ময়ুখ চৌধুরীর কবিতা
চিন্তার ঐশ্বর্যে ও স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল
আহমেদ মাওলা১৬ অক্টোবর, ২০১৫ ইং
চিন্তার ঐশ্বর্যে ও স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল
দশক বিবেচনায় ময়ুখ চৌধুরী সত্তরের কবি। কিন্তু দশকের খাঁচায় বন্দি থাকেনি তাঁর কবিতা। ক্রামাগত নিজেকে মুদ্রিত করে গেছেন নীরবে, নিঃশব্দে। গ্রন্থ প্রকাশের তাঁর কোনো তাড়া ছিল না। ছাপালেখার বয়স তেইশ বছর (স্মর্তব্য : শিশির দত্ত সম্পাদিত ‘স্বনির্বাচিত, ১৯৭৩) পেরিয়ে যাওয়ার পর তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কালো বরফের প্রতিবেশী, (১৯৮৯) প্রকাশিত হয়। এ এক অপরিসীম ধৈর্য। যা আমাদের বর্তমান তরুণ কবিতাকর্মীদের কাছে অপ্রত্যক্ষ। লোকসমাজের সামনে আসার আগে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে, তারপর তিনি আবির্ভূত হলেন কাব্যভুবনে। তাই, কালো বরফের প্রতিবেশী, একজন কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ হিসেবে যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তারচেয়ে বেশি ধৈর্য ও অনুশীলনের দলিল হিসেবে। প্রায় চার দশকের কাব্যযাত্রায় মুয়ুখ চৌধুরী পা ফেলেছেন খুব সচেতনভাবে। কবিতায় তিনি যা বলতে চান, তা নিজের মতো করে বলেন এবং পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন। অনর্গল উত্সারণে তাঁর বিশ্বাস নেই। স্বকীয় সৃষ্টিশীলতা ও শিল্পমান অক্ষুণ্ন রেখে তিনি কবিতা লেখেন। বাংলাদেশের সমকালীন দর্শনহীন কবিতার ভিড়ে ময়ুখ চৌধুরীর চিন্তাবান কবিতাকে আলাদা ভাবতে হয়, গুরুত্ব দিতে হয়। অবশ্য, আমি মনে করি কবিতার প্রধানতম বিষয় : কল্পনা। কিন্তু চিন্তার শিকড়ও কবিতার জন্য দরকার। ময়ুখ চৌধুরীর কবিতার মধ্যে রয়েছে চিন্তার ঐশ্বর্য, দার্শনিক ভাবনার ভিত্তি। বিজ্ঞানচিন্তা তাঁর কবিতাকে ভিন্ন এক সমৃদ্ধি ও পরিপুষ্টি দান করেছে। কালো বরফের প্রতিবেশী আসলে কে? ‘আপাদমস্তক কালো কান্না জমে আছে/ বরফ কঠিন ঘুমে স্তব্ধ জাগরণ, তিনযুগ/ স্বপ্ন দেখা শেষে, বামদিকে জোনাকির সবুজ/ মাংসের ছোঁয়া পেয়ে জেগে ওঠে হিমগুল্মলতা/ বিস্ফোরণমুখী এক কালো নিরবতা। তারপর/ শুরু হলো গাঢ় অন্বেষণ। হাত-পা বেরিয়ে/ আসে প্রবাহিত বরফের নামে। প্রতিবেশী মরুর/ আকাশ। মেঘলা কষ্টের ভাঁজে প্লাবনের পটভূমি/ করেছে সঞ্চয়, এইভাবে ঘন ত্রিভূজের মধ্যে জেগে/ আদিম হূদয়।’ (কালো বরফের প্রতিবেশী)

এই দর্শন, বৈজ্ঞানিক ভাবনা, অস্তিত্ব চেতনা পাঠকচিত্তকে আলোড়িত করে। তিনটি হিমযুগের পর পৃথিবীর সৃষ্টি। পৃথিবীর তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল। মানুষের শরীরেও সত্তর ভাগ জলের উপস্থিতি আদি জননী সমুদ্রের কল্লোলের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। জল আর সমুদ্র ময়ুখ চৌধুরীর কবিতায় ভিন্ন এক মাত্রা নিয়ে উপস্থাপিত হয়। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের নামকরণের মধ্যেও জলের নস্টালজিক অনুষঙ্গ বেজে ওঠে—‘অর্ধেক রয়েছি জলে, অর্ধেক জালে’ (১৯৯৯) অস্তিত্বের প্রয়োজনে জল যেমন সমুদ্রের দিকে ধাবমান, মানুষও তেমনি, সংসারের বাস্তবতার জালে আটকে পড়া মাছের মতো কেবল ছটফট করে। তিনি লেখেন—‘তোমার স্নানের জল কী করে গড়িয়ে আসে। প্রতিবেশী আঙ্গিনায় চোখের পাতায়?’ সিন্ধু সভ্যতার জল নিষ্কাশনের প্রকৌশলগত অভিজ্ঞানকে ময়ুখ চৌধুরী অসাধারণ চিত্রকল্পে তুলে ধরেন কবিতার পঙিক্ততে। বিজ্ঞান চেতনা ও ঐতিহ্যের উপাদান তাঁর কবিতায় এভাবে সম্পৃক্ত হয়।

আমার স্মরণে বারবার তাঁর সেই কবিতাটি গুঞ্জরিত হয়, আমি মুগ্ধ হয়ে আজো তাঁর কবিতা পড়ি—‘সবাই ভালো, সবাই ভালো/ আমিই কেবল মন্দ/ স্বর্ণদুয়ার খোলা সবার/ আমার দুয়ার বন্ধ/... মৌরি ফলের স্বর্ণদুয়ার/ চিনতে যদি চাও/ আমায় একটু/ মন্দ থাকতে দাও’।

কবির জন্মদিন মানে তো কবিতারও জন্মদিন। নিজের জন্মদিন স্মরণ করে তিনি লিখেছেন—‘আজ আমার জন্মদিন মনেই ছিল না/ সারাটা দুপুর এখানে-ওখানে ঘুরেছি/ আচমকা পকেটে একটা বলপেন গুঁজে কেউ বললো না— Happy Birthday/ জ্বরের ভেতর থেকে জিরাফের মতো মাথা উঁচিয়ে/ দেখে নিচ্ছিলাম / ২২-এ অক্টোবর/ ফ্যানের বাতাসে অস্থির ক্যালেন্ডারটাকে’।

আগামী ২২ অক্টোবর ময়ুখ চৌধুরীর পঁয়ষট্টিতম জন্মদিন। তাঁর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

মুয়ুখ চৌধুরী, জন্ম :২২ অক্টোবর ১৯৫০

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৪১
যোহর১১:৪৫
আসর৩:৫৪
মাগরিব৫:৩৫
এশা৬:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:৩০
পড়ুন