পাকিস্তানের কারাগার অন্ধকারে আইনের আলো
০৪ জুন, ২০১৮ ইং
পাকিস্তানের কারাগার অন্ধকারে আইনের আলো
সম্প্রতি একটি কারাগার

থেকে একজন নারীবন্দি মুক্তি পেয়েছেন। আদালতে প্রমাণিত হয়েছে যে তাকে ভুল করে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনি মুক্তি পেলেন ঠিকই তবে ২০ বছর পর। পাকিস্তানে ফৌজদারি অপরাধের বিচারের যখন এই হাল তখন সেখানে কারাগারে বন্দিদের আইনি প্রশিক্ষণের বিষয়টি কিছুটা আশাব্যঞ্জকই বটে

আশেক খান আলেখীন

 

পাকিস্তানের সবকিছুই যেন কিছুটা অদ্ভুত, অনিশ্চিত। পাকিস্তানের ক্রিকেট যেমন অদ্ভুত এবং ‘আনপ্রেডিক্টেবল’, তেমনি অদ্ভুত, অনিশ্চিত দেশটির গণতন্ত্রও। সামরিক জান্তার স্টিমরোলারের নিচে পিষ্ট গণতন্ত্র বার বার মাথা তুলে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছে, মাঝে মাঝে কিছুটা সফলও হয়েছে। গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটা স্বাদ পাকিস্তানের জনগণের ভাগ্যেও জুটেছে। তবে সামরিক খোলসে ঢাকা এই গণতন্ত্র বার বার হোঁচট খেয়েছে, বিগত ৫০ বছরে দেশটির বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধান নিহত হয়েছে এবং গণতন্ত্রও সেখানে শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াতে পারেনি। উগ্রবাদী ইসলামি গোষ্ঠীগুলোও এক্ষেত্রে কমবেশি অবদান রেখেছে। কিছুদিন পর পর আত্মঘাতী হামলায় বিপুল সংখ্যক মানুষ হতাহতের ঘটনার কারণেও দেশটিতে গণতন্ত্র ভালোভাবে বিকশিত হতে পারেনি। সর্বোপরি বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের দুর্নীতি ও একনায়কসুলভ আচরণের কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেশটির আইন ও বিচার বিভাগ। পড়তি গণতন্ত্রকে বার বার টেনে তুলেছে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান এই অঙ্গটি। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্নে গদিনসীনদের অনেককেই ছাড় দেয়নি তারা। বলা চলে দেশটির বিচার বিভাগই এখন গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে এবং প্রতিটি নাগরিককে তার আইনগত অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে আইন ও বিচার বিভাগের পরামর্শে পাকিস্তান সরকার নিয়েছে বেশ কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ। এরই একটি হচ্ছে কারাবন্দিদের আইনী শিক্ষা প্রদান কর্মসূচি, পাকিস্তানের মত উগ্রপন্থি একটি দেশের জন্য যা সত্যিই বিরল এক ঘটনা।

পাকিস্তানের করাচী শহরের কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন সালমা (ছদ্মনাম)। বছরখানেক আগে স্বামীকে গুলি করে হত্যার দায়ে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়ে যায়। তবে সালমার স্পষ্ট কথা- খুনটা তিনি করেননি। কে খুন করেছে তাও তিনি জানেন না। ১ থেকে ৬ বছর বয়সী তিনটি সন্তান আছে তার। স্বামী সন্তানদের নিয়ে থাকতেন করাচী শহরের উপকণ্ঠে। স্বামী খুন হওয়ার পর বাচ্চাদের নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে চলে যান তিনি। নিজের বাড়িতে যাওয়ার উপায় ছিল না, কারণ প্রেম করে বিয়ে করার কারণে তার বাবা-মা তাকে ত্যাগ করেছিল। শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পর সেই বাড়ির লোকজন তাকে তার স্বামীর বাড়িতে গিয়ে নিজের সব জিনিসপত্র নিয়ে আসতে বলে এবং বাচ্চাদেরও সাথে নিয়ে যেতে বলে। সালমাও সরল মনে বাচ্চাদের নিয়ে স্বামীর বাড়িতে যান এবং জিনিসপত্র গোছগাছ করতে থাকেন। ঠিক তখনই সেখানে এসে হাজির হয় পুলিশ। স্বামীর খুনের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করে। কারাগারে আসার আগে প্রাণপ্রিয় সন্তানদের কাছ থেকে বিদায় নিতে, তাদের একটু আদর করার সুযোগও পাননি সালমা। টেনেহিঁচড়ে তাকে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। আর পেছন পেছন চিত্কার করে কাঁদতে কাঁদতে ছুটতে থাকে সালমার তিন সন্তান। সন্তানদের অশ্রুসিক্ত মুখগুলোই তাদের নিয়ে সালমার শেষ স্মৃতি। আজ পর্যন্ত তাদের দেখতে পাননি তিনি। সালমার বদ্ধমূল ধারণা শ্বশুরবাড়ির লোকজনই তাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। তাকে স্বামীর বাড়ি পাঠিয়ে পুলিশে খবর দিয়েছে।

