পুতিনের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক
ট্রাম্প দেবেন বেশি নেবেন কম!
শিফারুল শেখ০২ জুলাই, ২০১৮ ইং
ট্রাম্প দেবেন বেশি নেবেন কম!

রাশিয়ার কাছ থেকে ভারত অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্র কিনছে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছুটা অসন্তুষ্ট হওয়ার মনোভাব প্রকাশ পায়। তখন ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র কেনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেয়। অথচ সেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করছেন। আগামী ১৬ জুলাই ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে দুই রাষ্ট্র প্রধানের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বহুদিন ধরেই পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন ট্রাম্প। তার এক সহযোগী জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের জন্য ব্যাকুল হয়ে বসে আছেন। কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি বিশ্লেষক তথা বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের কারো আশঙ্কা, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেবেন বেশি, নেবেন কম। আবার এই দু’জনের বৈঠককে ঘিরে ক্ষুব্ধ মার্কিন মিত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

আশঙ্কার কারণ: দুশ্চিন্তা এই যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ১২ জুন সিঙ্গাপুরে কিম জং উনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে যেভাবে তিনি কিমকে দিয়েছেন একইভাবে পুতিনকেও দেবেন। রাশিয়া কিমের সঙ্গে বৈঠকে সহায়তা করেছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। গত কিছুদিন ধরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাশিয়াকে শিল্পোন্নত দেশগুলোর সংগঠন জি-সেভেন এ অন্তর্ভুক্ত করে জি-৮ গ্রুপ করার দাবি করছেন। ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখলের কারণে রাশিয়াকে বাকি সদস্য দেশগুলো মিলে বাদ দিয়ে জি-৭ করেছিল। ট্রাম্প বলছেন, ক্রিমিয়াকে নিজেদের দাবি করার অধিকার রাশিয়ার আছে। কারণ সেখানে প্রচুর মানুষ বাস করে যারা রুশ ভাষায় কথা বলেন। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। কিমের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেছেন, তিনি উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করছেন। অথচ উত্তর কোরিয়া এখনো তাদের পরমাণু কেন্দ্রের আধুনিকায়নের কাজ করে যাচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও স্থগিত করেনি। কিন্তু ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন। পিয়ংইয়ং দীর্ঘদিন ধরেই এই দাবি করে আসছিল। গত নভেম্বরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং শি’র ভূয়সী প্রশংসা করেন। অথচ চীন ওই বৈঠকে বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবিলায় কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার করেনি। এখন চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ করতে হচ্ছে।

রাশিয়া, চীন এবং উত্তর কোরিয়ার তিনজন শাসকই একনায়ক বলে ধরে নেওয়া হয়। অথচ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাদের প্রশংসা করেন। কারণ ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, তিনি তার ব্যক্তিগত কূটনৈতিক দক্ষতা দিয়ে এসব ব্যক্তিকে বাগে আনবেন এবং লাভবান হবেন। মস্কোতে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল ম্যাকফল মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন যে, একটা ভালো বৈঠক ইতিবাচক কূটনীতির লক্ষণ। কিন্তু সেই ধারণা ভুল। ভালো বৈঠক বলতে বোঝায় যা সর্বশেষ ভালো ফল দেয়। ম্যাকফল মনে করেন, ট্রাম্প যেভাবে পুতিনের প্রশংসা করেন তাতে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা হবে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পিও এবং অন্য কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, আগের ওবামা প্রশাসনের চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার প্রতি অনেক কঠোর। তারা উদাহরণ হিসেবে রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ইউক্রেনে সৈন্যদের অস্ত্র সহযোগিতা বৃদ্ধি, রাশিয়ার কূটনীতিক বহিষ্কার এবং রাশিয়ার সাইবার যুদ্ধ নিয়ে কড়া প্রতিবাদের কথা বলেন। ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তারা এগুলো ঠিক বললেও বিরোধিতা করে বলেন, পুতিনের প্রশংসা এসব সিদ্ধান্ত ঢেকে দিয়েছে।

বিল ক্লিনটন ও জর্জ ডাব্লিউ বুশ আমলের কর্মকর্তা নিকোলাস বার্নস বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কী কথা বলেন সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার বক্তব্য তার নীতিকে অবজ্ঞা করে। এমনকি তিনি যে তার নিজ প্রশাসনর কর্মকাণ্ড থেকে ভিন্ন পথে সেই ইঙ্গিতও দেয়।

বর্তমানে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস এর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এন. ঘাস বলেন, ওবামার চেয়েও ট্রাম্প কিছুটা বেশি করেছেন। কিন্তু সেইসব কর্মকাণ্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা গানের লিরিকস এর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা গানকে অবমাননা করছেন। অথচ কিছু লিরিকস কঠিন হলেও গানটি ভালো হতে পারে।

ট্রাম্প সিঙ্গাপুরে বৈঠকের পর ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, তিনি যদি পুতিনের সঙ্গে একটা নৈশভোজ করতে পারেন তাহলে তিনি সিরিয়া থেকে রুশ সৈন্য প্রত্যাহার এবং ইউক্রেনে হস্তক্ষেপ থেকে রাশিয়াকে ফেরাতে পারবেন। গত বুধবার কংগ্রেসের সামনে সাক্ষ্য দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের বিষয়টি তুলবেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এর আগে একটি সম্মেলনের ফাঁকে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেছিলেন, আমি নির্বাচনে হস্তক্ষেপ নিয়ে পুতিনকে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি অস্বীকার করেছেন। আমার মনে হয়, এই প্রশ্ন করায় তিনি খুব বিরক্তিবোধ করেছেন যা আমাদের দেশের জন্য ভালো নয়। ম্যাকফল মনে করেন, পুতিন একটা ভালো সুযোগ পাবেন এবং নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ইউক্রেন ইস্যুতে ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হবেন। কারণ পুতিনের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা আছে।

ট্রাম্পই কেবল যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে বৈঠকের চেষ্টা করছেন তা কিন্তু নয়। এর আগে বিল ক্লিনটন বরিস ইয়েলেিসনের সঙ্গে, বুশ পুতিনের সঙ্গে, বারাক ওবামা পুতিনের মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করা দিমিত্রি মেদভেদেভের সঙ্গে বৈঠকের চেষ্টা বা বৈঠক করেছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সব বিষয়ের মধ্যে পুতিনকে দৃশ্যমান করে তুলছেন।

প্রধান মার্কিন মিত্ররা ক্ষুব্ধ হবে: ইউরোপের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে নানা ইস্যুতে বিরোধ। ট্রাম্প মনে করেন না যে রাশিয়া নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু পশ্চিমা মিত্ররা সেটা মনে করে। বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি নিয়ে ইইউ’র সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক জোট ন্যাটোকেও খুব ভালোভাবে নিচ্ছেন না ট্রাম্প। ইইউ এখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তারা এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে চায় না। অনেকের আশঙ্কা ট্রাম্প পুতিনের সঙ্গে পোল্যান্ড এবং বাল্টিক রাষ্ট্রসমূহে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক মহড়া বন্ধ এবং ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়াকে কিছু না বলেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে পারেন। এগুলো হবে ইউরোপের জন্য বিষফোঁড়া।

ইসরাইলে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্টিন এস. ইন্দ্রিক বলেন, ট্রাম্প যদি বৈঠকের সময় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরান এবং সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়ার সমর্থন আদায় করতে পারেন তাহলে বৈঠকটি ফলপ্রসূই হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি এক্ষেত্রে সফল হতে না পারে এবং রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তাহলে ইউরোপীয় মিত্ররা ক্ষুব্ধ হবে। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার লিখেছিলেন, অচলাবস্থা নিরসনে ব্যক্তিত্ব এবং নিজের সমঝোতার দক্ষতার ওপর নির্ভর করা খুবই বিপজ্জনক।

সম্পর্কের উন্নয়ন: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রেসিডেন্ট পুতিন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়ন চান। কারণ এর আগে তাদের মধ্যে বৈঠক হলেও সেটা ছিল অনানুষ্ঠানিক বৈঠক। দুই নেতা বহু দিন ধরেই এরকম একটি বৈঠকের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ক্রেমলিনে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট পুতিন দু’জনই মনে করেন নিজেদের মধ্যে সমস্যা দূর করা ও সহযোগিতার সুযোগ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই দুই দেশের নেতাদের একসঙ্গে আলোচনা করা উচিত। শুধু যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই নয়, আমি মনেকরি দুই নেতাই বিশ্বাস করেন যে এই বৈঠক বৈশ্বিক অস্থিরতা নিরসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে ট্রাম্প জানিয়েছেন, সিরিয়া যুদ্ধ ও ইউক্রেন সংকট নিয়ে পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন তিনি। পুতিন বলেছেন, জন বোল্টনের সঙ্গে বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পুতিন স্বীকার করেন যে দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কিছুটা শীতল অবস্থায় রয়েছে। পুতিন বলেছেন, মস্কোর পক্ষ থেকে কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করা হয়নি এবং তার দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল দেখা গেছে। নভেম্বরে এশিয়া প্যাসিফিক সামিটের সময় ভিয়েতনামে শেষবার দেখা হয়েছিল পুতিন ও  ট্রাম্পের।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২ জুলাই, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৭
যোহর১২:০৩
আসর৪:৪৩
মাগরিব৬:৫৩
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১৫সূর্যাস্ত - ০৬:৪৮
পড়ুন