটিকে খুশি করার জন্য লিখেছিলেন। বা কাউকে আকর্ষণ করানোর জন্য লিখেছিলেন বা প্রেমিকা তাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। বা তার পরিবারের ঘনিষ্ঠজন বা কাছের কেউ অনুপ্রাণিত করেছিলেন। বরং আমি লিখতে এসেছি এমন এক পরিবার থেকে যেখানে আমি রোজগারের জন্য চেষ্টা করলে আমার পরিবারের সবাই সাপোর্ট করত। অর্থাত্ অনেক দিন পর্যন্ত আমার পরিবারের কেউ লেখাকে সাপোর্ট করেনি। তারা ভেবেছে যে আমি লেখালেখি করে স্পয়েল হয়ে যাচ্ছি। আমি কোনোভাবে সংসারের কাজে আসছি না বরং ক্ষতি করছি। সে কারণে পরিষ্কারভাবে একটা জিনিস আমি বলতে চাই যে আমাকে লেখালেখির ক্ষেত্রে কেউ কখনো বলেনি। যখন দু-একটা লেখা বের হতে শুরু করেছে কেউ কেউ আকৃষ্ট হয়েছে তখন কেউ কেউ বলেছে যে এই ছেলেটা লিখতে পারবে। তুমি চেষ্টা করো। যদি লেখকদের মধ্যে কেউ কেউ আমাকে অনুপ্রাণিত করে থাকেন লেখালেখির ক্ষেত্রে তবে তিনি হচ্ছেন রফিক আজাদ, প্রথমত রফিক আজাদ দ্বিতীয়ত শহীদ কাদরী। এই দুজন আমাকে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন। অনুপ্রাণিত বলতে যখন আমার কিছু লেখা বেরিয়েছে তখন তাঁরা আমাকে দেখিয়ে দিয়েছেন বুঝিয়ে দিয়েছেন যে এটা এভাবে করো।

 

মি. বি. : প্রথম গল্পটা কোথা থেকে প্রকাশিত? পাঠকের সাড়া কেমন পেয়েছিলেন?

ই. হ. মি. : ১৯৭৩ সাল। ছোটদের গল্প। নাম হচ্ছে ‘বন্ধু’। এটা তখনকার পত্রিকা ‘দৈনিক পূর্বদেশ’-এর ছোটদের পাতা ‘চাঁদের হাট’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর বড়দের গল্প ‘শঙ্খিনী’। গল্পটি বাংলাদেশের অনেক পত্রিকায় ছাপতে গিয়েছিলাম কিন্তু তারা ফেরত দিয়েছে। তারা কেউ ছাপতে চায়নি। পরে গল্পটি আমি অমৃত পত্রিকায় পাঠিয়ে দিলাম, ওই বছরই। অমৃত পত্রিকায় গল্পটি খুব সম্মানের সঙ্গে ছাপা হলো। দুটো গল্পেরই সাড়া ব্যাপকভাবে হলো। যে সপ্তাহে ছোটদের গল্প পাঠানো হয়েছিল তার পরের সপ্তাহে বড়দের গল্প ছাপা হলো। পরে ‘চাঁদের হাট’-এর একটি অনুষ্ঠানে গেলাম। সেখানে অনেক বন্ধু-বান্ধব পেলাম সেই বন্ধুরা অনুপ্রাণিত করেছে পরবর্তী সময়ে। আর অমৃত পত্রিকায় ছাপা লেখাটি লেখকদের আকৃষ্ট করেছিল।

 

মি. বি.: সাহিত্যচর্চার সূচনায় শিশুতোষ রচনায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন কেন? কিশোর গল্প ‘বন্ধু’ রচনার পটভূমি কী ছিল?

