ইতালিতে সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের বিজয়
০৪ জুন, ২০১৮ ইং
ইতালিতে সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের বিজয়
প্রথমবারের মতো প্রথাবিরোধী কোনো রাজনৈতিক

দল ইতালির সরকার গঠন করার সুযোগ লাভ করলো। এখন দেখার বিষয়, প্রচলিত অখ্যাত ব্যবস্থা পরিবেষ্টিত পৃথিবী আর পুনর্জাগরিত জাতীয়তাবাদ একটি মৃতপ্রায় আন্তর্জাতিক

বিন্যাসকে সংস্কার করবার শক্তি ও দূরদর্শিতা

অর্জন করতে পারে কিনা

নাজনীন সুলতানা নীতি

 

বহুদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও একটি অমীমাংসিত নির্বাচনের পর এক গুরুতর রাজনৈতিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে কোনো রকমে সমাধানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে ইতালি। মার্চে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের প্রায় তিন মাস পর শপথ নিয়েছেন ফাইভ স্টার মুভমেন্টের নেতা গুইসেপ কন্টে। কিন্তু দেশটিতে ‘মধ্যপন্থী জনহিতবাদের’ সমর্থক দুটি দল ডানপন্থী লীগ পার্টি ও ফাইভ স্টার মুভমেন্ট মিলে যে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে তা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের হর্তাকর্তাগণ।

গত ২৭ মে, ইতালীয় প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেল্লা অর্থনৈতিক বাজারের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং ইতালি থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র মুদ্রা ইউরোকে হারানোর শঙ্কা নিরসনের অন্যতম উদ্যোগ হিসেবে একজন ইউরোবিদ্বেষী অর্থমন্ত্রী নিয়োগের ওপর ভেটো প্রয়োগ করেছেন। অন্তত তার সিদ্ধান্তেতো এমনটিই প্রতীয়মান হচ্ছে। যেখানে ইতালির রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য সরকার গঠনের তত্ত্বাবধান করা এবং মন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ব্যক্তির নিয়োগে হস্তক্ষেপ করা একেবারেই গতানুগতিক একটি ব্যাপার সেখানে মাত্তারেল্লার সিদ্ধান্তে এটাই সুস্পষ্ট যে, অর্থনীতি বিষয়ে একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতেই ভেটো প্রদান করা হয়েছে।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইতালির পাঁচ লক্ষ অভিবাসী ও শরণার্থীদের নির্বাসন প্রসঙ্গে লীগ পার্টির নেতা মাত্তেও সালভিনির প্রকাশ্য অবস্থান এবং বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট মাত্তারেল্লার কিন্তু তাকে  গ্রহণ করতে কোনো দ্বিধা বা সংশয় ছিল না। এদিকে ‘পঞ্চ তারকা আন্দোলন’ তথা ফাইভ স্টার মুভমেন্ট এবং লীগ উভয়েই অর্থমন্ত্রীর পদের জন্য বিকল্প কোনো নাম প্রস্তাব করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল। ইতালীয় রাজনীতির এই পরিষ্কার বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে দুটো দলের দাবিও দ্বিধাগ্রস্ত দুই নৌকোয় দোদুল্যমান। একদিকে তারা প্রেসিডেন্টের অভিশংসন চাচ্ছে আবার তারই কাছে আরেকটি সরকার গঠনের সুযোগ প্রার্থনা করছে।

গত মার্চে ইতালির জাতীয় নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ওই নির্বাচনে কন্টের ফাইভ স্টার পায় ৩২ শতাংশ ভোট, লীগ পায় ১৮ শতাংশ ভোট। এই দুই দল জোটবদ্ধ হয়ে কন্টেকে প্রধানমন্ত্রী করতে সম্মত হয়। পরে গত ২৮ মে মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেন কন্টে। তবে ওই মন্ত্রিসভা নিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্টের আপত্তির কারণে পিছিয়ে যায় সরকার গঠনের প্রক্রিয়া। পরে ৩১ মে নতুন মন্ত্রিসভার প্রস্তাব অনুমোদন করেন প্রেসিডেন্ট।

