পরমাণু চুক্তি ভেস্তে যাওয়া ইরানের জন্য আশীর্বাদ!
০৪ জুন, ২০১৮ ইং
পরমাণু চুক্তি ভেস্তে যাওয়া ইরানের জন্য আশীর্বাদ!
শুধু অর্থনীতি নয়

ইরানের রাজনীতিতে

যে বিভক্তির সুর শোনা যাচ্ছে সেখানেও ঐক্য তৈরির সুযোগ হবে। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর এক পতাকার নিচে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইরানের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য নানামুখী পথ তৈরির দিকেও উত্সাহী করবে

 

 

অলক বিশ্বাস

 

ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হয়ে আসাটা ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) বিশ্বের শান্তিপ্রিয় অনেক দেশের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইইউ চাইছে পরমাণু চুক্তিটি যেন কোনোভাবেই ভেস্তে না যায়। কারণ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে করা পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে বেশ কয়েক বছরের জন্য ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে সীমিত রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ফলে এই চুক্তি ভেস্তে গেলে ইরানের আবারো পুরনো পথে ফিরে যাওয়ার শঙ্কা রয়েই যায়। অনেক কিছুই নির্ভর করছে পরমাণু চুক্তি ভেস্তে গেলে ইরানের অর্থনীতিতে কিরূপ প্রভাব পড়ে তার ওপর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণার পর থেকেই তাই আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে ইরানের ভবিষ্যত্ অর্থনীতি।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে তেলের বাজার অস্থির হয়ে পড়বে। যার প্রভাব পড়তে পারে ইরানের অর্থনীতিতে। তবে কেউ কেউ বিষয়টিকে মন্দের ভালো হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। এই দলের ব্যাখ্যা, ২০১৫ সালের জয়েন্ট কম্প্র্রিহেনসিভ প্লান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) হওয়ার পর বাস্তব অর্থে কোনো কিছুই অর্জিত হয়নি ইরানের। ধারণা করা হয়েছিল পরমাণু চুক্তির মধ্য দিয়ে ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হবে।

নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে ইরানের অর্থনীতি। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই ঘটেনি। ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রতিশ্রুতি করেছিল তাও পূরণ করেনি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইরানের নাগরিকদের জন্য ভিসা সংক্রান্ত যে জটিলতা তৈরি করে গিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এসে বরং সেটিকেই বৈধতা দিয়েছেন। অন্যভাবে বললে, জেসিপিওএ’র চুক্তি অনুযায়ী ইরানকে যে ধরনের সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি করা হয়েছিল মার্কিন সরকার শুধু ইরানকে তা থেকে শুধু বঞ্চিতই করে গেছে।

এর ফলে চুক্তির আগে যেভাবে ইরানের অর্থনীতি চলছিল চুক্তির পরও তা সেরকমই রয়ে গেছে। ক্ষেত্রবিশেষে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। চুক্তির পর ইরানের যেসব সুবিধা ভোগ করার কথা ছিল তা লাভে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও চুক্তির পরের গত আড়াই বছরে ইরান আগের তুলনায় বেশি তেল বিক্রি করতে সমর্থ হয়েছে। পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্য রফতানি করে ইরান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সুগম করলেও তা ছিল খুবই সীমিত আকারে।

জেসিপিওএ’র বাস্তবায়নকে ঘিরে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির অর্থনীতি বিশ্লেষক দল যে ধরনের হিসেব নিকেশ করেছিলেন তাও খুব একটা ফলদায়ক হয়নি। ২০১৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দেশের সাথে ইরান যেভাবে ব্যবসায়িক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়েছে তাতে মোটের ওপর ইরানের লাভ হয়েছে কম-ই। ইরানের বাজারে বিদেশি পণ্য এবং সেবা উন্মুক্ত করার পর তা ইরানের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। এমনকি নেগেটিভ বাণিজ্য ভারসাম্য শতকরা ৫০ ভাগ পর্যন্ত বেড়েছে।