ই. হ. মি. : পটভূমিটা ছিল গেন্ডারিয়ার একটি বাড়িতে থাকতাম, সে বাড়িতে প্রচুর বানর ছিল। একটা পা ভাঙা বানরকে আমার ছোট ভাই খাবার দিত, এটা দেখে আমার মনে হয়েছে যে একটা বানরের সঙ্গে একটা বাচ্চা ছেলের বন্ধুত্ব নিয়ে একটা গল্প লেখা যায়। তো এই ধরনের গল্প সাধারণত শিশু-কিশোরদের উপযোগী হয়। তেমন কিছু ভেবে লিখিনি। মনে হয়েছিল লিখে ফেলেছি। এতে অনুপ্রাণিত হওয়ার কিছু নেই। দৃশ্যটি দেখে লিখে ফেলেছি। কেউ বলেনি যে তুমি লেখ। আর বড়দের গল্পটা লিখেছিলাম নিজের অনুপ্রেরণা থেকে কারণ যখনই ‘বন্ধু’ গল্পটা ছাপা হয়ে গেল, ছাপা লেখায় নিজের নাম দেখে আমি পাগল হয়ে গেছি। একদম উন্মাদের মতো। লিখতে শুরু করলাম, একটা লোভ যে খবরের কাগজে আমার নাম ছাপা হবে। এ কারণেই দীর্ঘদিন পর্যন্ত লিখেছি। তখন লেখা কী? গল্প কেমন করে লিখতে হয়? ভাষা কেমন হয়? কী পড়তে হয় কিছুই জানতাম না, নিজের মতো করেই লিখেছি।

 

মি. বি.: প্রথম গল্পগ্রন্থ ভালোবাসার বারটি গল্প নিয়ে ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত। লেখক হিসেবে গল্প দিয়ে শুরু করেছিলেন কেন? ২০১৫ সালে নিজেই ওই সৃষ্টিকর্মকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ই. হ. মি. : এখন নিজের লেখালেখির মূল্যায়ন করার ইচ্ছা বা আগ্রহ আমার নেই। যদি আমি সামান্যতম লিখে থাকতে পারি সেটা মূল্যায়ন করবে পাঠক। গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম কারণ ছেলেবেলায় আমি নানীর মুখে গল্প শুনে শুনে বড় হয়েছি। আমার মনে কাব্যভাবনাটা ঠিক কখনো আসেনি। কাহিনি বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলার প্রবণতা চলে এসেছে। এ কারণে আমি গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম। কবিতার কথা আমি কখনো ভাবিনি, বা অন্য কোনো কিছু লেখার কথা ভাবিনি। কাহিনির প্রতি বা ঘটনার প্রতি আমার একটা দুর্বলতা ছিল। যেটা গল্প লেখার ক্ষেত্রে কাজে লাগত, পরবর্তী সময়ে উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে কাজে লাগে।

 

