জেগে উঠছে যুদ্ধবিধ্বস্ত মসুল
১২ নভেম্বর, ২০১৮ ইং
জেগে উঠছে যুদ্ধবিধ্বস্ত মসুল

এম এ আলআমিন

 

ইরাকের প্রাচীন নগরী মসুল পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে চলেছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক আগ্রাসন এবং বিশেষ করে জঙ্গি গ্রুপ আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নগরীটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। নগরীর অংশের পুনর্নির্মাণ কাজ কিছুটা এগুলেও অর্থাভাবে নতুন অংশের কাজে গতিশীলতা আসেনি। তারপরও যুদ্ধের ধ্বংসলীলা পেছনে ফেলে জেগে উঠছে মসুল।

মসুলের পুরনো অংশের সার্জখানা স্ট্রিট এক সময় ছোটখাট ব্যবসায়ীদের কর্মব্যস্ততায় মুখরিত থাকত। যুদ্ধের কারণে সব কিছু এক সময় স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। সেখানে এখন আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরতে শুরু করেছে। আগে রাস্তার দুই ধারে শত শত দোকান ছিল। কেউ কেউ সেখানে কয়েক প্রজন্ম ধরে ব্যবসা করেছে। দোকানপাটে ঘেরা রাস্তাটি ছিল মসুলের পুরনো শহরের অন্যতম পরিচিত এবং স্থানীয় প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র। মধ্যযুগ থেকে এলাকাটি ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পরও এলাকাটি মোটামুটি অক্ষত ছিল। ২০১৪ সালে মসুল আইএসের দখলে চলে যায়। ২০১৭ সালে প্রবল রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে আইএস মুক্ত করা হয়েছে মসুলকে। লড়াইয়ের ব্যাপক মাশুল গুনতে হয়েছে মসুলবাসীকে। সার্জখানা স্ট্রিটের দোকানপাট প্রায় পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। অনেক জায়গায় ধ্বংসস্তূপের নিচে বিস্ফোরক পোঁতা আছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে আর্থিক সংকট রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের। বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোও সেভাবে এগিয়ে আসেনি। মসুলের পুরনো অংশের বাসিন্দারা ঝুঁকি নিয়েই পুনর্গঠন কাজ শুরু করে দিয়েছে। চলতি বছর জুলাই থেকে তারা একাজ শুরু করেছে। গত চার মাসে শহরের দজলা নদীর তীরবর্তী অংশের দৃশ্য প্রায় পুরোপুরিই বদলে গেছে।

