আইএসের পতন পরবর্তী মসুল ও বিশ্বমানবতা সংকট
০৪ জুন, ২০১৮ ইং
আইএসের পতন পরবর্তী মসুল ও বিশ্বমানবতা সংকট
তানিয়া পারভীন

 

ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল। ২০১৪ সালে যে শহর আইএসের বর্বরোচিত ও অনাহুত আগ্রাসনের ফলে বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল এক ঝটকায়। মূলত ক্ষমতা কুক্ষিকরণ, আধিপত্য বিস্তারের লোলুপতা এবং আদর্শিক দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত অভিপ্রায়ের পরিণাম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল মার্কিনীদের করাল আগ্রাসন। বেদনাদায়ক হলেও সত্যি, একসময়ের তিলোত্তমা শহর মসুল স্বার্থবুদ্ধিতার প্রগাঢ় অন্ধত্বের দৌরাত্ম্যে ধ্বংসস্তূপের এক মূর্তিমান ভাস্কর্যে পরিণত হয়ে ওঠে দুনিয়ার তামাম মুল্লুকে। চার বছরের ব্যবধানে আইএস মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে ইরাককে। কিন্তু এই চার বছরে ইরাকের অবকাঠামো, স্থাপনা-স্থাপত্য, শিল্প-সাহিত্য, অর্থনীতি তথা সামগ্রিক দেশের যে ক্ষতিসাধিত হয়েছে তা বিশ্ববাসীর কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। কিন্তু আইএস যুগের নির্মমতায় মানুষের বিশ্বাস আর নিরাপদ জীবনের যে স্বপ্ন মরীচিকায় পরিণত হয়েছিল সেই চিত্র অনেকেরই অজানা।

উগ্রসন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস দমনের পর ইরাকী সরকার সন্ত্রাসীদের পরিবারগুলোকে বেশ কিছু ক্যাম্পে নজরবন্দি করে রেখেছে। আইএসের সহিংসতা রুখতে ইরাকী সরকারি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে পুরুষ সদস্যরা, আর তাদের স্ত্রী-সন্তান-সন্ততিদের বন্দী করে রাখা হয়েছে ইরাকের মাহাম ক্যাম্পে। সেখানে প্রায় ১০০০ নারী ও ৮২০ জন শিশু মানবেতর জীবনযাপন করছে। এরা প্রত্যেকেই তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষমাণ তাদের জন্য নির্ধারিত কোর্টের শুনানির জন্য। কিন্তু এখানে বিচারিক অবস্থার এমন বেহাল ভগ্নদশা, যে তার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া দিবাস্বপ্নের সামিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনেক আগেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আগাম মন্তব্য করেছিলেন, আইএস পতনের পর মসুল ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় মানবিক সংকট জটিল ও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। বিশেষজ্ঞদের এমন সংশয়পূর্ণ মন্তব্য যে অমূলক বা নেহাতই মনগড়া নয়, তা বিশ্ববাসীর কাছে এখন ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে ২০১৪ সাল নিঃসন্দেহে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। কারণ সেবছরই বর্বর সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসের আগ্রাসী ক্ষমতার কোপানলে করায়ত্ত হয় মসুল। এবং এর পরপরই মসুলের গ্রান্ড আল জুরি মসজিদে খেলাফতের ঘোষণা দেয় ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক এন্ড দ্য লেভান্ত (আইএস) এর নেতা আবু বকর আল বাগদাদি। এসময়ে তিনি একটি নতুন খিলাফত এবং নিজেকে মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে জানান দেন। যা সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আইএস প্রণীত খিলাফত সাম্রাজ্যের বিশ্বনিয়ন্তা হয়ে দাঁড়ায়। বলাবাহুল্য, সে সময় সুন্নি অধ্যুষিত মসুলের অবহেলিত জনপদের একাংশ আইএসের অতর্কিত ক্ষমতা গ্রহণকে নীরবে সম্মতি জানায়। সেসময় আইএসের প্রতি আগ্রহী হয়ে ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তরুণ-তরুণীরা এদলের অনুসারী হন। যার দুর্নিবার ফলাফল অনিবার্য সহিংসতা ও সংকটাপন্ন মানবতা।

অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ আবার এমনও মন্তব্য করেছেন যে আপাতদৃষ্টিতে আইএস পতন হওয়ায় উগ্রসন্ত্রাসবাদের নিধন হয়েছে মনে হলেও একটি বিষয় কোনোভাবে নিশ্চিত বয়ান দেওয়া যাচ্ছে না যে, এতকিছুর পরও জাতিগত দ্বন্দ্ব নিরসনে নেতারা অব্যর্থভাবে সফল হবেন কি-না। যদি দেশটিতে রাজনৈতিক নেতারা আবারো ব্যর্থ হন, আইএসের মতো ভিন্ন কোনো সংগঠন দানা বেঁধে আবার যে সংঘবদ্ধ হয়ে অঘটন ঘটাবে না, একথার সত্যতা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। মরিয়ম তার সন্তান ওসামা এবং স্বামীকে নিয়ে সুদূর মস্কো থেকে মসুল পাড়ি জমান ২০১৪ সালে। তার স্বপ্ন ছিল ইরাকের মতো একটি মুসলিম রাষ্ট্রে নিরাপদে এবং খুব ভালোভাবে জীবন অতিবাহিত করবেন তার পরিবার নিয়ে। কিন্তু বাস্তব এবং কল্পনার মধ্যকার তারতম্যে তার অবস্থা এখন দিশেহারা প্রায়। কারণ মরিয়ম কখনো কল্পনা করেননি উগ্রসন্ত্রাসী তকমা গায়ে এঁটে তাকে একদিন কোর্টে হাজিরা দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মরিয়ম এবং মরিয়মের মতো এমন হাজার জনের বেশি নারী ভাগ্যবিধাতার কুচক্রে বিড়ম্বিত এবং অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন।

ইরাকে এমন অসংখ্য নারী-পুরুষ আছেন, যারা আইএসের পক্ষে সশস্ত্র যুদ্ধ না করেও ঘটনাচক্রে বিদ্রোহী, দেশদ্রোহিতার খেতাব পেয়েছেন। আবার অনেক হতভাগ্যরা আছেন, যারা শুধু নেহাতই ঘটনার সাক্ষীগোপাল হয়ে কয়েদখানার ঘেরাটোপে আবদ্ধ। মনে হতেই পারে এসমস্ত ভাগ্যবিড়ম্বিতদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই, যার বদৌলতে তারা এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পান। হয়তো পথ আছে ঠিকই, কিন্তু তা বাতলে দেবার মতো কোনো পথপ্রদর্শক তাদের পাশে নেই। আইন আছে লিখিত বিধান হয়ে সুদৃশ্য মলাটের ভেতর ঠাসা শব্দমালা হয়ে। নিরপরাধীদের ফরিয়াদ শোনার মতো সেখানে এমন কেউ নেই, যার হাত ধরে মুক্তি মিলবে এসমস্ত মানুষদের। মানবতার চরম বিপর্যয়ে- এরা অসহায়। এই অসহায়ত্ব মোচনের কী উপায় তা জানার এবং প্রাণে বেঁচে থাকার জন্য উন্মুখ মরিয়মদের মতো এমন হাজারো ভাগ্যবিড়ম্বিতরা।

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৪ জুন, ২০১৯ ইং
ফজর৩:৪৪
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৪৬
এশা৮:০৯
সূর্যোদয় - ৫:১০সূর্যাস্ত - ০৬:৪১
পড়ুন