মার্কিন সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ইতিমধ্যে কিছু ইউরোপীয় কোম্পানি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা গুটিয়ে আনার কথা ভাবতে শুরু করেছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় পারস্য তেল ক্ষেত্রের ১১ স্তরের কাজের জন্য গতবছর মোট ১ বিলিয়ন ইউরো (৭৫০ মিলিয়ন পাউন্ড) বিনিয়োগের চুক্তি হয়েছিল। ফরাসী তেল কোম্পানি টোটালও ইরানের সঙ্গে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার কথা বলেছে। একইভাবে জার্মানির বীমা কোম্পানি আলিয়ানজ এবং ট্যাঙ্কার অপারেটর মার্সক ইরানে তাদের ব্যবসা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের সাথে ব্যবসা করতে যাওয়া ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোরও ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা থেকে তারা পিছু হটার ঘোষণা দিচ্ছে।

চুক্তির আগে ইরানের পুঁজি ভারসাম্য পজেটিভ থাকলেও গত বছর ঘাটতি ছিল এক বিলিয়ন ডলার। চুক্তির নামে উন্নয়নের পথে হাঁটতে গিয়ে মুদ্রা মানও কমেছে। প্রেসিডেন্ট রুহানি বিভিন্ন সময় অর্থনীতির লাগাম ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। ইরানের স্বল্পমেয়াদী বিদেশি ঋণের পরিমাণ ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ ৭৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছুঁই ছুঁই করেছে। তাই অনেকেই জেসিপিওএ’র ‘মৃত্যুকে’ ইরানের বৃহত্তর অর্থনীতির সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছেন। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। তবে অর্থনীতিবিদদের সামগ্রিক বিবেচনায়, চুক্তি বাতিল হলে তা ইরানের অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দেবে।

শুধু অর্থনীতি নয় ইরানের রাজনীতিতে যে বিভক্তির সুর শোনা যাচ্ছে সেখানেও ঐক্য তৈরির সুযোগ হবে। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর এক পতাকার নিচে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইরানের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য নানামুখী পথ তৈরির দিকেও উত্সাহী করবে। তবে মন্দের ভালো হিসেবে বলা যায়, গত তিন বছরে মার্কিন প্রতিশ্রুতির যে অলীক আশার মধ্যে ইরান ঘুরপাক খেয়েছে তাতে আরো বেশি প্রমাণিত হয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কখনোই ইরানের বন্ধু ছিল না, বন্ধু হতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও বন্ধু হতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কখনোই ‘উইন-উইন গেম’ খেলতে পারবে না ইরান।

ইরানও সম্ভবত নিজেদের অবস্থাটা খানিকটা আঁচ করতে পেরেছিল যে কারণে গত বছর অক্টোবরে তুরস্কের সাথে মুদ্রা বিনিময় চুক্তি করে। আর এ বছরের এপ্রিলে উভয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, ইরানি মুদ্রা রিয়াল ও তুরস্কের মুদ্রা লিরা সহজেই বিনিময় করা যাবে। এতে মুদ্রা বিনিময় ও ব্যবসার জন্য মুদ্রা হস্তান্তর খরচ কমবে। এতদিন দেশ দুটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক লেনদেনের জন্য ইউরো ব্যবহার করে আসছিল। তুরস্কের মতো ইরানের অন্যান্য প্রধান বাণিজ্য অংশীদার যেমন চীনও মুদ্রা বিনিময় চুক্তি করার পথে অগ্রসর হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের দরুন ইউরোপীয় এসব কোম্পানি ইরানের থেকে দূরে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেওয়ার সাথে সাথে সেই শূন্যস্থান পূরণ আশা প্রকাশ করেছে চীন ও রাশিয়ার অনেক কোম্পানি। রাশিয়া জোরালোভাবেই ইরানের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে। তিন বছর আগে চুক্তি হওয়ার পর ইরান, রাশিয়া, আর্মেনিয়া, বেলারুশ, কাজখস্তান ও কিরগিজস্তান মিলে যে অর্থনৈতিক জোট গড়ে তুলেছিল সেটিও এখন প্রাণ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ট্রাম্পের ঘোষণার পরের সপ্তাহেই কাজাখস্তানের রাজধানীতে এই জোটের একটি বৈঠকও হয়েছে। তাই একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, যুক্তরাষ্ট্রের হঠকারী সিদ্ধান্ত ইরানের অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিলেও দিতে পারে।

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৪ জুন, ২০১৯ ইং
ফজর৩:৪৪
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৪৬
এশা৮:০৯
সূর্যোদয় - ৫:১০সূর্যাস্ত - ০৬:৪১
পড়ুন