সালমাকে প্রথমে নেয়া হয় সিন্ধু প্রদেশের একটি কারাগারে। সেখানে তাকে ১৪ দিন ডিটেনশনে রাখা হয়। এই ১৪টা দিন তার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। চড়, লাথি, ঘুঁষি মেরে মেরে তার কাছ থেকে জোর করে খুনের স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। ডিটেনশন শেষে করাচীতে মেয়েদের জন্য বিশেষ জেলে এনে তাকে রাখা হয়। আরও কয়েকটি কারাগারের মত সেই কারাগারেও পরীক্ষামূলকভাবে বন্দিদের জন্য আইনী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন কারা কর্তৃপক্ষ। আইনগত অধিকার সম্পর্কে কারাবন্দিদের সচেতন করে তুলতেই এই উদ্যোগ। এই ব্যবস্থায় প্রথমে বাছাই করা বন্দিদের আইনী প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। পরে তাদের দিয়েই অন্য বন্দিদের দেওয়া হয় প্রশিক্ষণ। করাচীর এই কারাগারটি তুলনামূলকভাবে ভালো। এতে বন্দির সংখ্যাও খুব বেশি নয়। কারাগারে ভালো পাঠাগারও রয়েছে যেখানে আইনের বিভিন্ন বই রয়েছে। সালমা সেখানে আইনী প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে জানতে পারেন যে, কাউকে গ্রেফতার করার ২৪ ঘন্টার মধ্যে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিয়ে যেতে পুলিশ আইনত বাধ্য। অথচ সালমাকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ৬দিন পর। সালমার সহবন্দিদের অনেককে আরও বেশ কিছুদিন পর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ।

পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালের শেষে দেশটির কারাগারগুলোতে বন্দিদের সংখ্যা ছিল সর্বমোট ৮৪ হাজার ৩১৫ জন। অথচ কারাগারগুলোর বন্দী ধারণক্ষমতা মাত্র ৪৬ হাজার ৭০৫ জন। এর মধ্যে ৭০ শতাংশের বিচারকাজ এখনও চলমান। এদের বেশিরভাগই গরিব, নিজেদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে বেশিরভাগেরই কোনো ধারণা নেই। অনেকে তার পক্ষে মামলা লড়ার জন্য কোনো আইনজীবীও নিয়োগ করেননি। একেকজনের বিচারকাজ শেষ হতে ৮/১০ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। তারপর বিচারে দোষি সাব্যস্ত হলে খুনের দায়ে কারো যাবজ্জীবন, কারো বা ফাঁসি হয়ে যায়, অন্য অপরাধের বেলায় আইন অনুযায়ী সাজা হয়। অর্থাত্ বছরের পর বছর কারাগারে বিচারের অপেক্ষায় থাকার অসহ্য মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় কয়েদীদের। অনেকে মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। প্রায়ই ঘটে আত্মহত্যার ঘটনা। আর অকালে অসুখে ভুগেও মারা যান অনেক কয়েদী। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তো কারাগারে বন্দি নির্যাতনের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে।

সম্প্রতি একটি কারাগার থেকে একজন নারীবন্দি মুক্তি পেয়েছেন। আদালতে প্রমাণিত হয়েছে যে তাকে ভুল করে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনি মুক্তি পেলেন ঠিকই তবে ২০ বছর পর। পাকিস্তানে ফৌজদারী অপরাধের বিচারের যখন এই হাল তখন সেখানে কারাগারে বন্দীদের আইনী প্রশিক্ষণের বিষয়টি কিছুটা আশাব্যঞ্জকই বটে। এটা যদি অব্যাহত রাখা যায় তাহলে ভবিষ্যতে তা সুফল দেবে একথা নিশ্চিত করেই বলা যায়। ইতিমধ্যে এর লক্ষণ দেখা যেতে শুরু করেছে। করাচীতে প্রতারণার দায়ে মারি নামে এক বন্দির কয়েক বছরের জেল হয়েছে। কিন্তু এর আগে বিনাবিচারে তাকে আটক  রাখা হয় অন্তত ৬ বছর। মারি এখন বলছেন, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আমি অবশ্যই আইনী লড়াই করবো। এতগুলো বছর যে আমাকে বিনাবিচারে আটকে রাখা হলো তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে আমাকে। এজন্য প্রয়োজন হলে আমি সর্বোচ্চ আদালতেও যাব।

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৪ জুন, ২০১৯ ইং
ফজর৩:৪৪
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৪৬
এশা৮:০৯
সূর্যোদয় - ৫:১০সূর্যাস্ত - ০৬:৪১
পড়ুন