কিন্তু এর আগে মাত্তারেল্লা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কোনো সুষোগ না রেখেই একটি টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীসভা নিয়োগ করেছিলেন।  যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইতালিতে একটি প্রাক-নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানো না গেলে প্রেসিডেন্টের এই অপরিণামদর্শী ভেটোই হয়তো দেশটিতে রাজনৈতিক মেরুকরণের সূচনা করতো। যেখানে ইতালীয় জনগণ দুটো সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী শিবিরের যেকোনো একটিতে যোগদান করতে বাধ্য হতো। একদিকে রয়েছে ইতালির ইউরোজোনের সদস্যপদ বিরোধী, চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতি ও প্রেসিডেন্টের একনিষ্ঠ সমর্থকগোষ্ঠী। তারা সবাই চলমান ব্যবস্থার অংশ হতে চায় এবং সেজন্য বিগতবার ক্ষমতায় থাকা ডেমোক্রেটিক পার্টির অক্ষরেখাতেই ক্রমাগত ঘুরছে। তাদের বিজয় হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি ইতালির অঙ্গীকারকে শুধু সুদৃঢ়ই হতো না, সেই সাথে অর্থনৈতিক দিক থেকে একেবারে সামনের কাতারে থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করবার জায়গাটাও সুনিশ্চিত হতো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বেশিরভাগ ইতালীয়র কাছে, ব্যবসা যথারীতি এক নিশ্চল অর্থনীতির নাম, আর এক অস্থিতিশীল ইউরোজোনের ভেতরে দুই অংক বিশিষ্ট বেকারত্বের মাঝে টিকে থাকার চেষ্টা করে যাওয়া।

তবে ক্ষমতায় আসা ফাইভ স্টার মুভমেন্ট ও লীগ ইতালীয় গণতন্ত্রের ওপর ইইউ -এর আমলাতন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বাজারের অত্যধিক প্রভাবের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার ছিল। তাদের দাবি একটাই, জার্মান কিংবা ফ্রেঞ্চদের নিতান্ত এক উপনিবেশ হওয়ার চেষ্টা বাদ দিয়ে ইতালি তার সার্বভৌমত্ব পুনরায় অর্জন করুক। ইতালীয় সমাজে এ ধরনের ধারণার গতি পাওয়ার পেছনে বেপরোয়া ইইউ ব্যবস্থাই দায়ী। সম্প্রতি ইইউ কমিশনার গুয়েনথার ওয়েটিঙ্গারের একটি বক্তব্য মানুষের ক্ষোভ আরো বেশি উস্কে দিয়েছে। তিনি বলেছিলেন, অর্থনৈতিক বাজারের নিয়ন্ত্রকের উচিত ইতালীয়দের ‘জনহিতবাদীদের’ ভোট প্রদান করা থেকে বিরত রাখা। এ বক্তব্যে অর্থনৈতিক বাজার একেবারে আঁতকে উঠেছে। ইতালির সরকারও আতঙ্কিত। কারণ, একদিকে তার বিপুল দেনার চাপ অন্যদিকে দ্রুত পতনশীল শেয়ার বাজার। আর আসন্ন নির্বাচনকে ইউরোজোনে ইতালির সদস্যপদের পক্ষে বিপক্ষে গণভোট হিসেবে মনে করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় মাত্তারেল্লার সিদ্ধান্ত জাতীয়তাবাদী শিবিরকে ব্যাপক শক্তিশালী যেমন করেছে তেমনি এর অবস্থানকেও আরো বেশি প্রগতিবাদী করে তোলার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তা আপাতত নস্যাত্ হয়ে গেছে।               

