এরদোগানের মেগা খাল খনন কর্মসূচি
এম এ আলআমিন০২ জুলাই, ২০১৮ ইং
এরদোগানের মেগা খাল খনন কর্মসূচি

তুরস্কে ২৪ জুন অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোগান আরও এক মেয়াদের জন্য ক্ষমতা নিশ্চিত করেছেন। তার দল একেপিও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। প্রথম দফা ভোটগ্রহণেই এরদোগান ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে যান। তাই দ্বিতীয় দফা ভোট নেয়ার দরকার হয়নি। দেশটিতে একই দিনে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়।

এবারের নির্বাচনের বিশেষত্ব হলো, গত এপ্রিলে গণভোটের মাধ্যমে দেশটিতে যে নতুন সংবিধান গৃহীত হয়েছিল নির্বাচনের পর সেটি বলবত্ হতে যাচ্ছে। সংশোধিত সংবিধান প্রেসিডেন্টকে প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী করেছে। ২০০২ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই এরদোগান বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে হাত দিয়েছিলেন। নির্বাচনের ফল বলে দিচ্ছে তার সরকারের গৃহীত এসব কর্মসূচির প্রতি জনগণের সমর্থন কিছুটা হলেও আছে। বিশেষ করে তার একটি মেগা খাল খনন কর্মসূচি এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। এরদোগান যে খাল খনন কর্মসূচিটি হাতে নিয়েছেন সেটি পুরো তুরস্ককে দুভাগ করবে এবং তা হবে দেশের নিজস্ব বাণিজ্য রুট। এরদোগানের দাবি এই খাল ইতিহাসে জায়গা করে নেবে। নির্বাচনের আগের সপ্তাহে রাজধানী ইস্তাম্বুলে প্রচারাভিযান চালানোর সময় এরদোগান বলেন, ‘পানামা খাল পানামা দেশটির পরিচয় দিয়েছে। মিসরের রাজস্ব আয়ের প্রধান উত্স সুয়েজ খাল। ইস্তাম্বুল খাল যেন হতে পারে আমাদের এ নগরীর জন্য মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেয়ার একটি ব্যবস্থা সে লক্ষ্যে আমি ভোটারদের সমর্থন চাই।’ তিনি গত ১৬ বছরে দেশটিতে যেসব পরিবর্তন এনেছেন এবারের নির্বাচন তার প্রতি জনসমর্থনের আস্থা-অনাস্থা প্রকাশের একটি উপলক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি এ সময়ে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জেলে পুরেছেন ও নাগরিক অধিকার খর্ব করেছেন। যদিও এ সময় প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ বজায় থাকে এবং মধ্যবিত্তের জীবনধারণে খুব একটা সমস্যা হয়নি।

প্রায় প্রতিটি শহরেই এরদোগান নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। সাধারণ মানুষের মনে এমন ধারণা হয়েছে যে এরদোগান একজন ‘নির্মাণ পাগল’ মানুষ। খাল খনন প্রকল্প এরই সর্বশেষ উদাহরণ। কেউ কেউ একে তার দূরদর্শিতা হিসেবেও দেখছেন। আবার অনেকে একে অপ্রয়োজনীয় খরচ মনে করেন। এরদোগান এবারের নির্বাচন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেড় বছর এগিয়ে এনেছেন। হতে পারে তার দুর্বল বিরোধী প্রতিপক্ষ যেন সুগঠিত হওয়ার সময় না পায় সেজন্য নির্বাচন এগিয়ে এনেছেন। কিন্তু বিরোধীরা এরই মধ্যে নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলেছিল। ফলে নির্বাচনে এরদোগান ৫০ শতাংশের ভোট পাবেন কি না তা নির্বাচনের ঠিক আগেও কেউ নিশ্চিত ছিল না। ৫০ শতাংশের কম ভোট পেলে দ্বিতীয় দফা ভোটে যেতে হতো। প্রতিটি নির্বাচনী সমাবেশেই এরদোগান তার নির্মাণ কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরেন। বিরোধীরা ক্ষমতায় এলে সব ধ্বংস করে ফেলবে বলে তিনি সতর্ক করে দেন। সম্প্রতি এক সমাবেশে তিনি বলেন, তার দল একেপি সারাদেশে ২ লাখ ৮৪ হাজার শ্রেণিকক্ষ তৈরি করেছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘আপনারা কি চান কেউ এসে এগুলো সব শেষ করে দিক?’ নির্বাচনী পোস্টারে প্রস্তাবিত খালটি প্রাধান্য পেয়েছিল। যদিও এটি খননের কাজ এখনও শুরু হয়নি। এরদোগান বলেছেন, তিনি পুনর্নির্বাচিত হতে পারলে শীঘ্রই এর পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু করবেন। তবে তার সবগুলো বড় বড় প্রকল্পের মূলমন্ত্র হলো অটোমান সাম্রাজ্য থেকে কামাল আতাতুর্ক পর্যন্ত তুরস্কের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তুলে ধরা।

কৃষ্ণ সাগর থেকে মর্মর সাগর পর্যন্ত ২৮ মাইল (৪৫ কিলোমিটার) দীর্ঘ খাল তৈরিতে ব্যয় হবে আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। সমালোচকরা বলছেন, এ খরচ ৬৫ বিলিয়নে পৌঁছাতে পারে। প্রায় ৮ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। এরদোগান সাত বছর আগে যখন এ খালের কথা প্রথম বলেন, তখনই অনেকে ‘ক্ষ্যাপাটে ধারণা’ বলে প্রকল্পের সমালোচনা করেছিলেন। এরদোগানের বক্তব্য, এ খাল থেকে রাজস্ব আয় হবে। খাল ব্যবহারকারী নৌযানগুলো টোল দেবে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, এ খাল ইস্তাম্বুলের একটি বড় অংশের প্রতিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করবে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই বলে যে, এর ফলে স্থানীয় আদি ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বদলে যেতে পারে। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন এ প্রকল্প আর্থিকভাবে টেকসই হবে না। প্রকল্পটি আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি-না তা নিয়েও অনেকের সংশয় আছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, ইস্তাম্বুল খাল নামে এরদোগান যে মেগা প্রজেক্টের কথা বলছেন সেটি যে কেবল তার উচ্চাভিলাষী একটি পরিকল্পনা তা নয়, অটোমান শাসনামলে ষোড়শ শতাব্দী থেকে স্থানীয় লোকজন এরকম খাল খননের প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবেছে। এ বিষয়ে ২০০৯ সালে সমীক্ষা হয়। এরপর ২০১১ সালের এপ্রিলে এরদোগান খাল খননের পরিকল্পনার কথা প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেন।

জার্মানিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দি ইউনাইটেড স্টেটসের আঙ্কারা শাখার পরিচালক অজগুর উনলুহিসারসিকলি মনে করেন, বিশাল বিশাল নির্মাণ প্রকল্পগুলো এরদোগান রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য করলেও এটি দেশটির বিভিন্ন শহরের মধ্যে বন্ধন আরও সুদৃঢ় করেছে। এ থেকে বিভিন্ন শহরের মধ্যে যোগাযোগ যেমন বেড়েছে তেমনি দেশটিতে বিপুলসংখ্যক স্বল্প শিক্ষিত মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। তবে বিরোধীদের দাবি প্রকল্পগুলো আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করেছে। এরদোগান ও তার ঘনিষ্ঠরা এসব প্রকল্প থেকে সরাসরি লাভবান হয়েছেন। তাদের মতে, বেশির ভাগ প্রকল্পই বাস্তবায়িত হয়েছে বিদেশি ঋণের অর্থে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে তা উঠে আসার সম্ভাবনা নেই বললে চলে।

বিরোধী পক্ষের লোকজন এ খাল নিয়ে প্রথম থেকেই বিরোধিতা করে আসছেন। পরিবেশবাদীদের থেকেও সমর্থন আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছেন এরদোগান। তা সত্ত্বেও নিজের পরিকল্পনা থেকে একচুলও সরে আসতে নারাজ তুরস্কের এ শাসক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার এ প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখলে এটাই হয়তো তুরস্ককে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবে বিশ্ববাসীর কাছে।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২ জুলাই, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৭
যোহর১২:০৩
আসর৪:৪৩
মাগরিব৬:৫৩
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১৫সূর্যাস্ত - ০৬:৪৮
পড়ুন