মি. বি. : আরেকটি প্রশ্ন—মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

ই.হ. মি. : জনপ্রিয় ধারা আর অজনপ্রিয় ধারা—এই ধারা বিষয়টি আমার পছন্দ নয়। লেখকের একটি লেখা যেমনই হোক, পাঠক যদি তা গ্রহণ করে থাকে তবে তিনি জনপ্রিয় লেখক, জনপ্রিয় লেখক শব্দটির মধ্যে তুচ্ছ- তাচ্ছিল্যের প্রবণতা আছে আমাদের দেশে। যেমন ওই লেখক জনপ্রিয়, ওই লেখার কিছু হয়নি। আমি মনে করি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর সব লেখাই অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকবে। শরত্চন্দ্রের সব লেখাই বহু বছর ধরে বেঁচে থাকবে। বাংলা সাহিত্যের কোন বড় লেখক জনপ্রিয় নয়? ইংরেজি সাহিত্যের কোন বড় লেখক জনপ্রিয় নন? মার্কেজের চেয়ে বড় কে আছে? হেমিংওয়ের সময় তাঁর চেয়ে বড় লেখক কে ছিলেন? তলস্তয় তো এখনো জনপ্রিয়। দস্তয়ভস্কি এখনো জনপ্রিয়। জনপ্রিয় বলতে আমাদের দেশে আমরা এক সস্তা লেখককে মনে করি। এই মনে করাটার মধ্যে আমি নেই। আমি মনে করি, যে লেখকের লেখা পাঠক গ্রহণ করবে সেই লেখক বড় লেখক। কারণ যারা তাঁর লেখা পড়ছেন তারা মূর্খ নন। কারণ মূর্খরা পড়ে না। সাহিত্য পড়ে সচেতন ব্যক্তি। আমার একটি লেখা হুমায়ূন আহমেদের একটি লেখা বা সৈয়দ শামসুল হকের একটি লেখা বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি লেখা বা সেলিনা হোসেন, শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ বা শামসুর রাহমান—এঁদের লেখা কমবেশি পাঠকদের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। কোনো কোনো লেখক পাঠক-পাঠিকার কাছে ব্যাপকভাবে পৌঁছে যায়। কোনো লেখক একটু কম পৌঁছে যায়। যে লেখক কম পৌঁছান তিনি জনপ্রিয় লেখক নন বা অন্য ধারার লেখক। একজন লেখক তাঁর নিজের মতো লেখেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর মতো লিখেছেন। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর মতো লিখে গেছেন। এখন আখতারুজ্জামানকেও একশ জন পাঠক গ্রহণ করেছেন। হুমায়ূন আহমেদকে একশ জন পাঠক গ্রহণ করেছেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কেও একশ জন পাঠক গ্রহণ করেছেন, দেবেশ রায়কে একশ জন পাঠক গ্রহণ করেছেন। এই দেবেশ রায়ের কিছু জনপ্রিয় লেখা আছে, আবার আখতারুজ্জামানের ‘খোয়াবনামা’ বইটি কোলকাতায় ১৫টি এডিশন হয়েছে। তার মানে তাঁর লেখা ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। তিনি জনপ্রিয় লেখক। এক অর্থে। কিন্তু তাঁর বলার ভঙ্গি, বর্ণনার ভঙ্গি, রাজনৈতিক বক্তব্য, দর্শন হয়তো হুমায়ূন আহমেদের চেয়েও অনেক ভালো। এজন্য জনপ্রিয় ধারা বা অজনপ্রিয় ধারায় আমি বিশ্বাসী নই। একজন লেখক তাঁর মতো করে লেখেন। তাঁর ক্ষমতা অনুযায়ী লেখেন। তাঁর মেধা অনুযায়ী লেখেন, তাঁর ভঙ্গি অনুযায়ী লেখেন। সেই ভঙ্গি পাঠক বেশি গ্রহণ করতে পারেন আবার পাঠক কম গ্রহণ করতে পারেন। ব্যাপারটা এই জায়গায়, স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারা বা অজনপ্রিয় ধারা এ বিষয়ে আমার যতটুকু বলার আমি বলেছি। একটা জিনিস আপনাকে বলার আছে সেটা হচ্ছে, স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে লেখক ছিল না, গুটিকয়েক বোদ্ধা লেখক ছিলেন যাঁরা গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধ লিখতেন। কিন্তু তাঁরা একরকম চাপের মুখে ছিলেন। কারণ তাঁরা একটা পরাধীন দেশে বসবাস করতেন। তাঁরা যা লিখতে চাইতেন যেমন করে লিখতে চাইতেন হয়তো তা পারতেন না। যখনই বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো আমাদের পুরোনো লেখকরা হাত খুলে লিখতে শুরু করলেন। তাঁদের সাথে সাথে একঝাঁক তরুণ লেখকও লিখতে শুরু করলেন। ফলে বংলা সাহিত্য ব্যাপকভাবে আগাতে শুরু করল। একটা সময় পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিকরা তাদের লেখার দ্বারা বাংলাদেশের বইয়ের বাজার একদম পূর্ণাঙ্গভাবে ছেয়ে রেখেছিল। আমরা যখন ব্যাপকভাবে লিখতে শুরু করলাম তখন পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল। আর সেই জায়গাতে বাংলাদেশের লেখকরা ঢুকে গেল। তখন দেশে সাহিত্যের জগত্টা বড় হয়ে গেল। বইয়ের জগত্ খুলে গেল। কথাসাহিত্যে ও পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখক এল। বাংলাদেশের সাহিত্য নিজস্ব একটি ধারা তৈরি করল। সাহিত্যের একটা মানদণ্ড তৈরি করল। একটা জায়গায় এসে আমাদের সাহিত্যটা দাঁড়াল।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং
ফজর৪:২৪
যোহর১১:৫৮
আসর৪:২৭
মাগরিব৬:১৭
এশা৭:৩১
সূর্যোদয় - ৫:৪১সূর্যাস্ত - ০৬:১২
পড়ুন