সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক অপসারণের ভয় নেই ট্রাম্পের!
শিফারুল শেখ১২ নভেম্বর, ২০১৮ ইং
সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক অপসারণের ভয় নেই ট্রাম্পের!
 

‘দিন বদলের শুরু’— সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার মন্তব্য। গত ৬ নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর টুইটারে তিনি এই মন্তব্য করেন। তার এই মন্তব্য সঠিক হবে কিনা তা ভবিষ্যত্ই বলে দেবে। তবে মার্কিন ভোটারদের অনেকেই বলছেন, নীল ঝড় না উঠলেও কংগ্রেসের ওপর যে কারো একক নিয়ন্ত্রণ থাকলো না সেটাই বড় কথা। আর কূটনীতিকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আর নিজের ইচ্ছামতো চলতে পারবেন না, ব্যালটের মাধ্যমে সেটাই বুঝিয়ে দিয়েছেন মার্কিন ভোটাররা। আগামী দু’টি বছর তাকে ডেমোক্র্যাটদের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সরকার পরিচালনা করতে হবে। তবে ট্রাম্প অপসারণ নিয়ে যেভাবে হুমকির মোকাবিলা করেছিলেন সেই ভয় কেটে গেছে বলেও জয়-পরাজয়ের হিসাব বলছে। 

ট্রাম্পের মন্দ-ভালো: ব্যালটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নাম ছিল না। কিন্তু জয়-পরাজয়ের ভার তাকেই নিতে হচ্ছে। তার দল প্রতিনিধি পরিষদে হেরে যাওয়ার তাকে ভোগাবে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন। শহরের নারী এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের যে অংশটা ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে পাঠিয়েছিল সেখানে প্রত্যাখ্যানের ছবিটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মার্কিন সংবিধানের আর্টিকেল-১ এর সেকশন-২ অনুযায়ী স্পিকার হচ্ছেন প্রতিনিধি পরিষদের সর্বেসর্বা। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা স্পিকার হন। তিনি কংগ্রেসম্যানদের মধ্যে বিভিন্ন দায়িত্ব বণ্টন করেন। তিনি বিভিন্ন কমিটি ও উপ-কমিটি গঠন করেন। এসব কমিটির চেয়ারপার্সন হন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থেকে। ডেমোক্র্যাটদের জয় মানে প্রতিনিধি পরিষদে তারা ভেটো ক্ষমতা পেলেন। বিল পাস করতে হলে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করেই করতে হবে। তবে স্বাস্থ্য বিল (ওবামাকেয়ার নামে পরিচিত) যে বাতিল হচ্ছে না সেই বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে গেছে মার্কিনিরা। এর আগে ২০১৭ সালে বাতিলের চেষ্টা করেও পারেননি ট্রাম্প। ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আয়কর রিটার্ন দিতে বাধ্য করা (প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া), রাশিয়ার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সম্পর্ক, ট্রাম্পের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাশিয়ার আর্থিক যোগসাজশ, ট্রাম্পের অভিবাসন ও কর সংস্কার নীতি, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ প্রকল্প বাতিল, তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং কয়েকজন মন্ত্রীর বিতর্কিত ব্যয়ের বিষয়ে তদন্তের দাবি তুলতে পারেন। এছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছেলে ট্রাম্প জুনিয়রের রাশিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে তদন্ত করতে পারে প্রতিনিধি পরিষদ। প্রতিনিধি পরিষদে জুডিসিয়ারি কমিটির চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছেন জেরল্ড ন্যাডলার। তিনি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনকে জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসা হবে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অপসারণে সায় দেবেন না প্রতিনিধি পরিষদের সম্ভাব্য স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। তিনি আগেই এই কথা জানিয়েছেন।

মার্কিন সংবিধানের আর্টিকেল-১ এর সেকশন-৩ অনুযায়ী পদাধিকার বলে সিনেটের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। এখানে ক্ষমতা থাকে ভাইস প্রেসিডেন্টের। তিনি কোনো বিষয় নিয়ে বিতর্কের আয়োজন করেন, কমিটি তৈরি করে দেন এবং তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থেকেই আসে। সংবিধানে কোনো নেতার কোনো ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা নির্ধারণ করে দেয় দল। সিনেটে রিপাবলিকানরা কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতাই ধরে রাখেননি, তারা আগের চেয়ে তিনটি আসন বেশি পেয়েছেন যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বড় জয়। এর অর্থ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিচার বিভাগে নিজের মর্জিমাফিক মনোনয়ন দিতে পারবেন এবং সেগুলো নিশ্চিত করাতে সক্ষম হবেন। নির্বাচনের আগে সুপ্রিম কোর্টে ব্রেট কাভানহর নিয়োগ নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলেও সবকিছু সামাল দিয়ে তাকে নিয়োগ দিতে সক্ষম হন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এর আগে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য তিনি তার মনোনীত ৮৩ জনের নিয়োগ নিশ্চিত করতে সক্ষম হন। ফেডারেল বিচারকরা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকেন। ট্রাম্প মনোনীতরা কয়েক দশক ধরে বিচার কাজ পরিচালনা করবেন। এর ফলে হোয়াইট হাউস ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকলেও বিচারকাজ করবেন ট্রাম্প মনোনীতরাই। দু’টি রাজ্যের গভর্নর পদ ট্রাম্পকে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য সুযোগ করে দিয়েছে। কয়েকটি রাজ্য ডেমোক্র্যাটরা দখল করলেও ফ্লোরিডা এবং ওহাইওতে ট্রাম্প মনোনীত প্রার্থীরাই জিতেছেন। এই দু’টি রাজ্যে যথাক্রমে ২৯টি এবং ১৮টি ইলেক্টোরাল কলেজ রয়েছে। এবারই যে কেবল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিনিধি পরিষদে হেরেছেন তা নয়, ঐতিহাসিকভাবেই ক্ষমতাসীনদের ক্ষেত্রে এমনটি হচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার সেন্টার ফর পলিটিক্স জানায়, ১৯০০ সাল থেকে ২৯টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে মাত্র তিনটিতে প্রতিনিধি পরিষদে জয় পেয়েছিলেন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট।

অপসারণের ভয় কেটেছে ট্রাম্পের: সমালোচনার পরও দমে যাননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরে সন্তুষ্ট তিনি। নিজেই নিজেকে ‘জাদুকর’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘১০৫ বছরে মাত্র ৫ বার সিনেট নিজেদের দখলে রাখতে পেরেছে কোনো ক্ষমতাসীন দল। ভোট কিভাবে টানতে হয়, ট্রাম্প আবার তা দেখিয়ে দিলেন। জাদু জানেন তিনি! রিপাবলিকানরা তাকে নেতা হিসেবে পেয়ে ধন্য হয়েছেন’। ট্রাম্পের এমন দাবির যৌক্তিকতাও আছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেছিলেন, ডেমোক্র্যাটরা বিরাট ব্যবধানে জিতবে। সেটি যে আটকানো গেছে, সেজন্য ট্রাম্পকেই কৃতিত্ব দিচ্ছেন রিপাবলিকানরা। আরো একটা অদ্ভুত সমীকরণ চোখে পড়েছে। নজিরবিহীনভাবে ভোটের আগে ৫০টি নির্বাচনী সভা করেছিলেন ট্রাম্প। তার মধ্যে গত দুই মাসেই ৩০টি। হাউসে ব্যাপক পরাজয় সত্ত্বেও টেক্সাস, ইন্ডিয়ানা, মিসৌরি, ফ্লোরিডা, নর্থ ডাকোটাসহ সিনেট ও গভর্নর নির্বাচনে ট্রাম্প যেখানে প্রচারণা চালিয়েছিলেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই জিতেছে রিপাবলিকান প্রার্থী। সেটাকেই নিজের সাফল্য বলে তুলে ধরতে চাইছেন ট্রাম্প। সিনেটে নিয়ন্ত্রণ থাকায় দেশের নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগীয় পদে নিয়োগ এবং বাইরের দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির রাশ তাই ট্রাম্পের হাতেই থাকলো।

সর্বোপরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যদি ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার সঙ্গে যোগসাজসের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তাকে অপসারণের উদ্যোগ নিতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। তবে তাদের এই উদ্যোগ সফল হবে না। কারণ এজন্য সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার হয় যা ডেমোক্র্যাটদের নেই। কেউ বলছেন, ট্রাম্পকে অপসারণের মতো বিস্ফোরক পদক্ষেপে আখেরে লাভবান হবেন ট্রাম্পই। রিপাবলিকান ভোটাররা তখন একজোট হয়ে তাদের প্রেসিডেন্টকে রক্ষার চেষ্টা করবেন। বিশ্লেষকদের মতে, ফের দায়িত্বে এলে ন্যান্সি পেলোসিকে (৭৮) রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কাজটি করতে হবে সুনিপুণভাবে। প্রয়োজনে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়াতে হবে।    তবে এটাও বোঝাতে হবে যে তার দল কোনো আইন পাস করানোর ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একসঙ্গে বসে কাজ করার ক্ষমতা রাখে। পেলোসি নিজেও দলের জয়ের পর বলেছেন, ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসে এমন সমাধান খুঁজতে কাজ করবে যা আমাদের একজোট হতে সাহায্য করে। বিভাজনের রাজনীতি অনেক হয়েছে। মার্কিন জনগণ শান্তি চায়। কাজ দেখতে চায়।

নিজের প্রজন্মের অন্যতম ক্ষুরধার রাজনীতিক বলে মনে করা হয় ন্যান্সিকে। মূলত ওবামার আমলে ২০১০ সালে বিতর্কিত স্বাস্থ্য বিল ঐতিহাসিকভাবে পাস হয়েছিল ন্যান্সির পরামর্শেই। তা সত্ত্বেও আট বছর পরে অনেকের কাছে তার ভাবমূর্তি ইতিবাচক নয়। কারণ ভোটারদের মধ্যে পেলোসি খুব একটা জনপ্রিয় নন। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দাবি, ভোটারদের এক তৃতীয়াংশ মনে করেন, হাউসে নতুন নেতা নির্বাচন করা উচিত ডেমোক্র্যাটদের। দলের অনেকেও শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন চেয়ে ভেতরে ভেতরে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন কয়েক মাস ধরে। মজার ব্যাপার হচ্ছে ট্রাম্প টুইট করে বলেছেন, প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হওয়া উচিত ন্যান্সি পেলোসির। ডেমোক্র্যাটরা যদি সেটা না চান, আমরা কিছু রিপাবলিকান ভোট যোগ করে দেব। তিনি এতটাই সম্মান পাওয়ার যোগ্য!  

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন