শরণার্থীরাই আরো উন্নত বানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে!
০৪ জুন, ২০১৮ ইং
শরণার্থীরাই আরো উন্নত বানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে!

শরণার্থীরা নানাভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখেন- শ্রমিক, উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক, করদাতা, ভোক্তা ও

বিনিয়োগকারী হিসেবে। তাদের প্রচেষ্টা কর্ম সৃষ্টি করে, উত্পাদনশীলতা ও আমেরিকান শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করে

এবং বাড়িয়ে তোলে ক্যাপিটাল রিটার্নস। এসবের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে উদ্দীপ্ত করে এবং বাড়িয়ে

তোলে উদ্ভাবন, প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি ও প্রবৃদ্ধিকে। কিছু কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করে আমেরিকানরা

আর সেই কাজগুলোই অবলীলায় করে যায় শরণার্থীরা

শফিকুর রহমান রয়েল

 

সারা বিশ্ব থেকে শরণার্থীদের পুনর্বাসন থামিয়ে দেওয়া এবং সাতটি দেশের (প্রায় সবগুলোই মুসলিম) পর্যটকদের নিষিদ্ধ করার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ নিয়ে কম ঘোলা হচ্ছে না জল। নিঃসন্দেহে এগুলো নির্দয়, ঘৃণাপ্রসূত ও বিতর্কিতভাবে অসাংবিধানিক সিদ্ধান্ত। একেবারে নিশ্চিত হয়ে কেউ কি এমন কথা বলতে পারবেন যে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত আরও অনেক আগে নেওয়া হলে নাইন ইলেভেন প্রতিহত হত আর এর পরবর্তীতে ইসলামি চরমপন্থীদের দ্বারা আমেরিকার মাটিতে ৯৪ জন লোকের প্রাণ যেত না। অবশ্যই নয়, কারণ ওইসব বর্বরতার সঙ্গে জড়িতদের কেউই শরণার্থীতো নয়-ই, উপরন্তু ওই সাতটি দেশের একটিরও নাগরিক নন তারা। কাজেই এই দুটো বিষয়ের প্রেক্ষিতে এ কথা অন্তত বলে দেওয়া যায়, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত অনৈতিক; উপরন্তু অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিকর, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থীরা যে বিশাল অবদান রেখে চলেছে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ওই সাতটি দেশ থেকে উঠে এসে মার্কিন মুলুকে থিতু হওয়া লোকেরাও এর ব্যতিক্রম নয়- ইরাক, ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, সুদান ও সোমালিয়া।

মার্কিন জনসংখ্যায় শরণার্থীরা এখন পর্যন্ত ক্ষুদ্র অংশ। ১৯৭৫ সাল থেকে অনুমোদিত শরণার্থীর সংখ্যা ৩০ লাখ ৩০ হাজার। কিন্তু তাদের অবদানের প্রসঙ্গ আসলে অল্প কথায় তা শেষ করে দেওয়া অসম্ভব। গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা শিশু শরণার্থী। গুগলের পিতৃকোম্পানি এলফাবেট আমেরিকার দ্বিতীয়-মূল্যবান প্রতিষ্ঠান, যার মূলধনের পরিমাণ ৫৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। স্মার্টফোনের চ্যাট ও কলিং এপ্লিকেশন হোয়াটসঅ্যাপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যান কৌম ও পেপ্যাল সহ-প্রতিষ্ঠাতা ম্যাক্স লেভচিন ছিলেন ইউক্রেন থেকে আসা শরণার্থী। শুরুতে সাহায্য করা এবং পরবর্তীতে ইনটেলের সিইও বনে যাওয়া অ্যান্ডি গ্রোভ ছিলেন সমাজতান্ত্রিক হাঙ্গেরি থেকে পালিয়ে আসা এক সাধারণ মানুষ, যিনি ইতিমধ্যে বিদায় নিয়েছেন দুনিয়া থেকে। হেজ-ফান্ড ব্যবস্থাপক ও লোকহিতৈষি জর্জ সরস, ইনটারেকটিভ ব্রোকার্স গ্রুপের জনক থমাস পিটারফি এবং এ লিজ কর্পোরেশনকে জন্ম দেওয়া স্টিভেন উদার-হাজি’র ক্ষেত্রেও ঘটনা প্রায় একইরকম।

হয়তো কেউ কখনো কল্পনাও করেনি, আমেরিকায় পৌঁছা ওইসব শরণার্থীরা এতোটা সফল হবেন। নতুন দেশে ঢুকতে গিয়ে তারা প্রত্যাখ্যাত হলে সবচে’ ক্ষমতাধর ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রটি কি সুযোগই না মিস করত! অন্তত এটি বোঝার মতো লোকের অভাব নেই সেখানে, যেকারণে এতো আপত্তি ও আলোচনা-সমালোচনা। ইসলামি রাষ্ট্র সিরিয়ার বর্বরতা, প্রেসিডেন্ট বাসার আল-আসাদের নির্মম  সরকার এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির   পুতিনের নির্দেশে চলা বোমাবিরোধের হাত থেকে বাঁচার আশায় সাহসী সিরীয়দের কেউ মার্কিন ভূখন্ডে পৌঁছালে, তাকে ফিরিয়ে দেওয়াটা হবে অমানবিক আচরণতো বটেই, অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত অনিষ্টকর। এর জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ হচ্ছে, পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করা অ্যাপলের (যুক্তরাষ্ট্রের সবচে’ মূল্যবান কোম্পানি) সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও কিংবদন্তীতুল্য সিইও স্টিভস জবসের জীবতত্ত্বিক পিতাও কিন্তু একজন সিরীয়, যিনি দেশ ছেড়েছিলেন অনেক আগে।

ট্রাম্পের কালো তালিকাভুক্ত সাতটি দেশ থেকে উত্থিত লোকেরা এরই মধ্যে মার্কিন অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রেখেছেন। অনলাইন মার্কেটপ্লেস জায়ান ‘ইবে’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইরানি-আমেরিকান পিয়েরে অমিদিয়ারের দ্বারা। এর মার্কেট মূলধন ৩৬.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার কাছে ট্রাম্পের অনিবন্ধিত ব্যবসাদি অতি তুচ্ছ। অমিদিয়ারের নিজে কামানো ৮.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ট্রাম্পের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ মূল্যের দ্বিগুণ। সফ্টওয়্যার দুনিয়া নিয়ন্ত্রণকারী ওরাকল কর্পোরেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বব মাইনারও ইরানি-আমেরিকান। গ্রন্থাকার আয়ান হিরসি আলি সোমালি-আমেরিকান। আমেরিকায় আসার সুবাদেই লেখক হিসেবে ব্যাপক নাম কামানো এ লোক একাধারে ইসলামি চরমপন্থা ও ট্রাম্পের মুসলিম-বিদ্বেষি রাজনীতির ঘোর বিরোধী।

সব শরণার্থী ও অভিবাসীই যে সফল, এমন কিন্তু নয়। তবে কুসংস্কার বলি আর যাই বলি, এমনই ঘটে। ভিয়েতনামি ‘নৌকা মানবদের’ একটা ক্ষুদ্র অংশে যুক্তরাষ্ট্রে ঠাঁই হয়েছিল। তাদের কেউই ইংরেজি বলতে পারতো না    আর তাদের কর্মদক্ষতা ছিল নামেমাত্র। গড়ে সেই ভিয়েতনামিরাই কিন্তু আজ আমেরিকার জন্ম নেওয়া লোকেদের চেয়ে বেশি কর্মে নিযুক্ত। একই কথা প্রযোজ্য গড় আয়ের বেলাতেও। এ প্রসঙ্গে ডেভিড ট্র্যানের কথা বলতেই হয়। হাই ফং ফুড প্রোডাক্টস নামক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে এই ভিয়েতনামি শরণার্থী পুরো আমেরিকায় সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। তার প্রতিষ্ঠানে উত্পন্ন অধিকাংশ খাদ্য সামগ্রীই এশিয়ায় রপ্তানি হয়। এরমধ্যে প্রধান হচ্ছে সিরাচা চিলি সস।

শরণার্থীরা নানাভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখেন- শ্রমিক, উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক, করদাতা, ভোক্তা ও বিনিয়োগকারী হিসেবে। তাদের প্রচেষ্টা কর্ম সৃষ্টি করে, উত্পাদনশীলতা ও আমেরিকান শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করে এবং বাড়িয়ে তোলে ক্যাপিটাল রিটার্নস। এসবের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে উদ্দীপ্ত করে এবং বাড়িয়ে তোলে উদ্ভাবন, প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি ও প্রবৃদ্ধিকে। কিছু কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করে আমেরিকানরা আর সেই কাজগুলোই অবলীলায় করে যায় শরণার্থীরা। যেমন, খামারের কাজ, অফিস পরিষ্কার ও বয়স্কদের যত্ন নেওয়া। পক্ষান্তরে ভয় কাজ করে, বহিরাগতরা তাদের কাজে ভাগ বসাচ্ছে। একটি গবেষণার ফলাফলে দেখা গিয়েছিল যে, শরণার্থীরা আমেরিকানদের ভালো বেতনের কাজ করতে সমর্থ করে তুলছে। নইলে স্থানীয়দের অনেকেই পছন্দ মাফিক কাজ বেছে নিতে পারতো না।

উচ্চতর দক্ষ শরণার্থী এবং তাদের উচ্চশিক্ষিত সন্তানেরা মূল্যবান প্রতিভা সরবরাহ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে উত্পাদনশীলতা বাড়িয়ে দেওয়ায় সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, শরণার্থী হয়ে আসা সিরীয় নার্সরা রোগীদের প্রতি মার্কিন ডাক্তারদের সেবা বৃদ্ধিতে সাহায্য করতে পারে। এক হিসেবে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী হয়ে আসা ২৮ শতাংশেরই ব্যাচেলর কিংবা উচ্চতর ডিগ্রী থাকে। আমেরিকায় জন্ম নেওয়া লোকেদের বেলাতেও একই কথা খাটে। ট্রাম্পের নিষিদ্ধ তালিকানুযায়ী ইরান, লিবিয়া, সিরিয়া ও সুদান থেকে আসা লোকরা গড়ে মার্কিন নাগরিকদের চেয়ে বেশি শিক্ষিত। তারা কাজ করছে শীর্ষস্থানীয় মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোয়, বিশেষত প্রযুক্তি খাতে।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৪ জুন, ২০১৯ ইং
ফজর৩:৪৪
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৪৬
এশা৮:০৯
সূর্যোদয় - ৫:১০সূর্যাস্ত - ০৬:৪১
পড়ুন