সামপ্রতিক একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, একটি সাধারণ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগেই আবার যে ভোটের হিসেব কষতে শুরু করেছিলেন অনেকে তা আপাতত বন্ধ হয়ে গেল। ৪ মার্চের নির্বাচনে লীগ ১৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। কিন্তু গত তিন মাসেই লীগের জনপ্রিয়তা প্রায় দ্বিগুণ দাঁড়িয়েছে। ক’দিন আগ পর্যন্ত ২৭ শতাংশ মানুষ কিনা লীগকেই ভোট দিতে চাইছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আজ একজন ইউরোবিদ্বেষী অর্থমন্ত্রীর বিনিময়ে ইতালি আগামী দিনের প্রবল ইউরো-বিরোধী সরকারেরই পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে।

আরো মৌলিকভাবে বলতে গেলে, ইতালিতে চলমান সংকট মূলত বৈশ্বিক সামপ্রতিক গতিধারারই একটি অংশ যেখানে রাজনৈতিক শূন্যস্থান দৃশ্যত দুটি পরস্পর বিরোধী অথচ মিথোজীবী ধারায় বিভক্ত। একদিকে, চলমান ব্যবস্থার প্রতিপালনে পুষ্ট ও অসাম্য আর অবিচারের জন্মদাতা সেকেলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে  দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত জাতীয়তাবাদের নতুন ধারার আবির্ভাব যা অজস্র মানুষকে তাদের সহজ স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। নব্যউদারবাদী বিশ্বায়ন, বাধাহীন অর্থনীতির স্রোত এবং ফুলে ফেঁপে ওঠা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রচার করা তথাকথিত ওয়াশিংটন ঐকমত্য মাঠে মারা পড়েছে। এর সঙ্গে অখ্যাত রাজনৈতিক শ্রেণির জোঁকের মতো আটকে থাকার চেষ্টা রাজনৈতিক দানব তৈরি করছে।

এইসব সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি। ইউরোপীয় অঞ্চলে একক মুদ্রা ব্যবস্থার অর্থ ছিল এর জনগণকে আরো কাছাকাছি নিয়ে আসা এবং এক ধরনের বহুজাতিক গণতন্ত্রের চর্চা করা। কিন্তু মুদ্রাব্যবস্থা যখন মাত্তারেল্লার অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের মতো রাজনৈতিক অসতর্কতার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় তখন পরিণতি সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে ওঠে। ইউরো জাতি এবং জনগণকে বিচ্ছিন্ন করছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের গভীর সংস্কার ও সত্যিকার গণতন্ত্রায়ন ছাড়া ইওরোজোন শেষ পর্যন্ত বিভক্ত হবেই। আর সেটি অপরিমেয় দুর্যোগ বয়ে আনবে। জাতীয়তাবাদী অন্তর্বিস্ফোরণ এবং আত্মঘাতী প্রচলিত ব্যবস্থা এই দুইয়ের মিথ্যে আশ্বাসের ধোঁয়ায় না হারিয়ে ইউরোপের অতিসত্ত্বর কার্যকরী রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

ইতালির গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে ওঠে ফাইভ স্টার মুভমেন্ট। খুব অল্প সময়েই এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আগের মেয়াদে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলেও তাতে আশানুরূপ ফল পায়নি ফাইভ স্টার। এবারেও তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি, তবে জোট হিসেবে সরকার গঠনের সুযোগ পেয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছে ফাইভ স্টার মুভমেন্টের নেতা গুইসেপ কন্টেকে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো প্রথাবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল ইতালির সরকার গঠন করার সুযোগ লাভ করল। এখন দেখার বিষয়, প্রচলিত অখ্যাত ব্যবস্থা পরিবেষ্টিত পৃথিবী আর পুনর্জাগরিত জাতীয়তাবাদ একটি মৃতপ্রায় আন্তর্জাতিক বিন্যাসকে সংস্কার করবার শক্তি ও দূরদর্শিতা অর্জন করতে পারে কিনা।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৪ জুন, ২০১৯ ইং
ফজর৩:৪৪
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৪৬
এশা৮:০৯
সূর্যোদয় - ৫:১০সূর্যাস্ত - ০৬:৪১
পড়ুন