এদিক দিয়ে পুরনো মসুলের মোহাম্মদ মুয়াফেককে একজন ভাগ্যবানই বলতে হবে। সার্জখানা স্ট্রিট তিনি মেয়ে রিমার নামে একটি ছোট কাপড়ের দোকান চালু করতে পেরেছেন। দোকানটি পুনর্গঠন করতে তার দেড় হাজার ডলার খরচ হয়েছে। তিনি ভাগ্যবান এ কারণে যে লড়াইয়ের ফলে তার দোকান বিধ্বস্ত হলেও ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে নগদ অর্থ ও পণ্য সামগ্রী উদ্ধার করতে পেরেছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, কেউ ফিরে না আসলেও তিনি সেখানে ফিরে যেতেন কারণ চিরচেনা জায়গাটি তার খুবই প্রিয়।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পুরনো মসুলের প্রায় ৮ হাজার ঘরবাড়ি ও দোকানপাট আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু নগরী পুনর্গঠনে সংস্থার কোন সহায়তা এখনও মসুলে পৌঁছেনি। সেখানে এমন কোন পরিবার নেই যেখানে পরিবারের অন্তত একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কোন কোন পরিবারের একাধিক ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ লড়াইয়ে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে ধ্বংসস্তূপের নিচে সব মৃতদেহ এখনও উদ্ধার হয়নি। এক বছর পরও ধ্বংসাবশেষের নিচ থেকে বেরিয়ে আসছে মৃহদেহের অবশেষ। মসুলের গভর্নর নুফাল আল আকুব সম্প্রতি পুরনো শহরের মেরামত করা একটি চায়ের দোকান পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেছেন, ব্যক্তিগত অর্থায়নে নগরীর এ অংশের পুনর্গঠনের কাজ যেভাবে এগিয়ে চলেছে তাতে তিনি অভিভূত। প্রায় আড়াইশ বাড়িঘর এরই মধ্যে মেরামত বা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। পানি ও বিদ্যুত্ সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য সরকার এখনও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অর্থ নেই। বাগদাদের কর্তৃপক্ষ আমাদের আর্থিকভাবে সহায়তা দিচ্ছে না। তাই যাদের সামর্থ্য আছে নগরীর পুনর্গঠন কাজে এগিয়ে আসার জন্য আমি অনুরোধ করছি।’ ইরাকে প্রকট আকারে বিরাজ করছে দুর্নীতি। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটিতে পুনর্গঠন কাজে প্রচুর অর্থ প্রয়োজন, কিন্তু দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার নির্মাণ কাজ বাধাগ্রস্ত করছে। বিষয়টি এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। তাই মসুলের গভর্নর চায়ের দোকানে খুব বেশি লোকের সঙ্গে কথা বলেননি। ‘সরকার কেন অর্থ সহায়তা করছে না’ একজন তাকে এরকম প্রশ্ন করলে উত্তরে তিনি বলেন, ‘উত্তরটা আপনার জানা আছে, আমার মনে হয় আপনারা আমার জন্য সমস্যা তৈরি করতে চান।’ আকুবের সঙ্গে দেখা করতে রাস্তায় ফুটপাতের ওপর বহুলোকের ভিড় জমে যায়, যাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন নারী। বেশিরভাগের হাতেই ছিল অর্থ সহায়তার আবেদন জানিয়ে করা আবেদনের কাগজপত্র। কিন্তু আকুবের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মীরা তাদের তার কাছে ঘেঁষতে দেয়নি। তিনি মাত্র কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে সেই স্থান ত্যাগ করেন। ইন্নাস আবদুল সালাম নামে এক নারী বলছিলেন, ‘তারা আমাদের কথা শোনে না, আমাদের তাদের অফিসে ঢুকতেও দেয় না।’ তার স্বামী স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষের সামান্য একজন চাকুরে। সম্প্রতি তাকে আটক করা হয়েছে। ওই নারী জানেন না কোথায় তার স্বামীকে রাখা হয়েছে। ইউসরা হুসাইন নামে আরেক জন নারী বলছিলেন, তার স্বামীকে ৯ মাস আগে গ্রেফতার করা হয়েছে, কারণ ওয়ান্টেড লিস্টে থাকা একজনের সঙ্গে তার নামের মিল ছিল। তাদের বাড়িটিও ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। ইউসরা বলছিলেন, ‘আমরা পুরনো শহরের বাসিন্দারা অবর্ণনীয় দুর্দশার শিকার’। উপস্থিত অনেক নারী তাদের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরেন। যখন তাদের কাছে এ বিষয়টি পরিষ্কার হলো যে গভর্নর চলে গেছেন, ভিড় ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসে।

চায়ের দোকানের মালিক রিদওয়ান শাকরি বলেন, ‘এক বছর আগে এলাকাটি আইএসমুক্ত হওয়ার পর আমি দোকানটি চালু করি। প্রথম দিকে কাস্টোমার বলতে গেলে আসত না, এখন অনেকে এখানে চা-কফি খেতে আসেন।’ তিনি মনে করেন গত বছর লড়াই শেষ হওয়ার পর প্রায় ৬শ পরিবার নিজেদের ভিটায় ফিরে এসেছে। সংখ্যাটি ২০১৪ সালের আগের জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও কম। বাড়িঘর ও স্বজন হারানোর ব্যথা নিয়েই মানুষ যে ফিরতে শুরু করেছে এ বিষয়টিকে ইতিবাচক মনে করেন শাকরি। তার মতে, যুদ্ধ বিধ্বস্ত এলাকায় নতুন করে জীবন শুরু করার জন্য সরকারি সহায়তা খুব জরুরি।

আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই পুরো নগরীর প্রায় ৫৪ হাজার বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়। নগরী পুনর্গঠনের জন্য ২০১৫ সালে ৪০ কোটি ডলারের একটি সরকারি তহবিল গঠন করা হয়েছিল। এর মধ্যে গত বছর পর্যন্ত পাওয়া গেছে মোটামুটি আড়াই লাখ ডলারের মতো। মসুল মিউনিসিপ্যালিটির প্রধান আব্দুস সাত্তার আল হিব্বু চলতি বছর আরও আগের দিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন তিনি সরকারের কাছ থেকে কোন আর্থিক সহায়তা পাননি। সরকারি সহায়তা ছাড়াই যুদ্ধ বিধ্বস্ত জনপদে জেগে উঠছে প্রাণের স্পন্দন।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন