সৌদি যুবরাজের ঘটনাবহুল এক বছর
নাজনীন সুলতানা নীতি০২ জুলাই, ২০১৮ ইং
সৌদি যুবরাজের ঘটনাবহুল এক বছর
সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে অকল্পনীয় আলোড়ন তুলে যুবরাজ হিসেবে অধিষ্ঠিত হওয়ার এক বছর পূর্ণ করেছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। গত বছর এক রাজকীয় আদেশ জারির মাধ্যমে পিতা বাদশাহ সালমান নিজ ভাইপোর স্থলে তাকে মনোনীত করেছেন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সী এই যুবরাজ বেপরোয়া না হলেও অনেকের কাছে উচ্চাভিলাষী আখ্যা পেয়েছেন ইতোমধ্যেই। একদিকে ক্ষমতা সুসংহতকরণ অন্যদিকে একজন সংস্কারক ও উদারপন্থি ইসলামের প্রতীক হিসেবে নিজ ভাবমূর্তি প্রকাশ করা উভয়ই কোনো সময়ের অপচয় না করে সুসম্পন্ন করেছেন তিনি।

সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে কাতারের ওপর সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিসরের অবরোধের পেছনে স্থানীয়ভাবে এমবিএস নামে পরিচিত যুবরাজেরই মূল হাত ছিল বলে মনে করা হয়। কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার উদ্যোগটিও মূলত মোহাম্মদ বিন সালমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন যায়েদ আল নাহিয়ান এর মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল যা সত্যিকার অর্থে তাত্পর্যবহ কিছু বয়ে আনতে তো পারেই নি উল্টো উপসাগরীয় সহযোগী পরিষদের অভ্যন্তরে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। এছাড়া লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির রিয়াদ থেকে বহুল আলোচিত জোরপূর্বক পদত্যাগের ঘোষণার পেছনেও ছিল সৌদি যুবরাজের ভূমিকা। যদিও পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে হারিরি শিগগিরই নিজ দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।

২০১৫ সালে বিশ্বের কনিষ্ঠতম প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার দু’মাস যেতে না যেতেই বিন সালমান ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার ঐ হঠকারী সিদ্ধান্তে এখন পর্যন্ত মানবিক দুর্যোগ নেমে এসেছে ইয়েমেনে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিন সালমান শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মী, লেখক, সাংবাদিক এবং দুজন প্রভাবশালী মুসলিম পণ্ডিতসহ ডজনেরও অধিক সমালোচক ও ভিন্নমতাবলম্বীকে কারাবন্দি করেছেন যা মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কর্তৃক মানবাধিকার ও সংস্কারের পক্ষে বলিষ্ঠ আওয়াজের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তিরস্কৃত হয়েছে। এ ঘটনার এক মাস পরই রিয়াদে একটি সম্মেলনে বক্তব্য উপস্থাপনের সময় বিন সালমান চরমপন্থার শেষ ভগ্নাংশটুকুও বিলুপ্ত করার শপথ নিয়েছেন। সেখানে এও যোগ করেছেন যে, সৌদি আরব পৃথিবীর সকল ধর্মের জন্য উন্মুক্ত একটি উদারপন্থি ইসলামের দেশে পরিণত হবে।

রাজনৈতিক দুর্নীতির মূলোত্পাটন: গত নভেম্বরে, বিন সালমানের নির্দেশে সৌদি যুবরাজ, উচ্চবর্গীয় ব্যবসায়ী ও সরকারি মন্ত্রীসহ প্রায় ৩৮০ জনকে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের আওতায় গ্রেফতার করা হয় যা সোজা চোখে নিজের সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের রাজনৈতিকভাবে বিলুপ্ত করবারই একটি উদ্যোগ বলে মনে করা হচ্ছে। সে সময় তাদের বেশির ভাগ রিয়াদের বিলাসবহুল রিটজ-কার্লটন হোটেলে বন্দি ছিলেন। জানা গেছে এদের অনেকেই মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদানের বিনিময়ে ছাড়া পেয়েছেন।

সৌদি যুবরাজ বর্তমানে তিনটি প্রধান নিরাপত্তা শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। আবার দেশটির ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে না চটিয়ে সেখানেও বেশ নৈকট্য বজায় রেখে চলছেন। যদিও যুবরাজের মূল উদ্দেশ্য ধর্মীয় রক্ষণশীলদের ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমিয়ে নিয়ে আসা। দুর্নীতি দমনে যুবরাজের গৃহীত সব ব্যবস্থা রাজ্যের প্রধান ধর্মীয় পরিষদের অনুমোদনক্রমে কার্যকর হয়েছিল। আর এই সব ব্যবস্থায় সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বার্তাটি এই যে, রাজপরিবার কোনো আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

সামাজিক সংস্কার: রক্ষণশীল সৌদি আরবকে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী করে তুলতে বিন সালমানের আধুনিকায়নের প্রচেষ্টাগুলো বহু প্রতীক্ষিত এবং প্রগতিশীল উদ্যোগ। আর এই কাজে সবচেয়ে বড় সমর্থন তিনি পেয়েছেন জনগণের কাছ থেকে যাদের ৬০ শতাংশেরই বয়স ৩০ এর কম।

এ বছরের জানুয়ারিতে নারীদের প্রথম বারের মতো উন্মুক্ত স্টেডিয়ামে খেলা দেখার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে যা এতদিন শুধু পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এছাড়াও এক রাজকীয় আদেশের মাধ্যমে গণসম্মিলনের স্থানগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, সেই সঙ্গে নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে সামপ্রতিক ও চলমান সৌদি নারীবাদী ও সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি এখনও আড়ালেই রাখা হয়েছে। অথচ তারা নারীদের গাড়ি চালানোর পক্ষে, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং লিঙ্গ সমতার সমর্থনেই জনসমক্ষে কথা বলতেন।

রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে যারা মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য কাজ করতেন, কর্তৃপক্ষ তাদের রাজ্যের দুষ্টু দমন অভিযানের বিষয়বস্তু করেছে। বিদেশি শক্তির সঙ্গে গোপন যোগাযোগ আছে এই অভিযোগে তারা বিশ্বাসঘাতক সাব্যস্ত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, তাদের ২০১৪ এর দুর্নীতি বিরোধী আইনের আওতায়ও অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি ভিন্নমত অবলম্বনকারীদের অবলোপনের একটি কৌশল হিসেবে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো কড়া সমালোচনা করেছে।

অর্থনৈতিক পরিবর্তন: ভিশন ২০৩০ এর মাধ্যমে সৌদির অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন সূচনা করেছেন যুবরাজ বিন সালমান। এই পরিকল্পনার আওতায় যুবরাজ দুই বছর আগে রাজ্যের অর্থনীতি ও তেলের ওপর একক নির্ভরশীলতাকে কমিয়ে আনতে বহুমুখী পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন যার কার্যকারিতা মূলত সামাজিক সংস্কার এর ওপর নির্ভর করে। আর এজন্য নারীদের মূল কর্মশক্তিতে অন্তর্ভুক্তিকরণ বাঞ্ছনীয়।

শিক্ষা, পর্যটন এবং বিনোদনের মতো গণখাতগুলোর উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি প্রয়োজনীয় রূপরেখা তৈরি করেছেন। তেমনি একটি পরিকল্পনা, দেশটির উত্তর-পশ্চিম তীরে ৫০০ বিলিয়ন ডলার  ব্যয়ে একটি উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষমতা সম্পন্ন ‘অর্থনৈতিক অঞ্চল’ তৈরি করা যা জর্ডান ও মিসরেও সম্প্রসারিত হবে। যেহেতু বহু দশকের অর্থনৈতিক লোপাটের  ফলে অর্থনীতি বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির শিকার সেজন্য ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনার আওতায় একটি সার্বভৌম অর্থ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরই সঙ্গে সৌদি আরবের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল উত্পাদন প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যা ইতিপূর্বে চিন্তাই করা যেত না।

সৌদি আরবে লোভনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে যুবরাজ মিসর থেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় সরকারি ভ্রমণেও গিয়েছেন। এসব দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গ এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়িক নির্বাহীদের সঙ্গে তিনি সাক্ষাত্ করেছেন এবং তাদের দিয়ে কন্টাক্ট বন্ডে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছেন এই আশ্বাসে যে, বিনিময়ে সৌদি আরবকে তিনি অতি রক্ষণশীল ঈশ্বরতন্ত্রের স্থলে আধুনিক দেশে পরিণত করবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

অপরিণামদর্শী আচরণ: তবে আঞ্চলিক  দৃষ্টিকোণ থেকে যুবরাজের ত্বরিত সিদ্ধান্তগুলো প্রকৃতপক্ষে তেমন সুবিধাজনক হয় নি। প্রতিবেশী ইয়েমেন ও কাতারের বিরুদ্ধে তার গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ফেলেছে এবং তাতে আঞ্চলিক শক্তির চেয়ে দুর্দশাই প্রদর্শিত হয়েছে বেশি। এছাড়াও রাজ্যের রক্ষণশীল ও সংস্কারমুখী, উভয় শ্রেণির মানুষের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করে চলা যুবরাজের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা যেটি থেকেই্ যাচ্ছে। যদি বেশি চাপ প্রয়োগ করেন তিনি, আর রক্ষণশীল ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়া তাতে যদি চলমান সমাজ ব্যবস্থার আকস্মিক পরিবর্তন হয় তাহলে কিন্তু তার বৈধতাই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে। আবার যদি তিনি ঐ গোঁড়া বিরোধীদের সহযোগিতা করেন, তবে ইতোমধ্যেই সংস্কারের সংস্পর্শে আসা সৌদি আরবে সামাজিক অস্থিতিশীলতার সূত্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, যা পুরো দেশকে সামান্য পরিবর্তন আর অতি নিষ্পেষণে ভারাক্রান্ত এক কর্দমাক্ত জলাভূমিতে পরিণত করবে।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২ জুলাই, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৭
যোহর১২:০৩
আসর৪:৪৩
মাগরিব৬:৫৩
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১৫সূর্যাস্ত - ০৬:৪৮
পড়ুন